সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

সকালে ঘুম থেকে ওঠে মোবাইলটা অন করে প্রথমেই ফেসবুকে টু মারা হলো, অনেকেরই দিনের প্রথম কাজ। তারপরই অনলাইনে থাকা আরও আরও সামাজিক সাইটে আনাগোনা-সহ নিজের দৈনন্দিন কাজ শুরু করেন অনেকেই।

কিন্তু নিজের দৈনন্দিন কাজ কোনদিন গোল্লায় গেলেও ফেসবুকটাকে কেউ গোল্লায় যেতে দেয় না। কারণ বর্তমান সময়ে ফেসবুকটা ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বুকের মধ্যিখানে কাঁঠালের আঠার মতো সবসময়ের জন্য লেগেই আছে।

তাই অনলাইনে বিভিন্ন সাইটে সপ্তাহে দু-একদিন প্রবেশ করলেও কারোর কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু মোবাইলে এমবি নামের ইন্টারনেট অথবা ওয়াইফাই সংযোগ থাকলেই ফেসবুক দর্শন করতে হয় খুব সকাল থেকেই।

এর কারণ বর্তমান সময়ে ফেসবুক হলো বিশ্বের জনপ্রিয় এক যোগাযোগমাধ্যম। তা-ও আবার একেবারে সস্তা দরে। যেমন সস্তা আনন্দের বিনোদন। তেমনই সস্তা একে অপরের সাথে খুবই শর্টকাটে যোগাযোগ করার সুযোগ। তা হোক কলে বা মেসেঞ্জারে বা ভিডিও কলে।

তাই বর্তমান সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যম হলো এই ফেসবুক। এই ফেসবুক যোগাযোগ মাধ্যমে আছে অনেককিছু। আছে আনন্দ, নিরানন্দ, হাসি-কান্না, জয় এবং ভয়-সহ সবকিছুই।

আনন্দের কারণ হলো, একজন মানুষ নতুন একটা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল বাজার থেকে কিনে প্রথমেই ফেসবুকে সাইন আপ করে ফেলে। তারপর লগইন। লগইন করা সম্পন্ন হলেই ফেসবুক নিজে থেকে কিছুসংখ্যক ফেসবুক ব্যবহারকারীর তালিকা দেখায়। সেই তালিকায় বেশিরভাগ ব্যবহারকারীই থাকে নিজ এলাকার এবং ঘনিষ্ঠ পরিচিত ব্যক্তিবর্গ। তখন নতুন লগইন করা ফেসবুকার নিজ এলাকার মানুষের তালিকা দেখে খুশিতে টগবগিয়ে বেছে বেছে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্টে টাচ্ করে। কিছুক্ষণ পর রিকুয়েষ্ট পাওয়া ব্যক্তিও স্বাচ্ছন্দ্যে রিকুয়েষ্ট গ্রহণ করে। হয়ে গেলো বাল্যবন্ধু বা চিরবন্ধু বা ফেসবুক বন্ধু।

তারপর নতুন ব্যবহারকারী নিজের প্রোফাইলে একটা ছবি আপলোড করে। সেই ছবিটা হোক নিজের, নাহয় হোক গাছপালা বা তরুলতার। ছবি যেটা বা যে রকমই হোক না কেন, ছবিটা আপলোড করার সাথে সাথে ছবিতে কেউ-না-কেউ লাইক দেয়, কমেন্ট বা মন্তব্য লিখে। যেমন: Nice, Good, Beautiful এরকম।

সেই লাইক-কমেন্ট দেখে নতুন ব্যবহারকারী আনন্দের জোয়ারে ভাসে। সেই আনন্দ থেকেই মহানন্দে দিন শেষে রাত জেগে ফেসবুকে একের-পর-এক ছবি আপলোড করা-সহ সারাক্ষণ ঢুঁ মারতেই থাকে। সাথে মাঝেমধ্যে দু’একটা শব্দ লিখে ছোট বড় আকারের স্ট্যাটাসও দিতে থাকে। যাকে বলে পোস্ট। সেই পোস্টে পড়তে থাকে লাইক-কমেন্ট। ব্যবহারকারীও পেতে থাকে ভীষণ আনন্দ। একসময় নিরানন্দেও কাঁদতে থাকে, যেকোনো একটা স্ট্যাটাস বা যেকোনো মন্তব্য করাকে কেন্দ্র করে। তখন আনন্দের জায়গায় নেমে আসে নিরানন্দ!

নিরানন্দের কারণ হলো, আপত্তিকর ছবি বা বিপত্তিকর স্ট্যাটাস বা পোস্ট। যদি হয় কোনও ধর্মগুরু বা কোনো দেবদেবী বা কোনও মহাপুরুষের বিকৃত ছবি, আর যদি হয় ধর্ম অবমাননাকর কোনও স্ট্যাটাস; তাহলেই বাঁধলো বিপত্তি ক্যাঁচাল। সেই ক্যাঁচালে ক্যাঁচালে মনের আনন্দ হারাম হয়ে নিরানন্দে রূপ নেয়। রূপ নেয়া নিরানন্দে পোস্ট দাতা নিজেও কাঁদে, তার সাথে তার কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীরা কাঁদে। কেউ আবার মনের আনন্দে শেয়ারের পর শেয়ার করে হাসতে থাকে।

হাসা হাসির কারণও আছে। সেগুলো হলো, ছবি বা কোনও মজার হাসির লেখা পোস্ট। কেউ যদি একটু অঙ্গি-ভঙ্গি করে একটা সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে, তার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা বন্ধুরা হাহা হিহিহি করে হেসে হেসে মন্তব্য লিখে। কেউ আবার মন্তব্যের ছোট বক্সে হাসির ইমোজি স্টিকারও সেটে দেয়। আবার কেউ যদি একটা মজার কৌতুক লিখে পোস্ট করে, তাহলেও তার ফ্রেন্ড বা বন্ধুরা হাসাহাসি করেই লাইক-কমেন্ট করে লিখে, ‘দারুণ লিখেছেন বন্ধু! আপনার লেখা পড়ে হাসতে হাসতে জীবন যায় যায় অবস্থা।’

এই হাসির মাঝেও দুঃখকষ্ট ও কান্নার উত্তাল ঢেউ লক্ষণীয়। তা হলো, কারো কারোর পোস্টে মৃত্যুর খবরে কেউ কেউ মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে মৃতব্যক্তির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে শোক প্রকাশ করে। আবার কারো কারোর পোস্টে দুঃখের খবর শুনে ব্যতীত হয়। কেউ আবার কেঁদে কেঁদে মন্তব্যের ছোট বক্সে লিখে, “আপনার পোস্ট করা লেখা বা ছবি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না।”

কারো কারোর পোস্ট আবার ভাইরাল হতে হতে ভাইরাসও হয়ে যায়। শেষাবধি সেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশের শহর-বন্দর গ্রাম-গঞ্জের পাড়া-মহল্লায়। আর সেই ভাইরাল থেকে রূপ নেয়া ভাইরাস কেউ-না-কেউ জয় করে ফেসবুকে রাতারাতি হিরো বনে যায়।

কারোর আবার ক্ষয়ও হয়। তা হয়, যদি আপত্তিকর পোস্ট কোনও অশ্লীল পোস্ট একবার ভাইরাস হয়। তখনই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। সেই আতঙ্কে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পোস্টদাতার মনে লাগে ভয়! ভয় মানে ভীষণ ভয়!

এই ভয়ের কারণ হলো, কারও কারও ব্যতিক্রমী কিছু পোস্ট ও বন্ধুত্বের ভালোবাসার আবেগে নিজের অসতর্কতাবশত কিছু মন্তব্য। আরও দশজন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মতো সবারই ফ্রেন্ড লিস্টে কিছু বন্ধু থাকতে পারে, যারা সময় আর সুযোগ বুঝে আপত্তিকর একটা পোস্ট দিয়ে বিপত্তিকর কিছু তেলেসমাতি কাণ্ড ঘটাতে পারে।

আর সেই ঘটা থেকে তেলেসমাতি ঘটনার সূত্রপাতও হতে পারে নিঃসন্দেহে। যদি কিছু ঘটেই যায়, তাহলেই ভীষণ ভয়ের কারণ হতে পারে। আমি ঠিক সেই ভয়ের কথাই বলছি। আর ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টে এতএত ফ্রেণ্ডের মধ্যে ওইরকম দু-এক জন সুযোগসন্ধানী ফ্রেন্ড যে থাকবে না তা-ও কিন্তু নয়! থাকাটাও স্বাভাবিক!

কারণ বর্তমানে ফেসবুকে যেমন সুস্থ স্বাভাবিক সুন্দর মনের মানুষ আছে, তারচেয়ে বেশি আছে অসাধু হীনম্মন্যতা মানুষিক প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীও। সুন্দর মনের মানুষগুলো থাকে জ্ঞানচর্চার সাধনায়, আর অসাধু অমানুষিক প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীরা থাকে গুজব রটানোর সুযোগে আর নিজের স্বার্থ হাসিলের ধান্দায়!

এসব অসাধু অমানুষিক প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীরা ফেসবুকে ঘুপটি মেরে বসে থাকে। এদের নাম ঠিকানা-সহ নিজের প্রোফাইল ছবিটিও থাকে দুই নম্বরি। এরা সহজে ফেসবুকে কোনও পোস্ট করে না। যদিও মাঝেমধ্যে দু’একটা পোস্ট করে, সেটা থাকবে অশ্লীল বা ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট। সেই পোস্ট এরা আরও দশ থেকে পঞ্চাশ জনকে ট্যাগ করে বিপদে বা ফাঁসানোর চেষ্টা করে। তা-ও যদি না করে, তাহলে তারা সবসময়ই ওদের ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা বন্ধুদের পোস্টের উপর রাখে বাজপাখির দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি মোটেও সু-দৃষ্টি নয়! সেই দৃষ্টি একেবারে শয়তানের কু-দৃষ্টি!

তাদের সেই কুদৃষ্টির আড়ালে থাকে তেলেসমাতি রটানোর সুযোগ। মানে গুজব যাকে বলে। তাদের সেই সুযোগটা কাজে লাগায় পোস্টদাতার অসাবধানতাবশত ধর্মের নামে আপত্তিকর পোস্ট বা স্ট্যাটাস শেয়ার করার মাধ্যমে। তাদের টার্গেট থাকে নিজ এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তি, আর নাহয় একজন নিরীহ ব্যক্তি; আর নাহয় তাদের নিজ স্বার্থসিদ্ধি বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য।

এসব লক্ষ্য নিয়েই কিছু-কিছু ফেসবুকার ইদানীংকালে আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে ফেসবুকের একটা স্ট্যাটাস শেয়ার করে অথবা একের-পর-এক ফেসবুক মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। অথচ নিজের ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা প্রিয় বন্ধুটির ভুলবশত করা পোস্ট সংশোধন করার জন্য পোস্টদাতাকে একটিবারও মেসেজ দিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করার উপদেশ দেয় না। বরং আরও আরও শখানেক বন্ধুদের মাঝে বিপত্তিকর স্ট্যাটাস বা পোস্টখানা শেয়ার করে হুলুস্থুল সৃষ্টি করে।

এসবের কারণে যেমন ধর্মকে টানতে হচ্ছে গ্লানি, তারচেয়ে বেশি টানতে হচ্ছে সমাজের বেশকিছু অসহায় মানুষকে কষ্টের বোজা! এই কষ্টের বোজা টানতে টানতে অনেক সুখের সংসার দিন-দিন দুখের সাগরের তলদেশে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সাথে আপত্তিকর পোস্টদাতার পোস্টের কারণে তার নিজ এলাকাটা মুহূর্তে পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। তা হচ্ছে কেবল ফেসবুকে থাকা কিছু অসাধু অমানুষিক প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীদের জন্য। তাই নিজে ভয়ে থেকেও অন্যকে সাবধানে থাকার অনুরোধ করতে হচ্ছে।

অনুরোধ করছি এই কারণে যে, এসব হীনম্মন্যতা অসাধু পরিচয়হীন বন্ধুরা কোনও সময়ই আপনার ভালো চাইবে না। বরং বর্তমান যুগের সেরা সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুকে আপনার ভুলবশত করা একটা স্ট্যাটাস বা একটা পোস্টকে কেন্দ্র করে আপনার নিজ এলাকায় তেলেসমাতি ঘটিয়ে দিবে। এতে এদের একটু বিবেকে বাঁধবে না বরং এরা দূর থেকে আনন্দই পাবে।

তাই সাবধানে থাকুন! এদের থেকে দূরে থাকুন! ভয়কে জয় করুন এবং এদের চিহ্নিত করে আপনার ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে এদের বিদায় করুন। নিজে নিরাপদে থাকুন। নিজে ভয়মুক্ত থাকুন। অন্যকেও শান্তিতে থাকতে দিন এবং সুন্দরভাবে বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করুন, অন্যকেও সুন্দরভাবে ব্যবহার করতে দিন।

ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ।

৭৬৬জন ৩৯জন
0 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য