ফেসবুকের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেলাম করোনা ভাইরাস এর কবলে পড়ে। হঠাৎ সবকিছু বন্ধ।কলেজ,আড্ডা,বন্ধু-বান্ধব,ঘোরাঘুরি। কিরকম দমবন্ধ করা একটা পরিবেশ। মুক্তির উপায় হিসেবে বেছে নিলাম ফেসবুক। আগের আইডিটা নস্ট হওয়ায় বেশ খুশিই হয়েছিলাম।হঠাৎই কস্ট হতে লাগলো। আমার আগের বন্ধু-বান্ধব ছিল খুবই কম,মাত্র সতেরজন। যাদের সাথে অনেকবছর পড়াশোনা করেছি,মধুর সময় পার করেছি, আড্ডাবাজ গ্রুপ একটা আমরা।

যা যাওয়ার তা নিয়ে কস্ট না বাড়িয়ে ভাবলাম আবার নতুন করে শুরু করা যাক । রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করতে গিয়ে তেমন কাউকে পাওয়া গেলনা। আছে আমার অবোধ স্টুডেন্টরা যাদের আমি গায়েই লাগাইনি,অবহেলা করেছি। তারাসহ কিছু অপরিচিত মোটামুটি প্রোফাইল দেখেটেখে এড করলাম। যাত্রা খুব একটা ভালো হলনা।আলু,বেগুন,পটল আর ওমুক তমুকের ছবি দেখে আর কত?

এরপর বাঘা বাঘা একেবারে প্রথম শ্রেনীর কিছু মানুষের ছবি,নাম সামনে জ্বল জ্বল করে ভাসতে লাগল। এ শ্রেনীর আশপাশ দিয়ে ঘুরলেও মনে হয় জীবন স্বার্থক হয়ে গেল। লজ্জা,সঙ্কোচ দ্বিধা হতে হতেই কিছু রিকোয়েস্ট মেরে দিলাম। সাথে এড করলাম কলিগ,পরিবার,পরিজন,আত্মীয়এনাদের। কেউ কেউ একসেপ্ট করল কেউ করলনা। বেশ পেটমোটা একটা তালিকা তৈরী হয়ে গেল।

কাজ যেহেতু নাই তাই ফেসবুক ঘাঁটাঘাটি করাই কাজ।এতে দেখা গেল,কিছু মানুষ আছেন তারা হাগু করার ছবিটাও পারলে পোস্ট করেন। ইরে বাস্ হাজারও লাইক।

কমেন্ট-ভাই ক্লিয়ার হয়েছে তো?

-হ্যাঁ ভাই,হয়েছে ধন্যবাদ।

কেউ কেউ গল্প,কবিতাও লেখেন। আমার মনটাও কেমন লকলকিয়ে উঠল। অনেকদিন লেখালেখি হয়না। জুতমত একখান কবিতা লিখতে পারলে কেল্লা ফতে। সবাই পড়ে বাহবা,লাইক,কমেন্ট করে ভাসিয়ে দেবে। লিখলাম একখান॥ যুগের আলোর “বনলতাসেন”দেখি কি পায়।রুই,কাতলা,বোয়াল একটাও নাই। যা দুএকজন চুনোপুঁটি আমার সেই অবোধ স্টুডেন্ট আর অপরিচিত ম্যাসেঞ্জার বন্ধু। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো কলিগ,বন্ধু-বান্ধবরা বিরহের কবিতায় ভাবতে শুরু করল আমি ভীষন কস্টে আছি। স্বান্তনা দিলেন কেউ কেউ। প্রেমের হলে জানতে চায় দোস্ত,এটা আবার কে? কিংবা খাইছে এতভালো একটা জামাই থাকতে বুড়ি আবার কারও প্রেমের পড়ল নাকি?

আর আমার কিছু পারিবারিক শুভাকাঙ্ক্ষী রীতিমত ভড় কে গিয়ে মাকে এসে বলল,বুবুমেয়ের বয়স এখনও তো শেষ হয়নাই। জামাই দিয়েছ সে তো সারা বছর নদীতে পরে থাকে আর মেয়ে কিসব কথা লেখে টেখে আমার মেয়ে জামাই বলছিল। দেখে রেখ শেষে মুখে চুনকালি না দেয়। মা তো অজ্ঞান হয় হয় অবস্থা। এরপর ল্যাপটপ নিয়ে বসলে কিংবা কারো সাথে ফোনে হাসলেই বিপদ!তিনি আবার কানেও কম শোনেন। কি না কি ভেবে বসেন। আমি রীতিমত লজ্জায় পড়ে গেলাম।

আমার ও আর একবার স্টোক হবার অবস্থা জামাই এর ফোনে।

ফেসবুকের ব্যাপারটা তিনি জানেন কিন্ত আমরা কেউ কারও সাথে এড না। হয়ত তিনি কারও কাছে শুনেছেন তাই আকারে ইঙ্গিতে বললেন তোমার কবিতার খবর টবর কি? বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।

আমাদের বিয়েটা হঠাৎ করেই হয়েছে। কেউ কারও নামও জানিনা।
আমাদের প্রথম কথা হল -আমার নাম জানেন?

-জানার অনেক সময় আছে। তারপরও বল কি নাম?
-এই ধরেন,কবিতা!

মানুষটা তাই ধরেও নিয়েছিল। আমি কবিতা শুনতে চাইলে তিনি বললেন,জীবনে এটা কোন বিষয় না। আর তার এসব পছন্দ না। মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করেছেন তাই আজ এত ভালো অবস্থানে। মেয়েদের দিকে তাকানো, প্রেম এসবের সময় ছিলনা। কবিতা তো অনেক পরের ব্যাপার। আর কবিতা টবিতার লোকজন আধা পাগল হয়। তার এসব  মানুষ পছন্দ না। আমি হতাশ হলাম। জীবনের শুরুটা আর কবিতা দিয়ে হল না। সেদিন থেকেই কবিতার ইতি। যা ছিল লুকিয়ে ফেললাম।

আমি ছেড়ে দেবার পাত্রি না। ভাবলাম হয়ত খুবই খারাপ লিখি তার চেয়ে বরং দুচারখানা ছবিই দেই। পড়ার চেয়ে দেখা সহজ। ছবি পোস্ট করে নিজে টুকুস করে একটা লাইক মেরে পালিয়ে গেলাম। কবিতার কপালে তাও ছিল । সেলফির কপাল বড্ড খারাপ। না তোলার টেকনিক,নাকি চেহারা খারাপ তাই তেমন কিছুই জুটলনা।

অতঃপর

আমার ফেভারিট রাজন আসিফ সোহরাওয়ার্দী স্যার আমার ফেইসবুকে আছেন। স্যার ছবি,কবিতা দেন দেখি, পড়ি। আমাদের এলাকার স্বনামধন্য পরিবারের মানুষ। তার সুবাদেই বোধহয় একটা নাম বারবার চলে আসে “Sabina Yeasmin”। কেমন মায়া মায়া মিস্টি মিস্টি বাচ্চা একটা ছবি। ছবিটার আকর্ষন কেমন ? একঘন্টা কেডস পড়ে দৌড়ানোর পর,একপোয়া ওজন কমিয়ে,বগুড়া দইঘর এর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় যেমন অনুভূতি কাজ করে তেমন। তখন দুচারটে রসমালাই আর পাটিসাপটার জন্য আপনাকে ভেতরে ঢুকতেই হবে। আর সান্ত্বনা স্বরুপ,হোকনা বিকেলে নাহয় একঘন্টা রুমেই নাচানাচি করে ওজন কমাবো।

সেই রসমালাই আর পাটিসাপটার লোভে ঢুকে পড়লাম সাবিনা ম্যাম এর প্রফাইলে। কিছক্ষনের মধ্যেই মাথা ঘোরা শুরু হয়ে গেল। এ মা,এ তো দেখি দুর্দান্ত লেখিকা এবং ব্লগার। বিসমিল্লাহ বলে রিকোয়েস্ট দিয়ে দুদিন ঘুমাতে পারিনি। লেখিকা কখন একসেপ্ট করবে। আশাবাদী মানুষ আমি তারপরও হতাশ হয়ে গেলাম। তিনদিন পর সকালবেলা অভ্যাসবশত ফেসবুকে ঢুকেছি।হায় আল্লাহ! সাবিনা ইয়াসমিন এর লেখা তারমানে একসেপ্ট করেছে।

খুব সাহস করে ম্যাসেঞ্জার এ নক দিলাম, নিজের মনের কথা জানালাম। ছোট্ট পরিচয় হল। জিসান ভাই এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পদার্পণ হল নতুন এক পৃথিবীতে। তারকারাজীতে ভরপুর সে পৃথিবী। আমার কেবলি মনে হতে লাগলো-

“দেখিতে গিয়াছি পর্বত মালা
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু,
দেখা হয়নাই চক্ষুমেলিয়া
ঘরহতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিশের উপরে একটি শিশির বিন্দু”।

এত ভালো লাগে ইচ্ছে করে সব ফেলে পড়ে থাকি। এত ভালো ভালো লেখা। মুগ্ধ হয়ে পড়ি। নিজেও চেষ্টা করছি।তাদের এত সুন্দর সুন্দর মন্তব্যের কোন জবাব খুঁজে পাই না। বুঝে উঠতে সময় লাগবে এবং আমিও একদিন সোনেলা পরিবারে বড় হব। আর কাউকে ভয় পাবনা।পাগল ছাগল যাই হইনা কেন সম্মান নিয়ে বাঁচাই বড় কথা। আর অনেক কৃতজ্ঞতা সাবিনা ইয়াসমিন আপুকে।

স্বল্প সময়ে ফেসবুক অনেকদিল। তবে ফেসবুকবাসি নিয়ে যা হোক মোটামুটি একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে । শেয়ার করলে কি হবে জানিনা। তবে বন্ধু তালিকা অতিব ছোট হবে এটা কনফার্ম। মানে আমারে আজই সব ব্লক মারবে।মারুক,কি আর করা। দুস্টু গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল অনেক ভালো।কি বলেন?

১.অতি উচচ শ্রেনীর মানুষরা আপনাকে চেনেন বলে ফরমালি রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেন। কিন্তু আপনার লেখা টেখা কোন কিছুই দেখতে তাদের আগ্রহ নেই কিংবা দেখলেও মন্তব্য করেন না। কেউ কেউ কেন একসেপ্ট করেন নিজেই জানেন না। কারন সারাদিন অনলাইন থাকেন কিন্ত কোন পোষ্ট দেন না এবং লাইক কমেন্ট করেন শুধু তাদের লেভেল এর মানুষজনদের। হয়ত এটা উচ্চমার্গীয় ব্যাপার স্যাপার। আমার সাধারনের বোঝার বাইরে।

২.এক শ্রেনীর কোন কাম নাই সারাদিন নিজের হাগু,মুতু,ছুচুর ছবি তোলেন আর পোস্ট করেন। এবং হাজার হাজার লাইক কমেন্ট পান। আমি খুঁজে পাই না ক্যামনে?

৩.একশ্রেনী হঠাৎ হঠাৎ কিছু পোষ্ট করেন। কাউকে যেহেতু লাইক কমেন্ট করেন না তাই বিষয় যতই ইম্পর্টেন্ট হোক দশ বিশের বেশি লাইক পান না। প্রথম শ্রেনীর মানুষ তো তাই তার শ্রেনীর দু একজন আর বাকিসব আমার মত তেলবাজ লাইক মারে। আপনি হয়ত কোন কারনে শুধু লাইক না দিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করে বসলেন। মতামত যতই গ্রহণযোগ্য হোক না কেন তিনি মেনে নিতে নারাজ এবং আপনাকে ব্লক মেরে দিলেন।

৪.এনারা রিকোয়েস্ট দেন। আপনি চেহারা ভদ্র দেখলেন কিংবা প্রোফাইল চেক করে একসেপ্ট করলেন। এক মিনিটের মধ্যেই আপনাকে ভিডিও কল দেবে। আপনি হয়ত জরুরী কোন সংবাদ পড়ছেন তাই কেটে দিলেন আবার দিবে,দিতেই থাকবে। রিসিভ করে পরিচয়ের কিছু পরেই বলবে যদি জুনিয়র হন তাহলে জটিল বন্ধু আর সিনিয়র হলে সে বলবে, অনেকদিন থেকেই একজন এক্সপেরিয়েনস সিনিয়র বান্ধবী খুঁজছিলো।

আপনি হবেন কিনা এটা জানার দরকার নেই। আপনার পার্সোনাল টাইমেও ভিডিও কল দেবে॥আপনি না করে দেবার ৩ দিনের মাথায় দেখবেন তার হলুদ সন্ধ্যা কিংবা বিয়ের ছবি দিয়েছে।

৭.এনারা আপনাকে অনলাইন দেখলেই ম্যাসে্নজারে চলে আসবে এবং সেটা মধ্য রাতও হতে পারে। নিজে অনলাইন থেকে আপনাকে বলবে এতরাত জাগলে শরীর খারাপ করবে। কিংবা কেমন আছেন। জামাই ছাড়া ক্যামনে থাকেন কস্ট হয় না? কাল কফি খাওয়া যায় কিনা ইত্যাদি।

৮.এনারা হলেন M N এই টাইপ কেউ। এনারা কাউকে রিকোয়েস্ট দেনও না আবার একসেপট ও করেন না। কিন্তু নিয়মিত খোঁজ খবর নেন। একরকম কাছের মানুষও বলা যায়।

জানতে চাইলে খুব সুন্দর উওর-কি দরকার জরুরী হলে ফোন তো আছেই।

ফাইনালি অভিজ্ঞতার ব্যাপারে লেখা মজা বলতে পারেন।আর আমার ভিআইপি লিস্ট টা অনেক পছন্দের। কস্ট দেবার জন্য নয়।

ভালো থাকবেন।

২৩৭জন ৭২জন
0 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য