ফেসবুকে থাকা হিন্দু ভাই-বোনদের বলছি!

নিতাই বাবু ২২ আগস্ট ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ০৯:৫৪:৪৮অপরাহ্ন সমসাময়িক ২৩ মন্তব্য

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে Sign-up করেছি কয়েক বছর গত হয়ে গেল। গত সাত-আট বছর আগে ফেসবুকের চেহারা যে-রকম দেখেছি, এখন আর সেই চেহারা নেই। ফেসবুকের চেহারা অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে এদেশের অনেক জ্ঞানীগুণীরা ফেসবুক বেশি একটা পছন্দ করতো না। দেশের কবি সাহিত্যিকরা ফেসবুক দর্শন (ভিজিট) করতো না। তাঁরা ফেসবুককে একরকম ঘৃণার চোখেই দেখতো। বর্তমানে ফেসবুক সবার জন্য প্রযোজ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক ছাড়া এখন আর কেউ কিছু বুঝে না।

ফেসবুক এখন সব কাজের কাজী। খবর, বিনোদন, আড্ডা, গল্প, চ্যাটিং, প্রচার, মুহূর্তে বার্তা আদান-প্রদান-সহ দেশ-বিদেশের টাটকা খবর একমাত্র ফেসবুকেই পাওয়া যায়, দেখা যায়, শোনাও যায়। তাই আগে যাঁরা ফেসবুককে আড়চোখে আর ঘৃণার চোখে দেখতো, তাঁরা এখন ফেসবুককে পূজার প্রসাদ হিসেবে বরণ করে নিয়েছে। তাই এখন এই বঙ্গদেশের সব কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে নায়ক-নায়িকা, ক্যাডার, মাস্তান, আস্তিক, নাস্তিক, ধর্মী বিধর্মী-সহ দেশের সমশ্রেণীর মানুষেই ফেসবুক নির্ভর হয়ে পড়েছে।

এর কারণ ফেসবুক বিশ্বের সবার জন্য উম্মুক্ত তাই। ব্যবহারের দিক দিয়েও ফেসবুক মানুষের সুবিধার্থে আগের চেয়ে বর্তমানে অনেক সহজ করে দিয়েছে। রেখেছে নানারকম সুবিধাজনক সিস্টেম বা অপশন। আগে কারোর পোস্টে লাইক দেওয়ার জন্য একটা অপশন ছিল। এখন লাইক-সহ চার-পাঁচটে ইমেজিং অপশন। আগে আলাদা কোনও ফেসবুক মেসেঞ্জার অ্যাপস ছিল না। যা ছিল ফেসবুকের সাথেই ছিল। এখন ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে মেসেঞ্জার অ্যাপের ভেতরে মেসেজ-সহ ভিডিও কল করার মতো সিস্টেমও রাখা হয়েছে। আগে ফেসবুকে পেইজ বা গ্রুপ ছিল না। এখন গ্রুপ-সহ গ্রুপিংও আছে। এসব গ্রুপগুলো কয়েকশো বন্ধু মিলে ব্যবহার করতে পারে। অপরকেও গ্রুপে আসার আহবান জানাতে পারে। বন্ধু তালিকার বন্ধু ছাড়াও গ্রুপে অনায়াসে সদস্য হতে পারে। গ্রুপ পরিচালনায় কয়েকজন মডারেটর থাকতে পারে বা থাকেও। এসব গ্রুপগুলো কবি, সাহিত্যিক, ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, ডাক্তার, দেশের ভিআইপি ব্যক্তিবর্গ-সহ আস্তিক, নাস্তিক, ধর্মী, বিধর্মী অনেকেই তৈরি করে থাকে।

এসব গ্রুপে কবিদের লেখা কবিতা পোস্ট হয়। মানুষে পড়ে। সাহিত্যিক ব্যক্তিরা সাহিত্য নিয়ে পোস্ট করে। সাহিত্যপ্রেমীরা মন্তব্য করে। ভাষাবিদরা ভাষা, বর্ণ, শব্দ, বাক্য, বানান নিয়ে পোস্ট করে। মানুষে বুঝে, শিখে, মন্তব্য করে। রাজনীতিবিদরা দেশের চলমান রাজনীতি নিয়ে পোস্ট করে। মানুষে পড়ে, মন্তব্য করে। ডাক্তাররা মানুষের উপকারের জন্য চিকিৎসা নিয়ে পোস্ট করে। মানুষে পোস্ট পড়ে উপকার পায়। ভিআইপি ব্যক্তিবর্গ তাঁদের কৃতিত্ব প্রকাশে পোস্ট করে। সাপোর্টাররা মন্তব্যে আছি বলে জানান দেয়। আস্তিকরা ধর্ম নিয়ে পোস্ট করে ধর্ম প্রচার করে। ধর্মের অনুসারীরা সাপোর্ট করে, মন্তব্য করে। নাস্তিকরা ধর্মে আঘাত করে পোস্ট করে। আস্তিকরা প্রতিবাদ করে। ধর্মীরা বিধর্মীদের সমালোচনা করে। বিধর্মীরা ধার্মিকদের ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট করে।

এভাবে সময় সময় বিধর্মীদের করা কারোর ধর্মে আঘাত করা পোস্ট ভাইরাল হয়ে যায়। ভাইরাল মানে যত শেয়ার তত ভাইরাল। শেষতক দেশে থাকা মিডিয়ার চোখে। তখন জাত গেল জাত গেল বলে তোলপাড় শুরু হয়। জ্বালাও, পোড়াও, ভাংচুর, মিছিল, মিটিং শুরু হয়। অন্য কোনও ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর পোস্টের সমালোচনা তেমন না হলেও, এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্ম অবমাননাকর কোনও পোস্ট কেউ করলেই মহাবিপদ। ফেসবুকে কিছু বেশি বুঝনেওয়ালা হিন্দু ইউজার আছে, তাঁরা হঠাৎ করে না বুঝেই তাঁদের গ্রুপে বা তাঁদের নিজেদের টাইমলাইনে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে পোস্ট করে। সেই পোস্ট ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে সৃষ্টি হয় আলোচনা সমালোচনা। তারপর ভাংচুর হাঙ্গামা। জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও! কিন্তু কেন? এসব পোস্ট কারা দরকারই বা ছিল কেন?

জীবের সেরা একজন মানুষ হয়ে আরেকজন ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার আমাদের প্রয়োজন কী? আমি মনে করি আগে আমার নিজের ধর্ম নিয়ে ভালো করে বুঝে নেওয়া উচিত। নিজের ধর্ম বিষয়ে শিক্ষা নেওয়াও উচিৎ মনে করি। তারপর নাহয় অন্যের ধর্ম বিষয়ে বন্ধুসুলভ আচরণে পরামর্শ দেওয়া। তাও খুবই সতর্কতা অবলম্বন করে। কারণ, আমাদের সকলের জানা থাকা উচিত একজন মানুষের আর কিছু থাকুক আর না থাকুক, কিন্তু ধর্ম থাকে। সবাইকে বুঝতে হবে মানুষ সব আঘাত সইতে পারলেও, একজন ধার্মিক মানুষ ধর্মে আঘাত সইতে পারে না।

তাই সময় সময় দেখা যায় ফেসবুকের একটা স্ট্যাটাসের কারণে কয়েকটা গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মানুষও মারা যায়। এসব স্ট্যাটাস বা পোস্টগুলো থাকে ধর্ম অবমাননাকর। যা একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ সহ্য করতে পারে না। তাও আবার এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম নিয়ে করা। যা এদেশে বিগত সময়ে অনেকবারই এরকম ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। ঘটনা ঘটিয়েছিল এদেশের ফেসবুক ইউজার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুইএক জন ছেলেপেলে। কিন্তু তাঁরা কেউ জানে না যে, পরের ধর্মকে ছোট করে নিজের ধর্মকে কোনদিনও বড় করা যায় না। অপরের নিন্দা করে যেমন নিজের সুনাম বাড়ানো যায় না, তেমনি অন্য ধর্মকে আঘাত করে নিজের ধর্ম বড় করা যায় না। বরং নিজের ধর্ম অপরের কাছে ঘৃণিত হয়। আর নিজের সহধর্মীরা বা স্বজাতিরা হয় ঘৃণার পাত্র।

তাই ফেসবুকে থাকা সকল সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু ভাই বোনদের অনুরোধ করছি, সামাজিক যোগাযোগ সাইটে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ধর্মে আঘাত করে কোনও স্ট্যাটাস দিবেন না, লিখবেনও না। কোনও গ্রুপে পোস্টও করবেন না। এতে ক্ষতি ছাড়া কোনও লাভ হয় না। আর ক্ষতিটা শুধু পোস্টদাতার একার হয় না। জের টানতে হয় দেশের সকল হিন্দুদের। জেনে রাখুন, একজন সংখ্যালঘু হিন্দু যদি না বুঝে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মে আঘাত দিয়ে পোস্ট করে, তাহলে সেই ফেসবুক পোস্টের কারণে আরও কয়েকশো সহধর্মীদের ক্ষতি হবে। এর কারণ খামখেয়ালিভাবে ভুল পোস্টের ভুল খেসারত।

আবার আমরা এদেশে কিন্তু সংখ্যালঘু। এটা তো একটা নাবালক শিশুও বুঝে। আর একজন সাবালক ফেসবুক ইউজার হয়ে বুঝছেন না কেন? এরকম খামখেয়ালি করবেনই বা কেন? এরকম খামখেয়ালিতে শুধু নিজে নিজের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া ছাড়া তো আর কিছুই নয় বলে মনে করি। সেই আগুনে আরও দশজন পুড়ে ছাই হয়। দোহাই আপনাদের, এভাবে নিজের ঘরে আগুন জ্বালাতে যাবেন না। আপনাদের মনে থাকা উচিত, ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকর পোস্টের কারণে কক্সবাজার রামুর উখিয়ার ঘটনা, আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছির নগরের ঘটনা কী হয়েছিল সেটা মনে রাখা। নিশ্চয়ই একজনের ভুলের কারণে আরও দশজনের ক্ষতি-সহ দশটি বসতঘর পুড়েছিল! তাই ফেসবুকে যেসব হিন্দু ভাই-বোনেরা এসব করে থাকেন, তাঁদের উদ্দেশ্য করে বলছি; আর নয় ফেসবুকে অন্য ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট!


এর চেয়ে উত্তম কাজ হবে আগে বেশি করে নিজেদের ধর্ম (হিন্দু ধর্ম) নিয়ে প্রচার করে প্রসারিত করুন। নিজেই নিজ ধর্মশিক্ষায় সুশিক্ষিত হন। অপরকেও ধর্মশিক্ষা দিন। যেমনটা দেখা যায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মসজিদে মাদ্রাসায়। যা আমাদের সনাতন ধর্মের মাঝে নেই। আমরা হিন্দুরা অর্থের লোভ বেশি করি। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি ভাবি। নিজেদের ধর্মও তো একরকম ভবিষ্যৎ বলে মনে করি। যা এখন আছে, তা খেয়ে-দেয়ে বেঁচে থেকে নিজেদের ধর্মটাকে তো টিকিয়ে রাখতে হবে। তা না করে নিজের ধর্মকে অবহেলা করি। অন্যে ধর্ম অবমাননা করি। তা না হলে আজ আমাদের এই অবস্থা কেন? এই অবস্থা শুধু নিজ ধর্মশিক্ষায় অশিক্ষিত তাই।

আমাদের ধর্ম তো নাকি সনাতন ধর্ম। সনাতন শব্দের অর্থ যদি হয় চিরস্থায়ী বা শাশ্বত ধর্ম; প্রাচীন অপরিবর্তনীয় বা আবহমান প্রচলিত হিন্দু ধর্ম। তাহলে আজ আমাদের ধর্মের জনসংখ্যা শূন্যের কোঠায় দাঁড়িয়েছে কেন? আমি মনে করি এরকম পরিস্থিতি ধর্মের প্রতি আমাদের অবহেলার কারণেই হয়েছে। আমাদের ধর্মের প্রতি ভক্তি আছে ঠিক, কিন্তু বিন্দুমাত্র ধর্মশিক্ষা নেই। ধর্মের প্রতি ভয়ও নেই। ধর্মীয় শিক্ষা দেখি হিন্দু ধর্ম ছাড়া অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের। বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের দেখি জীবনভর বৌদ্ধভিক্ষু সেজে থাকতে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদেরও দেখি একই অবস্থা। তাঁরা ধর্মকে ভক্তি করে। ধর্মজ্ঞান অর্জনের তপস্যা করে। ধর্মগুরুদের আদেশ মেনে চলে।

ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছেলে মেয়েদের দেখি প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা আরবি শিক্ষা বা ধর্মশিক্ষা বই নিয়ে মক্তবে, মাদ্রাসায়, মসজিদে যায়। মক্তবে মাদ্রাসায় গিয়ে ধর্মশিক্ষা শিখছে, ধর্মীয় ভাষা শিখছে। আরবি লেখা-সহ পড়াও শিখছে। ওরা ধর্মশিক্ষায় সু-শিক্ষিত হয়ে মাওলানা হচ্ছে। ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআনে হাফেজ হচ্ছে। ধর্মীয় চিন্তাবিদ হচ্ছে। দেশ-বিদেশে যাচ্ছে। ইসলাম ধর্ম প্রচার করছে। দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে ওয়াজ মাহফিল করছে। মানুষকে বোঝাচ্ছে। সাথে নানাবিধ বুদ্ধি পরামর্শও দিচ্ছে। তা ছাড়াও দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তো পড়ছেই, সকাল সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত। তাও একরকম বাধ্যতামূলক।

আর আমাদের ধর্মের পণ্ডিত, বৈষ্ণব, ঠাকুর, পুরোহিতরা শুধু হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ বলে চিল্লা-চিল্লি করে যাচ্ছে। অথচ হরে কৃষ্ণের অর্থও কারো কাছে বলতে চায় না। বোঝায়ও না। অনেক জায়গায় হরিনাম সংকীর্তন হয়। রামায়ণ পাঠ করা হয়। মহাভারত পাঠ করা হয়। কিন্তু কোথাও হিন্দু ধর্মশিক্ষা দেওয়া হয় না। এদেশে কোনও হিন্দু ধর্মশিক্ষা পাঠশালাও নেই বলে মনে হয়। ধর্ম কীভাবে পালন করতে হবে, আর কীভাবে ধর্ম প্রচার করতে হবে সেই দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতও কোনও ধর্মগুরু নেই। দৈনন্দিন কাজকর্মের মাঝে কীভাবে উপসনা করতে তাও কেউ কাউকে শেখায় না। অথচ মন্দিরে কর্মরত থাকা পুরোহিত নামের ঠাকুরদের দেখি মন্দিরে দুই পা টান করে বসে থাকে, আর কিছু ভক্তগণ এসে পুরোহিতের পায়ের বৃদ্ধ আঙুল চেটে খায়। এতে পুরোহিত মহা খুশি। ভক্তগণও পায় পরম তৃপ্তি। ধর্মের ঘণ্টা মন্দিরে বাজে ঠন-ঠনা-ঠন।

মন্দিরের পুরোহিতের কাছে কেউ ধর্ম বিষয়ে কিছু জানতে চাইলে ওরা মুখ ঘুরিয়ে রাখে। যদি জিজ্ঞেস করে গোসাইজী শিবলিঙ্গ বিষয়ে একটু বুঝিয়ে বলুন। তাহলেই পুরোহিতের মাঠায় বাড়ি পড়ে। প্রশ্নকারীকে বলে, এসব শেখার বয়স এখনো হয়নি। তাই এসব বিষয়ে জানতে চেওনা। এর মানে হলো, পুরোহিত হিন্দু ধর্ম বিষয়ে নিজেই কিছু জানে না। অথচ পূজা শেষে মন্দিরের দেবমূর্তির সামনে থাকা সবকিছু ধুয়ে মুছে গাট্টি ভড়ে বাড়িতে নিয়ে যায়। এতেই বুঝা যায়, ওরা শুধু পূজা দেওয়াই শিখেছে। ধর্ম বিষয়ে ওদের বিশেষ কোনও জ্ঞান নেই। ধ্যান ধারণাও নেই। শতভাগ প্রমাণিত হয় যে, বেশিরভাগ বৈষ্ণব, ঠাকুর, পুরোহিতেরা হিন্দু ধর্মের মর্মকথা কিছু জানে না। তাঁরা শুধু হরিনাম জপতে জানে, আর ঘণ্টা বাজিয়ে দেবমূর্তি পূজা করতে জানে। এছাড়া আর কিছুই জানে না, বুঝেও না। তাহলে ওরা পরকে বুঝাবে কী করে? আর হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও ধর্ম বিষয়ে বেশি কিছু শিখবেই বা কোথা থেকে? এভাবেই হিন্দুরা ধর্ম বিষয়ে থেকে গেল অজ্ঞ। হিন্দুদের ঘরে নতুন করে আসা নতুন অতিথিরাও থেকে যাচ্ছে অজ্ঞ। তাই সনাতন ধর্ম প্রাচীনকাল অতিক্রম করে আজকালকার সভ্যযুগে সনাতন ধর্ম অস্তিত্ব হারানোর পথে।

সনাতন ধর্মের অস্তিত্ব হারানোর পেছনে আরও বেশকিছু কারণও আছে। তা হলো, প্রায়-ঘরের মেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষা নেই। না থাকার কারণে মুসলমান ছেলেদের প্রেমে পড়ে। এরপর নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। হিন্দু ছেলেও মুসলিম মেয়েদের প্রেমে পড়ছে। এরপর নিজের ধর্মকে ঘৃণা করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। কেউ আবার কারোর মুখের মধুর কথা শুনে সপরিবারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। সেদিন এক পত্রিকায় দেখলাম, এক হিন্দু মেয়ে মুসলমান ছেলের সাথে প্রেম করে বিবাহ করেছে। এরপর বাড়িতে এসে মেয়েটার মা-বাবা-সহ ছোটবড় ভাই-বোনদের বুঝিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে ফেলেছে। অথচ ছোট থেকে বড় হয়ে আজ পর্যন্ত দেখিনি একজন মুসলিম ছেলে বা মেয়ে একজন হিন্দু ছেলে মেয়ের প্রেমে পড়ে সনাতন ধর্ম গ্রহণ করেছে। করেনি, দেখিওনি। আর করবেই বা কেন? তাঁরা নিজ ধর্মশিক্ষায় শিক্ষিত, দীক্ষিত। আর আমরা হিন্দুরা আছি যতসব কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে।

আমাদের ধর্মে কুসংস্কারের অভাব নেই। আছে নানারকম ভেদ-বিচার আচার-বিচারও। মানে জাত-পাতের ভেদাভেদ। এরমধ্যে জাত বৈষম্য হলো অন্যতম একটা কুসংস্কার। যা আগেকার সনাতন ধর্মের পণ্ডিতেরা তাঁদের নিজের অস্তিত্ব আর কৃতিত্ব রক্ষা করার জন্য করেছিলেন। এখন ওইসব ধর্মগুরু বা পণ্ডিতগণ না থাকলেও, তাঁদের করা কুসংস্কার নিয়মকানুন গুলো হিন্দুদের মনে প্রাণে সমাজে আলকাতরার লেগে রয়েছে। সেগুলো এমন, যেমন ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব, পুরোহিত-মহারাজ্ঞী, মেথর-মুচি, ডোম-চাঁড়াল, তেলি পাল-কুমার পাল, ভট্টাচার্য-আশ্চর্য, চট্টোপাধ্যায়-মুখোপাধ্যায়। আমি বড় জাত, সে ছোট জাত।

এসব জাত-বেজাতের বিধিনিষেধ থাকার কারণে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষগুলো হিন্দু সমাজে ছোট জাতই রয়ে গেল। দলিতদের আদিযুগ থেকে বর্তমান সভ্য জগতেও হিন্দু সমাজে দলিতদের ঘৃণার চোখেই দেখে থাকে। তাঁদের চলা-ফেরা, পোশাকাদি, সাজগোছও থাকে ভিন্ন। দলিতদের সাথে হিন্দু সমাজে অন্যকোনো জাত মিশতে চায় না, মিশেও না। তাঁদের জীবনধারণও থাকে ভিন্ন। তাঁরা থাকে হিন্দু সমাজ থেকে আলাদা কোনোএক নির্জন জায়গায়। হয়তো কোনও শ্মশানে, নাহয় কোনোএক সরকারি কোয়ার্টারে। তাও থাকে বস্তির মতন। তাঁরা নাকি ছোট জাত।  তাই হিন্দু সমাজ থেকে তাঁরা দূরে থাকে।

তাই একজন হিন্দু ভাইকে যদি জিজ্ঞেস করি, আপনার জাত কী? উত্তর আসবে আমি ব্রাহ্মণ, আমি পাল, আমি জুগী, আমি কায়স্থ, আমি ডোম, আমি লালবেগী বা মেথর। আর একই প্রশ্ন যদি একজন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জিজ্ঞেস করা হয়, তখন যেকেউ উত্তর দিবে আমি মুসলিম। এতেই বোঝা যায় যে হিন্দু ধর্মের মতো এমন জাত-বেজাতের নিয়মকানুন পৃথিবীর অন্যকোনো ধর্মে বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীদের সমাজে নেই। তাই বেশিরভাগ দলিতরা সনাতন ধর্মকে ঘৃণা করে অন্যসব ধর্মে গ্রহণ করছে।

এসবের জন্য ধর্মশিক্ষাকেও দায়ী করা যেতে পারে। কারণ হলো হিন্দু জনগোষ্ঠী ধর্মশিক্ষার অশিক্ষিত। ধর্মশিক্ষার অভাবে জেনে-না-জেনে, বুঝে-না-বুঝে অনেকেই হিন্দু ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য ধর্মে চলে যাচ্ছে। এভাবে যেতে যেতে আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। তাই আজ হিন্দুরা বিশ্বের বুকে ধর্মীয় জনসংখ্যার দিক দিয়ে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এসব হচ্ছে শুধু ধর্মশিক্ষা না থাকার কারণে। ধর্মশিক্ষা না থাকার কারণে ধর্মের প্রতি দিন দিন মানুষের বিশ্বাসও উঠে যাচ্ছে। ধর্মের প্রতি অনীহা প্রকাশে যে একরকম শাস্তি ভোগ করতে হয়, সেই ভয়ও কারোর মনে প্রাণে নেই। এই সুযোগে অন্য ধর্মাবলম্বীরা হিন্দু ধর্মের উপর বারবার আঘাত হানছে। সেই আঘাত সইতে হচ্ছে, যাঁরা হরিনাম জপে কোনরকম বেঁচে আছে। এসবের মূল কারণই হচ্ছে ধর্মশিক্ষায় অশিক্ষিত হয়ে থাকার কারণ।

যাঁরা ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম বা অন্য ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন, মার খেয়েছেন, ঘরবাড়ি ছাই করেছেন, তাঁরা এবার একটু ভেবে দেখুন! একটু পেছনে ফিরে তাকাক এবং দয়া করে একটু লক্ষ্য করুন! আপনারা অনেকেই ভাবেন যে হিন্দুধর্ম আদি অনন্ত কাল থেকে বিরাজমান। তাই হিন্দু ধর্মকে কেউ আঘাত ও ধ্বংস করতে পারবেনা। আমি এটাতে বিশ্বাসী নই। কারণ, আমি সবসময়ই অতীতকে সামনে রেখে পথ চলি। অতীতের কিছু ভুল বর্তমান এবং ভবিষ্যতে শোধরানোর চেষ্টা করি।

প্রিয় হিন্দু ভাই ও বোনেরা, আপনারা কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছেন আফগানিস্তানের হিন্দুরা কোথায় গেল? এই আফগানিস্তানেও কোনও একসময় হিন্দু ছিল। সনাতন ধর্মের বিস্তার ছিল। অনেক মন্দিরও নাকি ছিল। কিন্তু এখন আর নেই। আফগানিস্তান আর পাকিস্তানে হিন্দুদের কোনও অস্তিত্ব নেই। হিন্দুদের একটা মন্দির পর্যন্ত নেই। আবার ‘গান্ধার’ যার বিবরণ পাওয়া যায় মহাভারতে। যেখানকার নাকি রাণী ছিলেন গান্ধারী। আজ সেই স্থানের নাম কান্দাহার। আজ সেখানেও কোনও হিন্দু নেই। ‘কম্বোডিয়া’ জানা যায়, একসময় সেখানকার রাজা ছিলেন সূর্য্যদেব বর্মন। যিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মন্দির ‘আঙ্কোরভাট’ নির্মাণ করিয়েছিলেন। আজ সেখানে কোনও হিন্দু নেই। হিন্দুদের অস্তিত্ব নেই, কোনও মন্দিরও নেই। হিন্দুদের প্রাচীন কোনও স্থাপনা নেই।

একসময় ইন্দোনেশিয়ার বালিদ্বীপে ৯০% হিন্দু ছিল। এখন সেখানে মাত্র ২০% অবশিষ্ট রয়েছে। তাও কোনরকমভাবে। যেই কাশ্মীর নিয়ে বর্তমানে ভারত পাকিস্তান মারামারি হানাহানি হচ্ছে, সেই কাশ্মীরে ২০ বছর পূর্বেও ৫০% হিন্দু ছিল। এখন সেখানে শূন্যের কোঠায়। আগামী কয়েক বছর অতিবাহিত হলেই মনে হয় কাশ্মীরেও হিন্দুর অস্তিত্ব থাকবে না নিশ্চিত। এমন আরও বিস্তর উদাহরণ দেওয়া যায়, কিন্তু বেশি উদাহরণ টেনে কাউকে ক্লান্ত করতে চাই না। শুধু সব হিন্দুদের মাঝে ছোট্ট একটা প্রশ্ন রাখতে চাই। প্রশ্ন হলো, আমাদের সনাতন ধর্মের অবস্থা এমন হলো কেন? এখনো বা এই অবস্থা কেন? এখন হয়তো প্রশ্নের উত্তর আসবে জানি না। আমি মনে করি এই অবস্থার জন্য আমরা নিজেরা এবং ধর্মের ধর্মগুরুরা দায়ী।

এই অবস্থার সৃষ্টি হতো না। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাও কমতো না। যদি সনাতন ধর্মের ধর্মগুরু বা ধর্ম পন্ডিতগণ ইসলাম ধর্মের নবীদের মতো খেয়ে-না-খেয়ে কষ্ট করে দেশবিদেশে ঘুরে ঘুরে সনাতন ধর্ম প্রচার করতেন। আর ধর্মশিক্ষা দিতেন। কিন্তু না, তা তাঁরা করেননি। কোনও হিন্দু মহাপুরুষ দেশবিদেশে ঘুরে ঘুরে সনাতন ধর্ম প্রচারে নামেননি। তাঁরা ধর্ম পণ্ডিত, তাঁরা ধর্মগুরু। তাঁরা শুধু ঘরে বসে বসেই হরিনাম জপেছেন। আর হরিনাম সংকীর্তন করেছেন। বিস্তর শাস্ত্রগ্রন্থ লিখেছেন। কিন্তু হাতে কলমে আসল ধর্মশিক্ষা দেননি। এখনো তাঁরা যদি দেশের প্রতিটি মন্দিরে, প্রতিটি আশ্রমে, প্রতিটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে হিন্দু ধর্মশিক্ষা দেওয়া শুরু করে, তাহলে ভবিষ্যতে বেশকিছু সনাতন ধর্মাবলম্বী ধর্মশিক্ষায় সু-শিক্ষিত হবে।

তা হয়তো তাঁরা কোনদিন করবে না। তাঁরা হিন্দু ধর্ম প্রচারেও কোনদিন নামবেন না। তাহলে আমাদের নিজের ঘর নিজেদেরই সাজাতে হবে। আমাদের করতে হবে, দেশের প্রতিটি মন্দিরে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা সবার জন্য ধর্মশিক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ধর্মশিক্ষায় শিক্ষিত এমন পণ্ডিত একজন করে প্রতিটি মন্দিরে রাখতে হবে। ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজের লেখা-পড়ার পাশা-পাশি ধর্মশিক্ষাও বাধ্যতামূলক করতে হবে। ধর্মীয় ভাষা সংস্কৃত ভাষা শিখতে হবে, পড়তে হবে। তা কী এই বিশ্বে, এই দেশে কখনো হবে? মনে হয় না। মনে হয় তা আর হবার আশংকা নেই। আশংকা আছে এভাবে চলতে থাকলে কোনো এক সময় হিন্দু ধর্ম একেবারে বিলুপ্তি হবার। এছাড়া আর কী? কাজেই সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে ধর্ম নিয়ে বাদ প্রতিবাদ না করে, আগে আমাদের নিজেদের ধর্ম জানতে হবে, শিখতে হবে। নিজ ঘরের সন্তানাদি ধর্মশিক্ষায় সু-শিক্ষিত করতে হবে। তাহলেই একদিন-না-একদিন মরা গাছে ফুল ফুটবেই ফুটবে। সনাতন ধর্মও নতুন করে জাগ্রত হবে। আর না হলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

বি:দ্র: কিছু ভুল হলে বা কারোর পবিত্র মনে আঘাত লাগলে আমাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে নিয়ে ক্ষমা করে দিবেন।

১৮৭জন ২০জন
12 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য