প্রিয় শমশেরনগর চা’ বাগান,

কেমন আছো তুমি? তোমার উঁচু-নীচু টিলায় জন্মে থাকা চা গাছ, চায়ের পাতার ঘ্রাণ, ধূলো-কাদা মাখা পথ, সবুজ মাঠ, মাঠের চারদিক ঘিরে বাগান স্টাফদের বাসা, বিশাল বড়ো সেই দশ আর ছয় নম্বর লেক, গলফ ফিল্ড, নীল আকাশ, বাগান লাইনে বসবাসরত চা’ শ্রমিক, মসজিদ, একটা খুব ছোট্ট গির্জা, কালভৈরব দেবতা- মা দুর্গা মন্দির, আর নেপালের মন্দিরের আদলে সেই শিবমন্দির, তাদের সবাইকে নিয়ে তুমি সেই আগের মতোই ভালো আছো তো? নেপালি মন্দিরের আদলে গড়া ওই শিবমন্দিরের ছবি বহু পর্যটক এসে তুলে নিয়ে যেতো। আচ্ছা আমাদের সেই আনন্দমাখা বাসাটাকে কেমন রেখেছো তুমি? এখনও কি সেভাবেই আন্তরিক সময় দিয়ে মাতিয়ে রাখো সন্ধ্যাবেলাকে? বৃষ্টি তার নূপুর পড়ে টিনের চালে নেচে বেড়ায়? ঝমঝম শব্দ করে পড়া বৃষ্টির জল গান গেয়ে ওঠে কি? ভোরের উঠোনে শিউলি গাছের নীচে কি এখনও বিশাল পাটি পাতিয়ে রাখা হয় ফুল কুড়োনোর জন্য? আমাদের সাতসিঁড়ি দিয়ে বাঁধানো সেই তুলসী বেদিটা, যা শুধু সন্ধ্যা পূজোর জন্যই নয়, স্টাফ কোয়ার্টারে কারো জ্বর এলেই ঔষধ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তুলসী গাছের থেকে খুব বেশী দূরে নয় ওই যে মেহেদি গাছ, সেটা কি আছে? যেদিন গাছটাকে এনে নিজের হাতে লাগাই, কে জানি একজন এসে বলেছিলো হিন্দু বাড়ীতে মেহেদী গাছ লাগানো ঠিক না। সেসব কথাকে কেউ পাত্তাই দেইনি। ওদিকে ছোট্ট সেই মেহেদী আর তুলসী গাছ একই সাথে ডালপালা ছড়াতে লাগলো। তবে বহুদিন ছোট্ট মনে এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজে গেছি, গাছ কিভাবে হিন্দু আর মুসলমান হয়! তার উত্তর পেয়েছিলাম অনেকগুলো বছর পরেই। একবার কিছুক্ষণের জন্য সেই বাসায় গিয়েছিলাম, সময় ছিলো খুবই কম। ভেতরের উঠোনের দিককার বারান্দায় দাঁড়ালাম, দেখি তুলসী বেদি নেই, আর সেই তুলসী গাছ…নেই! তবে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে মেহেদী গাছটা। পথের পাশে অযত্নে পড়ে থাকা গাছটিকে তুলে নিয়ে এসেছিলো এই হিন্দু মেয়েটি। তারপর আর কিছুই দৃষ্টিকে দেখতে দেইনি। যদি কোনো আঘাত পেয়ে যাই, তাহলে?

আমি জানিনা কেন এখনও তোমাকে মনে করি! এমন এক সবুজ বন্ধনে আটকে আছি, আমার চোখে আর কোনো সবুজ লাগেনা, একই আকাশ তোমার কাছে, এখানেও। তাও দীর্ঘদিন বাস করার পরেও এই আকাশকে অপরিচিত মনে হয়। এখন বুঝি দেশভাগ হবার পর সেই সব মানুষদের যন্ত্রণা। প্রিয় শমশেরনগর চা’ বাগান জানো আমি কতোগুলো দেশ ঘুরেছি? অঢেল সৌন্দর্য দেখেছি, ডুয়ার্সের গহীন সবুজের ভেতর চায়ের বাগান,  নাহ টানেনি আমায়। অনেকগুলো দেশের আরণ্যক সৌন্দর্যে রাত কাটিয়েছি, অথচ আমার মনে পড়তো তোমার ছোট ছোট টিলা, আর পথের দু’পাশে বড়ো বড়ো রেইন ট্রি, শিরিষ গাছগুলোর কথা। চলতি পথে বৃষ্টি এলে গাছের নীচে দৌঁড়ে চলে যেতাম। তোমার ওই আকাশের মতো আমার এখানেও একটা আকাশ আছে। রাতের বেলায় অবশ্য তারা দেখতে পাওয়া যায়না, কৃত্রিম আলোর দাপটে বহু দূরের নক্ষত্রগুলো হেরে যায়। তাতে কি! ঘর অন্ধকার করে দিয়ে শুয়ে থাকলে দেখি জ্যোৎস্নার আলোয় ভিঁজে যাচ্ছে আমার বিছানা। আচ্ছা শুনেছি তোমার পথঘাট এখন খুব সুন্দর? আগের মতো নাকি আর বড়ো পুকুর, ছোট পুকুর তৈরী হয়না শ্রাবণের বৃষ্টিতে?  প্রকৃতি দিনকে দিন হেরে যাচ্ছে কৃত্রিমতার কাছে।

তোমার ওই সবুজ মাঠ বর্ষাকালে কি কাদা কাদা হয়ে যেতো, চৈত্র মাসে তো একেবারে সব হলুদ। ঘাস দেখাই যেতোনা। অযত্নের দাগ তোমার সারা শরীরে। বিকেলে ফুটবল খেলা চলতো, দেশের ফুটবলের কি খারাপ অবস্থা, অথচ ওই মাঠের খেলা দেখলে মনে হতো কোনো একদিন আমাদের দেশ নিশ্চিত বিশ্বকাপে খেলবে। ক্রিকেট খেলাও হতো। তবে ঘরোয়াভাবে আমার ক্রিকেট খেলা হতো যখন ঢাকা থেকে আমার ভাই-বোন, মামারা সবাই আসতো। মনে পড়ে তোমার, আমাকে রাখা হতো দুধ-ভাত করে? বসে থাকতাম যদি সুযোগ পাই খেলার! যদিও জীবনে একটা রানও নেয়া হয়নি, ব্যাট নিয়ে দাঁড়াতাম আর কিভাবে জানি স্ট্যাম্প উড়ে যেতো। আমাকে বল দেয়া হতো, উইকেট পাওয়া তো দূরের কথা, আমার ওভারে কম করে হলেও ৩৬ রান করে ফেলতো বিপক্ষ দল। আর আমাদের বাসার সামনে কোর্ট কেটে সন্ধ্যাবেলায় ব্যাডমিন্টন খেলা হতো, মনে আছে? ওখানে ছেলে-মেয়ে সকলে একসাথে খেলতো, ব্যবধান শব্দটার সাথে পরিচয় হয়নি তখনও। মনে আছে আমার বাপি ব্যাডমিন্টনের পুরো সেট (নেট-লাইট-র‍্যাকেট-ফ্লাওয়ার) কিনে দিয়েছিলো সকলের জন্য? যাতে ছেলে-মেয়েরা অযথা বাজে সময় না কাটায়। সন্ধ্যা থেকে প্রতিদিন খেলা হতো। ওখানে বয়সের  কোনো সীমারেখা ছিলোনা, তাই আঙ্কেল থেকে আপু, ভাইয়া, ছোটরা কেউই বাকি থাকতো না। আচ্ছা শুনলাম এখন নাকি সূর্যাস্ত হবার আগেই মাদকের আসর বসে মাঠের পশ্চিম কোণায়? জানো বেলজিয়ামে রোজ আমি ব্যাডমিন্টন খেলতাম স্পোর্টস সেন্টারে গিয়ে? কতো সুন্দর চারদিক, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, লাইটের পোকা নেই, খেলতে খেলতে ঘেমেও যেতাম না। তারপরেও কেন ওখানে আমি সেই আনন্দ পাইনি?

প্রিয় শমশেরনগর চা বাগান, তুমি যদি দেখতে এখানকার একেকটি লেক কি যে সুন্দর! কিন্তু স্মৃতির বাক্স খুলে গিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় দশ নম্বর লেক। আমি আর আনন্দ নিতে পারিনা। বরং দশ নম্বর লেকের পাড়ে জোঁকে ভরা ঘাসের মধ্যে গিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। পৃথিবীর যেখানেই যাই, আমাকে টানে তোমার মাটি। কোথাও আমার ভালো লাগেনা প্রিয় বাগান। বিকেলের সোনাঝুরি রোদ খুঁজে ফিরি আজও, জানি আর ফেরা হবেনা তোমার কাছে। আজন্ম এভাবেই ভাবনার ভেতরে লুকোচুরি খেলা করেই যাবে। আমার লেখার প্রতিটি পাতা জুড়ে থাকবে তোমারই গল্প। জীবনের একেকটি বেলার কথা। আমার অস্তিত্বে মিশে আছো, থাকবেও। আমার প্রিয় শমশেরনগর চা’ বাগান তুমি কি সত্যি ভালো আছো কৃত্রিমতার মিশেলে আধুনিক হয়ে, বলো তো? অনেক বড়ো হয়ে গেলো চিঠিটা, তাই না? অথচ এখনও অনেক কথাই জানার/বলার বাকি রয়ে গেছে। কোনো আরেকদিন লিখবো হয়তো, কি জানি কি! হয়তো, হয়তো না!!! ভালো রেখো।

হ্যামিল্টন, কানাডা
২০ মার্চ, ২০১৭ ইং।

২৭২জন ২৭২জন
5 Shares

৩৮টি মন্তব্য

  • গাজী বুরহান

    “একটি তুলসী গাছের কাহিনী” গল্পে পড়েছিলাম দেশ বিভাগের পর মানুষের কি অবস্থা ছিল। আরো পড়েছিলাম মোদাব্বের তুলসীগাছ দেখার পর কি হুঙ্কার দিল। “এ বাড়িতে হিন্দুয়ানি সহ্য করা হবে না” ইত্যাদি ইত্যাদি।
    শমশেরনগর চা বাগানে গিয়ে ছিলাম অনেক আগে। অসাধারণ সুন্দর একটি যায়গা। প্রকৃতি যেন তার রূপ-লাবণ্য উপচে দিয়েছে।
    আপনার উপস্থাপন কিন্তু বেশ ভাল ছিল। শুভকামনা..

    • নীলাঞ্জনা নীলা

      সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র লেখা কি যে পছন্দ আমার।
      তবে আমার লেখাটা খুব সত্যি। বাসায় যে কেউ আসতো, বলতো তুলসী বেদীটা নাকি খুবই সুন্দর। আসলে পাশেই ছিলো কামিনী ফুলের গাছ। সারা উঠোন জুড়ে গন্ধে ম’ ম’ করতো বর্ষার সময়। আর আমার রুমের জানালা খুলে দিলে শিউলী গাছ। ছবির মতো বাসাটা ছিলো।

      কবে গিয়েছিলেন? আমি বাগানে ছিলাম ২০০৩ সাল পর্যন্ত। তারপর বাপি চাকরী করেছিলো ২০০৮ সাল পর্যন্ত। আসলে এই লেখাটা মনের গভীর থেকে লিখেছি। আর তাই হয়তো আপনার ভালো লেগেছে।

      ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
      ভালো থাকুন।

  • মিষ্টি জিন

    তোমার চোখে শমশের নগরের সৌন্দর্য দেখলাম।
    পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাইনা কেন এবং সে দেশ যতই সুন্দর হোক না কেন নিজের দেশের মত , জন্মভূমির মত কখনই তাকে আপন মনে হয় না।
    আমার ঢাকার বাসার ছাদে অনেকগুলো তুলসী গাছ আছে। একটাও মেহেদী গাছ নেই।ঐ গাছ গুলোর একটার মালিক আমি ।ঐ বিল্ডিং এ কোন হিন্দু ধর্মালম্বি নেই।তুলসীর ঔষধি গুনের কথা সবাই জানে। আর সুইট বেসিল লিভ ছাডা তো থাই রান্নাই হয় না।
    আমি জানি তো ..চিঠি লেখায় কেউ তোমার সাথে পারবে না। প্রমান করে দিলে তো…

    • নীলাঞ্জনা নীলা

      মিষ্টি আপু তোমার মতো মানুষেরা আছে বলেই তো এখনও অসাম্প্রদায়িক অনুভূতি টিকে আছে।
      আমাদের বাসায় কোনোদিন, কখনো ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়নি। অন্যান্য হিন্দু বাড়ীতে তুলসী বেদী চারদিক দিয়ে বেড়া দেয়া, আমাদেরটা একেবারে খোলা ছিলো। মামনির মতে যাদের মনের ভেতর অপরিষ্কার, তারাই ধর্মের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। মেহেদী গাছ নিয়ে কে একজন জানি এসে বলেছিলো, মামনি বলেছিলো বেদীটা বাঁধানো, তা নইলে তুলসী গাছ আর মেহদি গাছ একইসাথে লাগাতাম।

      এমন একটা পরিবেশে বড়ো হয়েছি, আমার ৯৯% বন্ধু ছিলো মুসলিম। অথচ পূজোতে এসে প্রসাদ খেয়েছে। এমনকি মাছ-মাংস সবই। আজকাল এমন অনেক পরিচিতকেই দেখি হিন্দু বাড়ীতে খায়না। আবার বন্ধুত্বেও ধর্ম চলে এসেছে। আমি জানিনা সামনে আরও কতো কী দেখতে হবে!

      না গো আপু এটা চিঠি নয়, বুকের ভেতর জমে থাকা স্মৃতিগুলোকে উপুড় করে ঢেলেছি এখানে। ওখানে কিন্তু আমার শৈশব নেই, কিশোরী থেকে নারী। যদি আবার যাওয়া যেতো! ভালো থেকো আমার মিষ্টি আপু। -{@

  • মৌনতা রিতু

    দেখলাম মেহেদি গাছ, তুলসী বেদী, সবুজ চা বাগানের মধ্যে বাসাগুলোকে যত্নে রেখেছে।
    লেক! শৈশবের স্মৃতিকে কখনো ম্লান করে না, নতুন কোনো ঠিকানার চাকচিক্য।
    ফুটবল খেলেছো, কখনো?
    এতো সুন্দর করে শুধু তুমিই লিখতে পার।
    জান, আপু, আমার বাসায়ও একটা তুলসি গাছ আছে। রিয়ান মেমনের সর্দী,কাশিতে, আমার শ্বাষ কষ্টতে কি যে উপকার দেয় সে! আমার এমন অনেক জিনিস নিয়ে অনেকেই বিরুপ মন্তব্য করে। কিছু মন্তব্য হেসেই উড়িয়ে দেই কিছু আবার জোর প্রতিবাদ চলে।
    ভাল আছ তুমি?
    ভাল থেকো সারাক্ষন। (3 -{@

    • নীলাঞ্জনা নীলা

      বাগানের বাসায় বলতো দশ নম্বর “বান্ধ(লেক)।”
      মৌনতা আপু শৈশব আমার অন্য আরেক ছোট্ট বাগানে। এখানে আসি ক্লাশ সেভেনে যখন পড়ি। এখানে এসেই প্রথম পরিবেশ নিয়ে লেখা, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা এবং অবশ্যই প্রেমের লেখা। তবে লুকিয়ে। মামনি দেখে ফেলে, বাপি পড়ে বলে “এমন লিখা লেখ আবৃত্তি করার লাগি।” ওহ প্রেমের লেখা নিজের জন্য নয় কিন্তু। আমার একজন সহপাঠি চেয়েছিলো কাকে জানি দেবে। 😀
      বাপির আবৃত্তির জন্য ১৯৮৫ সালে লিখলাম “হে অনন্ত নীড়!”

      এই দেখো স্মৃতি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! মৌনতা আপু ধর্ম তো গাছ দিয়ে হয়না। আমাদের ধর্ম তো মানবতা।
      ফুটবল খেলিনি। তার মানে তুমি খেলেছো? শুনতে চাইইইইইইইই!
      তবে আমি খুব ভালো ছিলাম ব্যাডমিন্টন আর ক্যারমে।

      ভালো আছি গো আপু। আমি যে শান্তসুন্দরীর নীলনদ, ভালো রাখতে জানি। 😀

      ভালো থেকো। আবারও শুভ জন্মদিন। -{@ (3

  • নীহারিকা

    চা বাগানের আনাচ-কানাচ যেন দেখে এলাম আপনার দৃষ্টিতে। সেই কাঁদা মাখা পথ, তুলসী বেদী, সোনাঝুড়ি রোদ …… ঘুরে এলাম যেন আপনার চেনা কোনো পথে।

    চিঠি খুবই সুন্দর হয়েছে :c

    • নীলাঞ্জনা নীলা

      আপনাকে সুস্বাগতম। তবে আমি জানিনা এখন কেমন আছে। তবে প্রকৃতি হেরে গেছে আধুনিকায়নের কাছে। সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকেনা। এতো আলো যে জোনাকির অস্তিত্ব বোঝা যায়না। ২০১৫ সালে গিয়েছিলাম, এক ঘন্টার জন্য। তিরিশ মিনিটও থাকতে পারিনি। বদলটা নিতে পারিনি। তাই পালিয়ে এসেছিলাম।

      তবে আপনার ভালো লাগবে। প্রথম যাবেন তো, তাই!
      অশেষ ধন্যবাদ।

  • শুন্য শুন্যালয়

    দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে পড়া হয়, লেখাও হয় কিন্তু মন্তব্য হয়না। তুমিতো জানো এই মন্তব্যই আমার প্রাণ।
    ছোটবেলায় স্ট্যাম্প উড়ে গেলে কী হবে, এখন ব্যাট হাতে ট্রাই করে দেখো। গোটা এগারো কী, পুরো ২৫ উইকেট ধরাশায়ী হয়ে যাবে, আই প্রমিজ।
    বলেছিলাম আমারে নিয়া লিখতে লিখলা না, দেখি এইবার কে তোমারে প্রাইজ দেয়।
    এই সবজান্তা শমসের ঠিক জানতো এই চিঠি সে পাবে, পুরো চিঠিতেই তাই তার বিজয়ের হাসি।
    এতো ভালো, ভালো না বুঝলে? আমাদেরও দিন আসবে।

    • নীলাঞ্জনা নীলা

      তিলোত্তমা তুমি জানো তোমাকে নিয়ে অর্ধেক লেখা বসে বসে ঝিমুচ্ছে? কিন্তু দেইনি। মন চাইলো না চিঠিটা প্রতিযোগিতায় দিতে।
      ইস প্রাইজ না দিয়া যাইবা কই? জানোনা আমার অস্ত্র কলম? আর ধুত কলম না আমার অস্ত্র আঙ্গুল। এই আঙ্গুল কি করতে পারে জানো? সোনেলায় পোষ্ট দিয়া বিদ্রোহ করতে পারে। 😀

      আর শোনো এতো সুন্দর মন্তব্য করা ঠিক না, বুঝলে? তাহলে কিন্তু তোমার কাছে চলে আসবো। 🙂

      তবে বিশ্বাস করো জীবনে একটা রান করতে পারলাম না, না পারলাম উইকেট নিতে। এতোটাই পরোপকারী আমি। :p

      ভালো রেখো গো আপু। -{@

  • প্রহেলিকা

    সত্যি বলতে চিঠিটি পোষ্ট করার ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যেই নজরে এসেছিল। একটি অলস সময় কাটাচ্ছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে। চাইলেই মন্তব্য করতে পারতাম তখনই। কিন্তু তখন মন্তব্য লিখতে গিয়ে পড়ার যে আনন্দ সেটি নষ্ট করতে চাইনি।

    এই লেখাটিতে মন্তব্য আমার চেয়ে ভালো কেউ করতে পারবে না। কিন্তু আজ হাত চলছেই না একেবারেই। (কান্নার ইমো হবে)

    তবে এটুকু বলছি, আমার বিশ্বাস চিঠি প্রতিযোগিতায় এটি স্থান দখল করে নিবেই। সাফল্য কামনা করি।

    • নীলাঞ্জনা নীলা

      আপনার মন মনে হচ্ছে কিছু এলোমেলো? ভালো আছেন? মানে সুস্থ আছেন?
      কারণ, “এই লেখাটিতে মন্তব্য আমার চেয়ে ভালো কেউ করতে পারবে না” এভাবে বললেন তো, তাই মনে হলো। তবে আপনি যেভাবেই বলুন না কেন শৈল্পিক মন্তব্যই হয়।

      প্রতিযোগিতার জন্য দিলেও, আসলে লেখাটি পুরষ্কার পেয়েই গেছে আপনাদের সকলের ভালো লাগায়।
      শমশেরনগর চা’ বাগান এই জায়গাটি বাবা-মা-সন্তানের মতোই আমার অস্তিত্বকে দখল করে নিয়েছে। আর তাই যে কোনো অবস্থাতেও হেসে উঠতে পারি এখনও।

      ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

    • প্রহেলিকা

      ভালো আছি, অলসতা পেয়ে বসেছল প্রচণ্ড।

      এই লেখাটিতে আবারো ফিরে আসব। লেখা সম্পর্কেতো আগের মন্তব্যে কিছুই বলিনি। আসব আবারো এখানেই।

      • নীলাঞ্জনা নীলা

        আসলে কিছু কিছু মানুষের মন্তব্যে প্রাণ আছে, যা লিখতে এবং ভাবতে সাহায্য করে। শুধু নিজেই লিখে নিজেকেই যদি পড়াতাম, কিছু কি আর শেখা হতো? খাঁটি সমালোচনা নিতে ভালোবাসি। আমাদের শমশেরনগরে অনেক বরেণ্য ব্যক্তিদের আগমন ঘটেছে। আমার মনে আছে সিলেট থেকে বিশিষ্ট কবি দেলওয়ারের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ যখন হলো, উনি আমার লেখা নিয়ে কিছু কথা বলেছিলেন সকলের মধ্যেই। ওইটুকু বয়সে সমালোচনা নিতে মন্দ লাগেনি কিন্তু। আসলে এই শক্তি আমার বাপি-মামনির থেকে পাওয়া। মামনি বলেছিলো “যিনি তোর লেখার সমালোচনা করবেন, মনে রাখিস তিনি-ই তোর প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী।”

        এই দেখুন কি কথা থেকে কোন কথায় চলে এলাম! ধন্যবাদ দেবোনা এভাবে প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন, আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।

  • ছাইরাছ হেলাল

    স্মৃতিবিধুরতা আমাদেরও পেয়ে বসেছে, এটি পড়তে পড়তে।
    আমাদের জীবন কিছু স্মৃতির সমাহার, যা আমরা উল্টে-পাল্টে দেখি, দেখাই,
    কাঁদি-কাঁদাই, হাসি-হাসাই। থেকে যায় স্পর্শের বাইরে।
    এতো চিঠি নয়, তার থেকেও বেশি কিছু।

    শমশেরনগর আপনার সাথেই যেতে হবে দেখছি।

    • নীলাঞ্জনা নীলা

      একেবারে আমার মনের মতো বলেছেন। আসলে এটি চিঠি নয়। এ আমার অস্তিত্বের শেকড়। যেখান থেকে আমি এসেছি, শুধু কি আমি একাই এসেছি? নাহ অনেকগুলো সময়ও এসেছে। যাকে ছাড়া এই আমি কিছুই না। কতো কতো কথা জমে আছে! ভোরের ঘ্রাণ ঘাসের শিশিরে, ওখানেই তো দেখেছি ঘাসের মধ্যে শিশিরের হিরক দ্যুতি! তারপর হীরা আর চোখে লাগেনি। রক্তিম আকাশ দেখার পর থেকে, সমস্ত দিনের মধ্যে গোধূলি বেলা চোখে লেগে গেলো। আকাশের তারাদের সাথে কথোপকথন করতে করতে কবে যে রাত্রি প্রিয় হয়ে গেলো। যেদিন পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথন পড়লাম, মনে হলো তারাদের সাথে আমার কথা হয়, সেও তো কথোপকথন। কালপুরুষ হয়ে গেলো শুভঙ্কর আর আমি নন্দিনী। কেউ যখন জিজ্ঞাসা করে আমার প্রথম প্রেম কে? বলতাম কালপুরুষ। এসব ভাবনা তো আমাকে শমশেরনগর বাগানই এনে দিয়েছে।

      কুবিরাজ ভাই সুন্দর মন্তব্য পেলে লিখতে আনন্দ পাই। লিখিও, এলোমেলো লেখা চলেও আসে। আপনাদের মতো কয়েকজনের মন্তব্যের অপেক্ষায় থাকি। তা নইলে তো জানতে পারিনা লিখতে কি আসলেই পারি নাকি হলোনা কিছুই?

  • প্রহেলিকা

    ব্যক্তিগতভাবে সেসব মানুষগুলোকে বেশ অপছন্দ করি, ঠিক অপছন্দ নয় বলতে পারেন ঘৃণা করি যারা তার শেকড়কে ভুলে যায়। যান্ত্রিকতার মোহজালে অনেকেই শেকড় ভুলে যায়। মোহ শব্দটি ধ্বনিগতভাবেই যেখানে নিষ্প্রাণ সেখানে এই মোহ কার’ই বা বেশিদিন টিকে থাকতে পারে বলুন! একসময় মোহ কেটে যায়, তখন তারা শেকড়ের কাছে ফিরতে চাইলেও অকৃতজ্ঞদের শেকড় আর গ্রহণ করে না তখন। করুণা হয় সেসব মানুষদের জন্য।

    আলোচ্য লেখাটি একটি চিঠি নয়, হেলাল ভাইও বললো তার চেয়েও বেশি কিছু। হ্যা লেখাটির মাধম্যে আপনি আপনার শেকড়ের প্রতি যে আকুলতা সেটিকে মিহি বুননে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। সূর্যশিশিরের মতোন সময় আপনাকে গ্রাস করতে পারেনি। শ্রদ্ধা অবশ্যই জানাই।

    শব্দ আর কতটুকু পারে নিজের মনের মাঝে লীন হয়ে থাকা আকুতিগুলো বুনে দিতে! জানি যতটুকু লিখেছেন শেকড়প্রেমের এক ক্ষুদ্রাংশ কেবল। মাটির প্রতি যাদের এমন টান থাকে উনারা ভালো মানুষদের কাতারে সৰ্বপ্ৰথমেই থাকেন। সময় আমাদেরকে জলের মতো করে তুলে। কখনো সমুদ্রের, কখনো বা গ্লাসের ভেতর স্থির। নড়াচড়া করতে পারি না। তবুও সময়ের এই বৈরীতায় যে শেকড় ভুলে যাওয়া ঠিক না এই লেখাটিই তার প্রমাণস্বরূপ।

    • নীলাঞ্জনা নীলা

      আমার বাপি গল্প করতো, দাদুর নির্দেশ ছিলো স্কুলে যাবার আগে ক্ষেত করায় সাহায্য করতে হবে। ভোর চারটের সময় উঠে বাপি ক্ষেতে লাঙল চালিয়ে সকাল সাতটায় স্নান সেরে, খেয়ে স্কুলে যেতো। বর্ষার দিনে হাটু পর্যন্ত কাদা, স্যান্ডেল হাতে নিয়ে প্যান্ট গুটিয়ে স্কুলে যেতো। বাপি যখন ঢাবি’তে সুযোগ পেলো কিন্তু জীবিকার তাগিদে আর পড়তে পারলোনা, সে কথাও কখনো কারো কাছে লুকোয়নি। চা’ বাগানে বাপি একজন হেডক্লার্ক হিসেবে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর কাজ করেছে। কিন্তু বাপির মতো জ্ঞানী আমি অনেক পিএইচডি-এর মধ্যেও দেখিনি। আমাদেরই একজন পরিচিত বাপিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো বাগানের ম্যানেজার হিসেবে। বাপি বলেছিলো আমার সামনেই “আমি কোনো ম্যানেজার নই।” বাপিকে বললাম ম্যানেজার বললেও কি? ডানকান ব্রাদার্সের এম.ডি গর্ডন ফক্স এলে তো দেখি কেউ একটা শব্দ মুখ থেকে বের করতে পারেনা ইংরেজিতে। বাপি বলেছিলো, “নীলমন রে জীবনেও নিজের আইডেন্টিটি ভুলিস না।”

      প্রহেলিকা আমার যা কিছু ভালো তার সবটুকু মামনি-বাপির থেকে পাওয়া। আর খারাপগুলো শুধুই আমার নিজের।

      আপনার মন্তব্য পড়ার পর আর্দ্র হয়ে গেলো মন। কৃতজ্ঞতা!

  • অপার্থিব

    আজ বেশ কয়েকটি ভাল চিঠি পড়লাম। ঠিকই বলেছেন আজকালকার ছেলেমেয়ে খেলাধুলা আর সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা বাদ দিয়ে প্রযুক্তি পণ্য আর মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। শমসের নগর চা বাগানে যাওয়া হয়নি কখনো, লেখা পড়ে যাওয়ার আগ্রহ জন্মাল।

    • নীলাঞ্জনা নীলা

      বহুদিন পর এলেন। আসলে আপনাদের মতো কিছু মানুষের মন্তব্যের জন্য অপেক্ষা করি।

      একবার বেড়িয়ে আসতে পারেন, তবে এখন আর আমার মনের মতো নেই। ছোট্ট মফঃস্বলটা এখন শহর হয়ে গিয়েছে। শুনেছি বেশ যানজট হয়। ট্র্যাফিক পুলিশও আছে। আবার মাদকের আসরও। শুনেছি সন্ধ্যাবেলায় কোনো মেয়েরা তো বের হয়ই না, এমনকি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যে প্রেম ছাড়া আন্তরিক সম্পর্ক আছে সেটাও নাকি নেই। কেউই সেভাবে কারো সাথেই মিশেনা। অথচ সেই ১৯৮৬ সালের দিকে আমাদের মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলা হতো স্টাফদের ছেলে-মেয়ের মধ্যে, আর আমাদের বাসার ভেতরের উঠোনে হতো কাবাডি খেলা। ছেলে-মেয়ে কোনো ব্যবধান ছিলোনা। এখন কতো আধুনিক হয়েছে, কিন্তু দূরত্ব হয়েছে অনেক বেশী।

      ধন্যবাদ আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য।

      • অপার্থিব

        ব্যস্ততার কারণে খুব বেশি আসা হয়না তবে চোখ রাখি নিয়মিতই। মানুষে মানুষে সম্পর্কের এক ধরনের ব্রান্ডিং হয়েছে। একারনে আজকালকার জেনারেশন সম্পর্ক বলতে নারী ও পুরুষের মধ্যকার প্রেমের সম্পর্কই বোঝে, এই সম্পর্ক শুধু আবদ্ধ হয় ফোন,ফেসবুক,ভাইবার, হোয়াটস আপের মত প্রযুক্তিতে, বলতে পারেন এটা কোন প্রাযুক্তিক প্রেমের সম্পর্ক।

      • নীলাঞ্জনা নীলা

        খুব সুন্দর বলেছেন কথাগুলো।
        যান্ত্রিক প্রেম।

        ব্যস্ততা থাকবেই। তবু শুধু নিজের জন্য সময়টা রাখার চেষ্টা করবেন।

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ