প্রিয় মনি,

তোর নামটার সাথে জড়িয়ে আছে আমার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি। সেই প্রথম যখন আমরা খুলনা বসুপাড়া দাদাদের (আব্বার মামা) বাসায় উঠলাম, তার ঠিক দুই বাড়ি পরেই তোদের বাড়ি। তোর সেই ফ্রকটার রং এখনো আমার মনে আছে। সামনে তুই প্রথম এসে হেসে দিলি। তুই আমি সারাদিন খেলতাম। দিনমান ছুটোছুটি চলতো আমাদের। সুপারি বাগানের ডাগর ডাগর সুপারির মুখ কেটে ওর ভিতর পান দিয়ে কাঠি দিয়ে সেই লাল করা পান আমরা খেতাম। মুখ লাল করে একে অন্যকে দেখাতাম। শুধু রাতটা কাটতো আমাদের নিজেদের ঘরে। আমাদের খাওয়ারও ঠিক ছিল না। দুইজনই দুজনের পরিবারের সদস্য ছিলাম। বড় ভাল ছিলামরে! জীবনের সেই মায়াময় দিনগুলোতে হঠাৎ হঠাৎই আমার আলো ফেলতে ইচ্ছে করে। এই অবসরে আমি একা একা দেখি সবকিছু ছবির মতো। স্পষ্ট টলটলে পানিতে দূরের ঐ নীল সাদা আকাশ যেমন দেখা যায় তেমনই দেখি।
যেদিন আব্বার পোষ্টিং হলো, চলে আসার দিন তুই সারাদিন আসলি না। আমি জানতাম তুই কোথায় ছিলি। আমি ইচ্ছে করেই যাইনি। সেই বয়সেও আমরা এই বিদায় ব্যাথা খুব বুঝতাম তাই নারে! তোর খুবই প্রিয় জায়গা ওটা। কতোদূর হেঁটে হেঁটে আমরা যেতাম। আমরা এতো কথা কোথায় পেতাম বলতো? আমি চলে গেলাম তোকে ছেড়ে। আমার শৈশব ছেড়ে। বাল্য স্মৃতি আমার কষ্টে ঢাকা পড়ল। ওখান থেকে চলে আসার পর, বছরে একবার যেতাম। রিক্সা থেকে নেমেই তোর স্কুলে যেতাম। তুই দৌড় দিয়ে দোতলা থেকে নামতিস। ব্যাগটাও আনতিস না। সুমন ভাই তোর ব্যাগটা নিয়ে আসতো। মনে আছে, আমরা পলিথিনে ব্যাগে বই ঢুকাতাম বর্ষা এলে? আমাদের পাশে চকলেট ফ্যাক্টরিতে কাজ করত কিছু পরিবার থাকতো। দাদা ওদের সাথে আমাদের খেলতে দিত না। তুই আমি চকলেটের লোভেও কিছুটা ওদের সাথে মিশতাম। দু’একদিন তুই আমি চুরি করে ওদের সাথে চকলেট ফ্যাক্টরিতে গেলাম বেশি চকলেটের লোভে। ওসব বাচ্চাদের সাথে আমরাও লাল/সোনালী কাগজে চকলেটের ছোট ছোট বার মোড়াতে লাগলাম। দিন শেষে কোঁচ ভরে চকলেট নিয়ে আসলাম। লুকিয়ে রাখলাম। মুন্নি আপু টের পেয়ে দুজনকেই চুল ধরে দিয়েছিল দু ঘা।
অনেক স্মৃতিই এখন হয়ত ঝাপসা। তবুও এ সুখ স্মৃতি আমাকে বাঁচিয়েও রাখেরে। মানুষের শৈশব আর কৈশোর খুব মজার আর শ্রেষ্ঠ সময়; নির্দোষ, নির্মোহ, নির্মল ডালপালাহীন সরল ঐ বৃক্ষের মতো। মানুষের জীবন বাড়ার সাথে সাথে ডালপালার মতো  সুখ দুঃখ, স্বামী সন্তান গজিয়ে ওঠে। শুধু পার্থক্য একটাই বৃক্ষ তার শুকনো মরমর পাতা ঝেড়ে ফেলে তার শাখা থেকে। আমরা মানুষ পারি না দুঃখগুলো ঝেড়ে ফেলতে।
দাদা মারা যাওয়ার পর থেকে খুলনা যাওয়া একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো। তুই আমি এক আত্মা,  দুই আত্না হয়ে গেলাম। নতুন সহপাঠিদের মাঝে তোর আমার শৈশব কৈশোর একেবারেই হারিয়ে গেলো। স্কুল পেরিয়ে কলেজ জীবন, জীবনের প্রথম প্রেমের অনুভূতি কিছুই তোকে বলা হলো না। আমাদের সময়ে ফোন ছিল না। তোর আমার বন্ধুত্বের মধ্যে আমিই বড় বেভুলারে! হয়ত অনেকটা স্বার্থপর। তোকে কেন খুঁজিনি আর বলতো!
কিন্তু তুই আব্বার কাছ থেকে ঠিকই কেমন করে আমার নাম্বার নিলি। হঠাৎ একদিন তোর কন্ঠস্বর ফোনে। বিশ্বাস কর, বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল। জানিস, আমি ভাষা হারিয়েছিলাম, চোখ ভরে ছিল জলে। সম্পর্কের এই দিকগুলোতে ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেকটা ঠান্ডা আমি, নারে! আমি যে প্রকাশ করতে পারি নারে। ভালবাসা, রাগ অভিমান কিছুই প্রকাশ করতে পারি না। তাই তো এতো চাপা ব্যাথা বুকে। চারিদিকে এতো হাহাকার।
ফোনে তোর প্রথম শব্দ ছিল,”কেমন আছিস?” আমি তোর পরিচয় না জেনেই বললাম,”ভালো আছি।”
বললি,”চিনতে পেরেছিস?” কাপা ঐ কন্ঠে ছিল তোর বড় অভিমান। সেই ৯০ সালের পর ২০১২ চেনা কথা বল!
উত্তরের অপেক্ষা না করে বললি,”আমি মনি, তুই এখন কোথায়? রাতের ট্রেনে আসছি। সকালে স্টেশনে নিতে আসিস।” কোনো প্রশ্ন করতে নিষেধ করলি। কতো অধিকার ছিল তোর ঐ কন্ঠে। সারা রাত আমার উৎকন্ঠায় কাটলো, ঘুম হলো না। কতো স্মৃতি, কতো কথা, কতো প্রশ্ন এসে ভিড় করতে লাগল। প্রথম প্রশ্নঃ তোকে চিনতে পারব তো! কতো কিছুরই তো পরিবর্তন হয়েছে বল! তুই আমি তালপাতার সেপাই ছিলাম। এখন আমি মোটা হয়েছি, মা হয়েছি। নির্ঘুম রাত পার করে তোকে আনতে গেলাম। দুই মেয়ে নিয়ে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, তোর দিকেই আমি এগিয়ে গেলাম। অবাক ব্যাপার, তুই আমি কেউই ফোন দিয়ে কনফর্ম হলাম না তুই মনি কিনা। কোনো পরিচয় দেওয়ার আগেই তুই আমাকে জড়িয়ে ধরলি। সেই চেনা সব কিছু আমার। জানি, তোর ইচ্ছে হচ্ছিল জোরে কেঁদে ওঠার। না, কাঁদতে তোকে দেইনি। স্বার্থপর আমি তাই না!
কতোটা অভিমান জমা হলে এমন করে, দুই হাতের মুঠোয় চারটা ছোট ছোট হাত নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অজানায়! মেঘ যতো গভীর কালো হয় তার বর্ষণও কি ততো ভারি হয়?
তোর তো বর্ষণ হলো। হালকা হলি তুই। মেঘ কেটে রোদ উঠলো তোর আকাশে। আসলেই কি মেঘ কাটে বল?
লাল এক প্রাইভেটকারে স্বামী সন্তান নিয়ে চলে গেলি। আবারো চোখের আড়াল হলি। আচ্ছা তুই কি গাড়ির কাচ গলে আমার কোনো অভিমান জমানো দেখিসনি?
এখন তুই ভাল আছিস তো? আবারো এক ফোনের অপেক্ষায় রইলাম। তবে এবার হাসিমুখে ফোন দিস। ভাল থাকিস।
ইতি
সেই আমি তোর।
১৪/৩/১৭.

১৩০জন ১৩০জন
0 Shares

৪২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ