প্রায়শ্চিত্ত

নীরা সাদীয়া ১২ জুলাই ২০২১, সোমবার, ১০:২৩:৪০অপরাহ্ন অণুগল্প ৬ মন্তব্য

গনি মিয়া একজন আশি বছরের বৃদ্ধ। ওনার স্ত্রী ষাটোর্ধ হালিমা বেগম বিছানায় পড়ে আছেন অনেক দিন হলো। খুব শখ করে তিন রুমের একটা হাফ বিল্ডিং বাড়ি বানিয়েছিলেন। দুই ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে ওনার ছিলো ভরা সংসার। কিন্তু আজ মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা বিয়ে করে যার যার স্ত্রীদের নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। আজ তার ঘর শূন্য। দুটো ঘর খালিই পরে থাকে। একটা ঘরে দুই বুড়ো বুড়ির সংসার।

 

বৃদ্ধা হালিমা বেগমকে সেবা যত্ন করার কেউ নেই।বড় মেয়ে জামাই নিয়ে মাঝে মাঝে আসে এবং মা বাবাকে দেখে যায়। কিন্তু তারও তো সংসার আছে। বিছানার এসব মল মূত্র কেউ পরিষ্কার করতে চায় না, যদিও বা দুই ছেলে বৌদের নিয়ে কাছাকাছি বাসাতেই থাকে। অবশেষে বৃদ্ধ গনি মিয়া তার বাড়ি, দোকান সব ছেলের নামে লিখে দিলেন। তারপর থেকে বড় ছেলের আদেশে বড় বৌ সব দেখাশোনা করতে লাগলেন। কিন্তু মন থেকে নয়, বাধ্য হয়ে। বড় বৌ রান্না করে বুড়ো বুড়ির খাবার দিয়ে যেত। কিন্তু তাদের সাথে কোন কথা বলত না। ছেলেরা বৌদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে একদম ঝাড়া হাত পা। নিজের বাবা মায়ের খোঁজ নেবার কথা তাদের মনেই থাকে না।

 

অযত্নে, অবহেলায় একদিন বৃদ্ধা হালিমা বেগম মারা গেলেন। বৃদ্ধ গনি মিয়া একদম একা হয়ে পরলেন। তার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে গেল। ছেলেবৌ একবেলা খাবার দেয় তো আরেক বেলা দেয় না। বুড়োর কল চাপতে সমস্যা হয়, তাই গোসল করতে পারে না। কেউ কল চেপে দেয় না। এরকমভাবে দিনগুলো চলতে লাগলো। এমন সময় একদিন ছেলেবৌ ভাবলো আর দুটো ঘর তো খালিই পরে আছে, ভাড়া দিয়ে দেয়া যায়। তিনি ভাড়ার ব্যবস্থা করলেন। বুড়োর কোন অমত ছিল না। ভাড়াটিয়া হিসেবে এলো এক নব দম্পতি হাসি ও জামিল। বুড়োর এই অবস্থা দেখে হাসির মায়া লাগলো। সে বুড়োকে যত্ন করতে লাগলো। কল চেপে পানি ভরে দিত, ভালো কিছু রান্না করলে খেতে দিত। ছেলের বৌ খাবার না দিলে সেই খাবার দিত। এভাবে কিছু দিন যাবার পর বুড়োর ছেলে ভাড়া বাড়িয়ে দিল। এক মাসের মধ্যেই পরপর দুবার ভাড়া বাড়ানো হলো। ফলে হাসি ও জামিল এ বাসায় টিকতে পারলো না। বুড়ো অনেক কাকুতি মিনতি করলো যেন তারা এই বাসা না ছাড়ে। তবুও তাদের কিছুই করার ছিল না। তারা বাধ্য হলো বাসা ছাড়তে। বুড়ো আবার একা হয়ে পরলো। ছেলেবৌ একবেলা খাবার দেয় তো আরেক বেলা উপোস। এভাবে একটা বৃদ্ধ লোক কদিন বাঁচতে পারে? কিছু দিন পর একদিন হঠাৎ শরীরটা খুব খারাপ লাগছে দেখে বুড়ো নিজেই রিকশা করে হাসপাতালে গেলো। সেখানে গিয়ে ভর্তি হলো এবং একা একাই মরে পরে রইলো বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে!

 

বুড়োর করুন কাহিনী আমরা সবাই জানলাম। এবার চলেন একটু পেছন ফিরে তাকাই। ৪৫-৫০ বছরের গনি মিয়া দোকান করেন। দোকানের ব্যবসা রমরমা। ১২/১৩ বছর বয়সী মিতা তার দোকান থেকে খাতা, কলম ইত্যাদি কেনে এবং তার টাকা পরবর্তীতে তার বাবা শোধ করেন। মিতা টাকা দিয়ে কিনলেও তিনি বাকির খাতায় তা লিখেন, টাকা না দিলেও লিখেন। মিতার বাবার সৎ উপার্জন, তাই এই টাকা শোধ করতে তার কষ্ট হয়। কিন্তু মেয়ের পড়ালেখা তো বন্ধ হতে পারে না। প্রায়ই গনি মিয়া মিতাকে কালো, বেঁটে এসব বলে খোঁচা দেন। মিতা একটু বড় হবার পর যখন কলেজে উঠলো, তখন তাকে নানা রকম অসভ্য ইঙ্গিত করতেও ছাড়েন না গনি মিয়া। তাই মিতা তার দোকানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তাতেও রক্ষে নেই। এমনকি কলেজ যাওয়া আসার পথে কোথাও মিতাকে দেখলেই বলতেন, “আর কত পড়া লেখা কর? কবে শেষ হবে?” এমন বিষয়টা যেন মিতা তার টাকায় খাওয়া পড়া চালাত। এভাবে দিন যেতে লাগলো। এইচএসসি পাস করে মিতা অনার্স ভর্তি হলো। ইংরেজি নিয়ে পড়তে শুরু করলো। সে অত ভালো ইংরেজি জানত না, কিন্তু তার খুব আগ্রহ ছিল। সে কলেজের স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়তে শুরু করলো। স্যাররা ছুটির দিনগুলোতে বেশি পড়াতেন। তার পাশাপাশি মিতা ক্লাসেও নিয়মিত ছিল। তখন গনি বুড়োর নতুন উপদ্রব শুরু হলো। সে সবার কাছে রটাচ্ছে “এই মেয়েটা রোজ কোথায় যায়? ছুটির দিন কি কোন প্রতিষ্ঠান খোলা থাকে? তবুও মেয়ে কোথায় যায়?” এলাকার লোকও হৈ হৈ করে উঠলো তার সাথে সাথে। তারা তো মেয়ে মানুষের নামে একটু কিছু পেলেই হলো, মুখে মুখে বলতে লাগে। এসব কথা এলাকার লোকজন সবাই জানলো। মিতা যাওয়া আসার পথে গনি বুড়ো এসব বলতো। সে মনে মনে খুব কষ্ট পেত কিন্তু কিছু বলার ছিল না। বললেই কি কেউ বিশ্বাস করবে? তারা তো শিক্ষিতও না, জানেও না কোথায় কিভাবে পড়ালেখা হয়। অথচ তারা কোনদিন মিতাকে কোন ছেলের সাথে দেখেনি, কোন খারাপ জায়গায় দেখেনি। মিতা এমন কিছু করেনি যা মানুষ দেখে মন্দ কথা বলতে পারে। নিজের চরিত্রকে এতটা আগলে রাখার পরেও তাকে খারাপের তকমা পেতে হলো, এটা ভেবেই দুঃখ পেত মেয়েটা। তার কোন ভাই নেই যে সে ভাইকে জানাবে।একটা চরিত্রবান মেয়ের নামে কুৎসা রটালে তার শাস্তি বিধাতা নিজ হাতেই দেন।

 

অনেকেই ভাবেন এটা আর এমন কি। কিন্তু কৈশোর, যৌবনের পুরোটা সময় একজন ছেলে বা মেয়ে একা কাটিয়ে দিয়েছে, নিজ চরিত্রকে ঠিক রেখে চলেছে শুধু এই বিশ্বাসে যে সৃষ্টি কর্তা একদিন নিশ্চই তাকে পুরষ্কৃত করবেন, এটা কত বড় ত্যাগ, তা যারা এর মধ্যে দিয়ে গেছে তারাই শুধু বলতে পারবে। কিন্তু এতটা ত্যাগের পরও যখন চারপাশে মিথ্যা অপবাদ রটে তখন তার মনের অবস্থা কি হয় তা সে জানে আর তার বিধাতা জানেন।

 

শরীরে যখন বল থাকে তখন আমরা যা খুশি তা করে বসি। না জেনে না শুনে মানুষকে আঘাত করে বসি। কারণ আমরা জানি সে হয়ত এর কোন পাল্টা জবাব দিতে পারবে না। কিন্তু এই মানুষকে কে সৃষ্টি করেছেন? একই সৃষ্টি কর্তা… তাই তার পক্ষ থেকে জবাবটাও তিনিই দেন। হয়ত একটু দেরিতে দেন, কিন্তু সে জবাবটা হয় ভয়ানক।

 

বুড়ো গনি মিয়া মারা যাবার পর মিতা একদিন স্বপ্ন দেখল গনি মিয়া নিজের দোকানে বসে মাথা বের করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তখন মিতা খুব ভয় পেয়ে গেলো। ভাবতে লাগলো, “গনি মিয়া তাহলে মারা যায় নি? সে কি আবার আমাকে নিয়ে কুৎসা রটাবে?”

১৩৯জন ৬৭জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ