প্রাক্তন পুরুষের আত্মা

মুহম্মদ মাসুদ ৯ এপ্রিল ২০২০, বৃহস্পতিবার, ১০:৪২:৩০অপরাহ্ন অণুগল্প ১৪ মন্তব্য

জেলখানায় বসে আছে। চেহারাটা বিভৎস। চোখের মধ্যে চোখ ঢুকে গেছে। আর চেহারার মধ্যে শরীর। যে শরীরের প্রত্যেক অংশেই রোগের ভরাডুবি। এক পলক পড়লেই যে কেউ গালি দেবে। গাঁজাখোর। পুরোদস্তুর গাঁজাখোর। যার নেশার পেশায় ডুবে ডুবে কলিজা অবধি পুড়ে ছারখার।
একদম কাচুমাচু অবস্থা। চুলগুলো এলোমেলো অগোছালো। ঠোঁট দুটো কালচে বর্ণ। ছাইপাঁশ পোড়া ঠোঁটের নীলাভ মাংসপেশি। গাল দুটোও দৃশ্য হাড্ডি-গুড্ডিতে পরিপূর্ণ। ছটাক খানিক মাংসও নেই। শুকিয়ে চৌচির।
মুখভর্তি লম্বা দাঁড়ি। ডান কানে রিং লাগানো। চুলগুলো এলোমেলো অগোছালো। দাঁড়ির সাথে কিছুটা মিল থাকলেও অনেক গুলো চুল সাদা। বিশেষ করে দুই কানের দুপাশে।
মানিক। বাসের ড্রাইভার। বাসে বসে গাঁজা টানার সময় পুলিশ ধরে এনেছে। সেই থেকেই থানায় বন্দী।
ও মামা! ও পুলিশ মামা!
কি হয়েছে, বল?
একটা সিগারেট দ্যাওন যাইবো?
কেন? সিগারেট দিয়া কি করবি?
নেশায় ধরছে। আর কুলাইবার পারছি না। সেই রাত্রিবেলায় থেইক্কা একডা কিছুও…।
তাতে কি হইছে? সহ্য কইরা থাক।
না মামা! সহ্যশক্তিতেও কোন কাজকাম অইছইন না। একডা দ্যাওনই লাগবো।
হুমম, তা-না-হয় দিলাম। কিন্তু…।
হ, বুঝছিতো। দেমুনে। এক্ষনেই দেমুনে।
সিগারেট টানছে। হাঁকিয়ে সিগারেট টানছে। এ যেন সিগারেট স্বর্গ। যে স্বর্গরাজ্যে বাসগাড়ি ঠিকই চলে কিন্তু সিগারেটের ধোঁয়া বেশি। আর ধোঁয়ার গন্ধের স্বাদ আহ্লাদে সবাই মাতোয়ারা।
সিগারেটের পর্ব শেষ। দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে মানিক। মাথা নিচু করে কি যেন ভাবছে। আবার বারবার ঝুঁকছে। বুঝা যাচ্ছে না ঠিক। ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত। তাল-বাহানায় ব্যস্ত। ইতিমধ্যে দুজন পুলিশ ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঢুকে দিলেন নতুন কাউকে। মানিক দুচোখ খুললো। মুখে মিষ্টি হাসি। চোখে ঠোঁটে কিছু আনন্দ মিছিল। সত্যি…! এ আনন্দে বিষাদ নেই, ক্লান্তি নেই। বিরহ নেই, বিয়োগব্যথা নেই। আছে শুধু একরাশ নিরুত্তর সূর্যমুখী হাসি।
কি মামা? নতুন আইলেন নাহি।
কোন কথা নেই।
আরে মামা! কথা কওন। কথা না কইলে থাকপেন ক্যামনে?
না, তখনও কোন কথা নেই। যেন যান্ত্রিক যানবাহনের জ্যামে বসে বিরক্ত। চোখেমুখে ঠোঁটে বিলাসিতা নেই। আবার গাঢ় কোন দুঃখও নেই। তারপরও মুখ গোমড়া করে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে রইলো।
মানিক আবার জিজ্ঞেস করলো – কি আকাম-কুকাম কইরা আইছইন? যে মুখ দিয়া কথা কতিও কষ্ট অচ্ছে।
না। এবারেও সন্ধ্যার লোডশেডিং। যে লোডশেডিংয়ে সবার মুখ কালো হয়ে যায়। সাদাকালো, রং ফর্সা মানুষগুলোও কালো আলোকচিত্রের প্রদর্শনী হয়ে যায়।
একটু সুর পাল্টে আবার ডাকতে লাগলো মানিক, কি মিয়া? সিগারেট টানবেন নি। একডাই সিগারেট আছে। ইচ্ছে অইলে দুটান জুটবে। আর যদি…।
কথা শেষ না হতেই লোকটি মানিকের গা ঘেঁষে বসলো। বললো, নাম শরিফুল ইসলাম। তয় সবাই শরীফ বইলাই ডাকে। আপনেও শরীফ কইয়াই ডাইকেন। কোন সমস্যা অইবো না।
সিগারেট টানছে। দুজনেই মিলেমিশে টানছে। যে টানে সম্পর্কের ইতিবৃত্ত রচনা হয়। যে টানের কারসাজিতেই বোঝা যায় এ দুজনের সম্পর্ক হয়তো বহুত দিনের।

৩৫৮জন ২৬৬জন
14 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য