একটা ব্যাপার নতুন করে শব্দ চাতুরিতে প্রকাশ করার কিচ্ছুটি নেই। কন্যা শিশুটির ভ্রূণ থেকে পরিপক্ক রুপে বেড়ে ওঠা এবং ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে তাঁর আনুষঙ্গিক সবরকম অনুষঙ্গ Baby girl  ভিত্তিক হওয়া। দোকানে যদি নবজাত শিশুর জন্য কিছু উপহার কেনার জন্য যাই বা যাবেন! দোকানদার আগেই জিজ্ঞেস করবেন বেবি বয় নাকি গার্ল? সে হিসেবে আমাকে উপহার পছন্দের বিকল্প দেখিয়ে দেবেন। আমিও নারী হয়েই সেই বিকল্প থেকেই বাছাই করে নিই  নিই নবজাত *মানব সন্তান*  টির জন্য খেলনা অথবা পরিধেয় পোষাক। এখানে আমি নিজেও ব্যাতিক্রম হবার চেষ্টা করতেও শুধুই নারীর ভূমিকা পালন করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি ঠিক এই কারনে- ‘আমিও নারীত্বের স্বীকার।’

ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র, পারিবারিক নানা মূখী অনুশাসনের আমিও একজন। নির্বিবাদ যদি বলি! তবে সর্বৈব শান্তি বজায় রইল। নয়ত, নারীবাদী তকমায় আমি বিতর্কের তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলব নিজেরই অজান্তে। সেদিকে যাবার ইচ্ছে বা দুঃসাহস কোনোটাই নেই আমার। সবকিছু ঠিকঠাক থাকুক জায়গা মত। আজ ফ্রেন্ডলিস্টে এক ছোটভাই সম একটা লেখা শেয়ার করেছে দেখে ধৈর্য ধরে লেখাটা পড়লাম। উপরের হেডলাইনটা ই ছিলো এরকম- ★ লেখাটা আমার ফ্রেন্ডলিস্টের – বিশেষ করে- মেয়েদের পড়া উচিত★ স্বভাবতই আগ্রহ বেড়ে গেলো! পড়তে পড়তে কপালের চামড়া কুঁচকাতে কুঁচকাতে ব্যাথা ধরে গেলো। আমার খুব ইচ্ছে করছিলো লেখকের মুখোমুখি হয়ে কতগুলো প্রশ্ন করতে। কিন্তু উপায় নেই বলে তাগিদ এলো মনে কিছু লিখতে। হয়ত গুছিয়ে হবেনা, এলোমেলোই সই।

ওই লেখাটার বিষয়বস্তু ছিলো – “মহিলাদের সন্তান প্রসবের পদ্ধতি নিয়ে” লেখক এখানে কী বোঝাতে চেয়েছেন সে বিষয়ে আমার প্রশ্ন করতে মন চাইছিলো। লেখক এখানে সিজারিয়ান পদ্ধতির ঘোর বিরোধিতা করেছেন সম্পূর্ণ ধর্মীয় পর্দাপ্রথা এবং তৎসংলগ্ন আনুষঙ্গিক সবরকম রকম ফেরে। তার লেখার কিছুটা ছায়া অবলম্বন করে যদি বলি তাহলে কেমন হয়?

***

*বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিজার করা সম্পূর্ণ বেহুদা।

*কিছু ডাক্তারের ব্যাবসা টাকা উপার্জনের।

* এখনকার মেয়েরা গর্ভবতী হবার পরে ফুলেল বিছানায় শুয়ে বসে দিন কাটায় বলেই সিজার দরকার হয়।

* আগের দিনের মা খালারা ১০/১২টা বাচ্চা জন্ম দিয়েও ৮০/৯০ বছর পর্যন্ত কর্মঠ এবং সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি নিয়ে কাটিয়ে গেছেন (আমি বিরোধিতা করছিনা এসব এরকম প্রসঙ্গের )।

* আগের দিনের মায়েদের তুলনায় এখনকার মায়েদের কারণেই পরবর্তী মেয়েরা নিজেদের কারণেই সিজার পদ্ধতির মাধ্যমে বাচ্চা জন্ম দেন বেশি।

মোদ্দা কথায় যে বিষয়টা আড়ালে রয়ে গেছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে, তা হলো সন্তান প্রসবকালীন  জটিলতার বিষয়টা সম্পূর্ণ অলক্ষেই থেকে গেছে। পুরুষ ডাক্তার পর্দা খেলাপ করে কেন নারী চিকিৎসা করবেন? পুরুষ ডাক্তাররা কেন নারীর সিজার করাবেন? পুরুষ ডাক্তার কেন নারীর মেরুদণ্ডে সিজার ইনজেকশন পুশ করবেন? কেন মাসে মাসে চেক আপের জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে? আগের দিনে তো এসব কিছুই ছিলনা। তখন মৃত্যুহারও এত ছিলো না। লেখকের মতে, সিজারের কারণে এখন মৃত্যুহার বেশি। আমার কাছে বিষয়টা বিতার্কিক মনে হয়েছে। জন্মহার এবং মৃত্যুহার জরিপে প্রজন্মের তুলনা করে দেখা গেলে এখানে ভিন্ন চিত্র উঠে আসতে বাধ্য। উপরিউক্ত কোনো পয়েন্টের যথাযথ বিশ্লেষণের ধারেকাছেও যদি যাই তাহলে তর্ক লেগে যাবে অথবা অযথা লেখা দীর্ঘায়িত হবে। আমি বরং ২/১টা বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করতে চাই।

 

শিউলি আপার প্রথম এবং শেষ গর্ভধারণ-

আমি তখন দেড় মাসের গর্ভবতী। রমজান মাসের মধ্যবর্তী সময় শাশুড়ির সাথে ঢাকা থেকে শশুরবাড়ি গিয়েছি। বিয়ের পর থেকেই লক্ষ করে আসছি, আমি পৌঁছুলেই সকাল থেকে রাত ৯ সাড়ে ৯টা অব্দি মানুষজন (বিশেষ করে মহিলা, বৃদ্ধা, মেয়েরা)  দলে দলে আসতেই থাকেন বউ দেখতে। বিয়ের পরে পরে অনেককেই পরিচিত করিয়ে দেয়া হয়েছে। কে কে কেমন আত্মীয় হয়ে থাকেন! শিউলি আপা দূরসম্পর্কের মামাত ননদ হন। বয়সে বড় সম্পর্কে ছোট। আমি আপা বলে সম্বোধন করি। তাতে শশুরবাড়ির অনেকেরই আপত্তি। ছোট কে কেন আপনি/ আপা বলে সম্বোধনে ডাকাডাকি করি। সে যাই হোক; সন্ধ্যার পরে ঘরে মজলিস জমে যেত এককথায়। আমার রুমে আমি অনেকের সাথে হাসিমুখে গল্প করে যাচ্ছি। আমাকে নানাজনে নানারকম উপদেশ, পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন কী কী করা উচিত!  আর কী কী করা উচিত না। ডাক্তারি পরামর্শমতে যেন ভিটামিন ঔষধ না খাই এমন কথাও বলছেন অপেক্ষাকৃত বয়োজ্যেষ্ঠরা। আমার বড় ননাশ হঠাৎ করে বলে উঠলেন–” হ…  বেশি বেশি ভিটামিন খাইয়া শ্যাষে শিউলির লাহান অবস্তা না হয়!” অতি কৌতূহলে প্রশ্ন করে উত্তর পাইনি তখন। উত্তর দিলেন না কেউই তখন। এখানে তাঁদের মানসিক উন্নয়নের কিছুটা পরিচয় রেখেছেন বলে মনে করি। স্বভাবতই আমাকে সবাইই বয়সে বেশ অল্পবয়স্ক ভাবতেন। হয়ত ভয় পাব, হয়ত মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ব।এমনটা ভেবেই তখন আমাকে কেউই শিউলি আপার কাহিনী বলেননি। জেনেছি অনেক পরে।

ফারুক দুলাভাই অনেক ভালবাসতেন শিউলি আপাকে। দীর্ঘ ১৬ বছর বিবাহিত জীবনে অনেক প্রার্থনার পরে মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁদের পিতা/মাতা হবার সুযোগ দিয়েছেন। শিউলি আপাকে দুলাভাই সবরকম সতর্কতায় রেখেছেন। এবং প্রচুর পরিমানে খেয়াল রাখার উদ্দেশ্যে ভিটামিন সহ যাবতীয় পরিমানের ফলফলাদি গিলিয়েছেন আপাকে। গর্ভস্থ সন্তানের সুস্বাস্থ্যের চিন্তায় পরিমিতিবোধ বেমালুম ভুলে গিলে খেয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয়, একবারের জন্যেও চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাননি চেকআপ/ফলোআপের জন্য। যথাসময়ে প্রসব ব্যাথা উঠলে গ্রাম্য সবসময়ের দাই ডেকে আনা হলো। তিনি আবার আমার একমাত্র মামি শাশুড়ি। তিনি ঐ গ্রামের সব মহিলাদের ধাত্রী সেবা দিয়ে আসছেন নির্বিঘ্নে  বহুবছর ধরে। পুরো একদিন একরাত কষ্ট চললো সন্তান পৃথিবীতে আনার। ব্যার্থ হয়ে শেষ রাতে মামি বললেন হাসপাতালের নার্স লাগবে, তার পক্ষে সম্ভব না। নার্সও এসে যথাসাধ্য চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে বললেন বরিশাল মেডিকেলে নিয়ে যেতে। রোগী(শিউলি আপা) ততক্ষনে বেঁহুশ অবস্থা। বরিশাল স্থানান্তরে তখন আর সময় সুবিধা কোনোটাই অবশিষ্ট নেই। তিনদিন কেটে গেছে। হাসপাতালের একজন ডাক্তার অবশেষে অনুমতি পেলেন রোগী পর্যবেক্ষন করার। তিনি এসে কিছুক্ষণ ইচ্ছামত গালাগালি করলেন দুই ধাত্রী  এবং নার্স সহ পরিবারের সব্বাইকে। ততক্ষনে গর্ভস্থ সন্তান আর জীবিত নেই গর্ভে। শিউলি আপা মরো মরো। স্বাভাবিক পদ্ধতিতে সন্তান ভূমিষ্ঠ করার সবরকম রাস্তা বন্ধ। অবশেষে পেট কেটে সেই  অতিরিক্ত ওজনদার মৃত পুত্র সন্তানকে কেটে কেট টুকরো টুকরো করে বের করতে হয়েছে। সাথে শিউলি আপা হারালেন আজীবনের জন্য গর্ভধারণ করার ক্ষমতা।

শিউলি আপা এবং ফারুক দুলাভাই শেষাবধি এক অনাথ কন্যাশিশু দত্তক নিয়ে পিতা/মাতা হবার সুখ অর্জন করেছেন……….

 

বি:দ্র: লেখা বড় হয়ে যাবার কারণে আগামী পর্বে সমাপ্তি।

১৬৮জন ৩৩জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য