প্রশ্নাতীত

জাকিয়া জেসমিন যূথী ১৬ এপ্রিল ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৩:৪২:১১অপরাহ্ন গল্প ২৯ মন্তব্য

 

 

পিচ্চিটা তখন থেকে মৌমাছির মত গুণগুণ করেই চলেছে। আমি কিছুই শুনছি না! ওর কথায় মনযোগ নেই আমার। আমি ভয়ে কেঁচো হয়ে আছি!

 

বিকেলে ভীষণ ক্ষুধায় প্রায় বেহুঁশ হয়ে কি খাবো কি খাবো করতে করতে এ ঘর ও ঘর ঘুরে বেড়ালাম। মাঝেমাঝে ঘরে বৈকালিক নাশতা হিসেবে কিচ্ছু থাকে না! মাথার উপরের সিলিং ফ্যান বন্ধ রেখে জানালা পুরোটা খুলে প্রাকৃতিক বাতাসে সেপ্টেম্বরের তাতানো গরম থেকে রেহাই পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। কোন লাভই হলো না। ফ্যানের পাখাগুলো হাওয়া দিতে দিতে নিজেরাই গরম তাওয়া হয়ে উঠেছে। আরও চালানো হলে কয়েল খুলে নেমে পড়বে। অগত্যা জানালার লক বন্ধ করে এসির সুইচ অন করলাম। এসি অন করতে ইচ্ছে হয় না! দরজা জানালা বন্ধ করে এসি চালু করতেই লাশ কাটা হিমঘরের নিস্তব্ধতা নেমে আসে সবখানে।

তুলোর দুটো বালিশকে বক্স খাটের মাথার কাছে দাঁড় করিয়ে তাতে মাথা এলিয়ে শুলাম। কোমরে অসহ্য বেদনা! শুধু কোমরেই নয় পুরো শরীরে। দু’হাত ও পায়ের রগগুলো তে সুঁই ফুঁটানো যন্ত্রণা! এই সময় লোমশ ভালুক হাতটা খুউব প্রয়োজন। ঐ দুটো বালিশের মত গোবদা হাতে চেপে ধরে থাকলেই একমাত্র এই ব্যথাটা নিরাময় হতে পারে। অসহ্য গরমে আমি ঘেমে নেয়ে উঠেছি। এসি ঠান্ডা হয়ে হিমঘরে রূপ নিতে সময় মাত্র পাঁচ মিনিট। আমার এই সামান্য কটা মিনিটও সহ্য হচ্ছে না! প্রচন্ড গরমের সাথে মিলিয়ে অসহ্য ব্যথায় আমি অবশ হয়ে যাচ্ছি ক্রমশঃ! সেই সাথে চেপে বসছে গভীর ঘুম। দু’চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। চোখের পাপড়ি দুটো ভ্রু এর সাথে সেলাই করে দিলেও এই ঘুম আটকে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু আমার যে ঘুমোবার উপায় নেই। দু চোখের পাতা বুঁজে আসলেই তো! আমি আর ভাবতে পারি না। গা শিউরে উঠে ভাবলেই!

শুয়েছি, কয়েক মুহুর্ত পেরিয়েছে। সোজা হয়ে শুয়ে নিলে কোমরের ব্যথাটা দু-তিন মিনিটেই নিস্তার পেয়ে যায়। অন্তত কিছুটা ঝিমিয়ে আসার কথা। এখন হচ্ছে না! আমার ভয়মিশ্রিত দুঃশ্চিন্তা প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে সবকিছুতেই।

‘ক্রল! ক্রল! আই এম কামিং! ক্রল! ক্রল!’ বাইরের দরজায় বেল বেজে উঠলো। ‘আমাকেই উঠে খুলতে হবে নাকি?’ বিরক্তি আর রাগের আভাসে অজান্তেই আমার ভ্রু কুঁচকে উঠে। আমি উঠব কি উঠবোনা ভাবছি, মুহুর্তের মধ্যেই দরজা খোলার শব্দ কানে এলো। স্বস্তিতে আমি চোখ বুঁজলাম। উঠতে হলো না বলে। কিন্তু স্বস্তিটা মুহুর্তের ভেতরেই গায়েব হয়ে গেলো! চোখ না খুলেই টের পেলাম ও ঢুকেছে। ওর পায়ের শব্দ এমনকি ক্ষুদে নড়াচড়াও আমি টের পাই। খুব বেশি অনুভূতিপ্রবণতায় জড়াচ্ছি দিন কয়েক ধরে। আমার ঘরে তাফালিং রাইসা ঢুকেছে! চরম চঞ্চল একটা মেয়ে! আর কদিন পরেই বয়ঃসন্ধির গণ্ডি শুরু হবে কিন্তু চঞ্চলতা আর দুষ্টুমীর বহরে এখনো বাচ্চা বলে মনে হয়। এখন উৎপাত শুরু না হলেই বাঁচোয়া!

আমার হাতে রগের ব্যথাটা আবার টাটিয়ে উঠলো! আমি আমার খড়ির মত শুকনো দশ আঙ্গুলকে এক মুঠোয় বন্দী করে ব্যথা নিরাময়ের ব্যর্থ চেষ্টায় জড়াই!

 

দুই দিন আগের এক দুপুরে-

‘আম্মাগোওওওওও!’

তীক্ষ্ণ চিৎকারে আমি হতবাক হয়ে গেলাম! কলজেতে খামচি টের পেলাম! এভাবে চিৎকারের অর্থ কি? কণ্ঠ লক্ষ্য করে ছুটে গেলাম। কিচেনের বেসিনের কাছে কলটা ডান হাতে চেপে ধরে বুয়া কাঠ হয়ে আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘চিৎকার করলো কে, রিজিয়া আপা?’

বুয়া ওরফে রিজিয়া আপা ঘুরে আমার দিকে তাকালো। কিন্তু জবাব দিলো না। তার রক্তশুন্য ফ্যাকাশে মুখে চেয়েই বুঝে গেলাম ব্যক্তিটা কে।

কিন্তু চেঁচালো কেন?

বুঝতে পারলাম না!

বুয়াটা নতুন কাজে এসেছে। ভালোই সার্ভিস দিচ্ছে। হাসিখুশী। ভাবছিলাম আরও হাজার খানেক বেতন বাড়িয়ে কিছু কাজ বাড়তি চাপিয়ে দেবো। আমার প্রায় বৃদ্ধা মায়ের কথা বলারও একজন সংগী হবে। আমার নিজেরও আরাম হবে। কিন্তু ও কি দেখে এমন ভয় পেলো? ভাবনার বিষয়। গত দু’মাসে তো কোন সমস্যা হয় নি। তাহলে আজ কেন? আমার ঘরে একটা ইঁদুর, তেলাপোকা পর্যন্ত নেই! তাহলে কি দেখে ভয় পেলো?

 

“চলে যদি যাবি দূরে স্বার্থপর

আমাকে কেন জোছনা দেখালি

হবি যদি নাও ভাসিয়ে দেশান্তর

পাথরের বুকে ফুল কেন ফোঁটালি।

 

আমারই সীমানায় সে তো তোর ছায়া

সেখানে করে বিচরণ দুঃখের নিবাস

রাখিস কি খবর

তোর আঘাতেই জমে গেছে

নীল আকাশের জমিনে নীল বেদনা…”

 

খুব কাছে থেকে গানটা গাইছে কেউ। মিউজিকহীন। নেই শিল্পীর কণ্ঠস্বরের দীপ্ততাও। খোলা গলায় গাইছে কেউ। বিষাদ মাখা স্বরে। কিন্তু কে? কে গাইবে এই গান? চৌহান! হ্যাঁ, তাইতো! এ তো চৌহানের কণ্ঠস্বর। সে কেন? আমি! আমি তো! হ্যাঁ, আমি তো হাঁটছি! গানের গলা দূরে চলে যাচ্ছে। আমিও হেঁটে চলেছি। আয়নাল শিকদারের বাসায় ঘন ফুলের ঝাড়। আমার ফুল প্রয়োজন। অনেক ফুল। আর কেউ আজ এদিকে আসবে না। অন্য কোন বাড়িতে ফুলের গাছ নেই। ফুল নেই। রাত নিশুতি। সামনে একটা জঙ্গল। আমি হেঁটে এগুচ্ছি। ফুল ছাড়া আমি ফিরবো না। অন্ধকারে কি যেন ডাকছে। আমার গা ছম ছম করে উঠলো। কেঁপে উঠলাম অজান্তেই। হঠাত মাটি ফুঁড়ে বেরুলো একটা লোক। হেঁটে আসছে এদিকেই। পরিচিত কেউ নয় তো? ভাইয়া নাকি? আমাকে বাসায় ডাকতে এসেছে? দেখে ফেলবে না তো? কোথায় লুকোই? ভাবতে ভাবতে উঁচু ঢিবির মত একটা জায়গায় গিয়ে বসলাম। যেখানে বসেছি অন্ধকার সয়ে আসতে চোখে পড়ল আমার দু’পাশে দুটো কবর! হায়! আমি কবরের মাঝখানে এসে বসেছি! এর চেয়ে তো ভাইয়ার হাতে ধরা পরাও ঢের ভালো ছিলো। এখন যদি ভুত এসে আমার ঘাড় মটকে দেয়! ভুত শব্দটা মনে আসতেই ভয়ের ঠান্ডা স্রোত নেমে গেলো শিরদাঁড়া বেয়ে! একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে ফুল দেবো বলে এতক্ষণ ধরে যে ফুল চুরি করার অদম্য বাসনায় অন্ধকারকে জয় করে শিকদারের বাড়ির পথে সাহসে ভর দিয়ে চলছিলাম, সেটি মুহুর্তেই উধাও! আমি ঝেড়ে দৌড় লাগালাম। পেছনে ধুপ ধাপ শব্দ! কে ছুটে আসছে? কে! মাগোওও! বলে আমি ছিটকে পড়লাম। ঝটকা দিয়ে খুলে গেলো আমার চোখ! আমি কুঁজো হয়ে শুয়ে আছি। মেঝেতে। নিজের প্রতিটা মুভমেন্ট আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আয়নায়! মেঝে ছোঁয়া আট ফুট বর্গাকার এই আয়নায় পুরো অবয়ব দেখা যাচ্ছে আমার।

অন্ধকার ঘর। কিন্তু আয়নায় আমার পেছনে দাঁড়িয়ে চৌহান। হাতে ধরা সাদা একটি কাগজ। তাতে লাল কালিতে লেখা,

মনের কায়া

ফেলবে ছায়া

নিজেরই অজান্তে!

 

সুখের ভুবন

দুখের যোজন

ভাবনারই দেশান্তে!

 

রুক্ষতার কারণ গুলো

সৌজন্যতায় বদলে দাও

জীবনটা নয় অশুভময়

কাভি না তুম রেহাই পাও!

 

লেখাগুলো পড়া শেষ হয়ে আসতেই লেখার কালি মুছে গেলো আর লাল রক্তের ফোঁটা চুঁইয়ে নামতে শুরু করলো কাগজটা ছুঁয়ে মেঝেময়! আমি যেখানে বসে আছি, আয়নার বাইরে। এ যে টাটকা রক্ত! রক্ত আমার হাতের কাছে পড়েছে! আয়নায় লেগে রয়েছে! অথচ আমি তো রক্ত ছুঁইনি এমনকি আয়নার গ্লাসেও হাত লাগাইনি! হঠাৎ পেছনে ফিরে চাইলাম। আবার ফিরে তাকালাম আয়নায়। ও নেই! দু’বছর আগে মারা গেছে! বুয়ার ভয়ার্ত চিৎকারের কারণটা কিছুটা হলেও স্পষ্ট হলো এইবার! যদিও জানা নেই সেও আয়নার ভেতরে মানুষ দেখেছিলো কিনা!

 

 

প্রয়াত অরুণাভ চৌহান পাল এর সপ্তম বউ হিসাবে এক সপ্তাহ আগে কিছু মালপত্র সুদূর ইংল্যাণ্ড থেকে পার্সেল হিসেবে এসেছে আমার নামে। দু’বছর আগে কার-একসিডেন্টে ওর মৃত্যুর আরও ছ’মাস আগেই ডিভোর্স হয়ে গেলে, উত্তরাধিকার সূত্রটা এতদিন পরে কিভাবে থাকে সে এক বিস্ময়! তার উপর অত দূর থেকে আসা প্রাপ্ত সম্পত্তি হিসাবে ফার্নিচার? এটাই আমার মনে সন্দেহ জাগালেও মালের লিস্ট দেখতে গিয়ে আয়নাটার প্রতি তীব্র আকর্ষণ জন্মেছিলো বলেই ওটা সরাসরি আমার শোবার ঘরে প্লেস করিয়েছিলাম।

কিন্তু তখন যদি ঘূণাক্ষরেও জানতাম কি সর্বনাশ করতে যাচ্ছি তাহলে আজ আমার এই দিন আসতো না!

আয়না সেট করার পরে প্রথম পাঁচদিন কিছুই হয়নি। ঘটনা প্যাঁচ খেলো দু’দিন আগে বুয়ার চিৎকারে। আমি আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ঘটনাটা নিয়ে ভাবছিলাম। সেদিনও খুব গরম ছিলো। সেপ্টেম্বর মাসে প্রচন্ড গরম থাকে। বাইরে অঝোর বৃষ্টি হচ্ছিলো। কিন্তু ভেতরে অসহ্য গরম। আমি এসি অন করে মেঝেতে বসে আছি। চুল আঁচড়ানো হঠাৎ থেমে যায়। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, এসি অন করলেও পাওয়ার বাড়ানো। অথচ, ঘরটায় কবরের নিস্তব্ধতা। কারো ঘন ঘন উঠানামার গাড় নিঃশ্বাস আমার ঘাড়ের কাছেই পরছিলো। আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে কাউকেই দেখতে পেলাম না। কিন্তু স্পষ্ট মনে হলো এখানে কেউ আছে! এই ঘরে কেউ আছে! তারপরে আমি অস্থির হয়ে দরজা খুলে নিলাম। পুনরায় সব স্বাভাবিক ঠেকলো। কোন ঠাণ্ডা নেই। ঘরের ভেতরে স্বাভাবিক তাপমাত্রা। বুয়ার ভয়ার্ত চিৎকার আমার মানসিক অবস্থার অবনতি করেছে। আমি এখন অযথাই ভয় পেতে শুরু করেছি!

 

 

গত রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে যখন নিঝুম নিস্তব্ধ চারদিক তখন আমি আমার আয়নাটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। অনেক খুঁটিয়েও এর কোন ত্রুটি খুঁজে পেলাম না। এটা একদম নিরেট একটা আয়নাই। খুবই সুন্দর। থ্রিডি আয়না! যেদিক থেকেই তাকাও নিজেকে অপরূপ সুন্দরী বলে মনে হয়। দরজার সিটকিনি তুলে দিয়ে কয়েক রকমের শাড়ি নামালাম আলমারি থেকে। প্রথমে  জামদানী শাড়িতে সাজলাম। তারপরে বালুচরি টাঙ্গাইল। তারপরে একে একে মথুরা সিল্ক, কাতান, কাঁথা স্টিচ, সুতি, শিফন শেষে পাতলা ফিনফিনে রংধনু রঙের জর্জেট শাড়িটায় জড়ালাম নিজেকে। কেমন নগ্ন একটা উচ্ছ্বাস খেলে গেলো নিজের মধ্যে। শাড়ি যে পড়েছি মনেই হচ্ছে না! অপরূপ নারী সৌন্দর্যের দিকে অপলক চেয়ে দেখছিলাম। এ কি সত্যিই আমি? চোখ ফেরাতেই পারছিলাম না! অস্ফুটে আমার মুখ থেকে বেরুলো, ‘সন্দেহ করবার মত কিছুই তো নেই!’

‘ঠিক তাই, রেবতী!’

সাপের মত হিসহিসিয়ে যে কথা বলে উঠলো সেই কণ্ঠধারী ঐ একজনই। সুখের সাগরে ভেসে যাকে বিয়ে করে স্বপ্নীল আবহে ভেসে ইংল্যাণ্ড পাড়ি জমিয়েছিলো, তার বাড়ি যাওয়ার আগে কোন আভাস ছিলো না যে সে বিবাহিত ছিলো। তাও আবার একটা বউ নয়। তার ছয় ছয়টা বউ ছিলো। প্রত্যেককেই সে অমানুষিক নির্যাতনে অতিষ্ট রাখতো।

ভয়ে সেঁধিয়ে গেছি! এই লোক এতটাই জীবন্ত! কিভাবে? আমার মুখ ফুঁটে কোন আওয়াজ বেরুবে কোত্থেকে? আমি জবাব দেবো কিভাবে? আমি তো ঘটনার আকস্মিতায় স্বপ্নে আছি না বাস্তবে সেই বোধ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি!

 

কণ্ঠটি আমার স্থিরতাকে খান খান করে দ্বিগুণ ভয়ের বাষ্প ছুঁড়ে দিয়ে পুনরায় বলে উঠেছে, ‘কেউ বুঝতে পারে না এই রহস্যটা! তোমার দিন ফুরিয়ে আসছে ক্রমশঃ! তুমি ছেড়ে আসার পরে আমি তোমাকে শাস্তি দেয়ার জন্য অভিনব উপায় খুঁজতে থাকি। প্রেতসাধনা শুরু করি! একসিডেন্টে মারা যাওয়ার খবরটা শুধুমাত্র পত্রিকায় রটনা হওয়া একটা ঘটনা মাত্র! আসল ঘটনা কেউ জানে না।’

আমি অবাক হয়ে যাই ভুতুড়ে আয়না তথা আমার মৃত স্বামী অথবা কোন পাগলের প্রলাপ শুনে! এই দু’হাজার পনেরো সালে বিজ্ঞানের যুগে বাস করে এই কথা কাউকে বললে নির্ঘাৎ আমায় নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়ে যাবে। আমার ছয় সতিনের কারো সাথেও একই ব্যাপার ঘটছে কিনা জানতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তারা যে সব একেক সুদূর দেশের অধিবাসী।

 

আমি কাল রাত থেকে কিছুই খেতে পারছি না। আমার সারা চিন্তা চেতনায় ঢুকে গেছে ভয়! অপরিসীম ভয়! আমি কালের এক বিস্ময়ের ঘোরে ঢুকে গেছি! এই ঘোর থেকে আমায় কে বাঁচাতে পারে তাও আমি জানি না! প্রেতসাধনা নিয়ে যারা কাজ করে তাদের খোঁজ কোথায় মিলবে তাও জানা নেই।

আমার মা বিধবা তায় আবার বৃদ্ধা। তিনি এমনিতেই নিজের মেয়ের ভাবনায় অস্থির। এখানে তেমন কোন নিকটাত্মীয়ও নেই। কার কাছে সাহায্য চাইবো কিছুই বুঝছি না। এই মডার্ন যুগে বসে পুলিশকে জানালেও এঁরা কি কিছু উপায় করতে পারবে? উলটে আমায় পাগল ভাববে।

মনে সাহস ফিরে পাচ্ছিলাম, আমার কিছু হবে না। আর আমার বাসায় তো তেমন কেউ আসে না। তাই এই ভুতুড়ে আয়না থেকে অভিশপ্ত হওয়ার সুযোগ বা সম্ভাবনা কারও থাকছে না। কিন্তু রাইসা এসে পরায় আমার ভেতরে ভয়ের দানা বাঁধতে শুরু করেছে পুনরায়। ও আমার সন্তানতূল্য ছোট বোন যাকে আমি খুব বেশি ভালোবাসি। আর এই পিচ্চি আমার কাছে তার আপন সত্তার সব সুখ দুঃখ তুলে ধরতে পারে বলেই আজও এসেছিলো।

 

 

‘রাইসা? মা, চলো বাসায় যাই!’ কাকীমার ডাক শুনে রাইসা দৌড়ে দরজা খুলতে গেলো। কিন্তু খুলতে পারলো না। মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললো,

‘রেবু-দি, দরজাটা খুলছে না!’

‘খুলবে না কেন? লক মোচড় দাও!’

‘দিয়েছি! তবু খুলছে না!’

আমি উঠে গেলাম একটু বিরক্ত হয়েই। কিন্তু খুলতে না পেরে সত্যি ভয় পেয়ে গেলাম। আমি তো লক করিনি! তাহলে দরজা খুলছে না কেন?

এই সময় লক্ষ্য করলাম ঘরে ধোয়া ছড়াতে শুরু করেছে। সেই সাথে নামছে তীব্র ঠাণ্ডা!

‘রেবু-দিইইইই!’ তীক্ষ্ণ চিৎকারের শব্দ পেয়ে পাঁই করে ঘুরলাম আমার পেছনে থাকা রাইসার দিকে। ভয়ে নীল হয়ে গেছে মেয়েটা। ওকে ছুঁতে গিয়ে দেখলাম একটা বলয়ে যেন আটকা পড়েছে। আমার হাত দুটো রবারের অদৃশ্য একটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসলো। ওদিকে রাইসার মুখ আতংকে কুঁচকে যাচ্ছে! আর এগিয়ে যাচ্ছে আয়নার দিকে!

হায় ভগবান! আমি এখন কি করবো? কিভাবে মুক্তি পাবো এই অভিশপ্ত মুহুর্ত হতে? ডিভোর্স দিয়ে এসে ভেবেছিলাম সাইকোর হাত থেকে মুক্তি মিলেছে আমার। কিন্তু এ যে এমন বিধ্বংসী ব্যবস্থা নিয়ে আত্মা হয়ে ছুঁটে আসবে আমাকে শেষ করার জন্য তা কে জানতো!

 

আমার ঘরের বাইরে থেকে কান্নার শব্দ ছুটে আসছে। মা আর কাকীমার মিলিত হৈচৈ। কে যে কাঁদছে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে না। ধারুম ধুরুম শব্দ শুরু হয়ে গেলো দরজায়। ওরা কি আমার দরজার ভাংতে চেষ্টা করছে? নাকি লকটা? দরজার বাইরে প্রচণ্ড শব্দ আমার চিন্তা করার শক্তিকে গুলিয়ে দিচ্ছে। এদিকে আয়নার প্রায় সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে রাইসা। এখন ও মেঝে থেকে হালকা শুন্যে ভাসছে। প্রচণ্ড কোন একটা শক্তি যেন ওকে আয়নার ভেতরের দিকে টেনে নিচ্ছে। নিজের অবস্থা ওকে আতংকিত করে তুলেছে। রক্তশুন্য ফ্যাকাশে চেহারায় অপরিসীম ভয়ের ছাপ! এই মুহুর্তে ভয়ের পরিবর্তে কোথা থেকে যেন আমার মনের ভেতরে সাহসের সঞ্চার হলো। আমার যা হয় হতে পারে। কিন্তু রাইসার কিছু হতে দেয়া যায় না। যাবে না। আমার দরকার আগুন। আগুন দিয়ে কি করবো? পুড়িয়ে দেবো? আয়নার চারপাশে যে চিকন ডিজাইন করা কাঠ তাতে আগুন ধরিয়ে দিলে কি মুক্তি মিলবে? কিন্তু এ ঘরে তো আগুন নেই! ম্যাচ নেই! কি করা যায়? কি করা যায়!

অথবা ভারী কিছু? যা দিয়ে আয়নাকে আঘাত করা যায় যাতে ওটা ভেঙে যায়! ভারী কিছুর সন্ধানে আমার চোখ সারা ঘরে ঘুরে এলো। কিছুই পেলাম না! এটাচ বাথ-এ গিয়ে ঢুকলাম যদি বা আক্রমণাত্মক কিছুর খোঁজ মেলে। হতাশ হয়ে বের হয়ে এলাম।

আমি কি করবো বুঝছি না!

ধরাম করে খুলে গেলো আমার ঘরের দরজাটা। কাকীমা বড় এক শাবল নিয়ে ঢুকেছেন। শাবল কোথায় পেলেন সেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসার কথা মনেই এলো না। তার হাত থেকে ওটা নিয়ে সোজা গিয়ে আঘাত করলাম আয়নায়। প্রথমবারের আঘাতে কিছুই হলো না। কিন্তু একটা আর্তনাদ কানে এলো।

রাইসার কিছু হলো না তো? নাহ! চেয়ে দেখি সে তেমনিই রয়েছে। দ্বিতীয় আঘাত হানলাম আয়নায়। ফাঁটল দেখা দিল। ফাটলে হালকা রক্তের রেখা! ধীরে সেটা মোটা লাইনে রূপ নিচ্ছে। রাইসাও ধপাস করে মাটিতে পরে গেলো। ওকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম রবারের বলয়টাও নেই। আমি উপর্যপুরী আঘাতের পরে আঘাত হানতে লাগলাম আয়নায়। পুরো গুড়াগুড়া করে তবেই থামলাম।

আমি শাবলটা শক্ত করে হাতে ধরেই মেঝেতে বসে পড়লাম। চোখ বুজে এলো ক্লান্তিতে। মাত্র কয়েক পলক মাত্র। আমি চোখে খুলে দেখি, ঘরে কাঁচের চিহ্ণমাত্র নেই। এতক্ষণ ধরে ভেঙেছি। সারা ঘরে কাঁচের টুকরো জমে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমার ঘরটা পুরো অক্ষত। হঠাত আমার মাথা বোঁ করে ঘুরে উঠলো। এর পরে আমার আর কিছু মনে নেই।

 

পুরো এক মাস সেন্সলেস অবস্থায় থাকার পরে আমার জ্ঞান ফিরেছে। প্রকৃতই কি ঘটেছিলো সেদিন তা নিয়ে আমার জিজ্ঞাসার কোন জবাব মেলেনি। মেয়ে জীবন্ত আছে এটা ভেবেই হয়তো কেউ আর আমাকে সেই স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী নয়। কিন্তু প্রশ্নাতীত এক ব্যাখ্যা হয়ে এটা আমার মনের ভেতর গেঁথেই রইলো। জানি না এর মুক্তি কোথায়!

(সমাপ্ত)

 

নোটঃ

০১। লিটল ম্যাগ “শব্দীয়” এর বৈশাখ ১৪২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত

০২। সংযুক্ত image manipulation ছবিটি করেছে ব্লগার ও ডিজাইনার সূপর্ণা ফাল্গুনী

৩৬৯জন ২৫৯জন
14 Shares

২৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য