প্রবাসে একবার এক আত্মীয়ের বাসায় বেশ কিছুদিন থাকবার সুযোগ হয়েছিল। তখন আমি এদেশে নতুন। সেই আত্মীয়ের ৮/৯ বছরের দুটি কন্যা সন্তান ছিল। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, সেই পরিবারের বিশেষ এক অলিখিত নিয়ম ছিল প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনে কন্যাদ্বয়কে একটি করে চিঠি লিখতে হোত বাংলায়। আর চিঠিটি তারা লিখত সুদূর বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের নানুকে উদ্দেশ্য করে। সহজ সরল ভাষায় মনের কথাগুলো, সারা সপ্তাহে ঘটে যাওয়া মজার কিংবা দুঃখের ঘটনার উল্লেখ থাকতো চিঠি জুড়ে। অতঃপর লেখা শেষে তারা তাদের বাবা-মাকে পড়ে শুনাতো। এবং খামে পুরে ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে আসতো। সুদূর আমেরিকায় জন্মানো নাতনিদের কাঁচা হাতের বাংলা হরফে লেখা চিঠি পেয়ে এবং তা পড়তে গিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোন এক গ্রামে বসবাসরত নানুর চোখ কতটা ঝাপসা হয়ে উঠত জানিনা। তবে বিষয়টি আমায় যারপরনাই বিস্মিত করেছিল সেসময়ে। বিদেশে জন্ম এবং বেড়ে উঠা সন্তানদের বাংলা ভাষা চর্চা অব্যাহত রাখতে তাঁদের বাবা-মায়ের চালু করা নিয়মটি বেশ চমৎকার। অনেক বছর বাদে এক খ্রীসমাসের সময়ে শপিংমলে কন্যাদ্বয়ের সাথে দেখা। ততদিনে তাঁরা তরুণী। এগিয়ে এসে চমৎকার বাংলায় কুশল বিনিময় শেষে নানাবিধ বিষয়াদি নিয়ে গল্প হয় আমাদের। দীর্ঘদিন পর চেনা আপনজনের সাথে দেখা হলে যেমন, ঠিক তেমন। তাঁরা যে বাংলা ভাষাটা ঠিক ভাবে রপ্ত করতে পেরেছে এবং ধরে রেখেছে, তা অন্তত নিশ্চিত হলাম সেদিনের বাক্যালাপে।

প্রবাসে আসার পর কিছু পরিবারের সাথে পরিচয় হোল, বন্ধুত্ব হোল। লক্ষ্য করলাম যে অধিকাংশ পরিবারে এদেশে বেড়ে উঠা প্রজন্ম ইংরেজিতে কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। এবং বাবা-মা’রাও অনেকটা নিরুপায় হয়ে সন্তানদের সাথে কথা বলায় ইংরেজি ভাষাটাই ব্যবহার করছেন। এ বিষয়ে কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন, সকাল সন্ধ্যা চাকুরি না করলে তো সংসার চলে না। বাড়ি ফিরে রান্নাবান্না, পরিচ্ছন্নতা সহ যাবতীয় কাজ করতে হয়। সন্তানদের স্কুলের পড়ার বাইরে বাংলা শেখানোর সময় কিংবা সুযোগ হয়ে উঠে না। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজার, লন্ড্রি সহ নানাবিধ কাজ জমে থাকে। কিছু কিছু বাবা-মা’র মতে এতগুলো ভাষার বোঝা তারা শিশুদের উপর চাপিয়ে দিতে চান না। তবে পরিচিতদের অনেকেই ছুটির দিনগুলোয় বাংলা স্কুলে দিচ্ছেন সন্তানদের। কিন্তু তা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। এ বিষয়ে ব্যতিক্রম দেখেছিলাম কাছের একটি পরিবারে। আমি তাদের তিনটি শিশুকে দেখাশোনা করতাম সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি। সপ্তাহের পাঁচদিন শিশুত্রয় স্কুল এবং হোমওয়ার্ক করতেই সন্ধ্যা ঘনাত। ক্লান্ত শিশুরা সন্ধ্যায় রাতের খাবার শেষে ঘুমিয়ে পড়তো। কিন্তু ছুটির দুটি দিন বাড়িতে গানের শিক্ষক এবং আরবি শিক্ষক আসতো পর্যায়ক্রমে। বিকেলে বাংলা স্কুলে নিয়ে যাওয়া হোত তাদের। বাড়িতে বাবা-মা ইংরেজিতে কথা বলতে নিরুৎসাহিত করতেন। ইংরেজিতে বলতে চাইলে তিনি কোনভাবেই শুনতে চাইতেন না সেইসব কথা। উত্তরও দিতেন না কোন প্রশ্নের। আর তাই বাধ্য হয়েই বাংলা ভাষার চর্চা হোত সেই পরিবারের শিশুদের। শুধু তাই নয়, সেই বাড়িতে মাঝে মাঝেই সাহিত্য আসরের আয়োজন হোত। দেশ ছেড়ে এই দূর পরবাসে এসেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার সাথে সংশ্লিষ্ট এতোজন কবি লেখককে একসাথে সেখানে দেখে বেশ ভালো লাগতো এবং বিস্মিত হতাম। একদিন সেই আসরে আমাকেও নিমন্ত্রণ করা হোল কবিতা পাঠের জন্যে। সেইদিন আমার মনে হয়েছিল যেন আমি আরেকটি বাংলাদেশে এসে বসত গেড়েছি। এমন পারিবারিক আবহে যে শিশুরা বেড়ে উঠেছে, তারা তাদের বাংলা ভাষা চর্চা কতটুকু ধরে রাখতে পারছে কিংবা পেরেছে সেই প্রমান পেলাম অনেক বছর পর। এক অনুষ্ঠানে দেখা পরিবারটির সাথে। শিশুরা ততদিনে তরুণী। তারা সেই অনুষ্ঠানে স্টেজে গান গাইলো। ওদের মা ডেকে এনে আমায় পরিচয় করিয়ে দিলেন। মনে করিয়ে দিলেন সন্তানদের । স্পষ্ট উচ্চারণে বাংলায় কথা বলল তারা নানান বিষয়ে।

আমার প্রথম সন্তান যেহেতু কথা বলতে শিখেছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও অনেক দেরিতে, সেহেতু আমাকে শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষা বেছে নিতে হয়েছিল। স্কুলে ইংরেজি, টিভি কার্টুনে ইংরেজি, তাই আমাকেও ইংরেজি ভাষায় সন্তানের সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। অতঃপর পাঁচ বছর বয়সে সে যখন একটু একটু করে কথা বলতে শুরু করেছে, সেই সময়ে দেশে বেড়াতে গেলাম সপরিবারে। সেদিন ছিল এক চমৎকার বিকেল। মিরপুর আড়ং থেকে কেনাকাটা সেরে বেরিয়েছি সবে। হঠাৎ ডানে বাঁয়ে কোথাও ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সামনে জনস্রোত। এতো মানুষের ভিড়ে আমি কোথায় খুঁজে পাবো তাকে! ও কী হারিয়ে গেলো! এমনটি ভাবতেই বুকের ভেতরে তীব্র হাতুড়িপেটা শব্দ টের পাই। হাত, পা, শরীর হিম হয়ে অবশ হবার দশা। বারবার শুধু মনে হচ্ছিল, সে তো বাংলা জানে না! কে, কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাবে … কিছুই তো বলতে পারবে না! চোখে, মুখে যেন অন্ধকার দেখছিলাম। সে আসলে অদূরে পার্ক করে রাখা আমাদের গাড়ির দিকেই গিয়েছিল, বিধায় সে যাত্রায় রক্ষা! তারপরও বিড়ম্বনার শেষ নেই। সন্তানের ভাষাগত সমস্যার কারনে আমাদের দেশে বাড়ানোটাও সুখকর ছিল না। সে-ই প্রথম উপলব্ধি হয় আমার, যে করেই হোক আমার সন্তানকে আমার ভাষা শেখাতেই হবে। সেবার দেশ থেকে ফিরে তাকে প্রথমেই গানের ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দেই। শুধু বাংলা ভাষা, উচ্চারণ শেখা এবং বাংলা সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত রাখাই এর উদ্দেশ্য ছিল। আমার ধারনা, শিশুরা শিশুদের কাছ থেকেই বেশি শেখে। এবং হয়েছেও তাই। সেখানকার অন্য শিশুদের সকলেই বাঙালি ছিল, এবং সকলেই বাংলা ভাষায় একে অপরের সাথে ভাব বিনিময় করতো। এতে লাভ হয়েছে দুটো। একদিকে আমার সন্তান একটি চমৎকার পরিবেশ পেলো। অন্যদিকে যিনি গানের শিক্ষক ছিলেন, তার কাজ ছিল বিদেশে জন্ম এবং বেড়ে উঠা শিশুদের শুদ্ধ উচ্চারণে গান শেখানো। এবং তিনি তা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথেই পালন করতেন। বিভিন্ন উৎসবে শিশুদের নিয়ে বড় পরিসরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। যার ফলে একাধারে শিশুরা শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলাভাষা শিখতে পারতো, এবং আমাদের বাংলা সংস্কৃতির বিভিন্ন দিনগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতো। খুব আনন্দের বিষয় যে, আমার সেইসব শ্রম, চেষ্টা কোনটাই বৃথা যায়নি। আমার ছেলেটি এখন পনের বছরের কিশোর। বাড়িতে পরিবারের সকল সদস্যের সাথে শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলে। কখনো কখনো বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস কিংবা মাতৃভাষা দিবসে রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে, এবং এ বিষয়ে ধারণা পেতে সে কিছুটা পড়াশোনাও করে। তবে তার স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে তাকে নিরুপায় হয়ে চায়নিজ ভাষাটি বেছে নিতে হয়েছে। তার ভাষায়, ইংরেজি বর্তমান বিশ্বের প্রধানতম ভাষা যদিও, কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলছে ম্যন্ডারিন (সাধারণ অর্থে চীনা ভাষা) ভাষায়। তার স্কুল স্টাইভেসেণ্ট হাই স্কুলে চায়নিজ, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, জার্মান এবং জাপানিজ সহ নানান ভাষার ভিড়ে বাংলাভাষা বেছে নেবার সুযোগ এখনো হয়ে উঠেনি। বল বাহুল্য নিউইয়র্কের স্কুল্গুলোয় প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ভাষা বেছে নেবার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ‘ল্যাঙ্গুয়েজ ক্রেডিট’ পেয়ে থাকে।

তবে আগের যে কোন সময়ের তুলনায় নিউইয়র্ক সিটিতে বাংলা ভাষার ব্যবহারে সময়টা বেশ অনুকূল। সরকারিভাবে বাংলা ভাষার ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলেছে। আমার সন্তানদের স্কুল থেকে আসা জরুরি ফোনকলগুলোতে বাংলায় কথা বলে। ইমেইলও আসছে বাংলায়। স্কুলের বার্ষিক নির্দেশিকা পাচ্ছি বাংলায়। ভোটকেন্দ্রে, হাসপাতালে সহ গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়িয়েছে। তারপরও অত্যন্ত হতাশার সাথে বলতে হচ্ছে, এখন এটাই বাস্তবতা যে প্রবাসে আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলা ভাষার চর্চা হতাশাজনক। সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখানোর ব্যপারে অধিকাংশ অভিভাবকদের আগ্রহ কিংবা সচেতনতার অভাবই মূল কারণ। আমি যখন আমার সন্তানদের আমাদের ভাষাটি কেমন করে আমাদের হোল সেই ইতিহাস শোনাই, জাতি হিসেবে একমাত্র আমরাই মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্যে জীবন দিয়েছি সেই ইতিহাস শোনাই, তারা দু’চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে শোনে। আমার ধারনা, একটি ভাষার জন্যে রাজপথ রক্তাক্ত হওয়ার, জীবন দেয়ার মত ত্যাগের ইতিহাস আমাদের সন্তানদের জানানো প্রয়োজন। যেখানে বিশ্ববাসী স্বীকৃতি দিয়েছে, জাতিসংঘ আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের দিনটিকে অর্থাৎ একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে, সেখানে প্রবাসে আমাদের নতুন প্রজন্ম এ থেকে পিছিয়ে থাকলে সে লজ্জা আমাদেরই। আমরা আমাদের ভাষাটিকে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে যেতে হবে। তারা স্কুলে, কর্মস্থলে ইংরেজির ব্যবহার করতে হচ্ছে সত্য, কিন্তু বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সাথে ইংরেজি পরিহার করার রেওয়াজ চালু হোক প্রতিটি পরিবারে। আমাদের সন্তানরা ঘরে মাতৃভাষায় কথা বলুক। এ বিষয়ে সাহায্যকারী ভূমিকা পালন করতে পারে একমাত্র বাবা-মা, পরিবারের সদস্যরা। বাবা-মায়ের আন্তরিকতা এবং যথাযথ দায়িত্ব পালন ছাড়া এটি সম্ভব নয়। এ ব্যপারে প্রবাসে গড়ে উঠা বাংলা স্কুলগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের যুক্ত করা যেতে পারে। একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ, ষোলই ডিসেম্বর, পহেলা বৈশাখ, বসন্ত উৎসব, এইসব অনুষ্ঠানগুলোতে শিশুদের যুক্ত করা যেতে পারে। যদিও অনেক মায়েরাই তাদের শিশুদের এইসব কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত রাখছেন, তবুও তা সেই অর্থে আশাপ্রদ নয়।

৪১৪জন ৪১১জন
9 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ