প্রবাসে নতুন প্রজন্মের বাংলা চর্চা – ৪

রিমি রুম্মান ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, রবিবার, ১১:১৬:১৩পূর্বাহ্ন সমসাময়িক ৬ মন্তব্য

সারা পৃথিবীতে সপ্তম ভাষা হিসেবে স্থান পেয়েছে আমাদের বহু প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষা ‘বাংলা’। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের প্রাণের ভাষার একটি গৌরবজনক অধ্যায়। আমার এক ফেসবুক বন্ধু লিখেছিলেন,” পৃথিবীতে মোটামুটিভাবে মানুষের সমাজে সাত হাজার কথ্যভাষা আছে। দু’হাজারটি এমনও কথ্যভাষা রয়েছে, যেসব ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা এক হাজারেরও কম। একটা শঙ্কার কথা হচ্ছে, প্রতি চৌদ্দদিনে একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই হারে বিলুপ্ত হতে থাকলে পরবর্তী শতাব্দীর আগেই বর্তমান মানুষ সমাজে কথ্যভাষার প্রায় অর্ধেকই হারিয়ে যাবে।” আমি তার লেখার সাথে সম্মতি জানিয়ে নিজের শংকার কথা জানিয়ে মন্তব্য করি। জবাবে নিউইয়র্কে বসবাসরত, নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলা ভাষা ছড়িয়ে দেয়া নিয়ে কাজ করছেন এমন একজন জানালেন,” মন্তব্যটি সঠিক নয়। এখানে অন্তত দু’শর উপর বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ছাত্র ছাত্রী আছে যারা বাংলা শিখছে। তাদের অন্তত পঞ্চাশ /ষাট জন আছে  ভালোভাবে লিখতে, পড়তে জানে। অন্তত ৫/৭টা উইকেন্ড স্কুল আছে । এছাড়া সিটির এলিমেন্টরী স্কুল আছে যেখানে বাংলা শিখানো হয়। যারা শেখার তারা ঠিকই শিখছে। বাংলা শিখলে এখানে চাকরিতে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়। বাংলা জানার কারণে চাকুরী হয় এমন বহু ঘটনা নিউইয়র্কে ঘটছে। বছর পনের আগে একদল আতেলেকচুয়াল বলেছিলেন, এখানে বাংলা শিখে কী হবে। তারপর বলেছিলেন, এখানে এত বাংলা পত্রিকা থাকবে না। অথচ আজ পনের বছর পর বিপা পঁচিশ বছর পুর্তি পার করেছে। আরও অনেক সংগঠন কাজ করছে। নিউইয়র্ক সিটিতে বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করা হয়েছে। সিটির সকল এজেন্সীতে বাংলা দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে রয়েছে। স্কুলতো আছেই। নিউইয়র্কের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় জেনারেশন ইতিমধ্যেই বাংলা নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। নিশ্চিত করে বলতে পারি নিউইয়র্ক থেকে বাংলা কখনো বিলুপ্ত হবেনা। আমার মত অনেকে আমারও বহু আগ থেকে কাজ করছে। ” এই যে তিনি আশার কথা জানালেন, চমৎকার একটি মন্তব্য তুলে ধরলেন, আমি এমনটিই চেয়েছিলাম মনে মনে। কেউ বলুক,  কেউ শোনাক প্রবাসে ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠা আমাদের নতুন প্রজন্মের বাংলাভাষার চর্চা নিয়ে আশার কথা। যা হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানা।

প্রবাসে জন্ম নেয়া অন্য সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠা আমাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বাবা মায়ের আগ্রহে দেশীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোয় অংশগ্রহণ করছে। একটা সময় আমার ছেলেটির বয়স যখন আট বছর ছিল, আমি তাকে বাংলা শেখাবার জন্যে, বাংলা গান শেখাবার জন্যে প্রাণপণে চেষ্টা করে যেতাম। গানের স্কুলে ছুটতাম ছুটির দিনগুলোতে। কয়েক বছর বেশ ঠিকঠাকভাবেই চলল সব। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে অ আ ক খ ব্যানার নিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনারে গেলো। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গান গাইল। আমার মনটা ভরে গেলো আনন্দে। সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী থাকলো না। উপরের ক্লাসে উঠলে পড়ার চাপ বাড়ায় স্কুলের পড়াশোনা নিয়ে রীতিমত হিমশিম খাওয়ার দশা তার। সে আর সেইসব চালিয়ে যেতে চাইল না। ছুটির দিনগুলোয় বিশেষায়িত স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে কোচিং এ যাওয়া শুরু করলো। একদিন বলেই ফেললো, ‘ গত কয় বছর আমি তোমার কথা মত সব করেছি, তোমাকে খুশি করেছি, সুখি করেছি। এবার আমাকে একটু লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে দাও ‘। বাধ্য হয়েই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোয় অংশগ্রহণে বিরতি দিতে হয়। তবে এতে সুফল যা হয়েছে, সে বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সাথে একমাত্র বাংলা ভাষাতেই কথা বলছে আজো।

নিউইয়র্কের কিছু পাবলিক এলিমেণ্টারি স্কুলে বাঙালি শিক্ষিকা কিংবা প্যারেন্টস কো-অর্ডিনেটর বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে বাংলা শেখান। কিছু বাংলাদেশি শিক্ষক ব্যক্তিগত উদ্যোগে সপ্তাহের বিশেষ একটি দিন স্কুলের নির্ধারিত সময়ের পর বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষা লিখতে, পড়তে এবং বলতে শিখিয়ে থাকেন। এই যে দেশের প্রতি, ভাষার প্রতি ভালোবাসা আর হৃদয়ের টান থেকে পরবাসে আমাদের ভাষাকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়ার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন কেউ কেউ তা কিন্তু একেবারেই নিভৃতে করে যাচ্ছেন। এখানকার পাবলিক লাইব্রেরীগুলোতে অন্য ভাষার বিশাল বইয়ের সংগ্রহের পাশাপাশি যখন বাংলা ভাষার বইয়ের সংগ্রহ দেখি, মনটা আনন্দে ভরে যায়। মনে হয় যেন বইয়ের সেই সেলফটিই আমার একখণ্ড বাংলাদেশ। প্রবাসীদের দেশের প্রতি, ভাষার প্রতি আবেগটা যেন একেবারেই অন্যরকম! বাংলা ভাষাভাষী মানুষ খুব দ্রুতই বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে দিনে দিনে। আমি যখন দেশ ছেড়ে এই প্রবাসে আসি আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে, তখন চলতি পথে বাঙালি চোখে পড়তো না খুব একটা। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে বাঙালি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল হাতে গোণা। অথচ এখন এই ২০১৯ সালে সর্বক্ষেত্রে বাঙালির ছড়াছড়ি। কর্মক্ষেত্রে এবং ব্যবসাক্ষেত্রে সাফল্যের সাথে এগিয়ে আছে বাঙালি। শিক্ষাক্ষেত্রেও বাঙালি ছাত্রছাত্রীরা অনেকাংশে এগিয়ে। বিভিন্ন অফিসে, এমন কী রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তারা। নিউইয়র্কে অগ্রসরমান কমিউনিটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে যদিও, কিন্তু সেই অনুপাতে আমাদের নতুন প্রজন্মের মুখে বাংলাভাষার ব্যবহার বেশ নগণ্য। তাদের দৈনন্দিন জীবনে ভাষার স্থান সেই অর্থে পরিলক্ষিত হয় না বললেই চলে। এই যে এতো এতো বাঙালি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে, সে হিসেবে বাংলা ভাষা বিশ্বের দরবারে সমহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবার কথা। তারপরও বেশ কিছু আঞ্চলিক সংগঠন নিজ উদ্যোগে বাংলা ভাষাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ব্যপক ভূমিকা রাখছে। এখানকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে বেড়েছে অনেক। আজ থেকে কয়েক বছর আগে যাদের ছোট্টটি দেখেছিলাম, আধো আধো উচ্চারণে বাংলা গান গাইত, এতদিনে তারা বেশ বড় হয়ে উঠেছে। যথেষ্ট সাবলীল ভাবেই তারা এখন বাংলা বলছে, বাংলা গান গাইছে। মঞ্চে ছড়া কিংবা কবিতা আবৃত্তি করছে।

 

অনেক দাম দিয়ে কেনা এই ভাষার সাথে, শেকড়ের সাথে আমাদের সন্তানদের যুক্ত রাখতে হলে যে কোন অনুষ্ঠানস্থলে, শিশুদের খেলার পার্কে, দেশীয় কোন উৎসবে কিংবা পারিবারিক নিমন্ত্রণে গেলে স্মার্ট ফোন, আইপ্যাড এইসব সাথে নিয়ে যেতে চাইলে ঘোর আপত্তি জানাতে হবে। ছোট বয়স থেকে এই অভ্যাসটি গড়ে তুলতে হবে। বাড়ির বাইরে প্রযুক্তির ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ করতে হবে। কেননা, তারা প্রযুক্তির মাঝে গেইম খেলায় এমনভাবে বুঁদ হয়ে থাকে যে,নিজেদের মাঝেই বৃত্তবন্দী হয়ে থাকে। অন্য কোন দিকে মনোযোগী হতে পারে না। আর তাই এটি করা গেলে আমাদের সন্তানদের সাথে আমাদের ভাবের আদান প্রদান বাড়বে। তাতে আমাদের সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কের ভিত আরো মজবুত হবে। আমাদের হাজার বছরের গৌরবগাঁথা ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে বিদেশে বেড়ে উঠা নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলাভাষাকে  ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয়ে পরিবার থেকে কাজ শুরু করতে হবে। ঘরে সার্বক্ষণিক বাংলাভাষায় কথা বলতে হবে। আর এমন করেই সম্পূর্ণ বিপরীত এক সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠা আমাদের নতুন প্রজন্মের বাংলাভাষার চর্চা অব্যাহত থাকবে।

রিমি রুম্মান

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

৫৪৬জন ৫৪৫জন
5 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ