প্রবাসে ঈদ ও কোরবানি

রিমি রুম্মান ১০ আগস্ট ২০১৯, শনিবার, ০৯:৩৪:৩৭অপরাহ্ন সমসাময়িক ৫ মন্তব্য

নিউইয়র্ক কিংবা এর আশেপাশের অঙ্গরাজ্যগুলোতে ঈদ মানে এখন আর আগের সেইসব দিনের ন্যায় হাহাকারের ঈদ নয়। মলিন কিংবা ফ্যাকাসে নিস্তব্দ দিন নয়। নয় আর দশটা রুটিন দিনের মতোই ব্যস্ত কোন দিন। এখানে এখন ঈদ মানে আনন্দ-উচ্ছাসের কাঙ্ক্ষিত একটি দিন। এই ২০১৯ সালে এসে ঈদ মানে ভিনদেশি বশও জানেন মুসলমান সহকর্মীদের ছুটি দিতে হবে, কেননা এটি পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে ঈদ আনন্দে সামিল হবার দিন। অন্তত নিউইয়র্কের বাঙালি, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী অধ্যুষিত স্থানগুলোতে এখন ঈদ মানে আতশ বাজির শব্দে চারিদিক কাঁপিয়ে জানান দেয়া, ‘ আগামীকাল খুশির ঈদ’। এখানে এখন ঈদ মানে, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় দোকান খোলা রাখা, ভিড় ভাট্টা, কেনাকাটা, মেহেদির রঙে হাত সাজানো, বন্ধুদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, কিংবা দিনভর দেশে স্বজনদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলা। এখন ঈদ মানে শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় গাড়ি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে উম্মুক্ত মাঠে শত শত মানুষের দফায় দফায় ঈদ জমাত। এমন করেই কম বেশি ঈদ আনন্দে সামিল হয় প্রায় সকল প্রবাসী। সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এই ঈদ আনন্দ আরো দ্বিগুণ হয়ে উঠে এই দূর পরবাসে। আমার ছোট্ট ছেলেটি তুমুল আগ্রহ নিয়ে জানতে চায় ‘ঈদ-উল-আযহা’ কী। তাকে বলি, আল্লাহর রাস্তায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নিজের প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ)কে কোরবানি করেন। অর্থাৎ ‘ঈদ- উল-আযহা’ আত্নত্যাগ কিংবা উৎসর্গের উৎসব। সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের স্মরণে মুসলিম বিশ্বে ঈদ-উল-আযহা পালন করা হয়। আমাদের সন্তানরা আমাদের দেশের মতো স্বচক্ষে গরু জবাই দেখে না এই প্রবাসে। শহর থেকে দূরে ফার্মগুলোতে পশু কোরবানি হতো আগে অনেকটাই নিরবে। কিন্তু এখন দিনে দিনে ফার্মে সপরিবারে উপস্থিত থেকে কোরবানি দেয়া প্রবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। নিউইয়র্ক থেকে বেশ কিছু পরিবার ঈদের দিন সপরিবারে নিউজার্সি কিংবা প্যানসিলভেনিয়া চলে যান কোরবানি দেবার উদ্দেশ্যে। সেখানে ফার্মগুলোর আশেপাশে দিনভর একরকম উৎসবের মাঝে কাটে পরিবারগুলোর। মুসলিম মালিকের অধীনে থাকা ফার্মগুলো তাদের খামারের কাছাকাছি কোথাও ঈদের নামাজের ব্যবস্থা করে থাকেন। মিষ্টান্ন, খেজুর, সেমাই পরিবেশন করেন আগত মানুষদের। আমার এক বন্ধু থাকেন প্যানসিলভেনিয়ায়। তিনি বলেন, প্রতিবার তারা কয়েক পরিবার মিলে একটি গরু কোরবানি দিয়ে থাকেন। আর তাই ঈদের নামাজ পড়েই চলে যান ফার্মে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই মাংস কাটাকুটি, ভাগ-বাটোয়ারা, প্রতিবেশিদের বিলি-বণ্টন শেষ করেন সকলে মিলে। ভাগ-বাটোয়ারার আগেই রান্নার জন্যে কিছু মাংস বাড়িতে পাঠিয়ে দেন লোক মারফত অনেকটা আমাদের দেশের মতো। ব্যাকইয়ার্ডে গর্ত করে ইট বসিয়ে লাকড়ি দিয়ে আগুন ধরিয়ে বড় হাড়িতে রান্না করেন গৃহিণীরা। পরিবারগুলো বনভোজনের আমেজে ঈদ উদযাপন করে থাকে। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত ফার্মগুলোতে নিউইয়র্ক কিংবা এর আশেপাশের অঙ্গরাজ্য থেকে আগত মানুষের ভিড় বেড়েছে কয়েকগুণ। বেড়েছে কোরবানির অর্ডার। আর তাই আগেরদিন বিকেলে ফার্মের কাছাকাছি কোথাও তাবু টানিয়ে সেখানে রাতভর অবস্থান করেন কেউ কেউ। সকালে তারা বাড়ি ফিরে যাবার আগে নিজেদের গ্রুপের অন্য কাউকে দায়িত্বে রেখে যান। এভাবে পালা করে তাদের সিরিয়ালে অপেক্ষায় থাকতে হয় পছন্দের গরুটি সঠিক সময়ে কোরবানি দেবার জন্যে। খামারগুলোতে তিনদিনব্যাপী এই কোরবানি চলে। আমার সেই বন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কোরবানি দেবার প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে। জানালেন, লোহার বিশেষ কিছু একটা দিয়ে গরুর সিনায় আঘাত করা হলে সে মাটিতে বসে পড়ে এবং অনেকটা নিস্তেজ, অসাড় হয়ে যায়। শরীরের শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলে। অতঃপর সকলের সহযোগিতায় উপস্থিত হুজুর আল্লাহু আকবর বলে কোরবানি দিয়ে থাকেন। বেশিরভাগ প্রবাসী গ্রোসারিতে অর্ডার দিয়ে রাখেন সপ্তাহখানেক আগে। মাংস হাতে পান ঈদের দুই থেকে তিনদিন পরে।

জ্যাকসন হাইটসের মানি এক্সচেঞ্জ ‘সোনালি এক্সচেঞ্জ’ এ গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে দেশে ডলার পাঠাতে দেখা যায় বেশ কিছু প্রবাসীকে। ঈদ-উল-আযহাকে সামনে রেখে পশু কেনা এবং প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে সারা বিশ্বে অবস্থানরত প্রবাসীরা তুলনামূলক বেশি অর্থ পাঠিয়ে থাকেন দেশে। সেদিন একটি জাতীয় পত্রিকায় দেখলাম, সদ্য শেষ হওয়া অর্থ বছরে প্রবাসী আয় এসেছিল ১৬ বিলিয়ন ডলার। মন ভালো করা সংবাদ। প্রবাসে আমাদের ঈদ শেষ হয় আনন্দের মাঝে যদিও, কিন্তু রাতে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে ঘুমোতে গেলে, দু’চোখ বন্ধ করলেই খুব স্পষ্টই যেন দেখতে পাই, বাড়ির দিকে যাচ্ছি বাবা-মা, ভাই-বোনের সাথে ঈদ আনন্দে সামিল হতে। ঢাকা থেকে চাঁদপুরগামী লঞ্চ এগিয়ে চলছে শোঁশোঁ শব্দে। হকাররা চিৎকার করে ডেকে চলছে ঝালমুড়ি, ঝালমুড়ি …। লঞ্চ এগিয়ে চলছে মেঘনার বুক চিরে বিশাল বিশাল ঢেউ তুলে…। হাজারো ব্যস্ততা, আনন্দ, বেদনার মাঝেও আমরা প্রবাসীরা মনের গহিন কোণে আমাদের শেকড় আঁকড়ে বেঁচে থাকি দূরের এই দেশে, অনেকটা হারিয়ে যাওয়া মায়ের ব্যবহৃত কাপড় বুকে চেপে মাকে খুঁজে বেড়ানোর মতো।

রিমি রুম্মান

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

৬৪জন ১০জন
12 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য