প্রবাসে ঈদ এবং আমরা

রিমি রুম্মান ১ জুন ২০১৯, শনিবার, ০৪:২৮:৪০অপরাহ্ন সমসাময়িক ৩৩ মন্তব্য

যদিও তখনো দশ রোজা বাকি, তবুও মনে হচ্ছিল যেন ‘ রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ ‘। হ্যাঁ গত সপ্তাহের কথা বলছি। মেমোরিয়াল ডে উপলক্ষে সোমবার সরকারি ছুটি থাকায় একটানা তিন দিনের লং উইকেন্ড ছিল নিউইয়র্ক শহরে। বাঙালি, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি অধ্যুষিত এলাকায় গিয়েছিলাম প্রয়োজনীয় কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। বিগত বছরগুলোয় চানরাতে যে উৎসব উৎসব আবহ, ভিড়ভাট্টা, যানজট লেগে থাকতো, ঠিক সেই চিত্রটিই দেখতে পাই সেখানে। দোকানের সামনের ফুটপাতে পোশাক, ব্যাগ, ইমিটিশনের গহনা, চুড়ি কী নেই ! লং উইকএন্ড হওয়ায় নিউইয়র্কের আশেপাশের শহর থেকেও এসেছেন অনেকে কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। অনেকেই ফুটপাতে দরদামে ব্যস্ত। সেভেন্টি ফোর ষ্ট্রীটে এক ফ্যাশন ষ্টোরের বাহিরে ভিড় দেখে এগিয়ে যাই। জানতে পারি এ ভিড়, এ অপেক্ষা দোকানের ভেতরে যাবার জন্যে। ভেতরে অবস্থান করা ক্রেতারা কেনাকাটা শেষে বেরিয়ে এলে তবেই বাহিরে অপেক্ষমাণরা ভেতরে যাবার সুযোগ পাবে। তবুও অনড় দাঁড়িয়ে থাকলাম। এমন দৃশ্য তো আগে দেখিনি কখনো! দিনকে দিন পূর্বের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশেষ দিন উদযাপনে। মনে পড়ে যায় এইতো দু’মাস আগে ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখের বিকেলে জ্যাকসন হাইটসের পিএস সিক্সটি নাইন স্কুলে অনুষ্ঠিত বৈশাখী মেলায় যেতে অনেকটা সময় বাহিরে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ হবার কারণে নিরাপত্তা কর্মীদের তুমুল হিমশিম খেতে হয়েছিল। কিছু মানুষ বাহিরে এলে তবেই ঢুকতে দিয়েছিল বাকিদের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিতরা। ঠিক একই রকম জনস্রোত ছিল দোকানগুলোতে ঈদ শপিং এ। বাড়ির পাশের কুইন্স মলে গিয়েছিলাম অন্য একটি কাজে। পাকিস্তানী এক পরিবার ঈদের লেহেঙ্গা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ম্যাচিং জুতা কিনবে বলে। পাশেই বিশ্ববিখ্যাত কসমেটিকসের ষ্টোর ‘সেফোরা’য় দীর্ঘদিন পর দেখ হয় পুরনো কলিগের সাথে। ঈদকে সামনে রেখে কলেজ পড়ুয়া দুই কন্যাকে নিয়ে এসেছেন কসমেটিকস কিনতে। কে বলবে এই প্রবাসের ঈদগুলো কয়েক বছর আগেও পানসে, নিরানন্দের ছিল ! অন্য সকল দিনের মতোই সকলে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতো খুব ভোরে। রাতে ফিরে অন্যসব দিনের মতোই রাতের খাবার সেরে কর্মক্লান্ত শরীরে ফোন হাতে তুলে নিতো। দেশে কথা বলে কিছুটা হলেও ঈদ আনন্দ পেতে চাইতো। সেইসময়ে অর্থাৎ আমাদের ঈদের রাতে বাংলাদেশে ঈদের দিনের সকাল হতো। ফোনের এই প্রান্ত থেকে বাবাদের নামাজে যাবার ব্যস্ততা, মায়েদের রান্নাঘরে ব্যস্ততা দেখতে পেতো যেন, কথা প্রসঙ্গে এমনটিই জানিয়েছিল আমার সেই সময়ের প্রতিবেশি ক’জন। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে। ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্যের মাঝে পুরো রমজান মাস অতিবাহিত হয় এই প্রবাসে, এটি এখন আর নতুন নয়। প্রায় সর্বত্রই কর্মস্থলে সহকর্মীরা সহযোগিতা করে থাকে পুরো মাস জুড়ে। ভিনদেশি, অমুসলিম হলেও আমাদের ধর্মীয় রীতিনীতিকে বেশ শ্রদ্ধার চোখে দেখেন তারা। ঈদের সময় ঘনিয়ে এলে আগেভাগে সে অনুযায়ী শিডিউল তৈরি করা হয়। ঈদের দিন মুসলিম এমপ্লয়িদের ছুটি দেয়া হয়, আর অমুসলিমদের কাজ দেয়া হয়। খুব বেশি অসুবিধা হলে কেউ কেউ আধাবেলা ছুটি করে। নামাজ আদায় করে, পরিবারের সাথে কিছু সময় কাটিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে ছুটে।

এখন জুনের শুরু। নিউইয়র্কে এসময় চারিদিকে তাতানো রোদ, গরম থাকার কথা। অথচ সকালগুলোয় শিরশিরে হিম বাতাস বয়ে যায়। পথের দু’ধারের সারি সারি গাঢ় সবুজ গাছ বাতাসে দুলে উঠে। পাখিরা গলা ছেড়ে গায়। সবমিলে চমৎকার আবহাওয়া। ঈদ প্রায় দোরগোঁড়ায়। সব প্রস্তুতি শেষের দিকে। প্রতিবারের মত এবারও আগেভাগে ছেলেদের এবং তাদের বাবার ঈদের পাঞ্জাবি, পাজামা, টুপি প্রস্তুত। এসবের পাশে আমার নিজের সকালে নামাজে যাবার সময় পরার জন্যে সুতি জামা এবং বিকেলে বন্ধুদের বাসায় বেড়াতে যাবার জন্যে তুলনামূলক গর্জিয়াস জামা শোভা পাচ্ছে। এদিকে রান্নার আয়োজনও পিছিয়ে নেই। প্রবাসে আমাদের ঘরের কাজে সাহায্যকারী রহিমা খালা নেই, তবুও এই দূরদেশে ঈদ আনন্দে আত্নহারা হয়ে অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে কাজগুলো করে যাই। এক শহরে থাকার সুবাদে অচেনা মানুষগুলোই হয়ে উঠে আমাদের আত্নার আত্মীয়। যেহেতু মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবের দিনকে উপলক্ষ করে নিউইয়র্ক শহরের স্কুলগুলোয় ছুটি থাকে, তাই ঈদের দিন দিনভর আমাদের সন্তানরা একত্রে হাসি আনন্দে মেতে থাকে। রাস্তা বন্ধ করে নামাজ, খুতবা, কোলাকুলি, সবমিলে দৃশ্যটা অনেকটা দেশের ঈদের মতোই আনন্দমুখর, ঐক্যবদ্ধ এক ধর্মীয় উৎসব হয়ে উঠে। এ যেন শক্তিশালি এক সামাজিক বন্ধন। তবুও মন পড়ে থাকে দেশে। শেষ মুহূর্তেও তোড়জোড় আর প্রস্তুতি চলতো আমার মফস্বল শহরের দোতলা ঘরে। জানালার পর্দা আয়রন করা, বাবার পাঞ্জাবি,পাজামা, শার্ট আয়রন করা, অতঃপর ভাঁজে ভাঁজে একপাশে সাজিয়ে রাখা। গোসল সেরে বাবা পাঞ্জাবি-পাজামা-টুপি পরে জায়নামাজ হাতে ব্যস্ত হয়ে ছুটতেন মসজিদের দিকে। বাবাকে কী যে পবিত্র লাগতো! নতুন ভাঁজখোলা শাড়িতে রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে উঠা মায়ের মুখখানি এই পরবাসে বড় বেশি নস্টালজিয়ায় ভোগায়।

এ নস্টালজিয়া প্রবাসে বসবাসকারী প্রতিটি বাংলাদেশিকেই পেয়ে বসে, ক্ষণিকের জন্যে হলেও। রাব্বি নামের এক ছোটভাইয়ের সাথে দেখা জ্যাকসন হাইটসের সোনালি এক্সচেঞ্জের সামনে। ঈদের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, ” ঘামঝরা কষ্টার্জিত ডলার পাঠিয়ে স্বজনদের মুখে হাসি ফুটিয়েই সুখ পাই সারাবছরই। কিন্তু চানরাত আর ঈদের সকাল এলে মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠে। বুক ফেটে কান্না পায়। তবুও সব ব্যথা বুকের ভেতরে পাথরচাপা দিয়ে দেশে পরিবারের সাথে কথা বলি ভিডিও কলে। মা যখন জানতে চায়, বাবা, কী খেয়েছিস, কী পাঞ্জাবি নিয়েছিস, ভেতরে চেপে থাকা কষ্টরা বাঁধ ভাঙ্গা কান্না হয়ে বেরিয়ে আসে। সেইসব কান্না আড়াল করতে মা’কে ব্যস্ততার অজুহাত দেই, নামাজে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে অজুহাত দেই। রুমমেটদের সাথে একত্রে নামাজ সেরে বাঙালি রেস্তোরাঁয় সকালের খাবার খেয়েই কাজে চলে যাই। প্রতিবারই পরিকল্পনা থাকে আগামী ঈদ দেশে উদযাপন করবো পরিবারের সাথে। কিন্তু পারিবারিক নানাবিধ কারণে আর্থিক সংকট প্রকট হয়ে উঠায় ভাবি, সমস্যা সমাধান জরুরি, নাকি আমার দেশে গিয়ে ঈদ আনন্দ করাটা বেশি জরুরি ? শেষে নিজের আনন্দটুকু জলাঞ্জলি দিয়ে পরিবারের সুখটুকুকেই বড় করে দেখি। আশায় থাকি পরবর্তী ঈদের। ” স্টুডেন্ট ভিসায় তিন বছর আগে এ দেশে এসেছে সাহেদ। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকুরি করছে রেস্টুরেন্টের বাসবয় হিসেবে। ঈদের দিন বন্ধুদের সাথে লং ড্রাইভে যাবে জানালো। খানিকটা আবেগাপ্লুত হয়ে বলল, ” মাকে পা ছুঁয়ে সালাম করা, জড়িয়ে ধরা হবে না, এ কষ্ট বড় বেশি কাঁদায় এই দূর দেশে। মায়ের হাতের রান্নাও মিস করবো খুব “। খুব কাছের এক আত্মীয়ের ছেলেটি এসেছে ডিভি লটারি পেয়ে। জিজ্ঞেস করলাম ঈদের জামা নিয়েছে কিনা। জানালো, সাত বছর আগে এদেশে আসবার সময় সাথে করে নিয়ে আসা পাঞ্জাবিগুলো এখনো নতুনের মতোই আছে। সেখান থেকে একটা পরা যাবে। কষ্টার্জিত অর্থ সাশ্রয় করা শিখে নিয়েছে ছেলেটি। অথচ যে কিনা মধ্যবিত্ত বাবা-মা’র সংসারে প্রতি ঈদে নতুন জামার বায়না ধরে নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিতো ! শেষে খানিক অভিমান মিশ্রিত স্বরে বলে উঠে, ” আমার আবার ঈদ কিসের ! এই শহরে দেয়াল ঘড়ি ছাড়া আমার আর কেউ নেই “। দেয়াল ঘড়ি ! কথাটি একটু অন্যরকম শোনাল। বুঝলাম, ঘড়ির সময় ধরে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলা যাপিত জীবনের কথা বলছে। পাঁচ মাস আগে এ দেশে নতুন আসা আমার ভাইটি দেশে ডলার পাঠাতে যাচ্ছে শুনে জানতে চাইলাম, কাকে পাঠাবি ? বাবা-মা বেঁচে নেই, কিন্তু আমার চাচা-ফুপু তো বেঁচে আছেন। শহরে এবং গ্রামের মসজিদগুলো আছে, যেখানে আমরা ধর্মীয় শিক্ষা নিয়েছি। আছেন আরো অনেকে। এই যে এদের মনে রাখা, ঈদ উপলক্ষে মনে করে অর্থ পাঠানো, এ কেবল নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্যে। আমরা প্রবাসীরা আসলে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে, ভাগ্যান্বেষণে কিংবা জ্ঞানান্বেষণে গ্রাম ছেড়ে শহরে, দেশ ছেড়ে বিদেশে আসি ঠিকই। কিন্তু পুরপুরিভাবে সব ছেড়ে আসি না। আমাদের অস্তিত্ব, সত্ত্বা এবং হৃদয়ের অনেকাংশই রেখে আসি মা, মাটি আর শেকড়ে। মাথার উপর দিয়ে একখণ্ড ধূসর মেঘের ভেসে যাবার মতো। সূর্যের ঝলমলে কিরণ কিংবা আকাশ ভরা পূর্ণ চাঁদের আলোর মাঝেও যে ফিরে ফিরে আসে।

রিমি রুম্মান

কুইন্স, নিউইয়র্ক

৩৪৮জন ১৫১জন
24 Shares

৩৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য