সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে


বছরের শেষে সূর্যাস্ত আর প্রথম সূর্যদয় দেখব বলে কদিন আগে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ভ্রমন করে আসলাম।। ৩দিন ৪ রাত্রির প্যাকেজ। সড়ক পথে সেন্টমার্টিন যেতে হলে দুই ধাপে যেতে হবে। প্রথমে ঢাক থেকে টেকনাফ তারপরে সী বোটে করে সেন্টমার্টিন।


ফ্রেম বন্দি গোধূলী লগ্নে বিদায় ২০১৯

৩০ ডিসেম্বর রাতে আরমবাগের সৌদিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ১১৬ জনের একটি দল নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয় টেকনাফের উদ্দেশ্যে। সকাল ৮ টার মধ্যে আমরা পৌছে গেলাম টেকনাফের উখিয়া সিমান্তে। সেখানে দেখা মিলল অনেক রেহিঙ্গা নারী পুরুষের সাথে। এ যাবত টিভীতে তাদের দেখেছি। এবার সরাসরি দেখলাম। তাদের কেউ কেউ সেখানে নানা প্রকারের ব্যাবসা শুরু করেছে।কেউ কেউ ইউনিসেফের দেয়া পুষ্টী কর শিশু খাবার বিক্রি করছে। কেউ বার্মিজ বিভিন্ন দ্রব্য সামগ্রীর পসরা নিয়ে বসেছে। কেউ কেউ টিন আর বেড়া দিয়ে খাবার হোটেলে মত করে ব্যবসা করছে। তেমনি একটি হোটেলে দলনেতার সাথে ঢুকে পড়লাম। সকালের নাস্তা সেরে সেন্টমার্টিন যাবার জন্য ঘাটে উপস্থিত হলাম আর সী বোট এর জন্য ওয়েট করতে লাগলাম। ওয়েটিং ছাউনিতে দলনেতা আমাদের মাঝে প্রয়োজনীয় পোষাক ও গেঞ্জী বিতরণ করলেন।সকাল ১১ টায় আমরা যাত্রা শুরু করলাম স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে। আমারা যে সী বোটটিতে উঠলাম তার নাম আটলানটিক।


সী বার্ড এর সাথে মিতালী

নাফ নদীতে সী বোটটি যখন চলছিল তখন হাজারো সী বার্ড আমাদের বোটটি ঘেষেে উড়ে চলল। কেউ তাদের চিপস দিলে একদম কাছে এসে ছো মেরে নিয়ে যাচ্ছে। কোন ভয় বা শংকা নেই। ভারী মজারতো। খুব অবাক লাগলো। একপাশে বাংলাদেশে আরেকপাশে মায়ানমার মাঝখানে নাফ নদীতে ভাসছি আমরা।


দূঢ়ে দেখা যায় মায়নমার সৈকত

একসময় মায়ানমার আর বাংলাদেশ কিছুই চোখে পড়ে না শুধু পানি আর পানি।সাথে প্রচন্ড ঢেউ আর ঢেউ। এভাবে এক দেড় ঘন্টায় নাফ নদী ছেরে সাগরে চলে আসল সী বোটটি। এই প্রথম পরিচয় সাগরের বড় বড় ঢেউয়ের সাথে। সাগরের মাঝামাঝিতে এমন ঢেউ ডিঙ্গিয়ে সী বোটটি যখন চলছিল তখন খুব এ্যাডভেঞ্চার এ্যাডভেঞ্চার অনুভব করছিলাম। প্রায় তিন ঘন্টার মত সীবোটটি চলার পর দূঢ়ে দেখা গেল সেন্টামর্টিনের অবয়ব।

সেন্টমার্টিনে পা রাখলাম। মনটা আনন্দে ভড়ে উঠল ।এমন একটা জায়গায় আসতে পেরে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম। আমরা চলছি কটেজের উদ্দেশ্যে। বীচে দেখলাম অসংখ্য কুকুর আমাদের স্বাগত জানাতে চলে এসেছে।এদ্বীপে নাকি কুকুর মারার নিয়ম নাই। যেভাবে কুকুর বৃদ্ধি পাচ্ছে ডগ ভ্যালী না হয়ে যায় একসময়।


কুকুর বান্ধব সেন্টমার্টিন

আমাদের জন্য শুভ ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস এর পক্ষ থেকে আগেই কটেজ বুকিং ছিল। ঘাট থেকে ভ্যানের মত গাড়িতে চড়ে কটেজে উপস্থিত হলাম। আমাদের কে সেখানে দলনেতা কিছু জরুরী ব্রিফিং দিলেন। যেমন সাগরের জীব বৈচিত্র দেখা যাবে ছোয়া যাবে না, ন্ষ্ট করা যাবে না। কোন প্রকার উশৃংখলতা করা যাবে না, নেতার আদেশই শেষ কথা ইত্যাদী।

দলনেতার ব্রিফিং

আমার সাথে আরো তিন জন । আমাদের জন্য একটি রুম বরাদ্দ হল। এর মধ্যে একজন সাংবাদিক।সামুন ভাই। এছাড়া আমার সাথে আরো যে দুজন আছে তাদের একজন উকিল। তার নাম মোস্তাফিজ আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার নাম সাইফুল। চারজনের ক্ষন কালের সংসার। গা- গোসল ধোয়ার জন্য রুমের বাথরুমে ঢুকে দেখি পানি নাই। ল্যা ঠ্যালা। প্রথমদিনেই এই অবস্থা। কটেজের মালিকে জানাতেই তিনি মটর ছাড়লেন। আমি একটু অবাক হলাম এই সাগর ঘেরা দ্বীপে বিদ্যুত এলো কিভাবে? জানলাম এখানে সৌর বিদ্যুত ব্যবহার করা হয়। যাক পানি আসতে এখনো কিছু সময় লাগবে। এই ফাঁকে সাগেরে গোসলটা সেরে আসি।যেই ভাবা সেই কাজ, সাগরে চলে গেলাম গোসল সারতে।সাগরের পানিতে অসম্ভব বালি। এত দেখি গা ধুতে যেয়ে গা বালিতে ছেয়ে গেল। যাক রুমে এসে দেখি পানি চলে এসেছে। কলের পানিতে গোসলটা সেরে ফেললাম। জোহরের নামাজ শেষে খেতে গেলাম।


গোলাকার ছাউনি

খাবার সম্পটটি খুবই মনোরম। সাগরের বীচ ঘেসে চারপাশে নারকেল গাছ মাঝখানে গোলাকার ও বার্গাকৃতির ছাউনি ঘর।পাশেই পাকের ঘর । ওখানে খাবার টোকেন দিয়ে লাইনে দাড়িয়ে সবাইকে খাবার নিতে হয়। আমিও সবার মত খাবার সংগ্রহ করে। একটি ছাউনিতে ঢুকে পড়লাম।চেয়ার আর টেবিল পাতাই আছে। ক্ষিদে পেট চো চো করছে। বসেই গ্রোগাসে গিলতে লাগলাম। বিকেলে আসরের নামাজ শেষে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল সী বিচে। এখানে আমরা অবলোকন করব ২০১৯ সালের শেষ সূর্যাস্ত। ১১৬ জনের সবাই জড়ো হলাম সাগড়সৈকতের পশ্চিম পাশে। সাগর পারে ফুরফুরে মিষ্টি হাওয়া আমাদের সারাদিনের ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দিল। আস্তে আস্তে স্বন্ধ্যার হবার পথে সূর্য ডুবার জন্য প্রস্তুত সাগরের দুঢ় দিগন্তে। আমারাও প্রস্তুত হলাম এই অপার সৌন্দর্যের লিলা অবলোকনের করে স্বাক্ষী হতেে এক অবিস্মরনীয় গোধূলী লগ্নের।কি সুন্দর দৃশ্য সূর্যটা আস্তে আস্তে সাগরের মাঝে বিলিন হয়ে গেলো।রেখে গেল এক স্বর্নালী আভা। বিদায় ২০১৯ বিদায়। গুড বাই।

ছবিঃ ১


ছবিঃ২
গোধূলী লগ্ন ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯

আমরা এ অপার সৌন্দর্য অবলোকন করে মহান সৃষ্টি কর্তার কাছে যার যার ধর্মমতে দোয়া করলাম। স্রষ্টার শুকরিয়া আদায় করলাম। তিনি নিযে সুন্দর । তার সৃষ্টিও যে কত সুন্দর তা দেখে কৃতজ্ঞতায় ভড়ে গেল অন্তর। কত সুন্দর এ ধরনী আমাদের তিনি করেছেন দান। কিছুক্ষন সবাই হারিয়ে গেলাম স্রষ্টা আর সৃষ্টির মায়াবিরুপের ধ্যানে।


স্রষ্টার কাছে কৃজ্ঞতা জ্ঞাপন

মাগরিবের নামাজ শেষে রুমে ফিরে আসলাম । শরীটা খুব ক্লান্ত । আর আমার পায়েও একটা ব্যাথা আছে। আমার সাতে ফাস্ট এইড কিছু ঔষধ পত্র থাকে । সেখান থেকে মলম নিয়ে পায়ে ভাল করে ম্যাসেজ করলাম। এরপর বিছানায় একটু গা লাগিয়ে রেস্ট করছিলাম। ঘুমও এসে গিয়েছিল। তখনই আমাদের গ্রুপের নেতার ফোন পেলাম। এখনি খাবার ছা্উনিতে চলে আসুন। ওখানে গান হচ্ছে । আপনাকে লাগবে। আমি বললাম ভাই একবারে খাবার সময় যাবো এখন থাক । বড্ড টায়াড লাগছে। কিন্তু কাজ হলো না। কে শুনে কার কথা। বললেন এটা নেতার আদেশ হুকুম। নেতা বলেছেন সো নো হাংকি পাংকি। হাজির হলাম গানের আসরে। শুরু হলো আমাদের জমানো এক জলসা। সেখানে গানে গানে মেতেছিলাম। দেখা হয়েছিল সেখানে ইদানিং জনপ্রিয় মধু খই খই বিষ খা্ওয়াইলা গানের রচয়িতা আঃ রশিদ ভাইয়ের সাথে।


বাউল কবি রশিদ ভাইয়ের সাথে

আমাদের আড্ডা রাত দশটা পর্যন্ত চলল। এর সাথে চলল বারবিকিউ এর প্রস্তুতি।


বারবিকিউর প্রস্তুতি চলছে

এরপর খাবার পরিবেশন করা হলো। সবাই খাবার খেলাম। এশার নামাজ আদায় করলাম। আর কিছুক্ষন পর বারটা বাজবে শুরু হবে নতুন বছর।সবাই নতুন বছরকে স্বাগত জানতে অপেক্ষমান। মোবাইলে দেখলাম বারটা বাজল। তখনই সবার কলতানে মুখরিত হল সাগর পাড়। সবাই চিৎকার করে উঠল হ্যাপি নিউ ইয়ার। রাতে আমাদের এই দলের ইঞ্জিনিয়ার স্বপন ভাই তার মেয়ে আর ছেলে (সেও ইঞ্জিনিয়ার) মিলে ফানুশ উড়ানোর চেষ্টা করল । কিন্তু কিছুতেই উড়াতে পারছিল না। অনেক্ষন তাদের এ ব্যর্থতা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমতে চলে গেলাম। অবশ্য আমি চলে আসার পর তারা কিন্তু সফল ভাবে ফানুষ ওড়াতে পেড়েছিল।


সৈকতে ফানুষ উড়ানো

ঘুমুতে যাবার আগে আমাদের নেতা স্মরন করিয়ে দিলেন সকালে ৪টায় ঘুম থেকে উঠতে হবে। বছরের প্রথম সূর্যদয় দেখার জন্য তারাতারি উঠতে হবে তো। রাতে ঘুমাচ্ছি নাকডাকার আওয়াজে ঘুমানো জায় না। রুমে দুটি খাট। একটিতে উকিল আর ইঞ্জিনিয়ার । আমি আছি সাংবাদিকের সাথে। বেটার নাকা ডাকার আওয়াজে ঘুমের তার ছিড়ে যাচ্ছিল বারংবার। ঠ্যালা দিয়ে বলালম কিরে ভাই নাকের বাঁশিতো আর ভাল লাগে না । একটু থামান। সে উল্টো আমাকে বলে, কি বলেন আপনার নাকের উচ্চঙ্গ সঙ্গীতে আমার ঘুম আসছেনা । লও ঠ্যালা আমি আবার নাক ডাকলাম কখন। আসলে এই রুমের যারা আছি প্রত্যেকেই নাক ডেকিছি। কেউ ঘো ঘো- কেউ গো গো আবার কেউ গুরুত গুরুত।

দলনেতার হাকডাকে যখন ঘুম ভাংলো দেখি চারদিকে তখনও অন্ধকার। আর ক্লান্ত শরীরে ঘুমের রেশা কাটছেই না। আবার হাকশুনলাম। নামাজ পড়েন তারাতারি। কিছুক্ষন পড়েই রওনা দেবো। কি আর করা আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে পড়লাম। অযু করে নামাজ পড়লাম। তারপর প্রস্তুত হলাম প্রাতকালীন এ্যডাভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে। গন্তব্যস্থলে পৌছেই দলনেতা আমাদের চার/পাঁচ সাড়িতে দাড় করালেন। এপর শুরু হল প্রাতকালিন ব্যায়ম।


প্রাতকালীন ব্যয়াম

ইতিমধ্যে আকশ কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল। আমোদের বছরের প্রথম সূর্যদয় দেখার প্ল্যান বুঝি ভেস্তে গেল। কিন্তু না এর মাঝেও ক্ষনিকের জন্য রবি বাবু উকি দিলেন। আমরাও তাকে দেখে স্বার্থক করলাম নিজেদের। স্বাগত ২০২০ ।


স্বাগত ২০২০
স্রষ্টার কাছে দোয়া করলাম বছরটা যাতে সুন্দর আর প্রশান্তিময় হয়।বেশীক্ষন স্থায়ী হলনা এ শুভলগ্ন।মেঘের আড়ালে রবি বাবু হারিয়ে গেলেন । গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুর হল। আমরা এর মাঝে মার্চ করতে করতে সী বিচ ধরে কটেজের দিকে রওনা হলাম। নেতার নির্দেশ মাঝে মাঝে ভাংতে হয়। সবসময় নিয়ম মানলে সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হয়ে হয়। সাড়িবদ্ধ ভাবে সবাই যখন যাচ্ছিল আমরা কজন দলছুট হাজির হলাম দূড়ে জেলেদের সাগর পাড়ে মাঝ ধরা দেখতে। সবে মাত্র জাল টেনে তুলেছে । কত রকমের মাছে যে সেখানে। একটি মাছ দেখলাম টিভিতে ডিসকভারীতে প্রায় দেখায়। এর নাম উড়ুক্ক মাছ মানে ফ্লাইং ফিশ। আমাদের একজন আড়ইশ টাকা দিয়ে চারটি কেনে ফেলল। আর তখনই পাশ থেকে একজন স্থানিয় লোক হবে বলে উঠল এর কেজিই পাওয়া যায় দুইশ টাকায়। শুনে সহযাত্রি বন্ধুটি বলল সখের দাম লাখ টাকা।


উড়ুক্ক মাছ

সাগরের বীচ ধরে হেটে হেটে আমরা কটেজের দিকে আসছি। তখন নজর পড়ল সৈকতের শ্যওলা ধরা পাথর গুলোর দিকে।শামুক ঝিনুক শ্যওলা জিবাষ্ম দিয়ে গড়া এক অদ্ভুত পাথর। কোনটা ছোট কোনটা খুব বড়। শামুক ঝিনুক দিয়ে গড়া বলে পাথর গুলো খুব ধারালো। খালিপায়ে কেউ হাটলে পা কেটে যেতে পারে। পাশে সৈকতে একটি সামুদ্রিক সাপ দেখার সৌভাগ্যও হয়ে গেল।


সামুদ্রিক সাপ

কটেজে পৌছে দেখি অলরেডি নাস্তা শুরু হয়ে গেছে। টোকেন দিয়ে তরিঘরি নাস্তা নিলাম। সকালের নাস্তায় আমাদের ডিম আর খিচুরী দেয়া হলো। সাগর পারে ভোর সকালে এমন খাবার খেতে খেতে এক অজনা ভাল লাগায় আর্বিভূত হয়ে গেলাম।ইতিমধ্যে নেতার পয়গাম চলে এসেছে । আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছেড়া দ্বীপ। বেলা ১১টায় আমরা রওনা হলাম ছোড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে।

ছেড়া দ্বীপে দুভাবে যাওয়া যায় । স্থল পথে ও জল পথে। ভ্রমনটাকে আরেকটু ইন্টারেস্টিং ও এ্যাডভেনঞ্চারিয়ার্ছ করার জন্য আমরা জলপথে যাব ঠিক করলাম। জেটিতে পৌছে টলারে চাপলাম।


বাহারী রংয়ের টলার

টলার সবার জন্য লাইফ জ্যাকেট রাখা আছে। এক এক করে পড়ে নিলাম আমরা। টলার সাগরের বুক চিড়ে ছুটে চলল ছেড়া দ্বীপের দিকে।মনের আনন্দে গান ধরলাম- তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিবরে।


তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিবরে

প্রায় একঘন্টার মত সাগরে ভেসে আমাদের টলার ছেড়া দ্বীপের যেখানে থামল সেখান থেকে তীর অনেক দূঢ়ে। ছোট ছোট নৌকা আছে। টলার থেকে নেমে তাতে উঠে পড়লাম আমরা।


নৌকা করে ছেড়া দ্বীপে অবতরন

ছেড়া দ্বীপে পা রাখলাম আমরা।এখানেও দেখা মিলল সেই ধারালো শ্যওলা পাথরের। বলতে গেলে পুরো ছেড়া দ্বীপটাই এই পাথরে আবৃত। তাই এ দ্বীপে যেই আসুক খুব সাবধানে চলাফিরা করতে হবে। একবার পিছলে পড়লে হাত পা কেটে একাকার হয়ে যেতে পারে।


প্রবাল পাথর -১


প্রবাল পাথর-২

ছোড়দ্বীপ সম্পর্কে আগে শুনেছিলাম যে, এখানে অনেক ছোট ছোট নারকেল গাছ আছে। যেখানে ঝুড়ি ধরে নারেকেল ধরে থাকে। কিন্তু আমার সে ধারনা ঠিক হল না। এখানে নাকেল গাছ আছে বটে নারকেলও আছে। কিন্তু গাছগুলো ছোট নয় মাঝারি সাইজের। আর ডাবের দাম ঢাকা থেকেও বিশ টাকার মত বেশী। ৭০/৮০টাকা করে। এখানে নারকেল গাছ থেকে বেশী দেখা গেল কেয়া ফল গাছ।সম্পূর্ন দ্বীপ কেয়ার ঝোপে ছেয়ে আছে।

কেয়া ঝোপ


পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ বোর্ড

চারপাশের সমুদ্র মাঝখানে এ দ্বীপ । একটি পাশ কিছুটা শুকনো যে পথ দিয়ে সেন্টমার্টিন থেকে স্থলপথে আসার পখ রয়েছে। জোয়ারের সময় এটা পানিতে ডুবে যায়।


তীরে পাথরে আছড়ে পড়ছে ঢেউ

ছেড়া দ্বীপে আমার কাছে চির স্মরনীয় হয়ে থাকবে সাগরের পচন্ড ঢেউ এর গর্জন এর জন্য। বড় বড় ঢেউ গুলো গর্জন করতে করতে খুব জোড়ে এসে বড় বড় প্রবাল পাথর গুলোতে আছড়ে পড়ছে। কি অপূর্ব দৃশ্য। নিজ চোখে না দেখরে বুঝতামই না। খুব মজা লেগেছে আমার কাছে। মনে হচ্ছিল এখানেই থেকে যাই। ওখান আমি ধ্যন মগ্নের মত বসে বসে প্রকৃতির এ অপূর্ব শোভা অবলোকন করতে লাগলাম।ওখানে আমরা এক ঘন্টার মত ছিলাম।

এরপর আবার ছোট নৌকা করে টলারে উঠে সেন্টমার্টিনে ফিরে এলাম।একটি গ্রুপ সাহস করে পায়ে হেটে রওনা হয়েছিল। সেন্টমার্টিন পৌছতে তাদের প্রায় দুই ঘন্টা সময় লেগেছে। সেন্টমার্টিনে ফিরে আমরা সবাই এবার সাগরে গোসল করা জন্য প্রস্তুতি নিলাম।আমাদের কে যে ট্রাউজার আর গেঞ্জী দেয়া হয়েছিল তা পড়ে নেমে পড়লাম সাগড়ে।ঢেউ কেটে কেটে সামনে এগিয়ে যাই । মাঝে বড় ঢেউয়ের খপ্পরে পড়ে তাল হারিয়ে পড়ে যাই। কিছু নোনা জল ঢুকে পড়ে মুখে।সাগর স্নানে খুব মজা হলো।


সাগর স্নান

দুপরে নামাজ শেষে খাবার ছাউনিতে হাজির হলাম। সেখানে বাহারী আয়জন সামুদ্রীক কোরাল মাছের দু পেয়াজা আর ফ্লাইংফিশ ফ্রাই এর সাথে ভাত ডাল আর সবজি।আর কি তর সয়। তৃপ্তি নিয়ে খেলাম।

বিকেলে সবাই মিলে হন্টন করে পুরো সেন্টমার্টিন চক্কর দিলাম। বীচে হাটতে হাটতে দল চলে আসল সৈকত ঘেসে ছোট ছোট বাজার এর কাছে। জ্যান্ত বড় বড় লবস্টার বাহারি রংয়ের চিংড়ী, কাঁকাড়া ও নানা রকম সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হচ্ছে। পাশেই মসলায় মেরিনেট করা সামুদ্রিক মাছও আছে। কেউ জিবন্ত বা মেরিনেট কোন মাছ পছন্দ করলে তাকে তা তৎক্ষনাত ফ্রাই করে দেয়া হয়। শখ করে একটি বড় লবস্টারের দাম করলাম । দাম চায় ৫৫০/- টাকা। দাম শুনেই দিলখুশ ।

হরেক রকম সামুদ্রিক মাছ


লবস্টার আর কাঁকড়া

সেখানে আর দাড়ালাম না পাশেই নানা রকম সাজুগুজু প্রসাধনী ও সৌখিন দ্রব্য সামগ্রীর দোকান দেখে ঢুকে পড়লাম। শামুক ঝিনুকের মালা থেকে শুরু করে বার্মিজ সেন্ডেল সবই এ দোকানে আছে। দোকানগুলো পেরুলেই স্বল্প দূরত্বে একটি কটেজ প্রয়াত জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের সমুদ্র বিলাস। পাশেই সৈকতে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট মানব আকৃতির একটি পাথর। আমরা সেখানে কিছুক্ষন সময় কাটালাম।


প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের কটেজ সমুদ্র বিলাস


আদম সুরত পাথর

পুরো দ্বীপ চক্কর দিয়ে গোধূলী লগ্নে আমরা ফিরে আসলাম কটেজে। অতিরিক্ত হাটার কারনে পায়ে বেশী পেশার পড়ায় পা ফুলে ঢোল হয়ে গেছে । এমন দূর্বল পা নিয়ে এত পথ হাটা। ব্যথায় টন টন করছে। বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ডেকে তুলল। ভাই উঠেন এশার নামাজ পড়ে রাতের খাবার খাব। সবাই অলরেডি চলে গেছে। তরিঘরি করে উঠে নামাজ পর্ব শেষ করে রওনা হব এমন সময় পাশের রুমে আমাদের এই দলের একজন অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে শুনে তাকে দেখতে গেলাম। দেখি তার সাথে আসা তার এগার বার বছরের মেয়েটা বাবার ঘুমন্ত মাথার পাশে উৎকন্ঠিত হয়ে বসে আছে। আসলে সারাদিনের হন্টনের ক্লান্তিতে প্রেসার ফ্লট করেছে। মেয়েটাকে কিছু সান্তনার বাণি শুনিয়ে একটু স্বাভাবিক করে হাজির হলাম খাবার ছাউনিতে। সেখানেও আরেকটি এম্বারস সিচুয়েশন এর সমুক্ষিন হলাম । এক অপ্রত্যাশিত বিপদ এসে পড়ল যেন আমাদের উপর। টোকেন নিয়ে খাবার টা এনে দেখি টেবিল ফিলাপ হয়ে গেছে। কোনরকম এক কোনায় জায়গা করে খেতে বসেছি হঠাৎ করে পাশের টেবিলে একজন মারাত্মক ভাবে অসুস্থ হয়ে চেয়ার থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দম আটকে গেছে । বার বার শরীর ‍খিচুনি দিচ্ছে। সবাই খাবার দাবার ফেলে তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। হাত পা ছেড়ে দিয়ে তার দেহটা আস্তে আস্তে নিথর হয়ে গেল। তার অবস্থা দেখে আমরা সবাই ঘাবরে গেলাম। রাত তখন বাজে এগরটার মত। এসময় ডাক্তার পাওয়া কথা না । তারপরও কটেজের দায়িত্বশীল শুভ ভাই নিকস্থ ফার্মেসী থেকে একজনকে নিয়ে আসলেন।ডাক্তার না কম্পাউন্ডার জানিনা তিনি এসে তাকে দেখে বললেন ভয়ের কিছু নাই। হঠাৎ করে নার্ভস ব্রেক ডাউন হয়েছে। ভালো মত ঘুমালে সব ঠিক হয়ে যাবে। ঘুমের ঔষধ দিয়ে ঘুম পারিয়ে তিনি চলে গেলেন। সে রাতে আর কোন আড্ডা হল না সাবই যার যার মত ঘুমতে চলে গেলাম।

আজ সেন্টমার্টিনে আমাদের শেষ দিন।যথারিতি দলনেতার হাকডাকে ঘুম ভাঙ্গল। ফজরের নামাজ শেষে সবাই বীচে গেলাম ব্যায়ম করতে।

বিদায়ী প্রভাতে শরীর চর্চা

এরপর দলনেতা ফেরার প্রস্তুতি বিষয়ে আমাদের নির্দেশনা দিলেন।

যাবার বেলায় সৈকতে শেষ সমাবেশ

যাবার আগে কিছু কেনাকাটা করার জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কেউ শুটকি কিনল, কেউ বাচ্চাদের জন্য মালা চকলেট সহ নানা রকম বাহারী জিনিস কিনল।


শুটকি বাজার

বাজারের পাশে একটি মসজিদ দেখে আমাদের চোখ আটকে গেল। তার সামনে যেই ছোট পুকুরের মত রয়েছে তার পারগুলো সম্পূর্ণটা প্রবাল পাথরে গড়া। যা এতটা নান্দনিক যে সবার দৃষ্টি আকর্ষন করেছে।


মসজিদের সামনে প্রবাল পাথর দিয়ে গড়া ছোট একটি পুকুর

সেন্টমার্টিন ট্যুর এর ইতি টেনে দুপুর ২টা নাগাদ আমরা পৌছলাম জেটিতে। এরপর সীবোট এ উঠে টেকনাফ । সেখানে আমাদের বাসগুলো দাড়িয়েছিল। তাতে করে ফিরে এলাম ঢাকায়। স্মৃতি ময় কিছু মূহুর্ত ধরে রাখলাম হৃদয়ের ক্যমরায়।

ছবি সংগ্রহে কৃতজ্ঞঃ ইঞ্জি সাইফুল, শুভ ভাই, ইঞ্জি মোমিনুল স্বপন ভাই, রফিক তালুকদার ভাই, মিনহাজ ভাই ও হেনা বেগম।

৫৪৯জন ৩৫২জন
24 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য