” প্রতিশ্রুতি “

রেজওয়ানা কবির ২৮ নভেম্বর ২০২০, শনিবার, ০৬:২৪:১৮অপরাহ্ন গল্প ২৬ মন্তব্য

শব্দের খোঁজে এত যায়গায় যাচ্ছি, কিন্তু শব্দ আর পাচ্ছি না, আবার যে শব্দগুলো পাচ্ছি সেগুলো মাথার ভিতর উল্টো আকারে খেলা করছে, তাই শব্দের খোঁজ বাদ দিয়ে ফোনে গান ছাড়লাম।  যে গানটি বেঁজে উঠল তাহলো,

” সত্যি বলছি তোমাকে আর ভালোবাসি না,

তোমার জন্য মিছেমিছি রাত জাগি না,

সত্যি বলছি তোমায় নিয়ে স্বপ্ন দেখি না,

তোমার জন্য রাত জেগে কাব্য লিখি না,

এখন তোমার জন্য আমার কোন সময় নেই,

এখন আমি ভালোবাসি শুধু আমাকে”।

গানটি এই পর্যন্ত বেঁজে বন্ধ হয়ে আমার ফোনের রিংটোন, ” যেখানে সীমান্ত তোমার বাঁজা শুরু করল, ফোন হাতে নিয়েই দেখি রুকু আপুর ফোন।

আপু ঃ কবিতা লিখছি তোকে শোনাবো

আমি ঃ হ্যা বল

আপু ঃ বলেই যাচ্ছে, আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছি কিনা জানি না? শুধু ভাবছি আজবতো, আপু প্রতিদিন এতসব লেখে আমি পারি না ক্যান?

আপু ঃ বলেই যাচ্ছে,,,

আমি ঃ হঠাৎ স্তম্ভিতভাব থেকে ফিরে শুধু একটা শব্দ কানে এল সেটা হল ” প্রতিশ্রুতি “।

ফোনে কথা শেষ করে ভাবলাম, পেলাম তো একটা শব্দ প্রতিশ্রুতি দেখি লিখে ফেলি,,,,,

সেদিন ছিল অনেক রাত, প্রচন্ড বৃষ্টি ও সাথে বিদুৎ চমকাচ্ছিল, হঠাৎ অবন্তীর ফোনে একটা ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট আসল, অবন্তী তা দেখে প্রোফাইল ঘাটল, দেখল খারাপ না অবন্তীর মতই ছেলেটি জব করে। অবনী কোন চিন্তা না করেই তাৎক্ষনিক রিকুয়েষ্ট এক্সসেপ্ট করল।  যদিও বয়সটা আর সেই কিশোর কিশোরীর না, তবুও একটা সময় অবনীর খুব ক্লান্ত আর একা লাগে। এভাবেই সারাদিন অফিস শেষে অবন্তী বাসায় ফিরে শত মানুষের ভীরে একা হয়ে পরে।

পরদিন সেই রংধনু ছেলেটির সাথে অবন্তীর প্রথম মেসেঞ্জারে কথা হয়, এভাবে বেশকিছুদিন কথা হতে থাকে, তারপর ফোনে কথা আদানপ্রদান চলতেই থাকে, অবন্তীর ভালোই সময় কাটতে থাকে, কিন্তু এভাবেই অবন্তীর মত এত শক্ত একটা মেয়ে যেকিনা এত ছেলেদের সাথে মিশে বড় হয়েছে, এত ভালো ভালো অফার পেয়েছে, কখনো কারো সাথে কোন সম্পর্কে জড়ায় নি সে আজ হঠাৎ এই রংধনুর প্রতি ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে পরছে, অবন্তী ভাবছে হয়ত এটা নিছক ইনফ্যাচুয়েশন, কিন্তু যত দিন যাচ্ছে অবন্তী যেন তাকে আঁকরে ধরার চেষ্টা করছে আর তাকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছে । আর শুধু রংধনুকে বলত,আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না, রংধনুও তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সে কোনদিন তাকে ছেড়ে যাবে না,এভাবেই তাদের প্রেমের খুনশুটি, ঝগড়া, ভালোবাসা চলছিল।

কিন্তু সবকিছু হয়ত একভাবে সবসময় চলে না, ধীরে ধীরে ছেলেটার ব্যস্ততা বাড়ছিল, আর সে অবন্তীর থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, অবন্তীর এস এম এস, কল সব কমে আসছিল, কিন্তু এতদিনে অবন্তী এই সম্পর্কে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে, তাই ভীষন কষ্ট পাচ্ছিল, ছেলেটাকে যত বোঝাচ্ছিল সে তত দূরে সরে যাচ্ছিল,অপমান করছিল, যা তা ভাষা বলে, যেগুলো অবন্তী এর আগে কোনদিন এসব শুনে নি, তবুও কষ্ট পেয়ে, অপমানিত, অবহেলা পেয়েও বার বার ফিরে যায় তার কাছে। দিনের পর দিন অবন্তী যত বোঝায়, ছেলেটি ততই অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে, এমনকি তাকে হুমকি দেয়।। অবন্তী অনেক কষ্টে ছেলেটিকে বোঝায়, ছেলেটি কি ভেবে প্রতিদিন ১০ মিনিট করে কথা বলবে এই প্রতিশ্রুতি দেয়, এরপর আবার এভাবে কথা শুরু হয়। কিন্তু অবন্তী বার বার একই কথা বলে প্লিজ জান, তুমি আগের মত হও। কিন্তু ছেলেটা বার বার বলে আমি তোমার কাছে ফিরব কিনা জানি না, ফিরতেও পারি, নাও ফিরতে পারি, আবার বলে আমার মত হতে হবে, আমার সবকথা শুনতে হবে, এরকম হাজার শর্ত দেয়। অবন্তী সব মাথা পেতে নেয়, কিন্তু একজন মানুষ পরিপূর্ন কখনোই কারো মনের মত হতে পারে না। এভাবে আবার কথা হতে থাকলে রংধনু শুধু তার ভুল ধরে, তার দোষ খোঁজে, আবার অপমান করে, এমনকি অবন্তী যত ভালোবাসার কথা বলে তাকে  তত নোংরা কথা বলে।নিজে না ভালোবাসুক কিন্তু অন্যের ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতাও হয়তো তার নেই।

শেষ দিনের ঘটনা, অবন্তী সেদিন খুব কেঁদেছিল ,তারপর রংধনুকে অনেক কষ্ট ভালোবাসার এস এম এস করে, আবার ফিরে আসার কথা বলে, ছেলেটা এই এস এম এস দেখে অবন্তী কে যা তা বলে ব্লক করার হুমকি দেয়, শেষ  করে দেয় সম্পর্ক। অবন্তী ছেলেটির কাছে কোন পরিচয় চায় নি, শুধু মানসিক আশ্রয় চেয়েছিল, ছেলেটা সেই প্রতিশ্রুতি ও রাখতে পারল না। এতদিন অবন্তী অনেক কেঁদেছিল, অপমানিত হয়েও বার বার ফিরে গিয়েছিল কিন্তু সেদিন আর নিজেকেই কন্ট্টোল করতে পারল না,,তাই সেদিনের পর থেকে হয়ত অবন্তী আর ছেলেটিকে ডিস্টার্ব করে না কিন্তু প্রতিদিন ঘুমের ঔষধকে এখন সে সঙ্গী করেছে, কোনদিন দুই, তিন চার এভাবেই নতুন নতুন রোগকে শরীরে বহন করে, নিজের ক্ষতি করে কেটে যাচ্ছে তার বাকি দিন। মিথ্যে প্রতিশ্রুতির ফলাফল কান্না আর ঘুমের ঔষধই তার সঙ্গী এখন। আত্নহত্যা মহাপাপ বলে তাও করতে পারছে না, তবে মনে ছেলেটিকে লালন করে একইভাবে ভালোবেসে নিজেকে কষ্ট দিয়েই মৃত্যুর দিন গুনছে,আর সেই প্রত্যাশায় আছে কবে সে ফিরবে??  কবে সে এস এম এস এ আদর করে ডাকবে? কবে সে আগের মত বলবে, আমি আছি, ছিলাম, থাকব,? আর কবেই বা হাতে হাত রেখে বলবে ভালোবাসি❤️❤️❤️? আদৌ ফিরবে তো? এভাবেই অদ্ভুতভাবে পাওয়ার আকাঙ্খায় বেঁচেও মরে থাকা। কি  বিচিত্র ভালোবাসা???

গল্পের শেষটা থেকে আমার অনুধাবন, কাউকে ভালোবাসতে না পারি, তাকে অসম্মান করব কেন?নিজে না ভালোবাসি অন্তত অন্যের ভালোবাসার মূল্য দেই।  এছাড়া কাউকে ভালোবাসলে তার দোষ গুন সব নিয়েই পরিপূর্ন মানুষটাকে ভালোবাসা যায়।  আর আমি যদি ইচ্ছাকৃত কারো ভুল ধরতে চাই তবে আজীবন শত চেষ্টা করলেও আমার ভালো কিছু চোখে পরবে না। ইংরেজিতে বলে, ইট্স ইন্টায়রলি আপ টু ইউ।  আর আমি যদি ভালোবাসতে চাই তবে ভালো খারাপ মিলে তার ভুলগুলো ঠিক করে পাশে থাকতে পারি। কেননা ভালো খারাপ মিলিয়েই মানুষ ।আরে বাবা সবার সবকিছু ভালো নাই লাগতে পারে, তাই বলে তাকে মেনে নিলে কি হয়? সত্যিকারের ভালোবাসায় কোন খাঁদ থাকে না,। সব ভুলে তার ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা করে তার পাশে থাকাই যায়, এতে আরেকজন অন্তত একটু ভালো থাকে, এইটুকু করাই যায়, কারন আমরা মানুষ, আজ আছি কাল নাও থাকতে পারি, তাই যতক্ষন আছি, থাকি না ভালোবাসার মানুষটির পাশে।

আসুন কেউ কাউকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি না দেই, কেননা একটা মিথ্যে প্রতিশ্রুতি মানুষের জীবনকে ওলটপালট করে দেয়,মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। অবন্তী রুপকের আড়ালে হাজারো  মানুষের বাস্তব জীবন এভাবেই লুকায়িত থাকে। তাই যে প্রতশ্রুতি রাখতে পারব সেটা দেই, অন্যকে ভালোবাসি,সম্মান করি,যত ভুলই থাক না কেন সেগুলো মেনে নিয়ে পাশে থাকি,ভালোবাসি ❤️❤️❤️।

ছবিঃ নেট থেকে।

 

৪১৪জন ২০১জন
11 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য