প্রতিশোধ

অপার্থিব ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, রবিবার, ১০:২২:২৬অপরাহ্ন সাহিত্য ৯ মন্তব্য

বিকেলের শেষ ভাগে বোরাপাড়ার রাস্তার সামনের দিকে গেলে একটা অদ্ভুত দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। একটু টাকার লোভে কাঙ্গাল একদল মেয়েকে মুখে এক দলা পাউডার আর ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপষ্টিক মেখে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটা হয়তো ভদ্র সমাজের গ্রহনযোগ্য হবে না তবে আশার বিষয় হচ্ছে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। আমাদের ভদ্রসমাজের ভদ্রতাবোধ বড়ই বিচিত্র। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সেটা একটু একটু করে খসে পড়তে শুরু করে। বোরাপাড়া বাজারের ব্যস্ততার সাথে আবার ভদ্রলোকদের ভদ্রতাবোধের একটা ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক আছে। গাণিতিক ভাবে লিখলে ইকুয়েশনটা দাঁড়ায় এরকম-

F α 1/X

এখানে X হচ্ছে ভদ্রলোকদের ভদ্রতাবোধ এবং F হচ্ছে বোরাপাড়া বাজারের ব্যস্ততা।

একাসারিতে গোটা ত্রিশেক ঘর নিয়ে পাড়াটা । পাড়ার একেবারে শেষ প্রান্তের ঘরটা সুরভীর। এই মুহূর্তে সে বারান্দায় বসে সাজসজ্জায় ব্যস্ত, হাতে একটা ছোট আয়না যার উল্টোপাশে চিত্রনায়িকা শাবনুরের ছবি। সামনে একটা বাটিতে রাখা কিছু বরইয়ের আচার। এই মুহূর্তে তার সকল মনযোগ আবর্তিত হচ্ছে একটা ফেয়ার এণ্ড লাভলির শীর্ণ কৌটাকে ঘিরে। সর্ব শক্তি দিয়ে সেখান থেকে কিছু একটা আজ সে বের করেই ছাড়বে।

পাড়ার সদর দরজা দিয়ে বছর ত্রিশের এক যুবককে আমরা ভিতরে প্রবেশ করতে দেখি। যুবকের নাম হেকমত আলী। পেশা গ্রামে গঞ্জে ও লোকাল ট্রেনে তাবিজ বিক্রি। এই মুহূর্তে তার গায়ে একটা ময়লা চেক শার্ট ও কোমর থেকে নিচের অংশে একটা সিরাজগঞ্জী লুঙ্গি। যুবকের গা দিয়ে একটা মৃদু গন্ধ ভেসে আসছে, সম্ভবত সারাদিন গোসল করা হয়নি।

সদর দরজা দিয়ে ঢুকে সোজা সুরভীর ঘরের সামনে চলে যায় হেকমত। হেকমতকে দেখেও না দেখার ভান করে সুরভী। অবহেলাটাকে পাত্তা না দিয়ে বারান্দায় একটা পিঁড়ি নিয়ে ধুপ করে তাতে বসে পড়ে হেকমত এবং মুখে একটা সতেজ হাসি ধরে রেখে মোলায়েম কন্ঠে বলে- কেমন আছস সুরভী ?
সুরভী এক দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ হেকমতের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর এক ঝটকায় কাঁধে রাখা হেকমতের হাতটাকে সরিয়ে দিয়ে কর্কশ ভঙ্গীতে উত্তর দেয়- এতদিন কোন মাগীরে হান্দাইছিলি হারামাজাদা? আজ মনে পড়ছে আমার কথা?
সুরভীর মুখে খিস্তি শুনে হেকমতের হাসির ঝলক আরো খানিকটা বাড়ে।
-কি যে কস না তুই ? তোর কথা কি মনে না পইড়া পারে? কয়দিন নসুন্দিতে থাইকা আইলাম। পকেটেও টাকা পয়সা নাই ঐ কারনে আহি নাই?
-আইজকা কি টাকা নিয়া আইছস নাকি টাকা ছাড়া? দুই দিনের দুইশ দুইশ চারশ টাকা বাকি? আইজকা কিন্ত টাকা না দিলে তোরে ঘরে তুলুম না?

সুরভীর মুখটা শক্ত হলেও অন্তরটা নরম এই তথ্যটা হেকমত জানে। যদিও আজ তার মুখটাকে একটু বেশিই শক্ত বলে মনে হচ্ছে তবু হাল ছাড়ে না হেকমত। কণ্ঠটাকে আরো খানিকটা মোলায়েম করার চেষ্টা করে সে।
-এমন করিছ না সুরভী। তাবিজ বেইচা সারাদিনের কামাই ১০০ টাকা। ৫০ টাকা দিয়া দুপুরে খাইছি, আর ৫০ টাকা আছে। আল্লার কছম লাগে সামনের সপ্তায় তোর সব টাকা শোধ কইরা দিমু ।
-তোর কোন কথা শুনুম না, গতবারও কইছস এই কথা, আজ টাকা না দিলে তোরে ঘরে তুলুম না এইটাই ফাইনাল।
-মাইনষের উপর বিশ্বাস হারান পাপ বুঝছস সুরভী, আজ যে ফকির কাইল সে বড়লোক হইবার পারে আবার আল্লায় চাইলে আজ যে বড়লোক কাইল সে পথের ফকির।

শেষ কথাটার পর কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরবতার একটা হিম প্রবাহ বয়ে যায়। সুরভীকে খানিকক্ষণ গভীর চিন্তায় মগ্ন বলে মনে হয় কিন্ত শেষপর্যন্ত তার পেটের চাহিদার কাছে হার মানে হেকমতের দার্শনিকতা। অগ্নিমূর্তিতে তার কন্ঠ থেকে উচ্চারিত হয় – বাইর হ তুই আমার ঘর থাইকা?

হেকমতকে আর কোন অনুনয় বিনয় সুযোগ না দিয়ে ততক্ষণে খাটের নিচ থেকে একটা দা বের করে আক্রমন করার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়েছে সুরভী। দা হাতে দাঁড়ানো সুরভীকে অসুর বধে উন্মত্ত দুর্গা মূর্তি বলে বিভ্রম হয় হেকমতের। অবস্থা বেগতিক দেখে ব্যর্থ শিকারীর ন্যায় মাথা নিচু করে বের হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না তার। জীবনে এই প্রথমবার তাকে দারিদ্রের কাছে পরাজিত বলে মনে হয়।

পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ফুঁকতে ফুঁকতে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় হেকমত। আজ রাতটা তাকে সেখানেই পার করতে হবে। ভাদ্র মাসের প্লাবিত জ্যোছনায় ষ্টেশনের রাস্তার হাঁটার সময় একটা অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যের সঙ্গে নুতুন করে পরিচিত হয় হেকমত। ষ্টেশনের পুরোনো ঘরটার সামনে ফাঁকা জায়গায় দুটো কুকুর কুকুরী আদিম লীলা খেলায় মত্ত। আন্দোলিত হেকমত কি যেন ভেবে তাদের দিকে এগিয়ে যায় এবং কোন কিছু না ভেবেই মাদী কুকুরটির কোমর বরাবর কষে একটা লাথি বসিয়ে দেয়। করুণ একটা আর্তনাদ করে আলাদা হয়ে যায় কুকুর দুটো। মদ্দা কুকুরটি হেকমতকে আক্রমণ করতে যেয়েও কোন এক রহস্যময় কারণে পিছু হটে। বিজয়ী হেকমতের ঠোটের কোণায় একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠে, জোছনার রুপালী আলোয় তাকে সুন্দর দেখায়।

৩২৭জন ৩২৫জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য