বাবারা সব সময় নিষ্ঠুর হয়না। কড়া মেজাজের অন্তরালে চড়া ভালোবাসা সব সময় প্রকাশ করেন না বলেই বাবাদের বেশির ভাগ সময় নিষ্ঠুর বলে মনে হয়। ছোট্ট বেলায় বাবা ভীতির পাশা পাশি বাবা প্রীতি যে একদম ছিলোনা তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। শৈশব কৈশর অতিক্রম করে এখন স্পষ্টতঃ বুঝতে পারছি যে বাবার সেই কড়া অনুশাসনের একমাত্র লক্ষ্য ছিলো সন্তানদের আকৃতিতে নয় বরং প্রকৃত অর্থে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। যদিও আমার বাবার লক্ষ্য আমাকে দিয়ে পূরণ হয়নি তার আগেই আমি লাইনচ্যূত হয়ে পড়েছি, বাবার লালিত স্বপ্নকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি নিজের অজান্তেই। ছোট্ট বেলাতে আমার নিষ্ঠুররূপী বাবা তার আসল রূপে আবির্ভূত হতেন বিশেষ বিশেষ উৎসবে, তখন বুঝতাম আমার বাবা আমার বা আমাদের ভাই-বোনদের জন্য কি পরিমান ভালোবাসা মমতা পোষণ করে রাখতেন।

সে সময় আমাদের (ছোট্টদের জন্য) টেলিভিশন দেখার উপর ভীষণ কড়া কড়ি ছিলো। পড়া শোনা শেষ না করে পড়ার টেবিল থেকে উঠা বাবার রচিত অলিখিত পারিবারিক আইনে জঘন্যতম অপরাধের একটি ছিলো। তবে যেদিন বিটিভিতে হানিফ সংকেতের ইত্যাদি অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো সেদিন আমাদের জন্য আইন এবং আইনের প্রয়োগে বেশ তারতম্য লক্ষ্য করতাম। কারণ যেদিন টেলিভিশনে ইত্যাদি প্রচারিত হবে সেদিন আমাদের বাড়ীতে ছোট খাটো একটা উৎসবের মতো মনে হতো। অনুষ্ঠানটি শুরুর আগ মুহুর্তে বাবা আমাকে পড়ার টেবিল থেকে তুলে এনে তার কোলে বসিয়ে দিতেন, ইত্যাদি অনুষ্ঠানটি দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত। ইত্যাদি অনুষ্ঠানের নিয়মিত শিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাসের দ্রুত লয়ের জীবনমূখী গান আমাকে খুব টানতো। নকুলের নাম নিয়ে আমার নাক সিঁটকানো একটা ভাব ছিলো যখন বুঝতে পারলাম নকুল মানে হলো বেজী বা আমাদের প্রচলিত আঞ্চলিক ভাষায় যাকে নেউল বলে। তৎসময়ে আমি বুঝে উঠতে পারিনি বিড়ালের মতো গোল গাল চেহারার একটা মানুষের নাম নকুল হয় কি করে যদিও সেই রহস্যের রেশ আজো রয়ে গেছে। কি জানি হয়তো নকুলের জন্মের সময়ে তার আচার আচরণে বেজী বা নকুলের মতো চতুরতা খুঁজে পেয়েছিলো বলেই হয়তো তার বাবা-মা নকুল নামে নকুল কুমার বিশ্বাসকে আজীবনের জন্য মুড়ে দেন।

নকুলের জীবনমূখী গান গুলো শোনার পর থেকেই আমার একটা ধারণা জন্মে গিয়েছিলো যে “ন” অদ্যাক্ষরের গায়কের গান অতি উন্নত মানের হবে। সেই থেকে “ন” অদ্যাক্ষরের শিল্পীদের গান সংগ্রহ করা শুরু করে দিলাম। কিন্তু নাহ আমার ভাবনাতে ভুল ছিলো ! তবুও দমিনি আমি, আমি অতো সহজে দমিনা। স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে “ন” নামের গায়কের খুঁজে ক্যাসেটের দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতাম। সেই ধারাবাহিকতায় হঠাৎ একদিন ন-তে নচিকেতার একটা এ্যালবামের সন্ধান মিলে। এ্যালবামটা কিনে এনে যখন শুনতে লাগলাম তখন আমার মাথা নষ্ট হবার যোগাড়। গান এতো সুন্দর হতে পারে তা আমার ধারণার বাইরে ছিলো। তারপর থেকে মাথার মধ্যে শুধু নচিকেতা। অন্য কোন গায়কের গান যুৎসই বলে মনে হতো না। নচিকেতাই একমাত্র শিল্পী যার প্রতিটি গান আমি একাধিকবার করে শুনেছি এবং আজও শুনে যাচ্ছি। ওপার বাংলায় যারা গান করেন তাদের প্রায় সবার লক্ষ্য থাকে বোম্বেতে সুযোগ পাবার। নচিকেতা সেই লোভনীয় সুযোগ বার বার পেয়েও বাংলা গানকে দূরে ঠেলে তথাকথিত হিন্দি গানের জোয়ারে গা ভাসাননি। যে কারণে নচিকেতাকে ভক্তি সহকারে ভালোবাসি।

সুমন চট্টপাধ্যায়ের হাত ধরে জীবনমূখী বাংলা গানের পরিচয় ঘটলেও নচিকেতার হাত ধরে সেই বাংলা জীবনমূখী গান পূর্ণতা পেয়েছে বলে আমার ধারণা। তুমি আমি সম্বলিত সস্তা প্রেমের ক্ষ্যাতা টাইপ গান না করে নচিকেতা তার গানের মধ্যে তুলে এনেছেন যাপিত জীবনের টুকরো টুকরো অংশ। দেশ, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবার সব কিছুই তিনি ধারণ করেছেন তার গানের মাধ্যমে। আমি কলকাতায় অবস্থান কালে নচিকেতার সাথে একবার সামনা-সামনি বসে অল্প সময়ের জন্য কথা বলার সুযোগ ঘটেছিলো, সেদিনের সেই দিনটি আজো অমলিন হয়ে আছে আমার জীবনে। নচিকেতার গাওয়া গানগুলোর মধ্যে কেউ যদি আমাকে কয়েকটা গান বাছাই করতে বলে তবে আমি নির্ঘাত আটকে যাবো কারণ নচিকেতার কোন গানই আমার কাছে ফেলনা বলে মনে হয় না তার প্রতিটি গানই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নচিকেতা শুধু মাত্র একজন গায়কই নন তিনি একজন দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারকও বটে। অন্তত তাঁর গানের মধ্যে তার দর্শনের পরিচয় মেলে। সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে অসাধারণ কিছু গান ইতি মধ্যে আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন এবং এখনো দিয়ে যাচ্ছেন। নচিকেতার এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ সমাজ সংস্কারের জন্য, মানুষের মঙ্গলের জন্য। নচিকেতার দীর্ঘায়ূ কামনা করি সেই সাথে তার এই পথচলা যেন কখনোই থেমে না যায় সেই প্রার্থনা করি।

এই মুহুর্তে নচিকেতার যে গানটি শুনছি তা সবার সাথে শেয়ার করছি। আশা করছি সবার ভালো লাগবে। গানের লিরিকটাও সাথে দিয়ে দিলাম।

বারো টাকা
– নচিকেতা

যখন ঘনায় রাত্রী পাথুরে শহরে
যখন ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস আকাশ অধরে,
ঠিক তক্ষণি সস্তার মেকাপেতে মুখ ঢেকে
লাজ লজ্জার সংস্কারকে পিছে রেখে;
সেই সাধারণ মেয়েটা শহরে-
বিলোতে প্রেম রাস্তায় এসে দাঁড়ায়,
প্রেমহীন শহরের কদর্য লোকগুলো
তার কাছে প্রেম চেয়ে দু হাত বাড়ায়।
ঠিক তক্ষনি ঠিক তক্ষনি
মন্দির মসজিদ গীর্জায়
শুরু হয় পুঁজো আরাধনা,
বিশ্বপ্রেমের পাঠে শিক্ষিত হয় লোক
আঁকে প্রেমের আল্পনা;
সব পাপ দিয়ে আসে মানুষ দেবস্থানে
দেবতারা হাসে তুলে মাথা
মাঝ রাত্রীর হলে ফিরে যায় সেই মেয়ে
ঘরে রোজগার বারো টাকা।

সারা গায়ে কাল শীতে
ওও ক্ষিধের মাশুল
জীবন তরণী বায় স্রোত প্রতিকূল,
মুখ চেয়ে সন্ততি হাঁড়ি চড়েনা
বেজন্মা গালা গালে পেট ভরেনা;
ঠিক তক্ষনি এনে দিলো
এক রাশ সুবাতাস সেই রোজগার বারো টাকা
নেভাতে পেটের জ্বালা অবতার হয়ে এলো-
সেই রোজগার বারো টাকা
ঠিক তক্ষনি গোনা হয়-
প্রণামীর থালা লাটের ভাড়ার হয় পূর্ণ
দেবতাকে দিয়ে ঘুষ জমা রেখে সব পাপ
মানুষ বাড়ায় তার পূণ্য
সেই মেয়ে ভোর হলে শত বিদ্রুপ সয়
দেবতারা দেখে তুলে মাথা
সত্যি বিলোয় প্রেম সেই মেয়ে নিঃস্বারে
প্রণামী মাত্র বারো টাকা।
*************

বারো টাকা গানটি ডাউনলোড করে শুনতে এখানে ক্লিক করুন…

নচিকেতার জনপ্রিয় আর দুটো গান…

চোর চোর…

কালো মেয়ে…

২৮৬জন ২৮৬জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য