প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু

তৌহিদ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০২:৫২:১৩পূর্বাহ্ন সমসাময়িক ৩১ মন্তব্য

প্রণব মুখার্জি একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ছিলেন। শিক্ষকতা এবং সাংবাদিক হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করলেও প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে নানান উত্থান-পতনের মধ্যেও ভারতের রাজনীতিতে প্রণব মুখার্জি সব সময় ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

প্রণব মুখার্জি ১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি তাঁর বাবার পথ ধরে রাজনীতিতে নিজের ক্যারিয়ার গঠনের শুরুতে কংগ্রেসে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় নেতারা তাঁকে সে সুযোগ দেননি। পরবর্তীতে এই কংগ্রেসই তাঁকে দলে টেনে নিলে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রণব মুখার্জি নিজের মেধা, দক্ষতা, জ্ঞান দিয়ে ভারতে রাজনীতিকে আলোকিত করেছিলেন।

পাঁচ দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ২০১২ সালে ভারতের ১৩ তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার আগে তিনি প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ, বৈদেশিক বিষয়, বাণিজ্য, নৌ, শিল্প মন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৮৪ সালে বিখ্যাত ইউরো মানি ম্যাগাজিনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তিনি ছিলেন বিশ্বের সেরা অর্থমন্ত্রী। “ সর্ব মৌসুমের মানুষ ” হিসাবে খ্যাত প্রণব মুখার্জী ” ভারত-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি – ১২৩ ” এই চুক্তিটির রাজনৈতিক টানাপোড়নের সময় ভারতের পক্ষে এক অনন্য দৃষ্টান্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

প্রণব মুখার্জির ঘনিষ্ঠতম সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী বলেছেন- মূলত রাজনীতিবিদ হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করেই প্রণব মুখার্জী ভারতের সংসদে নিজের তৎপরতার মাধ্যমে আলো ছড়াতে শুরু করেন। প্রণব মুখার্জি একমাত্র ভারতীয় বাঙালি যিনি রাজনীতিবিদ হিসেবে সর্ব ভারতীয় রাজনীতিতে নিজের ছাপ রেখেছেন। তাঁর শ্বশুর বাড়ি বাংলাদেশের নড়াইল জেলায়। এদেশের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ছিলো সব সময়। ভিন্ন দেশের একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে কয়েকজন ব্যক্তির সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিলো প্রণব মুখার্জি তাদের অন্যতম।

প্রণব মুখার্জির লেখা “দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস” বইয়ে তিনি লিখেছেন- ২০০৮ সালে বাংলাদেশ তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদের ভারত সফরের সময় তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এদেশে কারাবন্দী দুই নেত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেবার কথা বলেছিলেন। দুই নেত্রীকে মুক্তি দিতে চাপ প্রয়োগ করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশের হস্তক্ষেপ চেয়ে ছিলেন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। এ কারণে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখাও করতে চেয়েছিলেন।

শেখ হাসিনা কারাগারে থাকার সময় অনেক আওয়ামী লীগ নেতাও তাঁকে ছেড়ে গিয়েছিলেন। যেসব আওয়ামী লীগ নেতা তখন শেখ হাসিনাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাদের সমালোচনা করেন প্রণব মুর্খাজি। তিনি লিখেছেন- “আমি তাদের বলেছিলাম, কেউ যদি খারাপ অবস্থায় থাকে তখন তাকে ছেড়ে যাওয়া অনৈতিক।”

মূলত প্রণব মুখার্জির হস্তক্ষেপেই বাংলাদেশে ২০০৮ সালে কারাগারে বন্দি সব রাজনীতিবিদদের মুক্তি দেয়া হয়েছিল এবং বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিল। বাংলাদেশের রাজনীতির উপর তাঁর কতটা প্রভাব ছিল, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায় এই বইটি থেকে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতির নানান ঘটনা উঠে এসেছে তাঁর লেখা এই বইতে। সেখানে উঠে এসেছে বাংলাদেশর রাজনীতির প্রসঙ্গও।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সাথে প্রণব মুখার্জির পারিবারিক সম্পর্ক কারও অজানা নয়। প্রণব মুখার্জি তাঁর “দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস” বইয়েও শেখ হাসিনাকে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেন। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করার পরে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেসময় তাদের পাশে অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। এর আগে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রণব মুখার্জির সাথে নিজেদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে সে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে।

২০১৩ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রণব মুখার্জির অবদানের কথা স্বীকার করে একজন “বিদেশী বন্ধু” হিসেবে প্রণব মুখার্জিকে “মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননায়” ভূষিত করা হয়। ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট এই মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।

ইতিহাসের নানা ওঠাপড়ায় প্রণব মুখার্জি ছিলেন বাংলাদেশের অসম্প্রদায়িক শক্তির একজন সার্বক্ষণিক সঙ্গী এবং অকৃত্রিম বন্ধু। বিদেশি হয়েও তিনি যেনো ছিলেন বাংলাদেশেরই একজন মানুষ। বন্ধুপ্রতীম মহান এই ব্যক্তিত্ব এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখবে।

তথ্যসূত্রঃ
======
* Deccan Chronicle News
* BBC Online News
* ছবি- নেট থেকে নেয়া

২৬৮জন ৫৯জন
0 Shares

৩১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ