গভীর অন্ধকারে বাশ ঝাড়ে লুকিয়ে থাকা সুজন ছোট্র শিশুটিকে নিয়ে ভয়ার্ত মনে এ দিক সে দিক তাকাচ্ছে হঠাৎ চোখে তার টর্চের তীক্ষ্ন আলোর রস্মি ভয় পায়িয়ে দেয়।তবু সে সেখানে স্হির টর্চের আলো আবারও সুজনের চোখ বরাবর সুজনের হাত শিশুটির মুখ চেপে রেখেছে যাতে সে কোন শব্দ না করে ।লাইটের আলো সরতে যতক্ষণ ততক্ষণে কয়েকজন অস্ত্রাধারী লুঙ্গি পেন্ট পড়া অবস্হায় সুজনের চারপাশে এসে দাড়িয়ে পড়ে।

-ভয় নেই...আমরা এ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা তুমি এখানে কি করছ, এক্ষুনি চলে যাও অন্যত্র.. এদিক দিয়েই পাক মিলিটারীরা আসবে।

সুজন একেতো নিজেই ভয়ে কাত তার উপর ছোট আরেকটি শিশু।সুজন বাশ ঝাড়ের ভিতর দিয়ে সোজা চলে আসে গ্রামের সরু পাকা রাস্তার ধারে উপরে উঠতে কানে ভেসে আসে চলন্ত গাড়ীর শব্দ থেমে যায় সুজন রাস্তার ঢালুতে শিশুটিকে নিয়ে শুয়ে পড়ে নিজেকে লোকানোর চেষ্টা।গাড়ীটি তার কাছাকাছি এসে থেমে যায়।গাড়ী থেকে বেশ কয়েক জন অস্ত্রধারী লোক নেমে একটু সামনে যে রাস্তার উপরে কালবাটটি ছিল সেখানে প্রায় পাচ জয় জন দ্রুততার সহিত কালবার্টের কয়েকটি স্হানে টাইম বোমা ফিট করে আবার গাড়ী ঘুড়িয়ে দ্রুত প্রস্হান নেয়।

সুজন সব ঘটনাই অবলোকন করে কিন্তু তেমন কিছুই বুঝতে পারে নি গাড়ীটি প্রস্হান নেবার পর সে এবার রাস্তার উপরে উঠে ছেলেটিকে কোলে নিয়ে চলতে গিয়ে থেমে যায় তার সম্মূখ বরাবর বেশ কয়েকটি মিলিটারী গাড়ী আসতে দেখে।আবারো শিশুটিকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ে সুজন।গাড়ীগুলো কালবার্টের বরাবর আসতেই প্রচন্ড শব্দে কালবার্টটি উপর দুটো মিলিটারী গাড়ি সহ ব্লাষ্ট হয়ে উড়ে গেল।সুজন আতংকে চিৎকার দেয় পাশে লুকানো থাকা মুক্তিবাহিনীর দুজন বাঙ্গালী সুজনকে মূখ চেপে তাদের আস্তানায় নিয়ে যায়।

জঙ্গলে মাটির নীচে গর্ত করে মুক্তি বাহিনীরা তৈরী করেছেন নিরাপত্তা আর প্লানিংয়ের জন্য একটি আস্তানা।সুজন সহ শিশুটিকে গর্তের আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়।শিশুটি সম্ভবত খাবারে জন্য কান্নায় চোখের জল পড়ছে তার গাল বেয়ে।

মুক্তিবাহিনীর এক জন সুজনকে নাম দাম বাসা বাড়ী জিজ্ঞাসা করে সেটিসফাই হয় এ বাঙ্গালী শিশু ও কিশোর।তাদের কাছে ছিল দূর গ্রাম থেকে আসা কৃষকের পালিত গরুর দুধ তা শিশুটিকে খেতে দিল।সুজন মুক্তিবাহিনী পেয়ে ভয় কেটে গেল সে এখন সাহসের বলতে শুরু করে সেও তাদের সাথে রাজাকার ধ্বংস করবে পাকিদের পাখির মতন গুলি করে মারবে অথচ মনে হয় না সে ভারী রাইফেলটা আলগাতে পারবে তার সাহস দেখে এক মুক্তিবহিনী তাকে সাবাস দেন।

-সাবাস বীর বাঙ্গালী,তবে তুমি অনেক ছোট তুমি বন্দুক চালাতে পারবে না।

-আমি বড় হবো কবে আমাকে বড় করে দেন না, আমিও যুদ্ধে যাবো।

-তুমি যে শিশুটকে এতক্ষণ বাচিয়ে রেখেছ তাতেই তুমি ক্ষুদে মুক্তযোদ্ধা হিসাবে ইতিহাসের পাতায় ঠায় করে নিবে।তোমার বাড়ী কোন গ্রামে?তোমার বাবার নাম কি?

-বাবা কেরামত মাওলা থাকি দক্ষিন গ্রামের রসুলপুরে ।

সুজনের বাবার নামটি শুনে ছেলেটির পরিচয় পেয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা ব্যাক্তিটি।যেমন বাপ তেমন ছেলে তার বাবা কেরামত মাওলা পাশ্ববর্তী দুটি গ্রামের গোপনী মুক্তিযোদ্ধা সংঘটিত কমিটির মুক্তিবাহিনী সংগ্রহ কর্তা।শিশুটিকে আর এক মুক্তিযোদ্ধা দেখ ভারে দায়ীত্ত্ব নেয়।মুক্তিযোদ্ধা ব্যাক্তিটি অনেক গোপনীয়তায় সুজনকে তার বাবার কাছে পৌছে দেন এবং সে ব্যাক্তিটি কেরামত মাওলার সাথে ঘন্টা খানেক বেশ গোপনীয় কথা বার্তা বলে প্রস্হান নেন।

ছেলেকে পেয়ে বাবা কেরামত দুশ্চিন্তা থেকে বাচলেন।মেয়ে রোজীর কাছে সুজনকে রেখে বাবা বেরিয়ে পড়লেন বলে গেলেন দুদিন পর বাসায় ফিরবে।দেশ স্বাধীনের জন্য কিছু সলা পরামর্শ করতে তাকে ঢাকায় তলব করা হয়।

মেয়ে রোজী আহত ছেলেটিকে ধীরে ধীরে সুস্হ্য করে তুলেছে সে এখন আগের চেয়ে অনেক ভাল।ছেলেটিকে রোজী কিছু প্রশ্ন করে যার কোন উত্তরই ছেলেটি দিতে পারে নি অথবা সে ইচ্ছে করেই পরিচয় দিচ্ছে না অথবা এমনও হতে পারে যুদ্ধের ভয়ংকর সর্বনাশা হামলায় তার সব পরিচয় রক্তের সাথে মিশে গেছে।ছেলেটিকে যখনই পরিচয় জানতে চায় তখনই ছেলেটি অন্তর হতে বেড়িয়ে আসে একটি করুন দীর্ঘশ্বাস।মুখে কোন শব্দই সে করতে পারে না পাকিদের অত্যাচারে তার রক্তাক্ত কন্ঠনালীতে  জয় বাংলার শ্লোগানটি চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে।তবে কাগজে কলমের খোচায় লিখে দেয়.....

-আমি একা,আমার এখন আর কেউ নেই...আমার কন্ঠনালীটি দিয়ে বজ্র কন্ঠে পাকিদের দেখলে বের হতো জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু,,,, সেই কন্ঠটিতে শব্দের মরন হয়েছে...।তবে অন্তরে বুকে এখনও জেগে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরনার বক্তব্য "এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম-জয় বাংলা.... বলতে গিয়ে ছেলেটির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল মাটিতে।

ছেলেটির প্রতি রোজীর ধীরে ধীরে মায়া জম্মাতে লাগল প্রায় পনের দিনের সেবায় রোজী ছেলেটিকে মনের গভীরে কখন যে স্হান দিল তা বোধ করি উপলব্দি করতে পারে ছেলেটি যখন বলল সে চলে যাবে। তখনই বুঝতে পারল তার মনের সাগরে নতুন এক স্বপ্নের চর জেগে গেছে।একটি পশুর সাথে যখন কেউ দীর্ঘদিন বসবাস মানে পালিত সেবার কাজ করেন একদিন সেই পশুটিকেও মনে হবে স্ব-গোত্রী রক্তের বন্ধন আর সে তো মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ট জীব।ছেলেটি কাগজে আবার লিখছে.....

-আমি চলে যাব,আমাকে বিদায় দিতে হবে।

রোজীর উত্তরও কাগজে, ছেলেটির লেখার নীচ বরাবর একই পৃষ্টায় লিখতে থাকে।ঠিক সে সময় সুজন আসে রোমান্টিজমে ভিলেন সেজে।

-তোমরা কি লিখছ?নাকি চোর ডাকাত খেলছ?

রোজী বিরক্ত হয়ে সুজনকে ধমক দেয় সে বোনের ধমক খেয়ে বাহিরে চলে যায়।হাটতে হাটতে সুজন চলে আসে মেঠো রাস্তার পাশে শরষে ক্ষেতে মৌমাছির শরষে ফুলের মধু সংগ্রহের দৃশ্যগুলো দেখতে থাকে,ফাকে ফোকে ফরিং পেলে ধরার চেষ্টা করে নিজেকে আনন্দে রাখে।শরষে ফুলে ছেয়ে গেছে দূর দিগন্ত।যে দিকে চোখ যায় কেবল সবুজের মাঝে হলুদের বসবাস।কি অপরূপ বাংলা মায়ের রূপ যেন স্বর্গ এসেছে নেমে বাংলা মায়ের সবুজে ঘেড়া বুকে।এমন দেশটি ছেড়ে কার যেতে মন চায় যেখানে মাটির মমতায় মিশে আছে আদর সোহাগ মান অভিমান অভিভূত হয়ে সুজন তাকিয়ে রয় দূর বহুদূর মনে হয় ঐ তো ঐ গ্রামের শেষে মিশে আছে নীলাকাশেরঁ শেষ ঠিকানাটি।মেঠো পথ ধরে বয়ে গেছে একে বেকে ছোট্র একটি খাল সেই খাল দিয়ে দেখা যায় মাঝে মাঝে ছোট্র নৌকায় দু চারটি যাত্রীর এ গ্রাম ও গ্রামের দিকে যাতায়াতের বাংলার প্রায় প্রতিটি গ্রামের মনোরম দৃশ্য।সুজন মৌমাছি আর ফরিংয়ে ধরার কৈশরের খেলায় মেতে রয়।

-কেনো চলে যাবেন,আমরা কি আপনাকে কোন কষ্ট দিয়েছি।

-না তা হবে কেনো, এমন বিপদে আপনি না সাহায্য করলে আমি হয়তো আজ সেই অন্ধকার গর্তেই হাড় কন্ঙাল হয়ে যেতাম।

-আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন।

-তা কি হয়!

-হবে না কেনো একশ বার হবে,আমিই তো বলছি তাছাড়া.......

লিখতে গিয়ে রোজীর কলম থেমে যায় হয়তো রোমান্টিকতার লজ্জাটি কলমকে স্পর্শ করেছে।

-তা ছাড়া কি?.........লিখুন।

---তা ছাড়া...... আমি আপনাকে ভালো....।

মনের ভাব প্রকাশের লেখাটি পুরোপুরি শেষ হতে পারে নি হঠাৎ তীব্র শব্দে মাটি সহ ঘরটি কেপে উঠল।আতংকে রোজী তার ছোট ভাইকে ডাকছে................সুজন সুজন...।ঘরের বাহিরে বের হয়ে দেখে  প্রায় মাইল খানিক দূরে শর্ষে ক্ষেত গুলিতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ।হলদে সবুজে রংঙে লালের সংমিশ্রন।আহত ছেলেটি রোজীর ভয়ার্ত চিৎকারে বাহিরে রোজীকে শান্ত দিতে থাকে।কোথাও সারা শব্দ নেই সুজনের।আহত ছেলেটি সুজনের খোজেঁ দৌড় দেয় সেই শর্ষে ক্ষেতের দিকে পিছু নেয় রোজী।

শর্ষে ক্ষেতে লুকিয়ে ছিল কয়েক জন কৃষক মুক্তিযোদ্ধা।অপেক্ষায় ছিল ক্ষেতের পাশে মেঠো পথ দিয়ে যখন পাকিরা যাবে তখনই হামলা করবে কৃষক সংগ্রামীর দল ।ইনফরমেশনটা ছিল ভূল,কথা ছিল একটি লরিতে দশ বারো জন মিলিটারী এ পথ দিয়ে এ গ্রামে প্রবেশ করবে আর তখনই শর্ষে ক্ষেতে লুকিয়ে থাকা পনের জনের একটি মুক্তিবাহিনীর দল এ্যাটাক্ট করবে তাদের লরিকে লক্ষ্য করে।কিন্তু ঘটনা উল্টো ঘটে হঠাৎ সেই পথ দিয়ে পাকিদের অস্ত্র সহ কয়েকটি লরি প্রবেশ করে সামনে পাকিদের ক্যাম্পে অস্ত্রগুলো জমা দিতে সেই সময় শর্ষে ক্ষেত থেকে কৃষক মুক্তিবাহিনীর হঠাৎ অতর্কীত হামলার প্রতিত্তোরে পাকিরা হেভি অস্ত্র বোমা ব্যাবহার করে। সেখানে প্রায় তিন চার জন মুক্তিবাহীনি শহীদ হন আর কৈশরের উম্মাদনায় খেলা রত সুজনের লাশটি পড়ে ছিল শর্ষে ক্ষেতে, সবুজ ঘাসে রক্ত মাখা টি শার্টটির জীর্ণ অংশটুকু লেগে ছিল নিথর শরীরে।সুজনের দেহের চিহ্নে কোন বুলেটের দাগ ছিল না ছিল রাইফেলের অগ্রভাগে ক্রীচের আঘাত।আঘাতে তার পেটের নারি-ভুড়ি বেড়িয়ে গেছে হয়তো পাকিরা যাযার বেলায় সুজনকে ক্রীচের আঘাতে শহীদ করে যায়।

রোজী এবং আহত ছেলেটি ঘটনা স্হলে আর সবার মতন হন্নে খুজছেঁ ভাইটিকে।এরই মধ্যে আরো কিছু মুক্তিযোদ্ধা এবং গ্রামের লোকজন ঘটনা স্হলে এসে আতংকে চিৎকারে লাশ গুলোকে কাধে নিয়ে জয় বাংলা জয় বাংলা উচ্চ স্বরে বলতে বলতে ঘটনা স্হল প্রস্হান করছেন।রোজীর চোখে পড়ে এক মাত্র ছোট ভাই সুজনের নৃশংসতায় শহীদ হওয়া নিথর দেহটি, চিৎকারে আকাশ ফাটিয়ে রক্ত মাখা ক্ষয়ে যাওয়া ভুড়ি বিহীন লাশটি বুকে জড়িয়ে নেয়।

প্রজম্মের ঋণ শোধ০১

......চলবে

0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ