খবর পেয়ে কেরামত মাওলা ঢাকা থেকে গ্রামে আসেন যুদ্ধের কিছু ম্যাসেজ নিয়ে।ছেলের লাশের পাশে বসে কিছু ক্ষণ বাক রুদ্ধ এরপর নয়নের জলে ছেলের পবিত্রতার গোছল করান।পৃথিবীর সব চেয়ে ভারী বস্তু পিতার কাধে ছেলের লাশ।ধর্মীয় নীতিতে সমাধি করা হয় নিজস্ব কবর স্হানে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান এর গ্রেফতারের পূর্বে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।পরিকল্গপিত গণহত্যার মুখে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধযুদ্ধ; জীবন বাঁচাতে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, সামরিক বাহিনীর বাঙ্গালী সদস্য এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর কব্জা থেকে মুক্ত করতে কয়েক মাসের মধ্যে গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে মুক্তিবাহিনী সারাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সাহায্য লাভ করে। ২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতা জনাব আব্দুল হান্নান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
তার পর দিন মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখল করেন এবং সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।এই ঘোষণা শুনেই বাংলাদেশের সাধারণ জনতা বুঝতে পারে যে দেশ স্বাধীন এবং এখন লক্ষ্য হচ্ছে বিজয় অর্জন। দেশবাসী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।সেই মুক্তিবাহিনীর এক জন সক্রিয় সদস্য ছিলেন কেরামত মাওলা সে তার গ্রামে গড়ে তুলেন মুক্তিবাহিনী একটি দল। প্রায় হাজার খানেক গ্রামের পাশ্ববর্তী গ্রামের সহজ সরল বলবান,ভঙ্গুর ছেলেদের নিয়ে গড়ে তোলেন।

আহত ছেলেটির পরিচয় জানতে চান কেরামত মাওলা।ছেলে হারানোর পর মানষিক ভাবে সে ভেঙ্গে পড়ে এখন দুশ্চিন্তা মেয়ে রোজীকে নিয়ে যে ভাবে গ্রামের পাশ্ববর্তী গ্রামের মেয়েরা রাজাকার আল বদরদের সহযোগিতায় পাকিদের মনোরঞ্জনের অন্ন হচ্ছে তাতে করে মেয়ের প্রতি এমন দুশ্চিন্তা আসবে স্বাভাবিক।তা ছাড়া কেরামত মাওলা মাওলানা হবার সুবাদে পাকিদের নজরে এখনও সে পাকিদের সহদোর হিসাবে চিহ্নিত কখন যে তার আসল পরিচয় "মুক্তিবাহিনী সংগঠিত নেতা" পরিচয় পেয়ে যান পাকিরা বলা মুসকিল।তাই কেরামত মাওলা মেয়েকে আহত ছেলেটির কাছে সপে দেবার মনে মনে চিন্তা করে ফেলেন।কিন্তু আর যাই হোক ছেলেরতো পরিচয় লাগবে।পাড়া পরশী না হউক নিজের মনকে কি বুঝ দিবেন এক জন অপরিচত ছেলের কাছে মেয়েকে তুলে দিয়েছেন।এমন লজ্জাষ্কর কথা শুনার চেয়ে আগেই পরিচয় জেনে নেন।আহত ছেলেটিকে ডাকার পূর্বে মেয়ে রোজীর সাথে কথা বলেন বাবা কেরামত মাওলা।

-মা রে,আমি কিছু কথা বলব তুমি তোমার মতামত জানাবা।

-কি এমন কথা যে আমার মতামত লাগবে?

-সব বাবাগো যে চিন্তাটা রাত দিন চব্বিশ ঘন্টাই মনে পড়ে সেইটা…..যে ছেলেটি আমাদের ঘরে আছে তাকে তোমার কেমন লাগে…বাস্ এইটুকুই…..।

ক্লাশ মেট্ট্রিক দেয়া শিক্ষিত মেয়ে বাবার ইশারা বুঝতে পারেন তাইতো তার মন চলে যায় নতুন জীবনের স্বপ্ন পূরণের দিকে।

-আপনার ইচ্ছের বাহিরে কোন কথা আমার নেই।

-ঠিক আছে ছেলেটিকে ডেকে আনো।

মেঠো বাড়ীর উঠোনে হেলান দেয়া চেয়ারটিতে কেরামত মাওলা বসে আছেন।মেয়ে ছেলেটিকে নিয়ে বাবার সামনে হাজির হন।ছলেটিকে এতদিন তেমন ভাল করে দেখেননি কেরামত মাওলা আজ পূঙ্খানো ভাবে আপাতা মস্তক দেখছেন।ছেলে দেখে কেরামতের মন ভরে গেল।যেমন ভদ্র তেমনি তার চেহারা।ছেলেটিকে প্রশ্ন করেন বাবা মেয়ে তা শুনে ছেলেটির হাতে কাগজ কলম দেয়।

-আমি কথা বলতে পারি না,পাক মিলিটারীরা দেশের স্বাধীনতা চাইতে আমার বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়,আমার পরিচয় দেবার মতন এখন আর কিছুই নেই,পাকিরা আমার সকল পরিচয় বুলেটের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে।এর কিছুটা আমার একটি কাগজের পাতায় নোট করেছিলাম ঢাকার এক লেখক বন্ধুকে দিবো বলে।

ছেলেটি কাগজের পৃষ্টাটি এগিয়ে দিলেন।কেরমত মাওলা কাগজটি হাতে নিয়ে ভাজঁ খোলেন।রক্ত ভরা কাগজটির ছিল চার পাচ স্হানে ব্লেডের ন্যায় ক্রীসের দাগ।আর লেখাটি ছিল ইংরেজীতে।

in 1971 our family lived in Comilla town. I was first year student in Comilla Victoria College. My father was a farmer. In war Pakistani military occupied our college as their camp. High way road Comilla is the connection between Dhaka to chitagoang. They often patrol the road in search of “ Mokti Jodhaa” if they suspect him as a Mokti Jodhaa they killed them. My college friends and my some village young people we join in Mokti Jodhaa. One day one Razakar with some Pakistani military came to our house, searched me.
They also captured some villager people including my fathers. Later they asked my father “where is your son? Or I will kill you” They did not say any thing. Pakistani army killed my father and village innocent people in line one by one. Few days later I heard news that what happened to our village, I was shocked I couldn’t control myself. So our friends took promise that we will save our country from Pakistani army by any cost even if we die in battle.
Some day late our Capt. prepared an operation that when the Pakistani army will cross over the bridge by jeep. We will setup bomb on bridge and blow them up. We will separate two group one will setup explosive on bridge. Other will arrest them if any of them survived from the blast.

Two days later our captain said tomorrow 1 platoon Pakistani army will cross over the bridge heading to Chitagoang. So this is our opportunity once in life time. That night we setup 3 highly explosives bomb on bridge and we position our self for hiding. At noon Pakistani army jeep crossing over the bridge then we detonated the bomb. Suddenly with a big blast hit the bridge and blow up Pakistani 5 jeeps full with soldiers. Then we go near the blast we saw some Pakistani solider servived form the blast we shot them one by one and we took their guns and supplies.
We fight many operations.

Bangladesh emerged as an independent state in the world map.(সূত্র ইন্টারনেট)

তারপর ছেলেটি মেয়েটির কাগজে লিখে লিখে বাবা কেরামতকে দেখাতে থাকেন।

-আমাকে একদিন হঠাৎ কিছু অপরিচিত লোক একা পেয়ে চোখ বেধে এই অঞ্চলে নিয়ে এসে আমাকে প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে হাত পা বেধে ডুবিয়ে আমার মুখ থেকে মুক্তবাহিনীর কথা বের করার চেষ্টা করে,না বলার কারনে ওরা আমার ছিহবার আল্লা জিহবা কেটে দেয় আমি অজ্ঞান হয়ে গেলে আমাকে ওরা ঐ জঙ্গলের গর্তে ফেলে দেয়……..এর পর আপনার মেয়ের বদলতে আমি নতুন জীবন লাভ করি……তবে রক্তে আমার প্রতিশোধের নেশা পাকিদের যে করে হউক এ দেশ হতে হটাতে হবে।

ছেলেটির কথা শুনে কেরামত মাওলার মন ভরে গেল।সে মেয়ের জন্য এমনি একজন দেশপ্রেমিক খুজঁছিল যাক পেয়ে গেছেন।

বিয়ের সমস্ত আয়োজন করেন কেরামত মাওলা।বিয়েতে অতিথীদের বলতে কয়েক জন মুক্তি বাহিনীর লোকাল যোদ্ধা ছিল।বিয়ের আয়োজন তেমন জাগজমক পূর্ণ করেননি কেরামত মাওলা।সফল ভাবে বিয়ের আয়োজন শেষ করে।আহত ছেলেটি এবং রোজী শুরু করে নতুন জীবন।বিয়ের কিছু দিন পর রোজীর স্বামী এলাকার মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়।

১৫ই নভেম্ভর দিবাগত রাতে হঠাৎ পাক বাহিনীর একটি দল রোজীদের বাড়ী দখল করে।ওরা জানতে পারেন কেরামত মাওলার আসল পরিচয় এলাকার আরেক দুষ্টু লোক পাকিদের সহকারী রাজাকার কুদ্দুস মাওলা বদলতে।সে দিন বাড়ীতে ছিল শুধু আহত ছেলেটি বাবার সাথে রোজী গিয়েছিল পাশের গ্রামের এক মাজারে বহুকাল পূর্বে নিজাম উদ্দিন আওলীয়ার দরবারে রোজীর উপর মান্যত করেছিল কেরামত মাওলা।পাকিদের ডাকে ছেলেটি ঘর হতে বাহিরে আসে।

-আবে ওই শুয়োর কা বাচ্চা তোমহারা ফাদার কেরামত কাহা হে?

ছেলেটি যে বধির তা পাকিদের জানার কথা নয় ছেলেটি কথার উত্তর এক বার দুই বার না বলাতে রাইফেলের গোড়া দিয়ে আঘাত করে।সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে...বুকের উপর পা রেখে পাকি,... শুয়োর কা বাচ্চা.....মুক্তিবাহিনী হারামী বলে আরো কয়েকটি আঘাত করে তার চেহারায়।রক্তে ভেসে যায় পবিত্র বাংলা মায়ের মাটি।ছেলেটিকে যতই আঘাত করছে পাকি ততই ছেলেটি বঙ্গ বন্ধুর মতন এক আঙ্গুল দেখিয়ে বার বার যেন বলে যাচ্ছেন "জয় বাংলা.... জয় বঙ্গ বন্ধু"।এর পর ব্রাস ফায়ারে বুক, ঝাঝড়া করে দেয় ছেলেটির।রাজাকার কুদ্দুস মাওলা রোজীদের ঘর বাড়ীতে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।

রোজীর বাবা কেরামত মাওলা খবর পান তার বিশেষ দূতের  কাছ থেকে।দূত এসে জানাল....হুজুর গ্রামে যাবেন না সব পুড়ে ছাড়খাড় আর জামাই বাবুজিকে ওরা মেরে ফেলেছে।আকাশ ভেঙ্গে পড়ে রোজীর মাথায়।উদরে তার নতুন অতিথীকে যে ভাবেই হউক রক্ষা করতে হবে।কেরামত রোজীকে দূতের সাথে ঐদিক দিয়েই ইন্ডিয়ায় তার এক আত্ত্বীয়র কাছে পাঠিয়ে দেন।সে থেকে যান গ্রামেই গ্রামের অসহায় মানুষের পাশে।

১০ ই এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়১৭ই এপ্রিল মেহেরপুর জেলার  মুজিবনগরের  বৈদ্যনাথ তলায়  স্বাধীন  বাংলাদেশ  সরকারের  প্রতিনিধি   ও  মণ্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করে।৩রা ডিসেম্ভর বাংলাদেশ ভারত যৌথ বাহিনী গঠিত হয় এবং ভারতীয় সৈন্যরা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করে।১৪ই যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চত বুঝতে পেরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করে। এ দিনটিকে বাংলাদেশে শহীদ  বুদ্ধিজীবি হিসেবে পালন করা হয়।সে দিন প্রায় প্রতিটি গ্রামে এলো পাতাড়ী কিছু সাধারন জনগণও হত্যা করেন এবং কিছু মুক্তিবাহিনী গুম হয় পরে হয়তো ওরা লাশ বানিয়ে নদীতে নদীতে ফেলে দেয়।

চলবে....

প্রজম্মের ঋণ শোধ০২

0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ