সমর স্বপ্নাকে ছাড়াই হাজির হলেন সূর্যদের বাসায়।সূর্য্যের মা রোজী আজ মহা খুশি।সারা জীবনের প্রার্থনা স্রষ্টা মুখ তুলে তাকিয়েছেন।ছেলের ঘরে নাতী হলে সে এক জন খেলার সাথী পাবেন।আজ রাতের খাবারটা কোন এক ভাল রেষ্টুরেন্টে খাবেন বলে মা আর মামীকে ঘরে রেখে ওরা মানে সূর্য-নন্দিনী,সমর আর অভি বেরিয়ে পড়লেন।
-স্বপ্না আসেনি কেন?সমরকে সূর্যের জিজ্ঞাসা।
-ওর শরিরটা ভাল নেই।
নন্দিনীর প্রশ্ন।
-মানে কি!কয় মাস চলে?
-মাস শেষ,এখন অপেক্ষার পালা।
-তাই!
-হ, কিছুক্ষণের মধ্যে ওকে হাসপাতাল নিয়ে যাবে।
-তুমি যে চলে এলে?
-ওখানে সবাই আছে।আমি আবার এ সব হাসপাতাল ভয় পাই।তাছাড়া ডাঃ রাত্রে ডেলিভারীর কথা বলেছেন আমি আবারো যাবো।

শহরের রাজ পথে সময় অসময়ে এখন প্রচুর লোকজনের সমাগম থাকে।কারন আসছে ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ দেশে হতে চলছে জাতীয় নির্বাচন।আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরই অনুষ্ঠিত হবে দেশের সকল দলের অংশ গ্রহনে একটি জাতীয় নির্বাচন।দেশের ইতিহাসে শুধু মাত্র ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে ঘটেছিলো কত ঘটন অঘটন।একমাত্র এবারই প্রথম এ দেশে যে জাতীয় নির্বাচন হতে চলছে তাতে সব দিক পরিষ্কার আর সব দলের সম্মতিক্রমেই হচ্ছে।কেননা আমরা যদি গত জাতীয় নির্বাচনগুলো পর্যলোচনা করি তবে কি দেখতে পাই।বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চলে মানুষ পোড়ানোর ত্রাস-সন্ত্রাসী আন্দোলন যতক্ষণ না ক্ষমাতা ছেড়ে নির্বাচন দিতে রাজী হত।এবারই প্রথম ক্ষমতাসীন সরকার দশ বছর কাটিয়ে দেবার পরও দেশে অরাজকতা সৃষ্টিতে কোন আন্দোলন হয়নি,টুকটাক দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বলা যায় চমৎকার একটি পরিবেশে ঘটতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন ২০১৮

উৎসব মুখর পরিবেশে ঢাকা শহরে পায়ে হেটে চলাচলের লোকের সংখ্যাই বেশী থাকে।বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারনা চলছে।খোলামেলা পরিবেশে ওরা একটি ফোচকার দোকানে গিয়ে বসলেন।দোকানদেরকে ফোচকার অর্ডার দিলেন।ওরা একে অন্যের সাথে কথা বলছেন।ওদের পাশে আরো অনেকে বসে বসে ফোচকা খাচ্ছিলেন পাশা পাশি কথা বলছিলেন বর্তমান রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে।অর্ডাকৃত ফোচকা সবার হাতে হাতে ঠিক সে সময় চলন্ত দু’জন পুরুষ থেমে গেলেন অভির সামনে।অভিও ওদের থেমে যাওয়ায় অবাক।লোক দুটি অভির নাম ধরে হ্যানসেক করতে হাত বাড়িয়ে দিলেন তার দিকে।অভিও ইতস্ততা নিয়ে হ্যান্ডসেক করলেন।
-ঠিক চিনতে পারছি আপনাদের?
-আমরাও তাই ভাবছিলাম,আর চিনবে কি করে সেই ছোট বেলায় একবার গিয়েছিলে,তারপর হতে তোমার আব্বুকে কতবার বললাম তোমাকে নিয়ে যেতে নিয়ে যাননি।অবশ্য এর মধ্যে আমি একবার তোমাদের বাসায় এসেছিলাম।তোমার সাথে কথাও হয়েছে।কি মনে পড়ছে?আরে আমি তোমার হারু কাকা।
অভি খুব চিন্তায় পড়ে গেল।এক হারু কাকাতো আছে তার পৈতৃক গ্রামে।তারতো এত বড় লম্বা দাড়ি টুপি কিছুই ছিল না।তাছাড়া তারা ঢাকায় এলেতো সে জানতে পারত।নাহ্ কোন হিসাব মিলছে না।এর মধ্যেই লোকটির পকেটে মোবাইলে রিং বাজছে।লোকটি রিসিভ করলেন।
-জি ভাই,আমি কাজ শেষ করেই আপনার বাসায় আসছি।তাছাড়া এইতো অভির সাথে দেখা হল।
-তাই,দাওতো ফোনটা ওরে।
-আচ্ছা।
লোকটি ফোনটি এগিয়ে দিল অভির কাছে।অভিতো অবাক।ফোনে কথা বলে বুঝতে পারল কলদাতা অভির আব্বু।বাপ পোতের কথা যা বলার তাই বলল।অতপর হারু কাকাকে জড়িয়ে ধরে কুলাকুলি করল অভি।এবং উপস্থিত সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
-এই হচ্ছে আমার হারু কাকা।গ্রামে থাকেন এবং এবার সংসদ নির্বাচনে তার ছোট ভাই প্রার্থী।ঢাকায় এসেছেন কিছু কাজ ছিল তা শেষ করতে।বসো কাকু…ঐ আরো দুটো ফুচকা দে।
সূর্য অভির মুখে এই হারু কাকার অনেক গল্প শুনেছেন।সূর্য তার ভাল মন্দ জিজ্ঞাস করলেন।
-অভির মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি।আপনি ভাল আছেনতো…তা আপনার এলাকার নির্বাচনী খবর কি?
-সব নৌকা।
-মানে?
-মানে হল আর যাই হোক এবার নৌকাই ক্ষমতায় আসতে হবে নতুবা যে উন্নয়ণের ধারাবাহিকতা আছে তা নষ্ট হয়ে যাবে।তাছাড়া দেশের সর্বত্রই কম উন্নয়ণতো করেননি শেখ হাসিনা!
এরই মধ্যে চাচার ফুচকা খাওয়া শেষ।
-আচ্ছা চাচা আপনি বাসায় যান আমি একটু পরেই আসছি।

চাচা চলে যাবার পর ওরাও ফুচকাওয়ালার দাম মিটিয়ে চলে এলো পল্টন মোড়ে হোটেল ৭১ এ।এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেল একটি জন সভাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও জনতার তান্ডবে।কোন মত ওরা হোটেলটির ভিতরে সিকিউরিটি রুমে গিয়ে নিজেদের আপাতত সেইফ করলেন।বাহিরে তুমুল যুদ্ধ চলছে।সভা সমাবেশ করা যেন এখন ভাগ্যের জোর।হোটেলের সিকিউরিটি রুমের এক পাশে দাড়িয়ে ছিল ওরা ঠিক সেই সময় একজন সম্ভবত বের হবেন সূর্যকে সালামালকি দিলেন।সূর্য অবাক।কে সে! তাকেতো চেনা চেনা লাগছে না।
-স্যার,আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না?
-নাতো…।
-আমি মিশু…আপনার আর্টের ছাত্র।মতিন প্রধান আমার বাবা।
এতক্ষণে সূর্য যেন চিনতে পারল।
-ও আচ্ছা…মিশু ঊষা।
-হুম,কেমন আছেন স্যার?
-ভাল,
-আসুন স্যার ভিতরে আসুন।
-না না না আমরা এখানেই ঠিক আছি।
-সমস্যা নেই স্যার,এই হোটেলটি আমাদেরই।
-ও তাই!
-ঠিক আছে চলো।
ভিতরে ঢুকে অবাক হলাম আরেকবার।বাহিরের চেয়ে ভিতরে আরো সুন্দর পরিপাটি।বলতে হবে প্রধানদের রুচিবোধ আছে।আর হবেই না কেন জন্মগত প্রভাবশালী ব্যাক্তিত্ব।ভিতরে আতিথ্যপরায়ণও চমৎকার।মিশু আমাদের আবদারে কিছু হালকা খাবারের কথা বলতে ম্যানেজারকে ডাকলেন।
-জি স্যার,
-শুনেন, ওনারা আমার খুব ঘনিষ্ঠ মেহমান।আমার একটা জরুরী কাজ আছে তাই আমি চলে যাব।আপনি ওনারা যতক্ষণ ইচ্ছে থাকবেন যা খুশি তা খাবেন।সব ফ্রি।
ম্যানেজারকে বুঝিয়ে মিশু বিদায় নিলেন।ওরা সবাই মিশুর প্রশংসা করল।সূর্যের মনে পড়ে যায় অতীতের কিছু স্মৃতি।

ওদের পাশেই অন্য এক টেবিলে বেশ ক’জন লোক কথা বলাবলি করছেন।একবার ফোনে আবার নিজেদের মধ্যে।এ ভাবে কথা বলে যাচ্ছেন।সহজে অনুমেয় হল ওরা নীচে যে সভা পন্ড হল সেই বিষয়ে কথা বলছিলেন।হয়তো সমাজের সাধারন অথবা হাই ওয়েটের রাজনৈতীক ব্যাক্তি।তাদের ভাষ্য এমন যে,সরকারের সকল উন্নয়ণ কাজের প্রশংসা না করলেই নয় তবে জনগনের কথা বলা,সভা সমাবেশে প্রশাসনের পক্ষ হতে যাতে বাধা না আসে সে দিকও খেয়াল রাখাটাই গনতন্ত্রের মুল ভিত্তি।তাদের মধ্যে হতেই অন্য এক জন অনেকটা যা হবার তা হউক ভাব নিয়ে বললে্ন,কি আর করা!ধরলাম ওদের সভা সমাবেশ করতে দিলাম আর নাইবা দিলাম তাতে দেশ জনতার তেমন কোন অসুবিদাই হবে না।
বরং বেচে যায় দেশ,এ নতুন প্রজন্ম!তাদের সাংসদ পদাচরণে আরো কিছু রাজাকারের গাড়ীতে দেশের পবিত্র পতাকা উড়া থেকে।আর এখনি পরীক্ষা করো না আমি নিশ্চিৎ নির্বাচনে তারা জয়ী যদি হতে পারেন তবে কে হবেন প্রধানমন্ত্রী!তা নিয়ে ঝগড়ায় আরো কিছু অপবিত্র রক্তে দেশের মানকে অপবিত্র করবে।আছে কি কেউ তেমন হাল ধরার।সময় এসেছে দেশের পবিত্র সংসদ হতে রাজাকার মুক্ত করার।আমার বিশ্বাস এ নতুন প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষের শক্তিকে জয়ী করে কিছুটা ঋণের বোঝা হালকা করবে।এরই মাঝে টিভিতে নির্বাচনী প্রচারনার শ্লোগান ভিত্তিক গান বাজছে…..গানটি যারা তৈরী করেছেন তারা নিঃসন্দেহে একটি ভাল অভিজ্ঞ ক্রীয়েটিভ দল অথচ সবাই তরুন।‘জয় বাংলা জিতবে আবার নৌকা/ শেখ হাসিনার সালাম নিন, নৌকা মার্কায় ভোট দিন।হাট-মাঠে, অলি-গলি, রাস্তায়,পাড়ায় মহল্লায় ক্রমশত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গানটি।টিভি স্কিনে পাশা পাশি  ক্ষমতাসীন দলের ইশতিহারের হেড লাইন চলছে। ডাঃ কামাল এর চলছে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের খবর।

ওরা লোকগুলোর কথাবার্তা হতে মনযোগ ফিরিয়ে মনযোগ দিলেন টিভি স্কিনের হেডলাইন খবরের প্রতি।খবরে আজকের ঘটনাটাও সরাসরি প্রচার হচ্ছে।এমন সময় অন্য একজন হঠাৎ তাদের সামনে চেয়ার টেনে বসে পড়লেন।সূর্য অবাক হলেও তাকে দেখার পর খুব খুশিই হলেন।অনেক বছর দেখা হয়না তাদের।
-কিরে চিনতে পেরেছিস?
-চিনবো না কেন?প্রথম প্রেম কি ভুলা যায়!কেমন আচিস তুই?বহু বছর পর দেখা।এতো দিন কই ছিলি?ও হ্যা পরিচয় করিয়ে দেই এই হচ্ছে তোর ভাবী আর এরা হচ্ছে…।।
-সমর অভি শুধু স্বপ্না ভাবী নেই।সমরের তৎক্ষনাত উত্তর।
-তুই কি এর আগেও ওদের চিনিস?
-অবশ্যই সমরের বিয়েতে গিয়েছিলাম।
-ও তাই~তা এখানে কি করে এলি?
-তুইতো জানিস আমি বিএনপি করি।তাই এ সমাভেসে এসেছিলাম।আর এখানে এসে দেখলাম তোরা এখানে।
-দিনকাল কেমন চলছে?
-নারে ভাই,খুব খারাপ অবস্থায় আছি যেন স্বাধীন দেশে গৃহ বন্দি হয়ে আছি।আমার সাথে আরো যারা আছে আমি সহ সবাই গায়েবী মামলায় বাঘুরা আছি।মনে হয় না এবারো রাজনিতীতে বিএনপি কোন সুবিদা করতে পারবে।
-তোর বিএনপি তো ভুল গতবার নির্বাচনে না গিয়েই করেছে।শুধু যে নির্বাচন বর্জন করেছেন তা নয়।রাজাকার জামাতকে সাথে নিয়ে ত্রাসের সৃষ্টি করে মানুষকে পুড়িয়েও মেরেছেন।অথচ সংবিধান রক্ষার্থে আওয়ামীলীগকে সেই ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনটা করতে হয়েছিল।
-ঠিক বলেছিস দোস্ত।সেই নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশগ্রহন করত তবে বিএনপির আজকের এ করুণ অবস্থা হত না।যাগগে পাপ বাপেরো ছাড়ে না।এখন বল তুই এখন কি করিস।
-সমাজ সেবা আর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করছি।আর একটা ছোট খাট ব্যাবসা আছে।

এর মধ্যে সমরের মোবাইলে রিং বেজে উঠে।সম্ভবত হাসপাতাল হতে কেউ একজন ফোনটি করেছেন।সমর যা ভেবে ছিল তাই হাসপাতাল হতে তার সালা ফোন করেছেন।ফোনটা রিসিভ করলেন।ওরা সবাই হঠাৎ চুপ হয়ে সমরের মোবাইল কথপোকথনের দিকে নজর দিলেন।
ফোনের অপর প্রান্ত হতে।
-হ্যালো!দুলা ভাই,,কই আপনি?
-এইতো..আশে পাশেই।কেন কি হয়েছে?কোন সমস্যা?
প্রথম বাবা হবার অনুভুতিতে সমরের সমস্ত শরীরে এক অন্য রকম প্রকাশহীন অনুভুতি কাজ করছিল।এসির রুমে তার কপাল জুরে ঘামের শিশির কণাঁ জমে আছে।মনে কখনো শংসয় কখনো বা পুলকিত শিহরণ জেগে যায়।
-না না না কোন সমস্যা নয়।মিষ্টির দোকানে দশ কেজি মিষ্টির অর্ডার দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আসেন।
অবাক হলেন সমর।ডেলিভারী হবার কথাতো রাতে।এখন কেন?যাক যা হবার তা ভাল ভাবে যখন হয়েছে তখন দিন আর রাত কি।ওরা সবাই সমরের মুখের দিকে চেয়ে আছে।যখন ওরা বুঝতে পারল খবরটা সু-সংবাদ তখন সমরকে সবাই অভিনন্দন জানাল।
-অভিনন্দন সমর।আমরা এমন একটি সময়ে আমাদের বংশধরকে পেলাম যখন দেশও পেতে যাচ্ছে নির্বাচনমুখী আরেকটি নতুন প্রভাত।যেখানে ওরা বড় হবে কেবলি মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা আর দেশ প্রেমের অহংকার নিয়ে।

চলবে…

প্রজন্মের ঋণশোধ ৪২ পর্ব

 

১৭৬জন ১৭৫জন
15 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য