“দেশের পাঁচটি বড় নগরে গত ৩০ বছরে প্রতিবেশব্যবস্থা ধ্বংসের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। এসব শহরে জলাশয় ও বনভূমি কমেছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে। এতে ১৯৯১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এসব শহরের বাসিন্দারা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট নগরের ওপর এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে”{ সূত্রঃ প্র/ আলো, ২৮ জুলাই’২২}।  চলতি মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ইকোলজিক্যাল ইনফরমেটিকস–এ এই গবেষণা প্রকাশিত হয়। গবেষণায় বলা হয়, “পাঁচটি নগরই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ঢাকা বুড়িগঙ্গার, চট্টগ্রাম কর্ণফুলীর, রাজশাহী গঙ্গার, খুলনা রূপসার ও সিলেট সুরমা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে। এসব শহরে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নদী ও জলাভূমির ওপর চাপ পড়েছে। ঢাকায় বছরে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে, রাজশাহীতে ৫ শতাংশ, চট্টগ্রামে পৌনে ৪ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে”। একথা অনস্বীকার্য যে, আমরা প্রকৃতির ওপর নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে আগ্রাসন দুর্বৃত্তায়ন চালিয়ে সংরক্ষিত অসংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড়, পাহাড় কাটা, নদী পুকুর জলাশয় দূষণ ও ভরাট করে দেশের প্রকৃতি পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ করছি। বিশেষজ্ঞ দলের মতে, “নগরে প্রতিবেশব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলাশয় ও সবুজ এলাকা ধ্বংস করা হচ্ছে। অথচ প্রকৃতির এসব উপাদান থেকে আমরা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যের জোগান ও স্বাস্থ্যকর আবহাওয়া পেয়ে থাকি। এসব ধ্বংস করে কংক্রিটের ভবন, সড়ক ও নানা অবকাঠামো গড়ে তোলায় আমরা সেবা পাচ্ছি না। এতে শহরগুলোতে দ্রুত তাপমাত্রা বাড়ছে ও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে”।’ এমতাবস্থায় গত গত ২৮ জুলাই’২২ দেশে ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস’ পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘প্রকৃতি রক্ষায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাই।’

আমরা যেদিকে তাকাই না কেন চারিদিকে যেন প্রকৃতি ধ্বংসের মহৌৎসব চলছে। পাহাড় সবুজ অরণ্য ধ্বংসের কারণে জীববৈচিত্র্যে বিরূপ ও কুপ্রভাব প্রভাব পড়ছে। বনে জঙ্গলে  বিরল ও বিভিন্ন প্রজাতির পশু পাখি কীট পতঙ্গ অভয়ারণ্য হারিয়ে বিলুপ্ত হচ্ছে। বিঘ্নিত হচ্ছে জীব বৈচিত্র্যের ভারসাম্য। কাপ্তাই উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা বাঙ্গালহালিয়ার লোকালয় ও কৃষিজমিতে এবং রাঙ্গামাটির ভাসানদামে নিয়মিত বন্যহাতি হানা দিচ্ছে। খাবারের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে বা ফসলের ক্ষেতে প্রবেশ করে বিভিন্ন ধরণের শস্য নষ্ট করছে। হাতি-মানুষের দ্বন্ধ তান্ডবে রূপ নিয়েছে। বন্যহাতির আক্রমণে মানুষের হতাহতের মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটছে। এক বন কর্মকর্তার মতে,“হাতির আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যাওয়া,বনের গাছপালা কাটা, বনে আগুন দেয়া, কৃষি ও জুম চাষ করা, মানুষের বস্তিসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির কারণে হাতির বিচরণ ক্ষেত্র সঙ্কুচিত এবং চলাচলের পথ বাঁধাগ্রস্ত হওয়ায় হাতি ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠছে। হাতির বিচরণক্ষেত্র নিরুদ্রূপ রাখা এবং চলাচলে ব্যাঘাত না ঘটার মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি”।

ফসলি জমিতে সার কীট নাশক রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে। যা পুকুর জলাশয় এবং নদীর  পানিকে দূষিত করার পাশাপাশি জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের এবং দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র মিঠা পানির প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর মৎস্য ভাণ্ডারও এখন হুমকির মুখে। গত ২৭ জুলাই পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবর থেকে জানা যায়, দূষণ কেমিক্যাল প্রয়োগ ও কারেন্ট জালের কারণে হালদায় ১৪ দিনে ৩টি মা কাতলা মাছ এবং ৩টি ডলফিন মারা গেছে। বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ হালদা নদীতে অল্প সময়ে এমন ঘটনায় হালদা বিশেষজ্ঞরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন এটি হালদার জন্য অশনি সংকেত। ডলফিনের মৃত্যু মাছসহ অন্যান্য জলজপ্রাণীর সুরক্ষা

এবং ভারসাম্যের জন্যে হুমকি তৈরি করছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। পাশাপাশি বিভিন্ন কল কারখানার রাসায়নিক, নদী-সংলগ্ন বাজার, কৃষি, ঘর ও গৃহস্থলীসহ বিভিন্ন উৎসের বর্জ্য নদীর পানিকে দূষিত করছে অহরহ। নদী দখল, ভরাট ও বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। আরও বেদনাদায়ক, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার বিষয় হচ্ছে হালদা নদী এবং শাখানদীগুলোতে মাছ ধরার জন্য কেমিক্যাল ব্যবহার করছে কতিপয় অসাধু মানুষ। রাতের আঁধারে বা মানুষের অগোচরে জাল পাতা, রাসায়নিক প্রয়োগ নদীর জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য শুধু হুমকিই নয় অশনি সংকেতও বটে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে নদী পাড়ের মানুষকে সম্পৃক্ত করে জন সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে হালদাসহ দেশের সকল নদীর দূষণ রোধ এবং জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।

প্রকৃতি পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য আরেকটি মারাত্মক হুমকি হচ্ছে অপচনশীল পলিথিন এবং প্লাস্টিক। চট্টগ্রাম নগরসহ দেশের বিভিন্ন শহর মফস্বলের নালা নর্দমায় প্ল্যাস্টিক বর্জ্যের কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ব্যবহার কমছে না। কমছে না প্ল্যাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহারও। পলিথিন ব্যবহার রোধে কঠিন এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্ল্যাস্টিকের রিসাইক্লিং কারখানা গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকারকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। “গবেষণায় প্রতিবেশব্যবস্থার সেবা বলতে বোঝানো হয়েছে, একটি প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো টিকে থাকলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী বেশ কিছু সেবা পায়। যেমন জলাশয় এলাকার চেয়ে কংক্রিটের এলাকায় ১ থেকে ৩ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা থাকে। তাপমাত্রা বেশি থাকলে মানুষ বৈদ্যুতিক পাখা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ নানা কিছু ব্যবহার করে। কোথাও সবুজ গাছপালা থাকলে তাপমাত্রা কমা থেকে শুরু করে ফলমূল,ঔষধিগাছ, পাখি ও প্রাণীদের বসবাসের জায়গা তৈরি হয়। এগুলো প্রতিবেশব্যবস্থার সেবা হিসেবে ধরা হয়”{ সূত্রঃ প্র/ আলো, ২৫ জুলাই’২২}। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। বর্ষা মৌসুমে অপ্রতুল বৃষ্টিপাত এবং তীব্র তাপদাহ মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ব্যাহত ও বিঘ্নিত হচ্ছে। গরমে মানুষের নাভিশ্বাস হচ্ছে। আমাদেরকে অবশ্যই  প্রকৃতির প্রতি সদয় হয়ে বন্ধ করতে হবে নির্দয় ও নির্বিচারে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, নদী দখল দূষণ, নদী পুকুর দীঘি জলাশয় ভরাট করে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন। দেশের কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থের কারণে দেশের প্রকৃতি আজ বিপন্ন ও বিপর্যস্ত। মানুষকে এ পৃথিবীতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিশুদ্ধ বায়ু, বিনোদনের ব্যবস্থা, কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ, পানির ব্যবস্থা, মাটির সুরক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে দেশ জাতি ও রাষ্ট্রকে। আমাদের মনে রাখা উচিৎ প্রকৃতি পরিবেশ এবং প্রতিবেশব্যবস্থা ধ্বংস করে কোনোভাবেই মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।  আসুন প্রকৃতির প্রতি সদয় হই এবং প্রকৃতির অপার দান নিজেদের জীবনে ভোগ আর উপভোগ করি।

১১৬জন ৪১জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ