গ্রীষ্ম, বর্ষা, পরত, হেমন্তের শেষে শুরু হয়েছে পৌষের কনকনে শীত! সকালে রাস্তায় বেরুলে দেখা যায় ঘন কুয়াশায় ঢাকা চারদিক। বুড়ো-বুড়িরা সূর্যদেবের মিষ্টি রোদের আশায় নায়-নাতি কোলে নিয়ে বসে থাকে বাড়ির উঠানে, নাহয় বাড়ির সামনে থাকা রাস্তার পাশে। সকালের মিষ্টি রোদের তাপ ক্ষীণ হয়ে বিকালে ঠান্ডা হাওয়ার সাথে শুরু হয় শীতের মহড়া।

আবার সময়তে শুরু হয় শীতের তাণ্ডব। যাকে বলে শৈত্যপ্রবাহ। এই শীতকে সামাল দিতে, মানুষ কতরকম পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। শীত থেকে রেহাই পেতে মানুষ কত-না চেষ্টা করে। শীত থেকে নিজেকে বাঁচাতে শরীরে জড়ানো হয় কতরকমের নামীদামী গরম কাপড়ের পোষাক। আবার দেখা যায় গরিব অসহায় মানুষের কষ্টও! তাঁরা ছিন্নমূল মানুষগুলো শীতের আগমন থেকে একটুকরো গরম কাপড় সাহায্য পাবার আশায় বসে থাকে রাস্তার পাশে, কেউ বাসস্ট্যান্ডে, রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে। কেউ দেয়, কেউ দেয় না। কেউ না দিয়েও তাঁদের কষ্ট দেখে উল্টো উপহাস করে।

কিন্তু শীত কারোর জন্য নির্ধারিত হয়ে আসে না, এদেশে চিরস্থায়ীভাবেও ঘুপটি মেরে বসে থাকে না। শীত আসে সবার জন্য। আসে আবার চলে যায়। থেকে যায় কিছু কথা, কিছু স্মৃতি। কেউ শীতের দিনে আরামে থাকে, কেউ অনেক কষ্টে থেকে শীতের দিনগুলো অতিবাহিত করে। শীত শেষে আবার পৌষ আসে শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে।

এবারও হেমন্তের শেষে পৌষ এসেছে তীব্র শীত সাথে নিয়ে। পৌষ মানে শীত। শীত মানে পৌষ। পৌষের শেষ দিনটিকে বলা হয় পৌষ সংক্রান্তি। পৌষের শীত মানে আনন্দ নিরানন্দ মিলেমিশে! পৌষের শীত মানেই পূজাপার্বণ। পৌষ মাস হলো, ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের মৌসুম। মিলাদ মাহফিলের মৌসুম। পৌষের শীত মানে হরিনাম সংকীর্তনের মৌসুম। শীত মানে পিঠাপুলির তৈরির একটা সুন্দর জুতসই মৌসুম। শীত মানে মেলা আর মেলা, উৎসব আর উৎসব। হতে পারে ১৫ জানুয়ারি ২০২০ইং এই উৎসবটির শুভসূচনা। এবারের বাংলার পৌষ সংক্রান্তির  হরেকরকমের আয়োজনের সাথে আমাদের সকলের প্রাণের দিনলিপি “সোনেলা” পরিবারও দিয়ে দিলো এক উৎসবের ঘোষণা। যা “সোনেলা ব্লগ পৌষ সংক্রান্তি উৎসব ২০২০”

সোনেলা পরিবারের এই উৎসবে থাকছে, পৌষকে নিয়ে যার যার স্মৃতি নিয়ে গল্প, কবিতা লেখার মেলা। যেহেতু এই “সোনেলা ব্লগ” হলো হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটা ব্যক্তিগত দিনলিপি বা ডায়েরি। তাই নিজেও এই পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উদ্যোগ নিয়েছি, পৌষ মাসের শীতের পিঠাপুলির গল্প নিয়ে সোনেলা ডায়রিতে কিছু লিখতে। তার আগে সোনেলা ব্লগ টিম-সহ সোনেলা পরিবারে থাকা সবাইকে জানাই পৌষ সংক্রান্তির প্রীতি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। সাথে জানাচ্ছি উৎসব আয়োজনকারীকে প্রাণঢালা আন্তরিক শুভেচ্ছা।

পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইন আসলে কী?
প্রবাদ রয়েছে বাঙালির ১২মাসে ১৩ পার্বণ। পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইন বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন এই উৎসব পালন করা হয়। এই দিন বাঙালিরা বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। তার মধ্যে পিঠা খাওয়া, ঘুড়ি উড়ানো অন্যতম। সারাদিন ঘুড়ি উড়ানোব পরে সন্ধ্যায় পটকা ফুটিয়ে ফানুস উড়িয়ে উৎসবের সমাপ্তি করে। আগে বাউল গান ছিল এই পার্বণের অন্যতম আকর্ষণ।

গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত হলেই বর্ষা, বর্ষার পর শরৎ এভাবে হেমন্ত, শীত ও বসন্ত কাল আসতে থাকে। সেরকম বাংলা বারোটি মাসও আবর্তিত হতে থাকে। এই আবর্তনে প্রতিমাসের শেষ দিন অর্থাৎ যে দিন মাস পূর্ণ হবে সে দিনকে সংক্রান্তি বলা হয়। এভাবে বারোটি মাসে বারোটি সংক্রান্তির মধ্যে বিশেষ ভাবে পৌষমাসের সংক্রান্তি উল্লেখ্যযোগ্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ। সংক্রান্তি অর্থ সঞ্চার বা গমন করা।

তবে পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইন হলো মূলত কৃষকদের একটা আনন্দ উৎসব। যা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় পালিত হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পৌষ সংক্রান্তি সাকরাইন নামেই, বাংলাদেশে এর নাম সাকরাইন। এটি আগে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু জনগোষ্ঠীদের মধ্যেই বেশি প্রচলিত ছিল। বর্তমানে কিন্তু পৌষের এই পৌষ সংক্রান্তি উৎসবটি এখন বাংলার প্রতিটি গ্রাম-শহরের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। বাংলার প্রতিটি মানুষই পৌষ সংক্রান্তি বা সাকরাইন বা মকর সংক্রান্তিকে ঘিরে নানারকম আয়োজন করে থাকে।

তবে এই পৌষ সংক্রান্তি বা সাকরাইন বা মকর সংক্রান্তি উৎসবটিকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ভিন্নভাবে পালন করা হয়। নেপালে এই উৎসবটি মাঘী উৎসব নামে পরিচিত। থাইল্যান্ডে পরিচিত সংক্রান নামে। লাওসে পি-মা-লাও নামে। মিয়ানমারে থিং-ইয়ান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে সু-পরিচিত। তা যেই নামেই হোক-না-কেন, পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইন হল কৃষিনির্ভর দেশগুলোর কৃষকেদের একটা আনন্দের উৎসব। তাই এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কৃষকদের মধ্যে এই উৎসবটি লক্ষণীয়। এরমধ্যে পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইন উৎসবটি ভারত এবং আমাদের দেশের কৃষকেরা হেমন্তের সোনালী ধান ঘরে তোলার পর মনের আনন্দে নেচে-গেয়ে খুব ঘটা করেই পালন করে।

কৃষিনির্ভর দেশগুলোতে প্রাচীনকাল থেকেই এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। তবে সুস্পষ্টভাবে কোন তথ্য পাওয়া যায় না যে, সর্বপ্রথম কোন দেশ থেকে এই আনন্দমুখর উৎসবটির উৎপত্তি। হতে পারে এটা হাজার বছরের উৎসব বা তারও আগের। তবে হিন্দু গ্রন্থ পুরাণেও পৌষের এই উৎসবটির উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই পুরাণ অনুযায়ী আমরা উত্তর পেয়ে যাই এর নাম মকর সংক্রান্তি।

মায়ের মুখে শোনা:
এই মহাতিথিতেই মহাভারতের পিতামহ ভীস্ম শরশয্যায় ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেছিলেন। আবার অন্য মত অনুযায়ী, পৌষ মাসের শেষ দিনই নাকি দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে অসুররা পরাজিত হয়েছিল। বিষ্ণুদেব অসুরদের বধ করে তাঁদের কাটা মুন্ডু মন্দিরা পর্বতে পুঁতে দিয়েছিলেন। তাই পৌষসংক্রান্তি অর্থাৎ পৌষ মাসের শেষ দিন সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাস হয়ে শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে আজও এই দিনটিকে এভাবেই মানা হয়ে থাকে।

অন্য মতে, সূর্য এ দিন নিজের ছেলে মকর রাশির অধিপতি শনির বাড়ি এক মাসের জন্য ঘুরতে গিয়েছিলেন। তাই এই দিনটিকে বাবা ছেলের সম্পর্কের একটি বিশেষ দিন হিসাবেও ধরা হয়। জড় বিজ্ঞান অনুযায়ী, সূর্যের গতি দুই প্রকার, উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণায়ণ। ২১ ডিসেম্বর সূর্য উত্তরায়ন থেকে দক্ষিণায়নে প্রবেশ করে। এ দিন রাত থেকে বড় হয়, আর দিন সবথেকে ছোট হয়। এর পর থেকে দিন বড় আর রাত ছোট হতে শুরু করে। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছয় মাস উত্তরায়ণ। আবার শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত ছয় মাস দক্ষিণায়ণ। তাই পৌষ মাসের সংক্রান্তিকেই বলা হয় মকর সংক্রান্তি।

এতেই বলা যায় যে এই পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইন উৎসবটি নতুন কোনও উৎসব নয়। এটি খুবই পুরানো লোকসংস্কৃতি উৎসব। যা একসময় শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কৃষকেরা পৌষ মাসের শেষ দিন আনন্দ উল্লাস আর নানারকম খাবার দাবারের আয়োজনের মধ্যদিয়ে এই উৎসবটি পালন করতো। বর্তমানে এই পৌষসংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তি বা সাকরাইন উৎসবটি শুধু কৃষকেরাই করে না, এই উৎসবটি এখন ধনী গরিব সবাই কমবেশি পালন করে থাকে। কেউ ধর্মীয় রীতিনীতিতে পালন না করলেও এই উৎসবের আনন্দে সবাই মেতে উঠে। যা এখন পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইন নামে সবার কাছে সুপরিচিত।

ছোটবেলায় দেখতাম আমার মা শত অভাবের মাঝেও পৌষ সংক্রান্তির জন্য আগে থেকেই কিছু ধান জোগাড় করে ঘরে রেখে দিতো। সাকরাইনের দিন সকাল থেকেই পুরো গ্রামের সবার বাড়িতে হতো গৃহলক্ষ্মীর পূজা। সবার বাড়িতেই কমবেশি করা হতো নানারকম পিঠা মিষ্টান্নের আয়োজন। পৌষের প্রথম থেকেই নির্দিষ্ট স্থানে বসতো মেলা। সেই মেলা চলতো পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত। মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তি বা সাকরাইনের দিন এক গ্রামের ছেলেরা পাশের গ্রামের ছেলেদের সাথে ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতার আয়োজন করতো। এখন সবই স্মৃতি। এখন আর এসব কিছু দেখা যায় না। ঘরে ঘরে আয়োজন করা হয় না বাহারি পিঠাপুলির। পাওয়া যায় না টাটকা খেজুরের রস। পাওয়া যায় না খেজুরের ঝোলা গুরও। নামগন্ধ নেই নতুন ধানের। ঘুড়ি উড়ানোর মন-মানসিকতার ছেলেরাও নেই। আছে শুধু পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি আসলেই পত্র-পত্রিকায় আর অনলাইন দিনলিপিতে এ নিয়ে লেখালেখি। এছাড়া বাস্তবে এর বিন্দুবিসর্গ বলতে কিছু নেই বললেও ভুল হবে না বলে মনে হয়। যাঁদের থেকে এই পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তির উৎপত্তি মানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্য থেকেও এই উৎসবটি মোটকথায় দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

আমরা কোনোএক সময়ের কৃষিনির্ভর দেশ হয়েও বর্তমানে পরনির্ভরশীল হয়ে পরছি। সেনার বাংলা থেকে উন্নিত হয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশে রুপান্তরিত হয়েছি। এখন পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইন উৎসবটির সাথে জড়িত থাকা নানারকম পিঠাপুলি মিষ্টান্নের আয়োজনও করতে ভুলে গেছি। এখন সবই চলে দোকানে দোকানে। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় হরেকরকমের বানানো পিঠা। শীতের দিনে নতুন জামাই বাড়িতে আসলেও পিঠাপুলির আয়োজন করতে হয় না আমাদের। নিশ্চিন্তে বাসার সাথে থাকা পিঠা বিক্রেতাকে অর্ডার দিলেই ঘরে চলে আসে পিঠা। আর মিষ্টান্নের জন্য তো কতো নামকরা মিষ্টান্ন ভান্ডার তো আছেই হাতের নাগালে। তাই আর এখন এই পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইনের মত এমন একটা জাঁকজমকপূর্ণ আনন্দমুখর উৎসবে আগের মতো তেমন কোনও আয়োজন দেখা যায় না।

তা দেখে মনে হয় কোনও একদিন গ্রামবাংলার মানুষের এই প্রাণের উৎসবটি হয়তো চিরতরে হারিয়েই যাবে। কারণ বর্তমান ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলার পুরানো কোনও লোকসংস্কৃতি উৎসবগুলো কোনমতেই খাপ খেয়ে থাকতে পারবে না নিশ্চয়! এটাই মনে হয় বাস্তব কথা। বাস্তব কথা হলেও প্রার্থনা করি এই পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা সাকরাইন উৎসবটি যেন বাঙালির মন থেকে চিরতরে হারিয়ে না যায়। শুভ পৌষ সংক্রান্তি। শুভ মকর সংক্রান্তি। সুভ সাকরাইন শুভ হোক!

১৬৩১জন ১০১৮জন
93 Shares

৩৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য