এই চল্ চল্ বর এসেছে! বর এসেছে! সবাই গেটে চল্!

বাড়ির মেয়েদের এমন চিৎকার-চেঁচামেচিতে পৌষের তীব্র শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকা বিয়ের বাড়ির লোকজনের মধ্যে যেন চনমনে উত্তাপ ছড়ালো। বরপক্ষের সবাই গেটে দাঁড়িয়ে আছে, তার আশেপাশে আছে কিছু মুরুব্বী এবং বরের কিছু ইঁচরেপাকা মামাতো, খালাতো, চাচাতো ভাই-বোনেরা।

আমাদের গুষ্ঠির মেয়েরাও কম নয়! বরপক্ষের মানুষদের সাথে উচ্চস্বরে দরকষাকষি করছে গেটের ফিতা কাটা নিয়ে। দুষ্টু মামাতো বোনটি নাকি ট্রেতে করে মিষ্টি আর পায়েসের সাথে দুইগ্লাস স্পেশাল শরবত রেখেছে বরের জন্য। তার একটিতে সে ফ্রিজের বরফ ঠান্ডা পানি মিশিয়ে এনেছে। কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে ফিক করে হেসে বলেছিল- দুলাভাই আমাদের চাওয়া পূরণ না করতে পারলে তার শাস্তি হিসেবেই ঠান্ডা শরবত। কি পাজি!

অবশেষে শ্বশুরবাড়ির মান রাখতে আর আমার বোনদের জেদের কাছে মানুষটি হার মেনেছিলো। তবে বেচারাকে কিন্তু ঠান্ডা শরবতই খেতে হয়েছিল শেষ পর্যন্ত!

বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ, এখন বরপক্ষ খেতে যাবে। সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং মজার বিষয় হলো বিয়েবাড়িতে আজ কেউ বরের জুতা চুরি করেনি! তবে ঘটনা ঘটেছে অন্য। আমার বরের গায়ের শালটি নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! এই ঠান্ডায় সে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছে।

আরে শাল গেল কই? কে নিয়েছে- এ নিয়ে নিয়ে বিয়েবাড়ি তোলপাড়। ঘটনা যা জানা গেল- বর সাহেব ছোট কম্মটি সারার জন্য বাথরুমে গিয়েছিল। সাথে তাকে সার্বক্ষণিক আদর যত্ন করা দু’জন শ্যালিকা ছিল বর যাদের কাছে তার শালটি গুচ্ছিত রেখেছিল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আর তাদের টিকিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেচারা বর নিশ্চিত মনে মনে ভাবছে- কি দুষ্টু শালা-শালিগুলো আমার! আরে নিবিতো এর থেকে জুতাজোড়াই নিতি তোরা। ঠান্ডায় শরীর না কাঁপিয়ে বরং এই বেশ ভালো ছিলো!

আমার বাবা খুব রাগ করেছেন বরের শাল চুরি হওয়াতে। এই তীব্র শীতে শাল ছাড়া থাকা অসম্ভব। আর সেও বা এত বোকা কেন? পাঞ্জাবীর কারুকার্য ঢেকে যাবে বলে একটা সোয়েটার পর্যন্ত পড়েনি পাঞ্জাবীর সাথে! শুধু শাল জড়িয়ে এসেছে বিয়ে বাড়িতে। কোন মানে হয়?

উঠোনে সামিয়ানা দিয়ে সাজানো প্যান্ডেলের নীচে সবাই খেতে বসেছে খাবার টেবিলে। তবে তাদের শরীর আঁকানো-বাঁকানো দেখে কারও বুঝতে অসুবিধা হলোনা তীব্র ঠান্ডায় প্লাস্টিক আর কাঠের চেয়ারগুলোও তাদের উপস্থিতি জানান দিয়ে যাচ্ছে শরীরে।

এবার বরের বাড়ির লোকজনের কানাঘুষা শুরু হলো। ঠান্ডায় গরুর মাংস জমে গিয়েছে সামান্য। তাতে চর্বি ভেসে বেড়াচ্ছে! ঠান্ডার দিনে গ্রামের বিয়েতে এটা হবেই। সেই কখন রান্না শেষ হয়েছে, চুলার আগুনও প্রায় নিভু নিভু। আর তারাই বা এত দেরি করে এলো কেন?

দু-একজনতো আরেক কাঠি সরেস! দাঁত দিয়ে টেনেও নাকি মাংস ছিড়তে পারছে না? কি অবস্থা! বরের বাড়ির লোকজনগুলো কি এরকমই হয়। কনের বাড়ির সবকিছুই বসে বসে হাতে গুনতে থাকে আর ইনিয়েবিনিয়ে কথায় কথায় মেয়ের বাবাকে অপমান অপর্যস্ত করতে থাকে।

বিয়েবাড়িতে কষ্ট করে এত কিছুর আয়োজন সবই মেয়ের বাবাকে একাই দেখতে হয়। কোন বাবাই চাননা তার অতি আদরের মেয়ের হবু শ্বশুরবাড়ির কারও যেন অসম্মান হোক। এই কথাটি অনেকেই অনুভব করতে পারেননা। সেখানে সামান্য মাংস নিয়ে কথা বলা চরম অপমান কি নয়?

মাংস ছেঁড়া যাচ্ছেনা তো কি হয়েছে? তাদের দাঁতের সমস্যা থাকলে আস্ত মাংসের পিস গপাগপ খেয়ে নেবে, এত কথা কিসের বাপু?

খাওয়া-দাওয়ার পরে বাকি আনুষ্ঠানিকতা সেরে কনের বিদায় বেলায় আমি কিন্তু একটুও কাঁদিনি। তবে বাবা খুব কেঁদেছে। মা মরা মেয়েটিকে আজ বিদায় দিতে হবে। চলে যাবে অন্যের ঘরে। এই বিদায়ের যে কি তীব্র ব্যাথা তা একমাত্র মেয়ের বাবারাই জানে।

আর আমি কাঁদবো কেনো? আমি কাঁদলে বাবা আরও কষ্ট পাবে। তাছাড়া আগামীকালইতো এ বাড়ির লোকগুলো গিয়ে জামাইসহ আমাকে আবার নিয়ে আসবে এখানে।

ছিঁচকাঁদুনে কান্না কেঁদে মেকআপ নষ্ট করার কোন মানেই হয়না। আমার বাসর রাতে মানুষটি আমার জলকাজলে মাখামাখি বিচ্ছিরি মুখ দেখুক এটি আমি কিছুতেই চাই না। কত কষ্ট করে খালাতো বোনটি সেই বন্দরের কাছে থাকা তার বান্ধবীকে রাজি করিয়ে এতদূর এনেছে শুধু আমাকে মেকআপ করানোর জন্য সেটাতো আমি জানি।

বরের ঘরের খাটে বসে আছি, ঠান্ডায় হাত পা জড়িয়ে আসছে আমার। অনেক রাত হয়েছে এখনো মানুষটির আসবার নাম নেই। রাগে একবার মনে হচ্ছে- সে আসলেই কি আর না আসলেই বা কি! আচ্ছা আমি কি ঘুমিয়ে পড়বো? মানুষটার কি একটুও আক্কেল নেই? ঠান্ডায় এভাবে বসে থাকা যায়!

ভাবছেন আমি কে তাই না? আমি পৌষী! পৌষ মাসে জন্ম বলে বাবা আদর করে আমার নাম রেখেছিলেন পৌষী। আর কি ভাগ্য! সেই পৌষ মাসেই আমার বিয়ে হচ্ছে আজ। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে চাকুরীর জন্য চেষ্টা করছি। তারমধ্যেই শুধু বাবার আবদার রাখতে গিয়ে আমাকে বিয়েতে রাজী হতে হলো।

মা’কে খুব মনে পড়ছে। আমার ছোটবেলায় একবার তীব্র শীতে নিউমোনিয়ার ধকল সইতে না পেরে মায়ের মৃত্যু হয়। এই পৌষেই আমার একজীবনের অনেক সুখ-দুঃখের স্মৃতি মনে গেঁথে আছে। মনের কোনে জমে থাকা চাপা কান্না বের হয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু আমি অনেক কষ্টে সে কান্নাকে চেপে রেখেছি।

সংসারের প্রথম দিনেই আজ আমি কাঁদবোনা, তাহলে সারাজীবন কাঁদতে হবে। আমার সাথে খালাতো বোনকে দিতে চেয়েছিলেন বাবা, আমি নিষেধ করেছি। কেউ যেন বলতে না পারে মা-মরা মেয়ে হয়ে আমি দুর্বল, আমার বাবা আমাকে সঠিকভাবে লালনপালন করেননি। আমি সেভাবেই নিজেকে, নিজের মনকে শক্ত করেছি অনেকদিন আগে থেকেই।

আমি প্রথম যখন আমার বর মানুষটির ছবি দেখেছিলাম তখন থেকেই এই মানুষটিকে পছন্দ করেছি। আর যেদিন সামনাসামনি প্রথম দেখেছিলাম তাকে- তার শ্যামলা বরণ মায়াবী মুখ, আর সুন্দর চোখজোড়ার প্রেমে পড়ে গিয়েছে। সে চোখে তাকালেই যেন কত না বলা কথা বোঝা যায়। তার ভদ্রোচিত প্রথম সে চাহনীর ছবি মনে গেঁথে আছে আমার।

দেখতে গিয়ে সে আমাকে নীরালায় একফাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলো- তাকে আমার পছন্দ হয়েছে কিনা? সে আরও বলেছিলো, বিয়ের পরে আমি আমার মত চাকরী করতে পারবো তার কোন আপত্তি নেই তাতে। যে সমাজে পুরুষের পছন্দই সর্বাগ্রে ধর্তব্য সেখানে মানুষটির এমন ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছিলাম সেদিন।

আমি তাকে মনে মনে ভালবেসেছি সেদিন থেকে- যেদিন সে তার বাড়ি থেকে শুধু আমি পছন্দ করব বলে অন্যান্য তত্ত্বের সাথে সুন্দর করে বর-কনের মতো সাজিয়ে দুটি মাছ পাঠিয়েছিল আমাদের বাড়িতে। কি যে সুন্দর লাগছিল ডালায় সাজানো মাছ দু’টিকে দেখতে! রুচি আছে তার বলতে হয়। শুধুমাত্র এই একটি কারণেই লোকটিকে আমার খুব পছন্দ হয়েছিলো।

আজকের এই পৌষ মাসের তীব্র শীতের ঠান্ডায় আমাদের বিয়ের দিনে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে সে। গায়ের শাল ছাড়াই তাকে ফিরে আসতে হয়েছে অবশেষে। বিয়ের পরে জামাই প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাবে বলে বাবা তার জন্য যে সোয়েটার কিনে রেখেছিলেন সেটাই তাকে দিতে চেয়েছিলেন বাবা। আমিই নিষেধ করেছি। পুরুষ মানুষ এতকটু কষ্ট সহ্য করতে পারে কিনা সেটাই আজ দেখতে চেয়েছি। যদিও পরে অন্য গরম কাপড় জড়িয়ে আমায় নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল তাকে।

আজ ঘরে আসুক সে,দারুণ একটি সারপ্রাইজ দেবো। প্রথম আমিই মুখফুটে তাকে বলবো আমার ভালোবাসার কথা। তার হারানো শালটি গায়ে জড়িয়ে দিয়ে যে সত্যি কথাটি তাকে বলবো সেটি হচ্ছে- বিয়ে বাড়িতে তার শালটি আমার বুদ্ধিতেই যে চুরি করা হয়েছিল!

২৬৭জন ২৭জন
28 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য