পৌষ তেষ্টা

রোকসানা খন্দকার রুকু ২১ ডিসেম্বর ২০২১, মঙ্গলবার, ০৮:২৩:৪৪অপরাহ্ন গল্প ১০ মন্তব্য

প্রজাপতির ডানায় স্বপ্ন তুলে দেয়া ডাগর ভোর। এমন ডাগর ভোরে আমি রান্না করতে গিয়ে হাত পুড়ে, বরফ পানিতে ডুবিয়ে কষ্ট দমনের চেষ্টা করছি।

অথচ এমন ডাগর শীত শীত ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেলেও বিছানা ছাড়তে মন চায় না। আর যুগল হলে তো কোন কথাই নেই! তারা ভোরবেলায় নতুন করে প্রেমময় খুনসুটিতে মেতে ওঠে। প্রথম প্রথম আমরাও তাই করতাম। আড়মোড়া ভেঙ্গে তানবীন পাশ ফিরে আমায় কাছে টেনে নিত। তার গায়ে গা লাগিয়ে ঘুমানো চাই।

আদুরে গলায় বলত, বউ এতো দুরে ঘুমাও কেন?

তারপর গলায়, বুকে মুখ ডুবিয়ে আদর করত।ভোরবেলায় কি হয় তার, সেই জানে। এতটুকু ছাড়া সারাদিন যেন তার চলেই না।  আমার প্রথম প্রথম ঘুম হতো না। পরে কেমন অভ্যাস হয়ে গেল।

তবে আজকাল ওর আর এসব দরকার হয়না। সে এখন অন্যজনের বুকে মুখ ডুবিয়ে এভাবেই আদর করে।

আজ তানবীন অফিসের কাজে কক্সবাজার যাবে, ৭.১৫ তে ট্রেন। আসলে অফিসের কাজ- ফাজ কিছু নয়, এটা তার অজুহাত। ওই পিয়াসী না কি যেন মেয়েটার নাম, তার পিয়াস মেটাতেই যাচ্ছে।

পরিচয় আগে থেকেই ছিল। আমাকে অনেকবার বলেছে মেয়েটার চাকরী হচ্ছে না। তাই পরামর্শের জন্য মাঝেমধ্যেই  ফোন দেয়। সেবার ঢাকায় তানবীন দুমাস ছিল। আসার পরই তার পরিবর্তন খেয়াল করলাম। কথায় কথায় চিৎকার করে, অল্পেই রেগে যায়। আর ফোনটা তার প্রিয় বস্তুতে পরিনত হলো। আগে পাসওয়ার্ড দেয়া ছিল না। এখন দিয়ে রেখেছে। সারাক্ষন চ্যাটিং করে। এবং ফোন সাথে সাথে রাখে।

পিয়াসী মেয়েটা কালো কুচকুচে। যাকে তেলকালো বলে। কালোতে আমার কোন কালেই কোন সমস্যা ছিল না।ঈদানিং কালো মেয়ে দেখলেই কেমন মেজাজ খারাপ হয়। অতি কামুক বলে মনে হয়। পিয়াসীর জন্যই হয়তো মনের ক্ষোভ সরু মরা নদীর মতো কালো, পাতলা কাউকে দেখলেই তার প্রতি গিয়ে পড়ে।

তানবীন পিয়াসীর সাথেই এই ভরা শীতে ভিজতে যাচ্ছে। মেয়েটা বোধহয় ভেজাতে পারে ভাল। তানবীনের চোখে- মুখে সুখের আভাই তার প্রমাণ। আমি এতো ভাল ভেজাতে পারিনা তাই সে আমায় ছাড়তে যাচ্ছে।

তানবীনকে আমার শরীর স্বর্বস্ব নয়, মন স্বর্বস্ব মানুষ বলেই মনে হয়েছে। সাদামাটা সহজ দাম্পত্যে সুখী একজন মানুষ। অধিকাংশ সময় অসুস্থ থাকে তাই তার সুস্থতার জন্যই যা যা করনীয় আমি তাই করেছি। এখন দেখছি সবটাই ভুল। আমি হয়তো তাকে পরিপূর্ণ শারিরীক সুখ দিতে পারিনি। পৌষের প্রচন্ড শীতেও সে যে ভিজতে জানে এবং প্রচন্ড তেষ্টা পায় এটা জানা হয়নি।

আজ আমি অনেক আগেই উঠেছি কারন রান্না করতে হবে।তানবীনের প্রচুর এসিডিটির সমস্যা।আলসারে টাটকা ও বাড়ির রান্না করা খাবার তার জন্য জরুরী। যদিও সে পিয়াসীর কাছে গেলে এটা মেইনটেইন করে না। তবুও প্রতিবার ফিরে পেট ব্যাথায় যখন কষ্ট পেতে থাকে তখন যেন আমারই দ্বিগুন কষ্ট হয়।

তানবীনের চোখমুখ কিছুটা ফোলা। ও বোধহয় রাতে তেমন ঘুমায়নি। অবশ্য  পিয়াসীর কাছে যাবার এক্সাইটমেন্টে ঘুম না হবারই কথা। কাল অনেক রাত পর্যন্ত ব্যাগ গুছিয়ে নিলো। ব্যাগের পেট এতো মোটা যে চেইন লাগানো কষ্টকর। বেশ কিছুদিনের জন্য যাচ্ছে বোধহয়! রাতে ওয়াশরুমে যাবার সময় শুনলাম কি রকম ফিসফিস করে কথা বলছে।

আমরা অনেকদিন আলাদা বিছানায় ঘুমাই। সে-ই বিছানা আলাদা করেছে। তার নাকি সমস্যা হয়। কিছুদিন মাঝে কোলবালিশ নিয়ে ঘুমাল। তারপর আমিই বললাম আলাদা ঘুমাতে। সে বেশ খুশি হয়ে চলে গেল।

আমি ঈদানিং তার কোনকিছুতেই তেমন অবাক হই না বা জবাবদিহীতা করি না। তাকে অনেক ভালোবাসি বলে হয়তো ছেড়ে যেতে সময় লাগছে। তবুও আমি চাই সে যেভাবে চায়, সেভাবে ভালো থাকুক! তাকে বদলাতে দেখছি আর নিজের প্রস্তুতিটাও নিচ্ছি। তবে আমি তাকে এতোদিন আমার মনে করেছি, আজও করি।

তানবীনকে খাবার দিতে হবে তারাহুরো করছি। আবার হাত পোড়ায় একটু মলম লাগাবো। সে মলমটাও খুঁজে পাচ্ছি না। সে চলে যাবার পর খুঁজব। না পেলে ডিসপেনসারী খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

তানবীনই সব ওষুধ রাখে। তাকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। আবার বেশি আহ্! উহ্! করলে বা জিজ্ঞেস করলে, এ সময় সে ভীষন রেগে যাবে ও বিরক্ত হবে। আর কোন খাবারই হয়তো খাবে না। ঈদানিং আমি যা করি তাতেই সে মহা বিরক্ত হয় আর আদিখ্যেতা মনে করে।

এখন যেমন আলসার থাকার পরও সে হয়তো বলবে,- “রান্না করবার কোন দরকার ছিল না। আমি যতটুকু খাই, বাইরে খেয়ে নিতাম। তাছাড়া ট্রেনেও তো অনেক খাবার পাওয়া যায়।”

হাত পোড়াতে মনে পড়ল, এর আগেও সে অফিসের কাজে যাচ্ছিল। কোথাও যাবার আগে আমার হাতের চা/ কফি খেয়েই বের হয়। চা বানিয়ে দিতে গিয়ে গরম চা আমার পায়েই পড়ল। তানবীনের সে কি অস্থিরতা! হাতের ব্যাগ ফেলে দিয়ে হাটু গেড়ে আমার সামনে বসে পড়ল। চোখে ছলছল পানি। যেন তারই পা পুড়ে গেছে।

-সরি, সরি সোনা, আমার জন্য তোমার এতো কষ্ট হল!

অবশেষে যে কাজটি তার করার কথা ছিল না সেটিও করে বসল। অনেকক্ষন ধরে আমার পায়ে চুমু দিয়ে দিয়ে যন্ত্রনা কমানোর চেষ্টা করল। আমার কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি। শুধু অবাক হয়ে তাকে দেখছিলাম। এ মানুষটা কি সারাজীবন এমনই থাকবে? আল্লাহ তুমি এমন দিন প্রতিদিন দিও।

এমন দিন আজ আর নেই। এখন এ মানুষটাই আজকের তিনগুণ পুড়ে গিয়ে লাল হওয়া হাতটির দিকে ফিরেও তাকাল না। আমিও তাই চুপচাপ চেপে গেলাম। কিন্তু জ্বলুনি সে কি আর থামে? একটু পানি লাগলে আরাম বোধ হয়, আবার বাড়ে।

তানবীনকে খাবার দিতে গিয়ে কষ্টে মাঝে মাঝেই হাত ঝাকাচ্ছি। হাতে লেগে থাকা সামান্য পানির ছিটা তার খাবারে পড়ল। সে ভীষন রেগে গেল।

-এতো হাত ঝাকাচ্ছ কেন? পানি যেখানে সেখানে পড়ছে দেখছ না।

-‘সরি’!

তার থেকে সরে গিয়ে হাসলাম। আমিই তো রেঁধেছি। রান্নার সময় তো আর হাতে গ্লবস ছিল না। এই নোংরা হাতের পানি তো রান্নাতেও আছে। আমাকে তার সহ্য হচ্ছে না বলেই এমন আচরন করছে। আকারে- ঈঙ্গিতে হয়তো তার জীবন থেকে দ্রুত সরে যেতে বলছে। আমি আবার তাকে একটু দেখাতেই শান্তি পাই। আশেপাশেই  থাকলেই মনে হয় সব আছে। তাই যেতে পারছি না। তবে একদিন পারব।

তানবীন তেমন কিছুই খেলো না। রান্না বোধহয় ভালো হয়নি কিংবা হাতের পানি পড়েছে বলেই খেলো না। অবশ্য ভোর পাঁচটায় মাছ- ভাত খাওয়ার রুচি কম হওয়ারই কথা। তবুও আমার ভীষন  কষ্ট হলো! খাবার সাথে দিতে চাইলাম, তাতেও সে মহাবিরক্ত!

তানবীনকে রিকশায় তুলে দিতে রাস্তা পর্যন্ত গেলাম। এতো সকালে রিক্সা আসতে দেরী হবে হয়তো।

সে আমায় বলল,- এতোক্ষন থাকবে, তোমার তো কলেজ আছে। চলে যাও।

আমার ভীষন ইচ্ছে করল আগের মতো সে আমায় জড়িয়ে একটা বিদায় চুমু দিক। সাত সকালে হাঁটতে বের হওয়া বয়স্ক মানুষরা সবাই তাকিয়ে লজ্জা পাক, শিহরিত হোক! আবার খুশিতে বলুক ভালবাসায় ‘বেহায়া দম্পতি’।

আমি চলে আসার আগে আড়ালে দাঁড়ালাম। তানবীন যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। স্মার্ট ফোনটা তারাতারী বের করে কানে লাগাল।কাউকে তার জানানো জরুরী যে, সে বেড়িয়েছে। চিন্তা যেন না করে।

এতোক্ষনে খেয়াল হল হাত ভীষন জ্বলছে। আমি ছটফট করছি যন্ত্রনায়। আচ্ছা, মনের যন্ত্রনার চেয়ে হাত পোড়ার যন্ত্রনা কি বেশি? অন্তত: মনের যন্রনার চেয়ে এ খুব বেশি কিছু নয়; তাই যতোক্ষন জ্বলতে থাকে; থাকুক!

আমরা দৈহিক কষ্টগুলোতে কি নির্দ্বিধায় একে, ওকে, তাকে বলতে পারি। তা কমানোর জন্য ব্যবস্থাও নিতে পারি। কিংবা বেশি হলে চিৎকার করে কাঁদতে পারি। আহ! উহ! করতে পারি। অথচ মন প্রতিনিয়ত পুড়ে ছাই হয় তা না যায় কাউকে বলা, না যায় আহ! উহ! করা। নিভৃত্বে, নিশ্চুপে মেনে নিতে হয়, মেনে নিয়ে চলি।

অনেক কাজ বাকি। কাপড়- চোপড় সব গোছাত হবে ।তানবীনকে বলা হয়নি এটাই তার সাথে আমার শেষ দেখা। পিয়াসীর কাছ থেকে ফিরে, সে আর আমায় পাবে না।

তার পার্মানেন্ট কাজের মেয়েটা, সারাক্ষন অস্থির হয়ে থাকতো কিসে তার কষ্ট কম হয়। কি তার পছন্দ, কি অপছন্দ, কিসে সে সুখ পায়। হালকা শরীরের মানুষটা ঘন ঘন অসুস্থ হয় সেজন্য কম ঝালে মসলা ছাড়া রান্না, পরিষ্কার বিছানা, গরম পানি, পরিষ্কার কাপড়- চোপর ঠিকঠাক শাওয়ারে দিয়ে রাখা এসব করে তাকে আর বিরক্ত করবে না। থাকুক সে তার পিয়াসীর পিয়াস খেয়ে! আমাতে হয়তো আর রুচি নেই!

রুচিতে একটা স্মৃতি মনে পড়ল। আমরা বন্ধুরা মিলে একবার টুরে গিয়েছিলাম। ঘুরতে ঘুরতে মোটামুটি সেখানকার সব খাবার- দাবারের টেষ্ট নেয়া হয়ে গেছে। এবার শুকোর খাওয়ার পালা। ডা: আরিফ, সাহসী ছেলে। সে সকালের নাস্তায় শুকোর অর্ডার করে ফেলল। আমি তো কাভি নেহী; অন্যরাও কেউই খেলো না।

খাবার সময় আরিফ বলছিল- তোরা ভীষন মিস্ করলি; অসাধারণ টেষ্ট। নরম আর চর্বিযুক্ত।

আমি দুম্বার মাংস খেয়েছিলাম, অনেকটা সেরকম দেখতে। অনেক দাম দিয়ে মজা করে খাওয়া শেষ করে আরিফ বেসিনে হাত ধুতে গেল। বেশ কিছুক্ষন সে নেই। ব্যাপার দেখতে শওকত গেল। শওকত বেচারাকে নাজেহাল অবস্থায় ওয়াশরুম থেকে নিয়ে এল। ফর্সা ছেলে বমি করতে করতে চোখ- মুখ লাল করে ফেলেছে।

আজও আমরা তাকে খ্যাপাই। সে নির্বিকার উত্তর দেয়- সব জিনিসের টেষ্ট জানা থাকা ভাল। আর “ ইচ্ছেতে স্বাধীনতা জরুরী“। যেমন- কারও পছন্দ গরুর মাংস আর কারও শুয়োর। আবার কারও কোনটাই না। সে সারাজীবন ঘাস, লতা- পাতা খেতেই পছন্দ করে। তানবীনের হয়তো শুয়োর খেতে ইচ্ছে করছে, আনন্দ করে খাক। রাখতে না পারলে না হয় ফেলে দেবে।

পরিচিত ও সাজানো সংসার ছেড়ে বের হতে বেশ রাত হয়ে গেল। বাইরে বেশ শীত আর আকাশে ঝাপসা চাঁদ। পেছনে ফিরে তাকালাম, আমার চোখও চাঁদের মতো ঝাপসা হয়ে গেল। দুরে কোথাও জুবিন- এর গান বাজছে, আমি শুনতে শুনতে পরিচিত বিদায়ী রাস্তায় হাঁটছি। গানের কথায় ভালবাসার কি সহজ স্বীকারোক্তি। আমি কি তানবীনের মতো পারতাম এতো সহজে কারও হতে?

“ দিলনে মেরে তেরে দিলছে কাহা, ঈশক্ তো হ্যায় ওহি জো হ্যায় বে ইনতেহা

তুনে কাভি জানা হি নেহী, ম্যায় হামেশা ছে তেরা; তেরা হী রাহা।।

কে যাব তাক জিউঁ ম্যায়, জিউঁ সাথ তেরে, ফির চাঁন্দ বান জাউঁ তেরি গালিকা

ম্যায় জিস দিন ভুলা দু; তেরা পেয়ার দিলছে, ও দিন আখরি হো; মেরি জিন্দেগীকা, মেরী জিন্দেগীকা।

না ঠ্যাহরেগা কোয়ী, আঁখো মে মেরী,হোনা সাকুগা ম্যায় অর কিসিকা,,,,,

ছবি- নেটের

২৮৯জন ১১৪জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ