পুলিশ হবো

নাসির সারওয়ার ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, বৃহস্পতিবার, ১১:১৮:২২পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৪৩ মন্তব্য
  • আপনি বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছেন, তাইতো?

# জী।

  • বিজ্ঞান বিভাগের কোন পদের জন্য নাম না দিয়ে পুলিশ পদের নাম সবার উপরে!

# আমি পুলিশ হবো।

  • পরিবারের কেউ পুলিশে কাজ করে?

# না।

  • তাহলে উৎসাহটা আসলো কি করে?

# নিজের উৎসাহে।

  • এই উৎসাহের কোন উৎস আছে?

# জী, আছে।

  • তা আমাদের যদি সেই উৎসাহের কথাটা বলতেন, তাহলে আপনার পুলিশ হবার পথে আমরা আপনাকে সহযোগীতা করতে পারতাম। বলার মত নাকি বলতে চাচ্ছেন না?

# আমি বৈজ্ঞানিক উপায়ে মানুষ পিটাবো।

কাগজ নাড়াচাড়ার মৃদু খচখচ শব্দটুকুও তখন থেমে গেলো। বিশেষ মৌখিক পরিক্ষার বোর্ডের পাঁচ জোড়া চোখ আমার চোখের দৃষ্টি হননে ব্যস্ত হয়ে পরেছে। আমি নির্বাক ভাবে প্রশ্নকর্তার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছি। অপেক্ষা বেশ যন্ত্রণার যা আবারও আমাকে মনে করিয়ে দিলো। এক মিনিটেরও বেশী সেই সময়টা যেনো ঘড়ির সাথে চলেনি। অন্য আরেকজন প্রশ্নকর্তা সেই হরতাল ভেঙ্গে দিলেন।

  • এই অভিনব আইডিয়াটা কী এবং পেলেন কেমন করে?

# পাঁচ মিনিট সময় দিলে বলা যাবে।

  • আরো বেশী সময় লাগলেও আপনাকে দেয়া হবে।

সেদিন যা বলেছিলাম, তার সারসংক্ষেপ – খেলা পাগল আমি সবেমাত্র কলেজে উঠেছি। খেলা বলতে শুধু ফুটবলই বোঝাতো তখন। ৭০ রের শেষ আর ৮০ দশকের সাক্ষীরা জানেন কেমন করে মোহামেডান আর আবাহনী শুধু দেশকে নয়, একটা পরিবারকেও দুভাগ করে ফেলতো তাদের খেলার দিন। সেই দুই দলের ফিরতি খেলা যা প্রথমবারে পন্ড হয়েছিলো তুমুল মারধোরের কারনে। তিন দিন পরে কোরবানীর ঈদ। অতএব, খেলা শেষ করেতই হবে তার আগে। এখানে যেনে রাখা ভালো যে সেই দুই দলের সমর্থকদের আলাদা গ্যালারী ছিলো যার মাঝে বেশ ফাকা জায়গা থাকতো। গ্যালারীতে তিল ধরার জায়গা থাকতো না, তবুও ঐ খালি জায়গায় কাউকে বসতে দেয়া হতনা। কারন একটাই, মারামারি কম হোক। তারপরও তো ইস্টক ছিলোই।

যথারীতি খেলা শুরু হবার আগেই একপশলা ইষ্টক বৃষ্টিপাত হয়ে গেলো। শুরুর পরে রেফারী বেচারা বেশ চাপে থাকতেন। কোন পক্ষই তার পক্ষে থাকেনি কোনদিন। খেলা চলছে খেলা থামছে মাঠে আর গ্যালারীর উত্তেজনার মাঝে। শেষ হলোনা ফিরতি ম্যাচও। রেফারী সাহেব রাত ১১ টায় দিলেন শেষ বাঁশি বাজিয়ে। পুরো স্টেডিয়াম এলাকাটা যেন নরকের রূপ নিলো। দোকান পাট খুব কমই খোলা ছিলো। যা ছিলো, তা আর আস্ত থাকলো না। সাথে রাস্তার লাইট সহ যা ভাঙ্গা যায়, মোটামুটি অন্ধকার হচ্ছে একটু একটু।

গ্যালারী থেকে বের হবার আগেই টের পেলাম আমরা ১৮ জনের দল ছোট হয়ে ২ জনের হয়েছি। অন্যরা কে কোথায় তা জানার কোন উপায় সেযুগে ছিলোনা। চাঁচা আপন প্রাণ বাঁচা অবস্থা। রাস্তায় নেমেই দৌড়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলাম। সাথে পানীয় ফ্রি যা বড় একটা ভাঙ্গা পানীয় সরবরাহ ট্রাক থেকে যে যার মত নিতে পারে। গুলিস্তান এসে দেখলাম ৬ নম্বর বাস ভাইয়েরা হরতাল শুরু করেছেন। স্টেডিয়াম পাড়া মাড়িয়ে আজ কোন বাস আর যাবেনা। রাত একটার দিকে এক রিক্সা ওয়ালাকে হাতে পায়ে ধরে উঠে পরলাম। স্টেডিয়াম এড়িয়ে আসলাম ঠিকই কিন্তু সচিবালয় এলাকা এড়ানোর কোন পথ ছিলোনা। কাছাকাছি যেতেই মোটামুটি নয়, ভালো ভাবেই টনক নড়ে উঠলো। রাস্তা ভর্তি শুধু পুলিশ আর পুলিশ এবং ৪০/৫০ টা রিক্সার লাইন। দুচার জনকে দেখছি পেটানোও হচ্ছে। সব রিক্সাই চেক করা হচ্ছে যা কিছুটা অন্ধকারেও দেখা যাচ্ছে। আমার বন্ধুটি বললো কেটে পরতে। আমার আবার ওর চাইতে বুদ্ধি বেশী। আরে না, আমাদেরতো চোর ছ্যাঁচোর মনে করার কোন কারন নাই। সেকালে জিন্স একেবারে সহজ প্রাপ্তির জিনিষ না যা আমরা পরে আছি। আর সাথে চুলের বাহারি মেলাতো আছেই। আরো বেশি বুদ্ধি দেখালাম, হাতের অবশিষ্ট পানীয়টি রিক্সার সিটের নীচে রেখে দিলাম পুলিশ দেখার আগেই।

“স্যার, ছাত্র পাইছি দুইটা”। আমাদের রিক্সার কাছে এসেই এক পুলিশের চীৎকার। শুধু শুনলাম, “নামা শালাদের”। এর পর শুধু লাঠি আর রাইফেলের বারি। কজন মিলে বা কতক্ষন পিটেয়েছিলো তা কখনো মনে করতে পারিনি। শুধু একটা ফটাস জাতীয় আওয়াজ আজও কানে বাজছে। মোটা একটা বেত (সম্ভবত রাজেন্দ্রপুর থেকে আনা) আমার বা কাধে পরে ভেঙ্গেই গেলো। মনে হয়েছিলো হাতটা আলাদা হয়ে গেছে শরীর থেকে (যা পরে সার্জারি করে ঠিক করতে হয়েছিলো)। দুজন পুলিশ আমাদের দুজনকে টেনে নিচ্ছে স্টেডিয়ামের দিকে। রাস্তায় তাদের বন্ধুরা তাদের হাত জ্বালাই করে নিচ্ছে আমাদের উপরে। আমাদের সহ আরো অনেককেই জড়ো করা হোল ভি, আই, পি গেটের কাছে। একসময় (সম্ভবত ভোর ৪টার দিকে) আমাদের সবাইকে পুলিশের বড় একটা ট্রাকে তোলা হলো। ট্রাকে তুলবার সময় ওরা একটা বিশেষ প্রক্রিয়ায় আসামী সংখ্যা দেয় যা এখানে লিখতে পারছিনা।

একসময় বেশ কয়েকটা ট্রাক ছাড়ল। কোথায় যাচ্ছি, কোন পথে যাচ্ছি, এযেন আমি নতুন এই শহরে। কিছুই মাথায় আসছেনা। কেমন যে বমি বমি লাগছিলো। সাথের বন্দুটিকে শুধু বলেছিলাম, আমার বা হাতে একটা চিমটি দে। চিমটি কী দিয়েছিলো!

আজ আর মনে করতে পারছি না,

৩৬৭জন ৩৬৭জন
0 Shares

৪৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য