সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

কালে কালে সবযুগেই পুরুষ তাদের পুরুষত্ব খুঁজে পেয়েছে নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার মধ্য দিয়ে।
আমার এ বাক্যটি শুনে অনেকেই আমাকে পুরুষবিদ্বেষী অথবা অন্য অনেককিছুই ভাবতে পারেন কিন্তু আমি বরাবরই যা নায্য বলে মনে করেছি, তাই বলে গিয়েছি। তাতে কে শুনলো না, বা কে মনঃক্ষুণ্ণ হলো, সেটা দেখিনি। আমার ভাবনা সবসময় এক জায়গাতেই আটকে যায়। সুবিধাবঞ্চিতদের দিকে, অত্যাচারিতদের দিকে, অনাচারের শিকার হওয়াদের দিকে। সুবিধাবাদের চিন্তায় ওগুলোকে এড়াতে পারিনা। সুবিধাভোগীদের জন্য সুবিধাবাদীরা কথা বলবে, বলে ধন্যধন্য হবে। কিন্তু সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কে-ইবা কথা বলতে চায়? যেখানে কেবলই বিষাক্ত তীর ধেয়ে আসে? তেলামাথায় তেল দেয়ার লোকের অভাব ঘটে না। এ যুগে তো আরও না। কিন্তু শুষ্কমাথায় কেউ চিরুনি দিতেও চায়না। আমার চোখ বরাবর সেই শুষ্কমাথার দিকেই চলে যায়। এটা আমার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। কমবেশি যাই লিখি, আজ পর্যন্ত মনে হয় না আমার কলম থেকে এমন কোন কথা বেরিয়েছে যা নিজকে লোকের মনে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে চতুরতার রঙ নিয়ে। যখন যে বিষয়টি নিজের মনকে আলোড়িত করেছে, তখন সে বিষয়েই লিখেছি। যদি লিখার শক্তি না পাই, চুপ করে থেকেছি কিন্তু লোকের মন রক্ষা করে চতুরতার আশ্রয় নেয়াকে বরাবরই সচেতনভাবে এড়িয়ে গিয়েছি।

বলছিলাম, নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে পুরুষতান্ত্রিকতার কথা। সব যুগেই পুরুষতান্ত্রিকতাকে টিকিয়ে রাখতে বর্ম হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে কল্পিত ধর্মকে। সে যুগে সতিদাহ প্রথা, এ যুগে যৌনদাসী। এজন্য ধর্মের বর্ম দিয়ে এমনভাবে নারীদের আচ্ছন্ন এবং আবদ্ধ করে রাখা হয় যে, মাথা তোলে ‘না’ বলার শক্তিটুকুও যেনো তারা না পায়, অধিকার চাওয়া তো দূর!

এর মধ্য থেকেই মাঝেমধ্যে কালের শক্তি হয়ে রাজা রামমোহন রায়দের মতো মহাপুরুষরা আবির্ভূত হন অত্যাচারী স্বগোত্রীয়দের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। এ লড়াই যে সে লড়াই নয়, কালের পর কাল জগদ্দল পাথরের মতো নারীর উপর চেপে থাকা পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়াই। যে লড়াইয়ে নামার কারণে তাঁর ধর্মাচ্ছন্ন মা তারিণী দেবীও ধর্মত্যাগী পুত্রের পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নিতে মামলা করেছিলেন। বিচার চলাকালীন সময়ে বিচার কার্যালয়ে দাঁড়িয়ে সগর্বে উচ্চারণ করেছিলেন, ধর্মত্যাগী পুত্রের মস্তক যদি এখানে ছিন্ন করা হয় তাহলে আমি পুণ্য কাজ বলে মনে করব। ধর্মাচ্ছন্নতাই মা’কে দিয়ে গর্ভজাত সন্তানের বিরুদ্ধে এমন কঠিন বাক্যটি উচ্চারণ করিয়েছিলো।
রাজা রামমোহন রায় স্বপ্ন দেখতেন আধুনিক এক ভারতের। মানুষকে মধ্যযুগীয় মানসিকতার গণ্ডি থেকে বের করে এনে একটি সুন্দর আলোকিত জীবন দর্শনের দিকে নিয়ে আসার স্বপ্ন। সে স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে সমাজ থেকে ধর্মের নামে ‘সহমরণ’ বা ‘সতিদাহ প্রথা’ নামের নিষ্ঠুর প্রথাটির বিলুপ্তি ঘটেছে আর হিন্দু নারীরা পেয়েছে মুক্তি জীবন্ত দাহ হওয়া থেকে।

আমরা অসভ্য থেকে সভ্যতার আলোতে এসেছি বহুকাল হলো। নারীও সেকাল পেরিয়ে একালে এসে অনেকখানিই আজ মুক্ত। কিন্তু ধর্মান্ধতার বেড়াজাল থেকে কী আজও সে মুক্ত? এ যুগে এসেও সে কখনো ধর্মাচ্ছন্নতায় আসক্ত, কখনো আবদ্ধ। তাইতো এ যুগেও নারী ধর্মাবরণে যৌনদাসী হয়। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যৌনজিহাদ করে। বিবাহিত নারী পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়। পুরুষ সে সম্পত্তিকে বাজী রেখে জুয়ার আসরে বসে। হেরে গেলে সে সম্পত্তি হস্তান্তরিত হয়। হস্তান্তরিত সম্পত্তি নিলামে উঠে। বাহ!
কী প্রাচ্য, কী পাশ্চাত্য, সর্বত্রই যে এক রুপ। সবেতেই পুরুষতান্ত্রিকতা। নারীকে গিনিপিগ বানিয়েই পুরুষতান্ত্রিকতার বজায় রাখা। সে পুরুষতান্ত্রিকতা বজায় রাখতে সময়ে সময়ে ধর্মকেও বর্ম বানানো হয়। সে যুগেও, এ যুগেও।
আলোকবর্ষকাল পেরিয়ে পৃথিবী এগিয়েছে বহুদূর, সে তুলনায় এগোতে পেরেছে কী নারী? পারেনি, নানা প্রতিবন্ধকতার অজুহাতে এগোতে দেয়া হয়নি তাকে।
কীসের ভয়ে তবে এ প্রতিবন্ধকতা?

২৭৭জন ২২৯জন
9 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ