পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ

জিসান শা ইকরাম ৩ অক্টোবর ২০২০, শনিবার, ০১:১১:৩৪পূর্বাহ্ন গল্প ৪১ মন্তব্য

ভোর রাত সাড়ে চারটায় ঢাকা সদরঘাটে লঞ্চ পৌছাল। পল্টুনে লঞ্চের সজোড়ে ধাক্কার বিকট শব্দে ঘুম থেকে আতংকিত অবস্থায় জাগলাম। আর ঘুম আসলো না। গন্তব্যে পৌছানোর পরে মানুষ সাধারণত যানবাহনে আর থাকতে চায় না। ব্যাগ গুছিয়ে একজন কুলি ডেকে তার মাথায় চাপিয়ে নেমে গেলাম লঞ্চ থেকে অধিকাংশ যাত্রীর সাথে।

রাস্তার বৈদ্যুতিক পোস্টে লাইটগুলো জ্বলছে তখ্নো। কয়েকটি রিক্সা আর সিএনজি যাত্রীদের ডাকাডাকি করছে। আমার গন্তব্য পল্টন, তাই রিক্সা নিলাম। রাস্তা একদম ফাঁকা। পথচারী বলতে মসজিদের নামাজ ফেরত কয়েকজন। একবার ভাবলাম আরো কিছুক্ষণ পরে না হয় যাই। কিন্তু অনেক যাত্রী যাচ্ছে দেখে আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম চলে যাবার।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কোর্ট পেরিয়ে ধোলাইখালের সিগনাল অতিক্রম করে সোজা নবাবপুর রোড হয়ে পল্টন যাবে আমাকে বহন করা রিক্সা। সিগনাল মোড় এর মাঝামাঝি আমি, হঠাৎ ধোলাইখালের দিক থেকে সিটি কর্পোরেশনের ময়লা বোঝাই এক ট্রাক দানবের মত এসে আমার রিক্সা কে সামনা সামনি চাপা দিল। রিক্সা সহ রিক্সা ওয়ালা ট্রাকের ধাক্কায় ছিটকে গেলো ট্রাকের চাকার আওতার বাইরে। আর আমি ট্রাকের পিছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে পরে রইলাম রাস্তার উপর। মাথার উপর দিয়ে চাকা চলে যাওয়ায় হলুদ মগজ আর লাল রক্তের মিশেলে রাস্তার উপর এক অ্যাবস্ট্রাক্ট চিত্রের মত দেখাচ্ছে। এত রক্ত ছিল আমার শরীরে! একটা চোখ কোটর থেকে বের হয়ে একটু দূরেই আমার দেহের দিকে তাকিয়ে আছে। মৃত্যুর পরে মানুষের চোখ আরো চল্লিশ মিনিট কর্মক্ষম থাকে, এরপর চোখের মৃত্যু হয়। হাত পা তখনো লাফাচ্ছে। দুহাত দিয়ে শরীরকে জাগানোর ব্যার্থ চেষ্টা করছে। একসময় নিথর হয়ে গেলো শরীর।

রাস্তার অন্য পাশে রিক্সা ওয়ালা অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। আমার ব্যাগ, ল্যাপটপ আমার মৃতদেহ আর রিক্সার মাঝামাঝি। চারজন লোক এলো। একজনে আমার ল্যাপটপটি কাঁধে নিয়ে চলে গেলো, যেন ল্যাপটপটি তার নিজের। সাইড ব্যাগটি নিয়ে নিলো অন্য একজন। লাগেজটি জাগানোর চেষ্টা করলো অন্য দুজনে, ভারি হওয়ায় হাতে নেয়া যাবেনা বুঝতে পারলো। মাথায় নিলে পুলিশের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে এই চিন্তায় এখানেই লাগেজটি খুলে ফেললো।

ভিতরে মালামাল দেখে তো অবাক দুজনেই। মৃত ব্যাটা শিওর পাগল। আমি তো হাসছি তখন এদের চিন্তা জানতে পেরে। লাগেজে প্রচুর পুরাতন জামা কাপড় যাতে আমার প্রিয়তমার স্পর্শ লেগেছিল বিভিন্ন সময়ে। একটি আস্ত ইট, কয়েক কেজি পাথুরে কয়লা ( আমি ইট প্রস্তুতকারক ছিলাম বলে প্রিয়তমার আবদার ছিলো এ দুটো সংগ্রহে রাখার), এক লিটার মাম পানির একটি খালি চ্যাপটানো বোতল যা শেষ বার দেখা হবার সময় প্রিয়তমা খেয়েছিল, শুকিয়ে যাওয়া পাঁচটি লাল আঙুর যা প্রিয়তমার দেয়া আঙুর থেকে না খেতে পারায় থেকে গিয়েছিল। একটি ভাঙা চাইনিজ মোবাইল যাতে প্রিয়তমার স্পর্শ লেগে আছে। পলিথিনের সুদৃশ্য একটি প্যাকেটে তার একটি চুল, আর আমার নিজের কয়েকশত ছবি যে গুলো সে তুলে দিয়েছিল নিজের মোবাইলে।

এইসব জিনিসপত্র দেখে রাগে দুজনে অস্থির হয়ে আমার মৃত দেহের কাছে এসে কয়েকটা লাথি দিল। আমার বাম হাতের আঙুলে সোনালী রঙের আংটি দেখে ফেলল একজনে। থেতলে যাওয়া আঙুল থেকে টেনে খুলে সোনার আংটি ভেবে নিয়ে চলে যাচ্ছে দুজন। আমি চিৎকার করে বলিছি ” প্লিজ নিওনা ওটা, সিলেট হযরত শাহজালাল এর মাজারের সামনে থেকে আংটিটি কিনে দিয়েছিল আমার প্রিয়তমা, রেখে যাও ওটা……..

ছবি: গুগল থেকে।

৩৩১জন ৩৭জন
0 Shares

৪১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য