১৯৮৮- ১৯৯১ পর্যন্ত প্রতি বছর খনন কাজ চালনা করা হয়। কিন্তু দেখা যায় এর বিস্তৃতি অনেক গভীরে। বাংলাদেশ আর ফ্রান্স এর মধ্যে একটা চুক্তি সম্পাদিত হয় ১৯৯২ সালে, যৌথ উদ্যোগে পূর্বদিকের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের মধ্যভাগে প্রতিবছর খনন কাজ চলে মূল মাটি পর্যন্ত। খনন কাজ দ্বারা ১৮ টি নির্মান স্তর উন্মোচন হয়। 

প্রাক আর্য স্তর হিসেবে সব শেষের যে স্তর উঠে আসে সেখানে উত্তর ভারতের কাল মসৃণ পাত্র, রুলেটেড পাত্র, লাল রঙ্গের পাত্র, প্রলেপযুক্ত পাত্র, পাথরের যাঁতা, মাটির রান্না ঘর, ইট বিছানো মেঝে পাওয়া যায়। এই স্তরের তেজস্ক্রিয় কার্বন তারিখ খ্রীস্টপূর্ব চার শতকের শেষ ভাগের প্রাক মর্জ যুগের। 

যে সমস্ত ঢিবি মহাস্থানগড়ের ভিতরে খনন করা হয়েছে সে গুলো ছাড়াও এখনো ৩৩ টির মত ঢিবি বাকি আছে। এর সন্নিহিত গ্রামগুলোতে আরও অনেক ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে, যেখানে প্রাচীন পুন্ড্রনগরের প্রাচীন ইতিহাস এখনো লুকিয়ে আছে। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জয় সিংহ রায়ের মতে প্রাক মর্জ যুগের প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে থেকে মানব জাতির চিহ্ন এখানে পাওয়া যায়। 

পুন্ড্র একটা অনার্য জাত, যারা কিনা আর্যদের কে অনেক বাধা দিয়েছিল ভারতের পূর্ব দিকে আসার পথে। কলিঙ্গ এর যুদ্ধ হয়েছিল এই আর্য / অনার্য দের মধ্যে। আর্যরা বিহার পর্যন্ত আসার পর অনেক বাধাগ্রস্ত হয়েছিল অনার্যদের দ্বারা। আর্যরা বারে বারে অনার্য দ্বারা বাধা হওয়ার জন্য অনার্য দের ‘দস্যু’, ‘নোংরা’ বলে সম্বোধন করতো। 

সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল প্রায় ৫০০০ বছর আগে। সিন্ধু আর সরস্বতী নদীর তীরে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। সরস্বতী নদী বর্তমানে নাই। 

কিছু কিছু পন্ডিতের মতে, 

পুন্ড্ররা সিন্ধু সভ্যতা শেষ হয়ে গেলে বা তার সমসাময়িক সময়ে তারা ভারতের পূর্ব দিকে এই সমতল ভূমিতে সরে আসে। 

কার্তিক চন্দ্র বর্মন এর লেখা গবেষণা “The Pundras and Their Real Home-Lands in Ancient Times” থেকে জানতে পারি “We know the history near about five thousand years ago Indus Valley civilization developed as an ancient Indian Sub continent. In the contemporary period Pundradesh was another powerful state which roused in the Eastern India. This civilization existed as contemporary to Egypt and Babylonian”। 

অর্থাৎ ‘পাক ভারত উপমহাদেশে পাঁচ হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠে ঠিক সেই সমসাময়িক সময়ে ভারত বর্ষের পুন্ড্রদেশ নামে আর একটা শক্তিশালী রাজ্য গড়ে উঠে। এই সভ্যতা গুলো মিশরীয় আর বাবলনিও সভ্যতার প্রায় সমসাময়িক’। 

 

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং নৃবিজ্ঞানী রাখাল দাস বন্দোপাধ্যায় বলেছেন “পুন্ড্ররা শুধু মাত্র একটা পুরনো জাতি নয়, তারা সমস্ত পৃথিবীর একটা পুরনো জাতি’।

কিছু কিছু পন্ডিত উল্লেখ করেছেন পাঁচ হাজার বছর আগে পুন্ড্ররা তাদের বসতী স্থাপন করে ছিলেন মহাস্থানগড়ের বাইরে। যা কিনা সিন্ধু সভ্যতার সমসামিয়ক। সিন্ধু সভ্যতার কাছাকাছি অনেক জায়গার নামের শেষে পুর আছে, যা কিনা এই বঙ্গদেশেও অনেক জায়গার নামের শেষে পুর দেখা যায়।

পুন্ড্ররা আর্য দের ধর্ম পুরো পুরি গ্রহণ করেনি। মাতৃ পূজা, মনসা পূজা, তান্ত্রিক পূজা, বট পাকুড়ের পূজা আর প্রকৃতি পূজা ছিল তাদের ধর্ম। যা কিনা এখনো দেখা যায়।

ধুতি, বিয়ের সময় কাঁচা হলুদের ব্যবহার এর চর্চা তাদের যা কিনা এখনও চর্চিত। অনার্যরা লুঙ্গি পড়ত, যা কিনা বঙ্গ, মাদ্রাজ এবং দক্ষিণের তামিল রাও পরিধান করে বিভিন্ন জেলার নামের শেষে “পুর” ব্যবহার অনার্য থেকে আসে।

১৯০১ সালের সেন্সর রিপোর্ট এ দেখা যায় এখনো অনেক বীরভূম, বর্ধমান, রাজশাহী, মালদা, মুর্সিদাবাদ এলাকার মানুষের নামের সাথে “পউরস” শব্দটি ব্যবহার করছে যা কিনা প্রাক আর্যরা ব্যবহার করতো। আর বাংলার মানুষরা ধর্মান্বিত হয়ে “শেখ” যুক্ত করতো নামের সাথে। ঘনশ্যাম বর্ণের, নাকের গড়ন লম্বাটে নয় আর উচ্চতায় কিছুটা খাটো

এই ধরনের মানুষ প্রচুর এই এলাকাটিতে ।

এতো বিরাট রাজ্য পাট, যার ছিল শক্তিশালী হস্তী বাহিনী, রাজধানী মহাস্থানগড় যার পরিমাপ ১.৫২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ উত্তর দক্ষিণে আর ১.৩৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ পূর্ব থেকে পশ্চিমে, সে কি হারিয়ে যেতে পারে? দৃশ্য পটের পরিবর্তন হতে পারে, রাজা মহারাজার বদল হতে পারে কিন্তু মানুষের বংশধরের কি পরিবর্তন হয়?

পুন্ড্র একটা হারিয়ে যাওয়া জাত নয়। আমরাই সেই পুন্ড্র। পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনলজির মুখপত্রের লেখা দিয়ে শেষ করছি। “Pundro (also known as Pundra, Paundra etc.) was the branch of one of the most developed civilizations of ancient west Bengal, now a part of Northern Bangladesh. The civilization of Pundro was not established over night— it had to go through the evolutionary process of thousand of years. A considerable number of Bangladeshi people today are actually the successors of the people of the pundra civilization. We cannot deny the fact that we are very much indebted to the Pundro civilization for all that we have today – for example, our education, culture, customs,social values etc. Pundro civilization represented a huge prosperous mixed population with its strong central government – it had a strong administrative and political system”.

“পুন্ড্ররা ছিল প্রাচীন বাংলার (পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চল) একটা সভ্য জাতি। এই সভ্যতা একদিনে গড়ে উঠেনি। হাজার বছর ধরে একটু একটু করে এই সভ্যতা কে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। আজকের বাংলাদেশের অনেক মানুষ এই পুন্ড্র সভ্যতার পরবর্তী উত্তরাধিকারী। আমরা অস্বীকার করতে পারব না, আজ যা অর্জন করেছি তার জন্য তাদের কাছে আমরা ঋণী – যেমন আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, নিয়ম নীতি, আর সামাজিক মূল্যবোধ ইত্যাদি। পুন্ড্র সভ্যতা একটা উন্নত জাতের সমন্বয়ে গঠিত সভ্যতা। এর ছিল শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থা। আর ছিল একটা মধ্যবর্তী সরকার ব্যবস্থা।”

 

তথ্য সূত্রঃ গ্রন্থ সূত্রঃ

The Pundra And Their Real Home Lands in Ancient Times, কার্তিক চন্দ্র বর্মন।

বাঙলার ইতিহাস, রাখাল দাস বন্দোপাধ্যায়।

বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস: রাজশাহী বিভাগ ইতিহাস এবং ঐতিহ্য, বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি।

বাঙালির ইতিহাস, আদিপর্ব: নিহাররন্জন রায়।

Ancient Janapadas Of Bangladesh, Md. Harun Ur Rashid.

History And Culture of Bengal, Sur.A.K.

The Dynastic History Of Northern India, Roy.H.C.

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব

২৬৬জন ১২৩জন
14 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ