পিতামাতার ভরণপোষণ বিধিমালা খসড়া: পুত্রবধূও বাধ্য সেবা দিতে।”

সম্প্রতি এই শিরোনামে পত্রিকান্তরে জানা গিয়েছে যে পিতা-মাতার ভরণপোষণ সংক্রান্ত একটি খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।

পিতা-মাতা! সন্তান জন্মদানের মাধ্যমেই মানব-মানবী পৃথিবীতে এই শ্রেষ্ট কৃতিত্বটি অর্জন করেন। ঠিক এই কারণেই ‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ’ বা ‘পিতার চেয়ে চাচা বড়’ হতে পারেন না। অর্থাৎ সন্তানের সাথে পিতামাতার যে অবিচ্ছেদ্য নাড়ীর সম্পর্কটি তৈরি হয়, তা জন্ম প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই। এ সম্পর্কটি পৃথিবীর শ্রেষ্ট বন্ধন।

জন্ম সম্পর্কটা যেমন রক্তের সাথে, তেমনি নাড়ীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। নাড়ীর টান, অনুভূতির টান, আত্মার টান! নাড়ীর টানকে কখনোই অস্বীকার করা যায় না। অন্যসব সম্পর্ককে আইনি কাঠামোতে বেঁধে দিলেও নাড়ীর সম্পর্ককে বেঁধে দেয়া যায় না। দিলেও তা তেমন কার্যকর হয় না। সেটা পজেটিভভাবে হোক বা নেগেটিভভাবে।

আইনি কাঠামো দেয়া হয় কাগজের সম্পর্ককে ঘিরে। দেয়া হয় এজন্য যে, গড়ে উঠা আত্মার বন্ধন কেটে গেলে যেনো পরিবারপ্রথাটা টিকে থাকে কাগজের জোরে। সামাজিক স্বার্থেই তা করা হয়, নতুবা সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তো। সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়তো।

কিন্তু নাড়ীর সম্পর্কে অনুভূতির টান সৃষ্টি হতে যে ন্যয়বোধ দরকার, বেড়ে উঠাকালীন সময়েই তা ক্রমান্বয়ে মানবশিশুর সুপ্তমনে সৃষ্টি হতে থাকে পরিবার থেকে, শিক্ষাঙ্গন থেকে, পরিবেশ থেকে। সে হিসেবে মা-বাবা, পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্র প্রত্যকেরই সেখানে ভূমিকা থাকে। সেসব জায়গায় দৃষ্টিপাত না করে আইন করে কী নাড়ীর সম্পর্ককে বাধ্যবাধকতায় ফেলা যায়? তাও আবার গিট্টু লাগিয়ে?

প্রথমেই কতোগুলো চিরসত্য বাক্য উচ্চারণ করেছি ‘নাড়ীর সম্পর্ক’, ‘জন্ম দায়’, ‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ’। আইনি খসড়ায় গিট্টু হিসেবে একটি লাইন জুড়ে দেয়া হয়েছে, “পুত্রবধূও বাধ্য সেবা দিতে।” কেনো? পুত্রবধূ বাধ্য কেনো? সন্তান পয়দা করেছেন মা-বাবা। রোজগার করে তাদের নিজ উদরে জন্ম নেয়া সন্তান আর আইনি কাঠামোয় ফেলা হচ্ছে পুত্রবধূকে? পুত্রবধূর সাথে তাদের সম্পর্কটি তৈরি হয় পুত্রের সূত্র ধরে। পুত্র আইনি কাঠামোতে বৈবাহিক সম্পর্কের ভেতর দিয়ে যে নারীটিকে অধিকার দিয়ে এ বাড়িতে নিয়ে আসেন, সে সূত্র ধরেই শ্বশুর শ্বাশুড়ীর সাথে পুত্রবধূর সম্পর্কটি স্থাপিত হয়। অর্থাৎ ছেলের কাগজের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। এখানে অনুভূতি নেই, থাকার কথা না। আছে কেবল দায়বদ্ধতা। অনুভূতি যদি তৈরি হয়, সে ধীরেধীরে একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের যেমন হয়, তেমনই। তবে এই অনুভূতি কিন্তু মানবীয় অনুভূতি, নাড়ীর টান নয়। নাড়ীর টান প্রাকৃতিক। অন্যদিকে দায়বদ্ধতা? সে কাগজীয়, স্বামীর সূত্র ধরে। জন্মদায় নয়। তবে কেনো এখানে আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করার চিন্তা করা হচ্ছে?

আইন করে কী এমনটা হয়েছে এদেশে সত্যিকারভাবে? হয়েছে কিছু? যেই লাউ সেই কদুই তো থাকে। এদেশে বেশিরভাগ আইনই তো, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নমুনার। বরং এতে বিরুপ পরিস্থিতিতে পড়বে ওই বৃদ্ধ মা-বাবাই। আর তা না হলে কে পড়তে পারে? বেকার পুত্রবধূ। কেনো পড়বে? সে কি রুজিরোজগার করে? করে না। তাইলে সে পড়বে কেনো?
স্বামী যদি তার নিজ রোজগারে পিতামাতার দেখাশুনা করেন, সেখানে বেকার বউও তো স্বামীর রোজগারেই দিনাতিপাত করছেন। যৌক্তিক ভিত্তিতে উভয়েই নির্ভরশীল। সেখানে এমনিতেই তো একটা ভারসাম্য বজায় থাকার কথা। তবে যদি স্বামী প্রবরটি সেরকম দক্ষ ম্যানেজার হন। আর যদি ম্যানেজারিয়াল পাওয়ারের দুর্বলতায় তিনি নিজেই কোনদিকে বেশি হেলে পড়েন, তো এর দায় আরেকজনের কাঁধে বর্তাবে কেনো? আর বর্তালে কী হবে? অথর্ব ম্যামেজমেন্ট এর কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। মুখোমুখি কারা হবে? স্বাভাবিকভাবেই বউ-শ্বাশুড়ী দ্বন্দ্ব (ননদ সম্পর্কটিও)।
গিট্টুর জটিল প্যাঁচে এবার বউ-শ্বাশুড়ী দ্বন্ধটি কোর্ট-কাচারিতেও যাবে! লোকে কী বলবে?
বলবে, এক নারী আরেক নারীকে সহ্য করতে পারে না।
বলবে, এই পৃথিবীতে সমস্ত ঝগড়াফ্যাসাদের কারণ নারী (ওই, কিছু হুজুররা বলেন না? অনেকটা তেমনই)।
গো-বেচারা স্বামী তখন ভালো মানুষ!
মোদ্দাকথা, এই দ্বন্দ্বে পরিবারপ্রথায় বিশৃঙ্খলা আরও ঝেঁকে বসবে। দায়বদ্ধতার বাধ্যবাধকতা জারি করতে গিয়ে ভাঙনের মাত্রা না আবার সংখ্যাতীতভাবে বেড়ে যায়, সেদিকটায়ও একটু দৃষ্টি রাখুন।

*বাকীটা পরের পর্বে।

৫০৯জন ৪৩৪জন
5 Shares

৫টি মন্তব্য

  • মনির হোসেন মমি

    যে ধরনের আইন তৈরী হচ্ছে তা কার্যকরের দিকে নজর না দিলে তা খাতা কলমেই পড়ে থাকবে।আর এ সব বিষয়ে আইনের চেয়ে বিবেক জাগ্রত করা জরুরী।পরের পর্বের অপেক্ষায়।

  • সেডরিক

    আমার মনে হয় আইনটি ঠিকই আছে। এদেশের মানুষকে আপনি আদর করে বুঝিয়ে বলে কিছু করাতে পারবেন না, এদেশের মানুষ শক্তের ভক্ত, নরমের যম।
    প্রতিটি মা-বাবাই পুত্রের ও পুত্রবধুর সেবা পাবার অধিকার রাখেন। আমার নিজের চোখে ৩ টি পরিবারের অবস্থা দেখা, বিয়ের পর পুত্র তার স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা থাকছেন, এবং বাবা-মায়ের কোন খোজ নিচ্ছেন না। ঠাই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। এই বাবা-মা থেকে আলাদা থাকার বিষয়ে পুত্রবধুই প্রভাব খাটিয়েছেন।

    “কেনো? পুত্রবধূ বাধ্য কেনো? সন্তান পয়দা করেছেন মা-বাবা। রোজগার করে তাদের নিজ উদরে জন্ম নেয়া সন্তান আর আইনি কাঠামোয় ফেলা হচ্ছে পুত্রবধূকে?” – আপনার কি পুত্র আছে? যদি থাকে এবং ভবিষ্যতে সে তার স্ত্রীর প্ররোচনায় আপনার থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন বুঝতে পারবেন।

  • ইঞ্জা

    আপু, আপনার লেখাটি আমি এফবিতে পড়ে কমেন্টও করেছিলাম, এরপরেও আবার বলছি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে, আজকালকার পুত্রবধুরা নিজেরাই আলাদা থাকার ব্যবস্থা করে বা করতে চাই, আমাদেরই এক অখ্যাত ব্লগারের সাথে রিসেন্টলি একি ঘটনা ঘটে, ভদ্রলোক রিটায়ার করার কারণে বর্তমানে অসহনীয় অবস্থায় আছেন, আবার আমার শশুর ফ্যামিলিতে একি ঘটনা ঘটেছে, ছেলেকে বিয়ে করারনোর এক মাসের মধ্যে নতুন বউ তাদের ছেলেকে বাধ্য করেছে আলাদা হওয়ার জন্য এবং ফ্যামিলিকে টাকা পয়সা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, এমনই হাজারো লক্ষ্য ফ্যামিলি এই দেশে আছে যাদের পুত্রবধুরা স্বামীকে বাধ্য করেছে বা করছে স্বামীর পিতা মাতাকে বৃদ্ধা আশ্রমে রেখে আসার জন্য, এইসব দেখে শুনেই আমার মত আইনটি সময় উপযোগী, ধন্যবাদ প্রিয় আপু।

  • সুরাইয়া পারভিন

    ম্যানেজারিয়াল পাওয়ারের দুর্বলতায় তিনি নিজেই কোনদিকে বেশি হেলে পড়েন, তো এর দায় আরেকজনের কাঁধে বর্তাবে কেনো? আর বর্তালে কী হবে? অথর্ব ম্যামেজমেন্ট এর কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। মুখোমুখি কারা হবে? স্বাভাবিকভাবেই বউ-শ্বাশুড়ী দ্বন্দ্ব (ননদ সম্পর্কটিও)

    বিষয়টা গভীরে গিয়ে ভেবেছে কে কবে! দারুণ লিখেছেন।

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ