পাত্রী চাই! সুশীল,ঘরোয়া,সংসারী

রোকসানা খন্দকার রুকু ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৪:৫২:০১অপরাহ্ন রম্য ২১ মন্তব্য

বয়স বাড়ছে; একটু একটু গার্জেনভাব বোধহয় চেহারায় এসেছে। ঘটকালি করার অফার আসে প্রায়ই। পরিচিত ছোট ভাই কিংবা ছেলের বাবারা মেয়ে দেখতে বলে। আমিও প্রাণপণে চেষ্টা করি কিন্তু সফল হতে পারিনা। কারন একটাই, এ কাজে প্রচুর পরিমাণে মিথ্যে কথা বলতে হয়। তিলকে তাল বানিয়ে ফেলতে পারলে তবেই কাজ হবে। আমি সব সত্যি বলে দেই, তাই হয়তবা কাজ হয়না।🤪🤪
যা হোক, এবার খুব কাছের একজনের মেয়ে দেখতে বলেছে। আমিও প্রানপণ চেষ্টায় আছি। কিন্তু দেখুন তো এমন মেয়ে পাওয়া যায় কিনা? থাকলে জানাবেন, খুব উপকার হবে!

ছেলে ঢাকা ভার্সিটি থেকে কেমিস্ট্রিতে পড়াশুনা করে এখন জব করছে জাইকায়। শ্যামলা গড়নের ছেলেটি পাঁচ ফুট, ছয় ইন্চি লম্বা। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। এতবছর বিয়ে করেননি কেন? সহজ উত্তর, “স্যাটেল হতে বয়স তো লাগেই।” বাহ্ অসাধারণ! খালি কোন মেয়েকে গতাতে পারলেই হল। জীবন এতদম ফকফকা।🥰🥰

আমি মোটামুটি কোমর বেঁধে নেমে পড়লাম ঘটকালীতে। দুএকটা ভালো ঘটকালী করতে পারলে বেশ হবে। মাঝে মাঝে দাওয়াতও খাওয়া যাবে। তাছাড়া করোনাতে কাজও তেমন নেই। চারিদিকে বিয়ের ধুম পরেছে। ধুমধারাক্কা  বিয়ে করে সব সেটেল হয়ে যাচ্ছে। ঘটকালি তো করব কিন্তু তার কেমন মেয়ে দরকার। এটা জানা জরুরী। জানা গেল, মেয়ে লাগবে ভালো পরিবারের, সুশীল, সংসারী, ঘরোয়া।

ভালো পরিবার বুঝতে বংশটংশ আরকি! কিন্তু সুশীল, সংসারী, ঘরোয়ায় এসে বিপদ! একটু জানতে চাইলাম এ তিনটে বিষয়ে। কোনটাইপ মেয়েদের মাঝে এসব বৈশিষ্ট্য থাকে। কারন মেয়েরা যেহেতু বিয়ের আগ পর্যন্ত বাবার বাড়িতে থাকে। একটু গটছাডা, বাবা-মায়ের আদরে- আবদারে বড় হয়। তাই বিবাহিত মেয়ে বা মহিলার সাথে কমপেয়ার করাও মুশকিল। পরিচিত ভাই বিভিন্ন আকারে, এঙ্গেলে আমাকে  মেয়ের বিষয়টা বোঝাচ্ছে কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কারন যে মেয়ের কথাই বলি তাতেই তিনি অসম্মতিসহ কিছু এক্সট্রা বৈশিষ্ট্য যোগ করেন। এবার আমি নামলাম জলজ্যান্ত উদাহরণ নিয়ে। আমাকে যেহেতু বেশ কিছু বছর ধরে সে চেনে;তাই নিজেকেই প্রথম উদাহরণ হিসেবে নিলাম, “আমার মত হলে চলবে কিনা?”

উত্তর,” আপনি তো, সবই ঠিক আছে, তবে একটু পাতলা আর ফর্সা লাগবে”। ও আচ্ছা।

পাশেই পরিচিত ছোট বোন আছে। সে বছর দুয়েক হল দর্শনে মাস্টার্স শেষ করে চাকরী- বাকরীর চেষ্টা করছে। ফর্সা, পাতলা, মোটামুটি সুন্দর। সে চলবে কিনা?

এবার বলল,” চাকরী হলে ভালো হতো। এখনকার সময়ে দুজনের চাকরী ছাড়া চলাটা একটু সমস্যা।”

এ রকম বেশ কতকগুলো মেয়ের ছবি, বর্ননা হয়ে গেল। সে সবটাতেই আর্জি পেশ করে। তার আসলে লম্বা, ফর্সা, শিক্ষিত, চাকুরীজীবী মেয়ে লাগবে। সাথে এক্সট্রা হবে সুশীল, সংসারী, ঘরোয়া।

ফাইনালী এরকম চাকরীজীবি মেয়ে পাওয়া গেল। আমার প্রতিবেশী বাংলা( সাঁইত্রিশ বিসিএস)। মেয়ে শ্যামলা, পাতলা, লম্বা, মোটামুটি দেখতেও। রান্না- বান্না ভালো জানে, কবিতা ভালোবাসে, পর্দা, নামাজ- কালাম  সবই করে। এবার মেয়ে তার ভীষন পছন্দ হল। আমাকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে,”আপু খুব সুন্দর। তারাতারি কথা বলেন।”

এবার বুঝলাম তার কি চাই। আচ্ছা, এই অবস্থা। তুমি তো মিয়া বিসিএস নও। টাকলু, ভুঁড়ি, বুড়া কোথাকার। তারে বললাম আরে ভাই খারান, নি:শ্বাস নেন, তার সম্পর্কে বাকিগুলো তো বলি।

“আমার সাথে তার ভীষন ভাব; বন্ধু, বড়বোন সব আমি। একসাথে খাওয়া, বেড়ানো, সকল গল্পও হয়। আমাদের খুটখাট ঝগড়া প্রায়ই লাগে। ঝগড়ার সময় সে এত বেশী রেগে যায় যে, সামনে যা পায় তাই ছুঁড়ে মারে। বই- খাতা, মোবাইল যা সামনে পায় সব। একদিন তো বটিও ছুঁড়ে মেরেছিল। অল্পের জন্য আমাকে লাগেনি। কেন লাগলো না এ জন্য সে রাগে কান্না- কাটি শুরু করে দিল। আমি যে তার বয়সে অনেক বড় এটা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। পরে অবশ্য আমাকে অনেক সরি-টরি বলেছে।”😜😜

বেচারা বড়ই হতাশ বোধ করল। আচ্ছা শিক্ষা দেবার জন্য হাসলাম,”বেটা বামুনের চাঁদে হাত।” আমারও ঘটকালি আবারও ফেল। এ জীবনে আর নতুন স্ট্যাটাস এড হবার সম্ভাবনা বোধহয় নেই।

ঘটকালি তো গেল কিন্তু মাথায় তখনো ঘুরতে থাকলো ভালো পরিবার, সুশীল, সংসারী, ঘরোয়া। এসবের মানেটা আসলে কি? কিংবা কোনধরনের মেয়েরা এমন হয়।

“এমন একটা মেয়ে হবে যে মোটামুটি শিক্ষিত। পরিবারের যে কোন বিপদে- আপদে কাজে লাগবে। বাচ্চা- কাচ্চা মানুষ করবে, রান্না- বান্না করবে॥ অহংকার, রাগ, জেদ এসব থাকা যাবে না। চাকরী করলে ভালো কিন্তু সেটাও করবে চুপচাপ। স্বামীর মুখের উপর কোন কথা বলা কিংবা প্রতিবাদ করবেনা। তার কোন বিশেষ মতামত থাকবে না। ওঠ বললে উঠবে কিংবা বসতে বললে বসবে। এমন মেয়েই আসলে ভালো পরিবারের, ঘরোয়া, সুশীল, সংসারী। কি পাওয়া যাবে?” একসাথে এতগুলো!

এরপরে আবার ঘরসাজানোর নামে ফার্নিচার, ফ্ল্যাটের নামে নগদ অর্থ, মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তায় কিছু ব্যাংক ব্যালেন্স, পাড়াপড়শি মুখ দেখাদেখির জন্য গাড়ি ভর্তি পিঠাপুলি, মন্ডা মিঠাই। মেয়েজন্ম যেন অভিশাপ, পাপ!

মেয়েরা কোননা কোন ভালো পরিবারেই জন্ম নেয়। পরিবেশ, পরিস্থিতির উপর তার অনেক কিছুই ডিপেন্ড করে। কারও রাগ বেশি, কেউ জেদী, অহংকারী এমন হবেই! বাবা-মা গরীব হলেও আদর যত্নেই যেহেতু বড় করে ।তাই সংসারও ঘরোয়া ব্যাপারটা তার মাথায় তখনো ঢুকে না। সংসার শুরু করার পর আস্তে আস্তে শিখে নেয় বা নিতে হয়। অল্প কিছু মেয়ে ব্যতিক্রম হয়ে তৈরি হয়। তারা সবকিছুই বোঝে।🥰🥰

বিয়েটা যদি হয় মনের সম্পর্ক, আত্মার সম্পর্ক, ভালোবাসার সম্পর্ক, প্রেমের সম্পর্ক, সর্বোপরি বন্ধুত্বের সম্পর্ক তাহলে সেখানে এতগুলো শর্ত কেন? আসছে নতুন বছর, আমরা সকল জরা- দুঃখ কাটিয়ে তৈরি করব নিজেকে আগামীর জন্য নতুন করে। সাথে আশা করছি, কোন একদিন আমরা সব কাটিয়ে মনে মন মিলিয়ে, আত্মায়, ভালোবাসায়, প্রেমে গড়ে তুলব এক একটি স্বার্থহীন সম্পর্ক। প্রজন্ম হবে ভালবাসাময়! সবাইকে নববর্ষের ফুলেল শুভেচ্ছা ।🌹🌹

২৪৭জন ৩০জন
0 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য