পাখির ছানা

আবু জাকারিয়া ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫, বুধবার, ১২:১১:৫৫অপরাহ্ন গল্প, সাহিত্য ১৪ মন্তব্য

সারাটা দিন খেলে বেড়াবে ছেলেটা, পড়াশুনার প্রতি একটুও মনযোগ নেই। স্কুল ছুটি হলেই বাড়িতে এসে পুকুরে ঝাপ দিয়ে ছেলেদের সাথে সাতার কাটতে শুরু করবে। খাওয়া দাওয়ার কথা ভূলে গিয়ে ডুবাতে থাকবে পানিতে। উঠবে চোখ লাল করে।
বাবা মা আরো বিরক্ত হল যখন দেখল কোথা থেকে একটা শালিক পাখির ছানাকে ধরে এনেছে খোকা। সারা দিন সেই পাখির ছানাটা নিয়ে মেতে থাকতে শুরু করেছে। ছেলেদের দল ছোট্ট বারান্দায় আড্ডা পেতে বসেছে। আস্তো একটা বাশ কেটে এনেছে পাখির খাচা বানাবে বলে। খোকার মা রেগে গিয়ে বলে, ওরে খোকা তোর পাখি কি উড়বার পারে যে আস্ত একটা বাশ কাইটা হালাইছ খাঁচা বানাইবার লাইগা? সেদিকে খেয়াল নাই খোকার। দুপুরের ভীতর বাশ দিয়ে বড় একটা খাচা বানিয়ে ফেলল। অদক্ষ্য হাতে যেমন কাজ, খাচাটা দেখতে একদম বাজে আর নড়বড়ে, একটা পাতিহাঁস রাখলে ভেংগে বেরিয়ে আসবে, একটা বিড়াল ছানা রাখলেও খাচার বড় ফাক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে, তেমন হয়েছে। সুতারাং খাচাটা আরো উন্নত করে তৈরী করা প্রয়োজন। ছেলেদের দল কাজে লেগে গেল। জোড়া তালি দিয়ে কিছুটা উন্নত করে পাখির বাচ্চাটাকে ভিতরে আটকে রাখল। নারেকেলের আচা দিয়ে তৈরী করল খাবার রাখার বাটি। সেই বাটিটায় একবার খাবার এসে জমা হয় পরেরবার পানি। পাখির বাচ্চাটা তা ছুয়েও দেখেনা। অবশেষে পাখিরা যা খায়, ঘাস ফড়িং, পোকামাকড়, খুজতে শুরু করে দিল খোকা। কয়েকটা নাম না জানা পোকা ধরে এনে ঠেসে ঠুসে খাওয়াল পাখিটাকে। খোকার বাবা বলে, কি হল খোকা, স্কুলে যাইবি না, দেরি হইয়া যাইবেতো। খোকা চেঁচিয়ে বলে, এখনই যামু বাবা। দেরি করমু না। খোকা পাখির বাচ্চাটাকে পানি খাওয়ায়। খোকার মা বলে, কি হলোরে তোর। খোকা বলে, যাচ্ছি বই কয়ডা দাও। খোকা স্কুলে চলে যায়। অপেক্ষা করতে থাকে কখন স্কুল ছুটি হবে। মাষ্টার বাবু খেয়াল করল খোকা বাইরে তাকিয়ে আছে। বাইরে তাকাল মাষ্টার বাবু, কোন স্কুল পালাতক বাদর দেখা যায় কিনা, দেখা গেলনা। খোকার কাছে এসে সপাং শব্দে খোকার পিঠের উপর বেত্রাঘাত করল। চমকে উঠল খোকা। মাষ্টার বাবু বলল, কিরে বাদর পড়াশুনায় মনযোগ নাই যে, বাইরে তাকিয়ে কি দেখতাছো? খোকা কোন কথা বলেনা। স্কুল ছুটি হলে ঘাসফড়িঙ ধরতে স্কুল মাঠে চলে যায় খোকা। কিন্তু ঘাসফড়িঙ ধরতে আলাদা দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। এমনভাবে ঘাসফড়িঙ এর কাছে এগিয়ে যেতে হবে যাতে মাটিতেও টের না পায়। সারা মাঠে তন্যতন্য করে একটা ঘাস ফড়িং দেখতে পেল খোকা। এখন ধরতে পারলেই হয়। খোকা ঘাসফড়িঙটার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগল। কাছাকাছি আসতেই ঘাসফড়িঙটা উড়ে গেল। হঠাৎ মাষ্টার বাবু দেখে ফেলেছে খোকাকে। “এই বাদর স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে, এখনও ওখানে কি করছিস?” মাষ্টার বাবু বলে। খোকা মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে, কিছুই না স্যার। মাষ্টার বাবু বলে, তারাতারি বাড়ি যা। ঠিক মত পড়া করে আসিশ কাল। তানা হলে কিন্তু পিঠের ছাল থাকবে না। খোকা বলে, জ্বী আচ্ছা। মাষ্টার বাবু বলে, জ্বি আচ্ছা মানে? খোকা বলে, স্যার এখনই বাড়ি যাচ্ছি। খোকা বাড়ির দিকে হাটতে শুরু করল। রাস্তার পাশে একটা মরা গাছ দেখতে পেয়ে খোকার বুঝতে অসুবিধা হল না যে এই কাঠের মধ্যে পোকা আছে। কাঠটা একদম পচে গেছে। যত পচা তত বেশি পোকা থাকবে কাঠের মধ্যে। কাঠটা মাটিতে আছার মেরে ভেংগে ফেলল খোকা। সাথে সাথে কয়েকটা কেঠ পোকা বেরিয়ে এলো কাঠের ভীতর দিয়ে। পোকাগুলো একটা কাগজে পেঁচিয়ে নিল খোকা। “এই খোকা ওখানে কি করছিসরে?” খোকা পিছনে তাকিয়ে দেখল পাড়ার রাজু ভাই দাড়িয়ে আছে। খোকা বলল, কিছু করছিনা। রাজু বলল, তোর হাতে কিরে? খোকা বলল, কিছুনা, একটা কাগজ। রাজু বলল, দেখি কাগজটা। খোকা প্রথমে কাগজটা দেখাতে চাচ্ছিলনা। রাজু জোর করে কেড়ে নিল। খুলে দেখল কয়েটা পোকা পেচান কাগজ দিয়ে। রাজু পোকাগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, কি আজে বাজে জিনিস নিয়ে ঘুরিস, ঘেন্না করেনা? রাজু চলে গেলে পোকাগুলো কুড়িয়ে কাগজে পেচিয়ে নিয়ে বাড়ি আসল খোকা। খাওয়াতে লাগল পাখির বাচ্চাটাকে। খোকার মা চেঁচিয়ে বলে, কি হল রে খোকা নাওয়া খাওয়ার কথা ভূলে গেলি নাকি? খোকা বলে, আইতাইছি মা। খোকার মা বলে, বলিকি এহন রাইখা দে। পরে খাওয়াস। খোকা ভাত খেতে বসে। খোকার মা বলে, কি হইলরে খোকা গোছল না করিশ পুকুর থাইকা হাততো ধুইয়া আইবি। আজে বাজে জিনিস ধরছ হাত দিয়া। খোকা পুকুর থেকে সাবাব দিয়ে হাত ধুয়ে এসে ভাত খেতে বসে। খোকার মা বলে, বলিকি খোকা বাচ্চাটা ওর বাসায় ফেরত দিয়া আয়। অভিষাপ দিব তা না অইলে। খোকা বলে, পাখিটা আমি পালুম, কথা শিখামু। খোকার মা বলে, আরে বোকা শালিক পাখিতে কতা কইবার পারেনা।
খোকা বলে, পারে, আমি দেখছি। নান্টু ভাইয়ের শালিকটাও কতা কইত। খাওয়া শেষ করে পাখির বাচ্চাকে কথা শেখানর কাজে লেগে যায় খোকা। ওর সাথে যোগ দেয় আরো চারপাশটা ছেলে। খোকা বলে, বল খোকা.. খোকা…খোকা….খোকা। এইভাবে শিখাইলে শিখা যাইব। অন্য ছেলেরাও ভাষা শেখানর কাজে লেগে যায়। যে যার নাম উচ্চ শব্দে বলতে থাকে। খোকা ধমক দিয়ে বলে, তোদের নাম কছ ক্যান, আমার নাম ক। বারান্দায় “খোকা খোকা” উচ্চ শব্দে বাজতে থাকে।
খোকার বাবা আসে বিরক্ত হয়ে বলে, কি ব্যাপার তোরা বারান্দায় বসে চেচাচ্ছিস ক্যান? সবাই থেমে যায়। খোকা পাখিটা বাইরে নিয়ে আসে। একদল পিচ্চি এসে জড় হয় পাখির ছানাটা দেখার জন্য। হা করে দেখতে থাকে পাখির ছানাটা। বড়রা কেউ বিরক্তি নাক ছেটায় আবার কেউ হাসাহাসি করে। খোকার তাতে কিছু যায় আসেনা।
রাতে ঘুমানোর সময় কয়েক পাল্লা ওঠে পাখির ছানাটা দেখার জন্য। পানি এনে খাওয়ায় ছানাটাকে। খোকার মা চেঁচিয়ে বলে, খোকা এখন ঘুম পর। রাত্রেও সুস্থে থাকবার পারিশ না।

২.
খোকা পাখিটাকে পোকা মাকড় ধরে এনে খাওয়াচ্ছে, পান্তা ভাত আর পানি খাওয়াচ্ছে। পাখিটা খেতে চায়না, বারবার ফেলে দেয়। খোকা বলে, বল খোকা…খোকা…খোকা…খোকা। বল ভাত খাব। খোকার মা বলে, স্কুলে যাওয়ার সময় হইছে। এহন স্কুলে যা, আইসা খাওয়াইশ। খোকা স্কুলে চলে যায়। স্কুল ছুটি হলে বিলে চলে যায় ঘাস ফড়িং ধরতে। সেখানে অনেক ঘাসফড়িঙ দেখা যায়। খোকা পাঁচ ছটা ঘাস ফড়িং মেরে কাগজে পেচিয়ে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিল। পথে আবার রাজুর সাথে দেখা হল। রাজু বলল, কিরে খোকা তোর হাতে কি দেখি। আবার পোকা নিয়েছিস নাকি? খোকা দেখাতে চায়না, বলে, রাজু ভাই ফেলে দিয়েন না। রাজু খোকার হাত দিয়ে কেড়ে নেয় ঘাস ফড়িং পেচান কাগজটা। রাজু বলে, ঘাস ফড়িং মেরেছিস কেন? খোকা বলে, আমার পাখির বাচ্চাটাকে খাওয়াব। রাজু হেসে বলে, তোর আবার পাখির বাচ্চাও আছে নাকি? খোকা মাথা নেড়ে জবাব দেয়। রাজু বলে, শোন পাখিতে ঘাস ফড়িং খায়না, খায় মাছ ভাত, মাছ ভাত খাওয়াবি বুজেছিস? বলেই রাজু ঘাসফড়িঙ গুলো ছুড়ে মেরে একটা নালায় ফেলে দিল। খোকা মনে মনে রাজুকে একরাশ অভিষাপ দিয়ে আবার বিলে ঘাসফড়িঙ মারতে গেল। তিন চারটা মারার পর ঘাস ফড়িংগুলো নিয়ে বাড়ি আসল ।
খোকা চেচিয়ে চেচিয়ে বলল, মা আমার পাখি কই?
খোকার মা বলল, বিড়ালে নিয়া গেছেরে খোকা।

(ছোটদের বলছি, তোমরা জংগলের পাখির ছানাকে ধরে আনবে না। ওদের জংগলেই বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। তোমরা প্রয়োজনে ছবি আকায় মনযোগ দিতে পার। কারন তোমরা হয়ত জান ছবি আকতে দারুন মজা। আর যদি রং পেন্সিল না থাকে তাহলে তোমাদের মা বাবা ভাই বোনদের কাছে বায়না করতে পার। কি কি আকবে তার একটা ধারনা দিলাম নিচে-)

আঁকি লিখি যা খুশি তাই
পেন্সিল একটাও নাই
কালো রং ভাল রং
কোথা গেলে পাই।

লাল রংয়ে ফোঁটে ফুল গোলাপ
শাদা রংয়ে কাশফুল বনে
হলুদে ফোঁটে ফুল গাদা।
চারটা পেন্সিল কিনে দাও দাদা।

এঁকে লিখে খাতা ফেলব ভরে
যা খুশি তাই
পেন্সিল একটাও নাই।

আকাশের নীলটাও আঁকব
শাদা মেঘ ঘুরে বেড়াবে
সূর্যি মামাকে দেখব
মেঘের আড়ালে লুকাবে
যা খুশি তাই
পেন্সিল একটাও নাই।

প্রজাপতি আঁকব উড়বে
বনে বনে ফুল ফুটবে
যা খুশি তাই
পেন্সিল একটাও নাই।

মেঝ কাকার ঘরটাও আঁকব
দিপু ভাইয়ের সাইকেলও আঁকব
স্কুলের পতাকাটা আঁকব
নদী তীরে নৌকাও আঁকব
বড় বুবুর কলসীও আঁকব
ছোট ভাইয়ার ঘুরিটাও আঁকব
যা খুশি তাই
পেন্সিল একটাও নাই।

আর কি আঁকব বলত বন্ধুরা?
আরো আঁকব একটা তালগাছ
একরাশ বাবুই পাখির বাসা
কিন্তু একটাই সমস্যা
কি যান?
পেন্সিল একটাও নাই।
আঁকব আঁকব আঁকব
যা খুশি তাই
পেন্সিল একটাও নাই।

হাতে নিয়ে পেন্সিল
ওই যে এসেছে দাদা ভাই
আঁকব যা খুশি তাই
পেন্সিল একরাশ পেয়েগেছি ভাই।।

উৎসর্গঃ শিশুদের

৬৬১জন ৬৬১জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ