বিশ্বে দেশমার্তৃকার তরে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে সবগুলো যুদ্ধ বা সংগ্রামে ছিল দুটি পক্ষ।এক শাষক এবং শোষিত।আমাদের বেলায়ও তাই হয়েছিল নাপাকিস্থান ছিলো শাসক আর আমরা পূর্ব পাকিস্থান ছিলাম শোষিত জনতা।আপনি বা নতুন প্রজন্ম যারা জানেন না পূর্ব বাংলায় নাপাকিদের শোষনের মাত্রা কেমন ছিলো কেনই বা একটি ভূ-খন্ডের  জনগণ জীবন মরন বাজী রেখে একটি স্বাধীন সার্বোভৌমত্ব রাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল।আপনি যদি না জানেন তবে এ দেশে বসবাস করেন কোন মুখে?আপনাকে জানতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকেও জানাতে হবে কতটা অত্যাচারিত নিষ্ঠুর ছিলো পশ্চিমারা আর কতটা ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হওয়া এই ভূমিতে আপনি আমি বুক ফুলিয়ে আজও দাড়িয়ে আছি।
বিশাল ইতিহাস ঘেটে আমার যত সামন্য জ্ঞানে যতটুকু জানতে পেরেছি এ যেন বিশাল সাগরের জলের ফোটা তা জানিয়ে নিজেকে বাঙ্গালী হিসাবে ধন্য করার চেষ্টা করছি।শাসিতের কাতার থেকে এক লাফে শাসকের কাতারে উঠে যাওয়া তাই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য ছিলো একটি স্বর্ন যুগ।পশ্চিমা শাসক চক্র পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণকে রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই দাবিয়ে রাখা চেষ্টায় অনবরত থাকতেন।তাদের অর্থনৈতিক শোষণের পরিসংখ্যান উপনিবেশিক শক্তির থেকেও  অনেক সমৃদ্ধ ছিলো।ধর্মের ধোঁহাই দিয়ে নির্মিত রাষ্ট্রে পূর্ব বাংলার মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি হয়তো পাওয়া যাবে মনে হয় না।

এবার লক্ষ্য করুণ সে সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন দিকের পার্থক্যগুলো:

(y) ১৯৪৮-৫০ সালে পূর্ব বাংলা Rs ৬২২ মিলিয়ন বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিয়ে যাত্রা শুরু করে
(y) পশ্চিম পাকিস্তান Rs ৯১২ মিলিয়ন নিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে।
(y) ১৯৫৭-৫৮ সালে গিয়ে পূর্ব বাংলার বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য’র ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত ছিল Rs ৩,৬৩৬ মিলিয়ন
(y) পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল Rs ৩০৪৭ মিলিয়ন।
স্বভাবতই দেখা যাচ্ছে বাণিজ্য ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার(বাংলাদেশ) আয় ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেক বেশী। একই বাহিকতা ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় পঞ্চ-বার্ষিক পরিকল্পনা পর্যন্ত অব্যাহত।
(y) প্রথম দিকে পূর্ব বাংলার GDP growth rate ছিল ২.২%
(y) পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ৩.১%।
(y) পূর্ব বাংলায়  ১৯৫৪-৫৫ থেকে ১৯৫৯-৬০ এ জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি হার ছিল ১.৬%
(y) পশ্চিম পাকিস্তানে ৩.২%।
উৎপাদন ব্যবস্থার বৈষম্যের জন্য পূর্ব বাংলার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার এক সময় কমতে থাকে।এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে মাথা পিছু আয় এর সূচক প্রথম সময়ের ০.১% থেকে কমে ০.৭% এ গিয়ে ঠেকেছিল।তার বিপরীতে +০.৮% থেকে বেড়ে পৌঁছে +১.৮%।

শোষক নাপাকিদের পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্থানের অর্থ ব্যায় করার পার্থক্য দেখুন:

 

পাকিস্থানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% মানুষ পূর্ব বাংলায় বসবাস করলেও পূর্ব বাংলার মানুষের ব্যয়ের হিস্যায় পেত মাত্র ২৫-৩০%। অথচ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রতিনিধিত্ব ছিল পূর্ব বাংলার ৬০% প্রায়।কারন পূর্ব বাংলার সোনালি আঁশ পাটই ছিল পাকিস্তানের প্রধান রপ্তানি পণ্য।এখানে মাথা পিছু আয়ের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য দেখা যায়।

১৯৫৯-৬০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথা পিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় ৩২% বেশি ছিল আর দশ বছরের মাথায় এ ব্যবধান গিয়ে ঠেকে ১৯৬৯-৭০ সালে ৬১%।পূর্ব বাংলায় অবস্থিত ৪৩% শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পপতিগণের আর পশ্চিম পাকিস্তানের শত ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা যেখানে পূর্ব বাংলার কেউ নেই।
আমদানী-রপ্তানী:
পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৫৯% ভাগ এর জোগান দাতা ছিলো পূর্ব পাকিস্তান কিন্তু ভোগের বেলায় বা আমদানির বেলায় করত মাত্র  মাত্র ৩০% পূর্ববাংলা আর ৭০ ভাগই করতো পশ্চিম পাকিস্তানের ৪৪% লোক।
আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান আমদানি করতো ৫২৯২ মিলিয়ন রুপী আর বিনিময়ে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যেতো ৩১৭৪ মিলিয়ন রুপী।তাহলে দেখা যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০০০ মিলিয়ন রুপীর বেশি।আর ১৯৪৭ সাল থেকেই- পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মোট ৩০০০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের রিসোর্স পাচার হত।

চাকুরী নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈসম্য:
সরকারী সকল দপ্তরের প্রধান কার্যালয় ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানে,বিশেষ বিশেষ অনেক পদে নিয়োগ হয়েছে আবার কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই।তা ছাড়াও পূর্ব বাংলার প্রায় ২০০০ মাইল দূরে গিয়ে এক জন পরীক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষা দেয়া ছিল অনেক কঠিন কাজ।দুই অঞ্চলের অসমতা বা সাম্যহীনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।শক্তি শালী হতে থাকে উপনিবেশিক ভিত্তি।কেবল মুক্তিযুদ্ধের সময় লেঃ কর্নেল (অবঃ) ওসমানী ছিলেন এক মাত্র সর্বোচ্চ সামরিক অফিসার।এর উপরে সম্ভবত আর কোন বাঙ্গালী বা পূর্ব বাংলার কোন লোক যেতে পারেনি।এক সময় ১৯৫৬ সাল ঠেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনে বাংলাদেশ থেকে কোটা ভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হতো যার মধ্যে মাত্র ৩ জন যুগ্ম সচিব ১০ জন উপ সচিব এবং ৩৮ জন সহকারী সচিব পদে নিয়োগ পেত।
তার বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তান সচিব- অতিরিক্ত সচিবের সব পদ এবং ৩৮ জন যুগ্ম সচিব ১২৩ জন উপ সচিব আর ৫১০ জন সহ কারী সচিব এর পদ পেতো।

বলা যায় মাত্র তিন জন পূর্ব পাকিস্তানি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তাও আবার ৪-৫ বছরের জন্য। তারা হলেন খাজা নাজিম উদ্দিন, মোহাম্মদ আলি (বগুড়া) এবং হুসেন শহীদ সোহরাওয়ারদি।প্রথম দু’জনই ছিলেন নবাব বংশীয় অভিজাততন্ত্রি উর্দুভাষী এবং পশ্চিম পাকিস্তানের তল্পিবাহ তাই তারা কখনোই পূর্ব বাংলার দুঃখ দুর্দশার দেখার সুযোগ পান নি বর পরিতাপের বিষয় যে খাজা নাজিম উদ্দিন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়েই ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির ভাষা মিছিলে গুলি বর্ষণ করা হয়। আর একজন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারদি যুক্তফ্রন্ট আওয়ামীলীগ এর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অল্প সময়ের জন্য-১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ থেকে ১৭ অক্টোবর ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত।এক সময় সেও পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের কারণে তিনিও পূর্ব বাংলার উন্নয়ণে ব্যর্থ হন।
মানবতাহীন যত অবহেলা:
পূর্ব বাংলায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সময়ে প্রাকেতিক দূর্যোগেও ছিলো নাপাকিদের চরম উদাসীনতা অবহেলা।তার একটি বড় উদাহরন হল ১৯৭০ সালে ১২ নভেম্বর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়।স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ২৫০ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা সাইক্লোনের ছবি দেখেও তারা প্রথমে ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত দিয়ে পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়।ফলে ১৪ই নভেম্বর পর্যন্ত এ ঘূর্ণি ঝড়ে মৃতের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ লক্ষ লোক।এই তথ্য ছিলো সরকারী ভাবে বাস্তবতা বলে শেষ পর্যন্ত সেই ঘুর্ণিঝড়ে প্রায় দশ লক্ষ লোক নিহত হন।
পশ্চিমাদের উদ্ধার কাজের অনিহা গাফলতির কারনে এতো লোকে মৃত্যু হয়।প্রাশ্চাত্যের সাহায্য চলে এলেও পশ্চিত পাকিস্থানের কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।ফ্রান্সের হেলিকপটার পাওয়া গেলেও কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান আর্মির কোনো হেলকপটার দেখা যায়নি।তাদের গাফিলতির একটি নমুনা ২৮ নভেম্বর ১৯৭০,দি ইকিনমিসট পত্রিকার বরাতে পাওয়া যায়,”ব্রিটিশ উদ্ধারকারী বিমানগুলো ঢাকায় আটকে পড়ার কারণ> রেডক্রস নাকি সেনা বাহিনী রিলিফের কাজ পরিচালনা করবে এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না থাকাটা ছিলো উদ্ধারকাজে প্রধান বাধা”।
মাত্র দুই দিনে দুই লক্ষ মানুষের মৃত্যুও তাদের মনে মানবতার রেখাপাত করেনি।এমন নরঘাতকরা ১৯৭১ সালে কতটুকু অত্যাচার করেছিলো পূর্ব বাংলার জন সাধারনদের তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
মাওলানা ভাসানীর কন্ঠেও ঝড় উঠেছিল-চেয়েছিল সরকারের পদত্যাগ।তিনি বলেছিলেন-বাঙালির দুঃখের দিনে সরকার সাহায্য নিয়ে তো এগিয়ে আসে নি বরং কথায় কথায় জাতীয় সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের কথা বলে যাচ্ছে,এসব সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব সব বোগাস।তিনি কেন্দ্রীয় বাঙালি মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে করে বলেন,বাঙালি মন্ত্রীরা এমন হৃদয় হীন হতে পারে তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি।
ফসলাদির মূল্যস্তর ও বৈদেশীক ঋণ বন্টন:
গমের মূল্য যখন পশ্চিম পাকিস্তানে ১০ টাকা মন তখন পূর্ব পাকিস্তানে এর মূল্য ৩৫টাকা মন।
পশ্চিম পাকিস্তানে যখন ১৮ টাকা মন দরে চাল বিক্রি করা হত তখন পূর্ব পাকিস্তানে তার দাম প্রায় তিন গুন বেশি প্রায় ৫০ টাকা দরে বিক্রি হত।একটি দেশের দুই অংশে মূল্য স্তরের এতোটা পার্থক্য থাকার কোনো যুক্তি সঙ্গত কারণ ছিল না।কারন একটাই পূর্ব বাংলাকে দাবিয়ে রাখা যেন মাথা চাড়া দিয়ে পশ্চিমাদের উঠতে না পারে আর এ রকম অনুভুতি প্রত্যেকটি পশ্চিম পাকিস্থানীদের মনে লালন করত।যার প্রকোপ বাড়ে ১৯৫২ সালে মার্তৃ ভাষা বাংলা বিজয়ের পর পরই।

তাই আসুন নাপাকিদের ঘৃণা করি এবং তাদের সাথে সকল প্রকার ভ্রাতৃত্ব বন্ধন ছিন্ন করে স্বাধীনতা স্বপক্ষের শক্তিকে দেশ পরিচালনায় আবারো সুযোগ দিয়ে দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাই।

এখানে অনেক তথ্য আছে যা আমি বিভিন্ন মাধ্যম হতে সংগ্রহ করেছি,থাকতে পারে তথ্যের সামন্য ভুলত্রুটি তাই আরো  তথ্য যদি আপনার জানা থাকে যোগ করবেন এবং কোন ভুল তথ্য থাকলে তা সংশোধন করার সুযোগ দিবেন।আমি এ সব তথ্যগুলো উপস্থাপন করেছি কেবল মাত্র নতুন প্রজন্মেকে জানানোর জন্য….
“যারা জানেন না কেন বা কি কারনে ১৯৭১ সালে আমাদের গ্রামের সহজ সরল দামাল ছেলে মেয়ে কিশোর যুবক বৃদ্ধরা অস্ত্র হাতে ঝাপিয়ে পড়েছিল এবং শহীদ হয়েছিল ত্রিশ লক্ষ প্রান কেবল মাত্র  একটি লাল সবুজের পতাকার তরে”।

কৃতজ্ঞতায় তথ্য ও ছবি
কিশোরগঞ্জ সংবাদ
উইকিপিয়া
অনলাইন বিভিন্ন মাধ্যম।

১৮৪জন ১৮২জন
0 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য