পরিযায়ী পাখির বন্ধু হই।

শামীম চৌধুরী ১৮ অক্টোবর ২০১৯, শুক্রবার, ১২:২৯:১৭পূর্বাহ্ন পরিবেশ ২৩ মন্তব্য

মধ্য অক্টোবর থেকে আমাদের দেশে পরিযায়ী পাখির আগমন শুরু হয় । প্রতি বছর দেশে শীত আসে আর শীতের সঙ্গে আসে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি। দূর দেশ থেকে আসে একটু আশ্রয় ও খাদ্যের আশায়।

সেসব দেশ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আমাদের দেশে চলে আসে। কোনো কোনো পাখির হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস উড়তে হয়।

কখনও কখনও এমন দূর দেশ থেকে ওরা আসে যে সেখান থেকে উড়ে আসতে আসতে পথে প্রায় তিন মাস সময় লেগে যায়। আবার কিছু দিন আমাদের দেশে থেকে আবার ফিরে যায়। ফিরে যেতেও আবার তিন মাস উড়তে হয়। তার মানে কোনো কোনো পাখির বছরে ছয় মাস শুধু উড়তে উড়তেই কেটে যায়।

পৃথিবীতে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখি আছে। গবেষকরা এদের মধ্যে ১ হাজার ৮৫৫টি প্রজাতির পাখিকে পরিযায়ী পাখি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মানে মোট পাখির মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশ পাখি পরিযায়ী।

প্রতি বছরই দু’বার ওরা আমাদের দেশে আসে। এক তথ্যমতে, বাংলাদেশে মোট ৩১৬ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি প্রতি বছর আসে যার মধ্যে ২৯০ প্রজাতির পাখি আসে শীতে। অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বর থেকে ওদের আসা শুরু হয় আর চলে যায় মার্চে।

অর্থাৎ শীতে আসে বসন্তে বিদায়। এসব পরিযায়ী পাখির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- হাঁস, রাজহাঁস, কালেম, ডাহুক, ছোট সরালি, খঞ্জনা, চটক, মাঠ চড়াই, কসাই পাখি, গাঙচিল, নীলশির, লালশির, কালো হাঁস, লেঞ্জা হাঁস, ক্ষুদে গাঙচিল, কুন্তিহাঁস, জিরিয়া, চখাচখি পাখি, বালিহাঁস, বড় সরালি, কালিবক, জলময়ূর, ডুবুরি, কোপাডুবুরি, ছোট পানকৌড়ি, বড় পানকৌড়ি, কালো কুট, কাদা খোঁচা বা চ্যাগা, জালের কাদাখোঁচা, ছোট জিরিয়া, বাটান, গঙ্গা কবুতর, রাজ সরালি, পিন্টেল, পাতি সরালি, সাদা বক, দলপিপি, পানমুরগি, কাস্তেচড়া, বেগুনি কালেম, পানকৌড়ি, ঈগল, পিয়াং হাঁস, ভূতিহাঁস, ধুল জিরিয়া ইত্যাদি।

পরিযায়ী পাখিগুলো প্রধানত আসে আমাদের উত্তরের দেশ থেকে। বিশেষ করে হিমালয়, নেপাল, সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, চীনের জিনজিয়ান, ইউরোপ ইত্যাদি অঞ্চল যখন শীতের দাপটে বরফে ঢেকে যায় তখন সেখান থেকে পাখিগুলো উড়াল দেয়।

ওরা জানে যে কখন ওদের কোন দেশে আশ্রয় নিতে হবে। এজন্য আসার আগে ওরা পাখার নিচে বেশি চর্বি জমা করে রাখে।

মাইলের পর মাইল ওরা উড়ে চলে সেই সঞ্চিত চর্বির শক্তিতে। ওদের পরিযায়ন স্বভাবটাও বেশ অদ্ভুত। সাধারণত ওরা দলবেঁধে চলে। যেখানে ওরা একবার আসে, সাধারণত সেসব জায়গাতেই পরের বছরগুলোতেও আসার চেষ্টা করে।

তবে সবসময় একই পাখি হয়তো আসে না। তবে দলকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য অবশ্যই পূর্ব অভিজ্ঞ পাখি থাকে যারা ওড়ার সময় ঝাঁকের সামনে থাকে ও পথের নির্দেশ দেয়।

ওদের দেহে অসাধারণ এক সংবেদ ও সাড়া প্রদান কৌশল আছে যা দিয়ে ওরা শত শত এমনকি হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ঠিকই আগের জায়গায় ফিরে আসতে পারে। যাত্রাপথের আকাশ, নক্ষত্র, পাহাড়, নদনদী, জলভূমি, অরণ্য ইত্যাদি ওরা চিনে রাখে এবং এসবের সাহায্যে ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছে যায়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া পাখিগুলো একটু উষ্ণতা, খাদ্য আর আশ্রয়ের আশায় আমাদের দেশের বিভিন্ন বনজঙ্গল, হাওর, বাঁওড়, খাল, নদী, চর, বিল, জলাশয়ে এসে জড়ো হয়।

ওদের রং-বেরঙের সৌন্দর্যে শীতের দিনে রঙিন হয়ে ওঠে আমাদের জলাশয়গুলো। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর, বাইক্কার বিল, বরিশালের দুর্গাসাগর, ভোলার চরগুলো, পাবনার চলনবিল, সুন্দরবনের নদনদী ও খাল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক ইত্যাদি স্থানগুলো যেন পর্যটনে আনে নতুন মাত্রা। এ দেশের পাখিপ্রেমীরা মেতে ওঠে পাখিশুমারি আর নতুন পাখি খোঁজার আনন্দে।

ভাবতে অবাক লাগে, এ সময় পরিযায়ী পাখির ওপর লোভাতুর দৃষ্টি পড়ে কিছু দুষ্টু মানুষের। পাখি শিকারির দল মেতে ওঠে পরিযায়ী পাখি শিকারে। দেশে আইন থাকলেও তারা তা উপেক্ষা করে শিকার চলে।

শিকার করা পাখিগুলো সচরাচর হাটবাজারে দেখা যায়। আমারা অনেকেই সেসব পাখি কিনে মেতে উঠি পাখিভোজে। কী নৃশংসতা, কী অমানবিক! যে পাখিগুলো আমাদের কাছে এলো একটু আশ্রয় ও উষ্ণতার আশায়, তাদের আমরা নিরাশ্রয় আর শীতলতা দিলাম। নিরীহ পাখিগুলোকে হত্যা করলাম! পাখির ছানাগুলোকে এতিম করে দিলাম!

 

জলবায়ু পরিবর্তনের বিড়ম্বনায় আতঙ্কিত ভুক্তভোগী দেশগুলো। তাপমাত্রা পরিবর্তন হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে ঋতুবৈচিত্র্য। ঠিক সময়ে ফুল ফুটছে না। পাখির প্রজননক্রিয়া বিঘ্ন হচ্ছে।

আগে যেসব দেশে যতটা শীত থাকত, এখন সেখানে কিছুটা উষ্ণ হয়ে ওঠায় অনেক পারিযায়ী পাখির পরিযায়নকালীন আবাসস্থল পরিবর্তন করতে হচ্ছে। আমাদের দেশেও জলাশয়ের পরিধি সংকুচিত হচ্ছে।

জলাশয়ে থাকা মাছ-শামুক ইত্যাদি কমে যাচ্ছে। ফলে যে নিশ্চিত খাদ্য ও আশ্রয়ের আশায় পরিযায়ী পাখিগুলো আমাদের দেশে আসত, ওরা এসে আর সেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সঙ্গে আমাদের আঘাত পরিযায়ী পাখিগুলোকে বিপদগ্রস্ত করে তুলছে।

পাখিকে বলা হয় প্রকৃতির অলঙ্কার। পাখি পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে। পাখির বিষ্ঠা থেকে ফসলি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। মোটকথা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাখির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

আসুন, আমরা সবাই পাখির বন্ধু হই। পরিযায়ী পাখির আগমনকে স্বাগত জানাই, দেখভাল করি। যেন আগামী শীতে ওরা আবার ফিরে আসতে পারে আমাদের দেশে।

২০৪জন ৩১জন
49 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য