পরিত্রান

আজিম ৩০ জুন ২০১৫, মঙ্গলবার, ১২:৩৯:২৪অপরাহ্ন গল্প ১৯ মন্তব্য

 

মেঘলা আকাশ, গুমোট আবহাওয়া। দেশের রাজনীতিরও অবস্থা গুমোট-ই এবং সহসাই কাটছেনা এই অবস্থা। অনির্দিষ্টকালের জন্য শুরু হয়েছে অবরোধ, সারাদেশ জুড়ে জ্বলছে অসংখ্য বাস-ট্রাক-গাড়ী, দুরপাল্লার চলছেনা কোন বাস । সবারই মুখে এক আতংক, কখন যেকহয়!

আগামী বৃহস্পতিবার রমিজ মিয়া বাড়ী যাবেন। প্রতি সপ্তাহেই যান। বাড়ী তাঁর চাঁদপুর শহরে। ঢাকায় একটা চাকরী করেন কর্মকর্তা পযার্য়ের। কিন্তু অবরোধ কী বৃহস্পতিবারের আগে ভাঙবে, এটাই তাঁর চিন্তা। ঢাকায় ছেলে-মেয়েদের নিয়ে থাকতে পারেননা অভাবের কারনে, যদিও তাঁর পযার্য়ের প্রায় সবাই থাকেন। কিন্তু তিনি তাদের মত নন, অবৈধ কোন কিছু গ্রহন করেননা তিনি, মনে মনে এটাকে ঘৃণা করেন।

রমিজ মিয়ার মেয়েটিই তাকে টানে বেশী। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে তিশা নামের তাঁর মেয়েটি। বাবা ডাকটা ওর থেকেই শোনা রমিজ মিয়ার প্রথম, এজন্য একটু বিশেষ টান অনূভব করেন উনি ওর উপর। পরেরটাও বেশ, ছেলে রুবায়েত, দশম শ্রেণির ছাত্র। লেখাপড়ায় টান অনূভব করেনা ও, কিন্তু রেজাল্ট করে যাচ্ছে বরাবরই ভাল।

সন্তান দু’টি আর স্ত্রী রমিজ মিয়াকে টানে বেশী। তাই ছুটি মিললেই আর দেরী করেননা বাড়ী যেতে। না ওটাও উনার ভাড়া-ই বাসা, নিজের হয়ে ওঠেনি বাসা। স্ত্রী চাকরী করেননা, নিজের বা স্ত্রীর নিজেদের কিছুই নেই অথবা উত্তরাধিকার সূত্রেও কোন সম্পদ এখনো পাননি কেউ, তবে পাবেন কিছু ভবিষ্যতে। কষ্টেই দিন কাটে ওদের, দুশ্চিন্তাই নিয়ে থাকেন ওনারা।

অথচ হাঁ করলেই রমিজ মিয়া অবৈধ অর্থ কামাতে পারেন। না, এতো কষ্টের মাঝেও রমিজ মিয়া হাঁ করেননা। বিবেকে বাধে এই জন্যই কী! পুরোপুরি হাঁ বলতে পারেননা রমিজ মিয়া। কারন এটাই একমাত্র কারন নয় তার সততা নিয়ে চলার। আরো আছে। রমিজ মিয়া এদেশের প্রতি একধরনের ঋণ অনূভব করেন। ভালও বাসেন দেশকে প্রচন্ড। এদেশে কেমন করে তিনি অবৈধ আয় করেন, যেখানে অধিকাংশ মানুষ খুবই কষ্টে দিন যাপন করেন।

মানুষের কষ্টে দিনযাপনের কারন মনে করেন রমিজ মিয়া যে, এদেশটা অনায্যতায় ভরে গেছে, নায্যতার অভাব প্রচন্ড এদেশে। অনায্যতার এই সারিতে শরিক হতে চাননা তিনি, শক্তি বাড়াতে চাননা অনায্যতার। বাড়াতে চান নায্যতার শক্তি। কীভাবে, সেই চিন্তাই করেন রমিজ মিয়া। একটা চাকরী করলেও দেশের প্রতি ঐ ঋণ শোধ করার ইচ্ছা তাঁর মধ্যে ক্রমেই প্রকট হয়ে ওঠছে। কোন কোন সময় মনে হয় তার, চাকরী ছেড়ে দেয়, দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশকে স্বচ্ছ-শুভ্র-সুন্দর করার কাজে। কিন্তু পারেনা, সংসারটা পথে বসবে বলে। তার চেয়ে আপাতত: চিন্তাটা লালন করেন, এবং ক্রমেই চিন্তা-ভাবনাগুলো দৃঢ় হতে থাকে তার চেতনায়।

ওদিকে সংসার চালান শাহিদা বিবি, রমিজ মিয়ার এককালের অতি প্রিয়। জোড় হয়েছেন তাঁরা ভালবেসে ঠিক নয়, যদিও ভালবাসতেন একে অন্যকে মনে মনে কেবল, প্রকাশ ছিলনা কারোরই। সেই ভালবাসা শুকিয়ে গেছে ওদের। দারিদ্রই ওদের ভালবাসাকে শুকিয়ে দিয়েছে। ঝগড়া-ঝাটিও হয় ওদের মধ্যে, রমিজ মিয়া দু’দিনের জন্য বাসায় এলেও হয়। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, সন্তান দুটির লেখাপড়ার খরচ সময় সময় বিরাট বোঝা মনে হয় ওদের কাছে। শাহিদা বিবি চাপ দেননা রমিজ মিয়াকে অসৎ হতে, তবে মনে করেন শুধুমাত্র দারিদ্রতা কাটাতে ন্যুনতম যা লাগে, তা নিলে অসুবিধা কোথায়? তবে এজন্যই যে শুধুমাত্র ঝগড়া হয়, তা নয়। আসলে এভাবে চলতে চলতে খিটিমিটি লাগবেই।

সন্তান দুটিও ওদের খুব লক্ষী, তিশা আর রুবায়েত। শটর্কার্টে ওকে একসময় রুবা বলে ডাকত তিশাসহ সবাই, কিন্তু ও রাগ করে, বলে মেয়েমানুষের নাম। তাই রুব বলে ডাকা নামটাই প্রচার হয়ে আসছে। আসলেই ওরা অনেক ভাল, কারো সাথে কোন গন্ডগোল করেনা । লেখাপড়াকেই সবার্ধিক গুরুত্ব দেয়, রেজাল্টও করে অনেক ভাল। মানুষের উপকার করে ওরা, মানুষের কষ্টে মন খারাপ করে, হতাশও হয়ে পড়ে সময় সময়।

তিশা মনে করে, এটা ওদের শিক্ষাকাল হলেও শিক্ষা নিলেই হবেনা শুধু, জ্ঞানার্জনও করতে হবে এ সময়টায়। অতি নিবিষ্টমনে এই জ্ঞানার্জন করে চলে ও। বাবার  উপদেশের প্রেক্ষিতে পাঠ্য বইয়ের বাইরেও অনেক বইপত্র পড়ে ও। ’যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখিবে তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।’ জ্ঞান-গরিমার সমাথর্ক অমূল্য এই রতনের সন্ধান করে যায় ও।

সংসারের দৈনন্দিন অভাব-অনটন ওদের ব্যথিত করে, তবে রাগান্বিত করেনা। দেখে ওদের আশেপাশে অনেক ওদের বন্ধু-বান্ধব আছে, যাদের আরো অভাব। আবার ওদের চেয়ে অনেক ধনীও আছে। জীবনের স্বল্প পরিক্রমায় এটাও শিখেছে ওরা যে, উপরের পরিবর্তে নীচের দিকে তাকাতে হয়, তাতে শান্তি পাওয়া যায়। কিছুটা এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনেক কষ্ট পাওয়া গেলেও চুড়ান্তভাবে রয়েছে এটাতে এক অনাবিল শান্তি। আর উপরে তাকালে ভর করবে যা, তা হচ্ছে শুধুই অশান্তি। উপরে তাকিয়ে অশান্তিটা ওরা তাই গ্রহন করেনা। শ্রমজীবি মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে ওঁদের কষ্টটা অনূভব করে ওরা। অনূধাবন করার চেষ্টা করে সমাজের চলমান এই বৈষম্যকে, এই অসামঞ্জস্যতাকে। জানে বাবাও এরকম-ই ভাবে বিষয়গুলোকে নিয়ে।

সেদিন বাবা-মায়ের মধ্যকার কিছু কথা কাটাকাটি শোনে ওরা। ওদের সামনে সাধারণত: বাবা-মা ঝগড়া করেনা, করলেও ওরা শোনেনা, মনে করে অবৈরী নয় ওগুলি। কিন্তু সেদিন বাবা-মায়ের কথাগুলি কেন জানি আকৃষ্ট করে তোলে ওদের।

তুমি রাজনীতি করবে! এদেশে রাজনীতি আছে নাকি? লোকে পাগল ভাববে তোমাকে, পাগল। সংসার চালাতে যে পারেনা, হিমশিম খায়, সে করবে রাজনীতি! রাজনীতির কী বুঝ তুমি? এদেশ কোনদিন ভাল হবেনা। নিম্ন কন্ঠেই বলে চলেছেন মা বাবাকে।

দেখ, এদেশে রাজনীতি বলতে যা বোঝায়, তা না-ই বা বুঝলাম, তবে দেশ এভাবেই চলবে না-কি? অন্য কেউ যখন এগিয়ে আসছেনা আর আমি যখন বুঝি যে, এছাড়া আর কোন পথ নাই, তখন আমার চুপ করে থাকাটা কী সাজে? পরম করুণাময়ের কাছে কীভাবে আমি জবাবদিহি করব বলতে পারো?

সব তোমাকেই করতে হবে কেন বুঝিনা। ঘুষ তোমার খাওয়া চলবেনা, দেশ শুদ্ধ করার জন্য যুবসমাজকে ডাক দিতে হবে তোমাকেই, এসব কী? আর তুমি কী করতে পারবে, কিছুই না, শুধু শুধুৃ

দেখ বিবি, বিবি বলেই ডাকেন ওনাকে রমিজ মিয়া, জানি তুমি আমার উপর বিরক্ত, অভাবকে টেনে নিয়ে এসেছি সংসারে বলে। কিন্তু আমি তো পারিনা এসব করতে তুমি তা জানো। আর এসবে হয় নিজের উপর দিয়ে অথবা স্ত্রী-সন্তানদের উপর দিয়ে যেকোন বিপদ যায়, রোগ-শোক হয়, বয়সকালে হঠাৎ একদিন দেখা যাবে, মুখ বেঁকে গেছে একদিকে, প্রেশার-স্ট্রোক-হার্ট এ্যাটাক প্রভৃতি রোগে ভর করেছে শরীর..

থামিয়ে দেন শাহিদা বিবি, বলেন অনেক শুনেছি এই লেকচার, বাদ দাও, আমিও সেজন্য তোমাকে কোনদিন কোনরকম চাপ দেইনি। সেকথা নয়, বল, রাজনীতি তুমি কেন করতে চাও? ক্ষমতায় গিয়ে লুটপাট করবার জন্য?

বিবি, আমি রাজনীতি করতে চাই, সেটা বলিনা। তবে আমার পক্ষে সার্বিক চলমান এই অব্যবস্থার মধ্যে দৈনন্দিন গতানুগতিক জীবনযাপন করা সম্ভব নয়।

এতে যাদের ক্ষতির সম্ভাবনা, তারা তোমাকে ছাড়বে কেন, সেটা ভেবেছো?

জেনে আবার কেন জিজ্ঞাসা করছো বিবি?

হাঁ, জানি তুমি স্বেচ্ছায় জীবন উৎসর্গ করতে চাও।

কোন কথা বলেননা রমিজ মিয়া। প্রিয়জনদের কাছে আর কিছু বলা যায়না। মনের গহীনে একটা স্বপ্ন গাঁথা হয়ে আছে যে ওঁর। হাঁ, সবর্শক্তি নিয়ে লড়বেন তিনি, প্রচন্ড একটা শক্তি গড়ে তুলবেন তিনি, কংক্রিটের মতো জমাটবাঁধা যেশক্তির শুধুমাত্র অহিংস প্রদর্শনেই ভেসে যাবে দেশ থেকে সকল অন্যায়-অত্যাচার আর অবিচার। দেশ হয়ে উঠবে শুভ্র-ধবল। জানেন তিনি, প্রচুর বিপদ আছে একাজে। তবুও দেশের মানচিত্রকে বুকে করে দৌড়াবেন তিনি বাকী জীবনটা। এর বিনিময়ে যা-ই হোক এতটুকুও যদি তা মানুষের মনে দাগ নয়, সামান্যতম আঁচড়ও রেখে যায়, তবুও উদাহরন তো তৈরী হয় একটা, নাথিং-এর চেয়ে সেটা তো কম নয়। এই উদাহরনই অনেককে উদ্বুদ্ধ করতে পারে ত্যাগী হতে।

”অন্যের উপকার করতে থাকো, তোমার সমস্যা মিটে যাবে।” রমিজ মিয়ার এই কথাটা আগে শুনলে শাহিদা বিবির অত্যন্ত রাগ লাগত। সময়ের পরিক্রমায় কথাটার একটা আলাদা মানে এখন তিনি খুঁজে পাননা অথবা পাচ্ছেননা, তা নয়। এর কারন সন্তান দু’টি নিয়ে তাঁর স্বস্তি। ঘুষখোর ঘনিষ্ট এবং স্বল্প-ঘনিষ্ট তিনটা পরিবারের দিকে তাকিয়ে এই স্বস্তির জায়গাটা আরো বেড়ে যায় তার। এক পরিবারে গৃহস্বামী, বয়স মাত্র ৫০ উনার, স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে গত তিনবছর ধরে শয্যাশায়ী। আরেক পরিবারের দু’টি সন্তানই বখে গেছে পাড়ার খারাপ ছেলেদের সংসর্গে পড়ে। ঘনিষ্ট পরিবারটির অবস্থা হচ্ছে এরকম যে, একটি-ই সন্তান তাদের, ভাল ছাত্রীও ছিল ও বেশ, তবে গত প্রায় তিন বছর ধরে ও ম্যাট্রিক পরীক্ষার গন্ডীই পার হতে পারছেনা মানসিক অসুস্থতার কারনে। অথচ সংসারে অগাধ পয়সা ওদের, হাজার হাজার অবৈধ টাকা আসছে বাসায় প্রতিদিন, দেশে আর বিদেশে মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসাও হচ্ছে সেই পয়সায়, অথচ কোন ফল হচ্ছেনা, অবৈধ সেই পয়সা দিয়েও সন্তানকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার গন্ডী পার করাতে পারছেননা ওরা।

মন যখন একটু ভাল থাকে, শাহিদা বিবি তাকিয়ে থাকেন তিশা আর রুবের দিকে। পরম করুনাময় খোদা তা’লার কাছে একনিষ্টভাবে কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে চিত্ত তাঁর, চোখে পানি চলে আসে, রমিজ মিয়ার উপরও ভক্তিতে ভরে উঠে মন তখন, মনে হয় রমিজ মিয়ার কথাগুলি ঠিকই। মোবাইলটা নিয়ে বসেন রমিজ মিয়াকে ফোন করতে তখন উনি।

গভীর রাতে ঘুমন্ত তিশা একটা স্বপ্ন দেখে ধড়ফড়িয়ে জেগে ওঠে। বিশাল আকাশের মেঘ ফুঁড়ে ভাসমান অবস্থায় চলতে থাকা একটা মানব-মুর্তি দেখে ও। দুই হাত ছুঁড়ে কী যেন আটকাতে চেষ্টা করছেন মানবমুর্তি। নীচে চলছে প্রচন্ড তান্ডব, বিল্ডিংগুলো কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে, দেবে যাচ্ছে নীচে, ভেঙ্গে যাচ্ছে। রাস্তা-ঘাট, নদী-নালা সব উড়ে উড়ে ধোঁয়ার কুন্ডলী হয়ে মিশে যাচ্ছে আকাশের মেঘমালার সাথে। প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এক মানবমুর্তি এগুলো ঠেকানোর। তিশার একসময় মনে হচ্ছে ক্রমশ:ই যেন মুর্তিটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে..। এ-কি! যতই স্পষ্ট হচ্ছে মুখটা, একি, এযে বাবা, হাঁ বাবারই মুখ যে এটা। বাবা.., চিৎকার দিয়ে ওঠে ও।

মেয়ের চিৎকারে ধড়ফড়িয়ে ওঠেন মা। স্রেফ স্বপ্ন মনে করে আবার ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। ঘুম আসেনা শুধু তিশার।

মনে পড়ে তিশার, বাবা বলত, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আল্লহ তা’লা ব্যাজার হন, সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও যে জাতি নিষ্চুপ বসে থাকে, আসলে শাস্তি-ই সে-জাতির প্রাপ্য। তবে কী এ-জাতির শাস্তি শুরু হয়ে গেল! স্বপ্নটা কেন এমন হলো, সেই চিন্তায় বাকী রাতটা কেটে যায় ওর।

অতি প্রত্যুষে বাবার আসার চিরন্তন সংকেতটা পেয়ে দরজা খুলে দেয় তিশা, পরম বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকে ও ওর অতি প্রিয় বাবার দিকে।

৩৩৯জন ৩৩৯জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ