পরিত্যক্ত

জিসান শা ইকরাম ২০ জানুয়ারী ২০১৬, বুধবার, ১২:২৯:০২পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩৪ মন্তব্য

বাদাম শেষ মেয়েটি নিরুদ্দেশ। পার্কে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় মগ্ন যুগল কুট কুট করে বাদামের খোসা ভেঙ্গে বাদাম খাচ্ছিল।বাদাম শেষ হবার পরে দেখা গেলো মেয়েটি আর নেই। এখানে পরিত্যক্ত শুধু বাদামের খোসা নয়, প্রেমিক ছেলেটিও।

জীবনের প্রয়োজনেই সবাই কম বেশী পরিত্যগ করি পুরাতন ব্যবহৃত জিনিস পত্র। সুঁই হতে শুরু করে সংসারের যাবতীয় ব্যবহার্য জিনিস পত্র এক সময় অচল বলে ফেলে দেই বা পরিত্যাগ করি। পরিত্যক্ত হয় শহর, মৃত নগরী নাম দেই আমরা। পরিত্যাগ করি চর জেগে ওঠায় বহমান নদীকে। যত দামীই হোক না কেন এক সময় পরিত্যক্ত হয় স্বর্ণ হীরার খনি। ফুল দিয়ে সাজানো বাসর ঘরের ফুল একদিন বাসি হয়ে যায়। ফেলে দেই আমরা তা আবর্জনার মতই। অথচ ফুলের মাঝেই দুজনের প্রথম রাতের স্বপ্নের বীজ বপন। একটি সময়ে যা আমাদের জন্য অপরিহার্য, ব্যবহারের পরে তা তার গুরুত্ব হারায়।
পরিত্যাক্ত হয় শৈশব কৈশোরের সেই সব সোনাঝরানো দিনগুলো। অবহেলায় পরে থাকে গ্রামে থাকা বাড়িঘর, ভূমি, শানবাঁধানো ঘাটলা। জৌলুস পূর্ন জমিদার বাড়ি্র দেয়ালে জন্ম নেয় গাছ, নাচ মহল, বাইজী মহল পরিত্যক্ত হয়ে বাস স্থান হয় মোরগ মুরগী বা কুকুরের।
পরিত্যক্ত হয় ইতিহাস, ব্যাক্তি ও সমাজ। নবাব হয়েও মীরজাফর পরিত্যক্ত থাকে মানুষের মাঝে, বিশ্বাস ঘাতকতার উদাহরন হয়ে। প্রতাপশালী সাকা চৌ, মোশতাক,গোলাম আজম বাঙালীর হৃদয় থেকে পরিত্যক্ত। এসব হচ্ছে বস্তুগত এবং মানুষকে পরিত্যাগ করার উদাহরন।

ভালোবাসাও তো পরিত্যাগ করি আমরা। চেনা জানা ভালোবাসা গুলো হঠাৎই পাল্টে যায়।বয় ফ্রেন্ড/গার্ল ফ্রেন্ড পালটানো আজকাল কোন ব্যাপারনা। পুরান প্রেমিক/প্রেমিকার সাথে মতের অমিলে একদা অপরিহার্য ভালোবাসা পরিত্যাগ করার উদাহরণ আমরা সবাই দিতে পারবো। ব্রেক আপ যেন হাল ফ্যাশন। ঠোঁটের একদম লাগোয়া পিছনেই অপেক্ষায় থাকে ব্রেক আপ। যেন ছটফট করে কখন বের হবে শব্দটি। চলতি ভালোবাসায়ও পরিত্যাগ করার ঘটনা বিরল নয়। ভালোবাসার মাঝে থেকেই বিশ্বাস, আস্থাকে পদদলিত করে অজানা বা জানা কোন কারনে ভিন্ন ভালোবাসার মাঠে বিচরণও এক ধরনের পরিত্যাগ। ভালোবাসার জনকে উপেক্ষা,প্রতারণা, ধূম্রজাল সৃষ্টি ইত্যাদিও মুলত পরিত্যাগ করারই নামান্তর।
পরিত্যক্ত সব কিছুকেই আমরা প্রায় সবাই ভুলে যাই। এটিই প্রগতি বা জীবনকে সামনে এগিয়ে নেয়ার নিয়ম। নতুবা জীবন তো থেমে যেতো। জীবনকে বহমান রাখতে আমাদের অনেক প্রিয় বিষয়কে পরিত্যাগ করতেই হয়।

কেন জানি আমার পরিত্যক্ত জিনিসের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ। অপটু হাতে যত ছবি তুলি আমি তার মাঝে প্রিয় একটি বিষয় হচ্ছে পরিত্যক্ত জিনিসের ছবি তোলা। প্রতিটি পরিত্যক্ত জিনিসের ছিল একটি ইতিহাস। আদর-যত্ন ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ছিল একটি সময় এসবকে ঘিরে। অথচ আজ তারা মূল্যহীন, অপ্রয়োজনীয়, পরিত্যক্ত।

মেলবোর্নে পথের পাশে পরিত্যাক্ত সাইকেল
মেলবোর্নে পথের পাশে পরিত্যাক্ত সাইকেল

এক সময় কত আদরের ছিল এই বেবি সাইকেলটি।ধুয়ে মুছে তেল চেইনে তেল দিয়ে ঝকঝকে তকতকে রাখা হতো। কত অজস্র বার এর চাকা ঘুরেছে জীবন চাকার মত।আজ সে পরিত্যক্ত।

মেলবোর্নের এক নদীর পারে পরিত্যাক্ত সিগারেটের ফিল্টার
মেলবোর্নের এক নদীর পারে পরিত্যাক্ত সিগারেটের ফিল্টার

কি ভেবেছিল এখানে বসে সিগারেট হাতে নিয়ে বসে থাকা মানুষেরা? নিরিবিলি একাকী বসে তাঁরা কোন চিন্তায় মশগুল ছিলো। এক বাঙালিও হাসিমুখে রেখে দিল তার সিগারেটের ফিল্টার। অন্যদের মত সে ফিল্টারকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলেনি। তার কোন অতিরিক্ত টেনশন ছিলো না, ভবিষ্যৎ আনন্দ আর সুখের নেশায় পরিপুষ্ট ছিল তার হৃদয়। জলের দিকে তাকিয়ে  সে মুগ্ধতার কথাই তো ভেবেছে এতক্ষণ।

প্রায় পরিত্যাক্ত দুই জন
প্রায় পরিত্যাক্ত দুই জন

দুজনে দুজনার মাঝে গভীর ভাবে মগ্ন। কতক্ষন পূর্বে এসেছেন এনারা। হয়ত সমস্ত দিনই কাটাবেন এখানে।
পাশাপাশি বসে হয়ত স্মৃতি রোমন্থন করছেন ফেলে আসা পরিত্যক্ত যৌবনের রঙিন দিনগুলোর কথা।
কিছুদিন পরে নিজেরাই হয়ে যাবেন পরিত্যক্ত।

পরিত্যাক্ত ফেরী
পরিত্যাক্ত ফেরী

কতা হাজার অযুত লক্ষ জনকে পারাপারের মাধ্যম এই ফেরী আজ পরিত্যক্ত। ভাসবে না সে আর জলে।
এখানেই একটি সময় মরিচা হয়ে মিশে যাবে।

৫০১জন ৪৯৯জন
0 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ