পরিচয়

বোকা মানুষ ২০ আগস্ট ২০১৯, মঙ্গলবার, ০৬:৫৭:২৬অপরাহ্ন গল্প ২১ মন্তব্য

কিস্তি ১.

৮ মার্চ ১৯৭১। সকাল ১০ টা। দীর্ঘকায়, টকটকে ফর্সা তরুণটিকে অনেকক্ষণ ধরে নিউমার্কেটের মোড়ে ঘোরাফেরা করতে দেখছে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির ঝাড়ুদার গঙ্গারাম। তরুণটি বিভিন্ন জটলার কাছে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। শুনছে জটলার আলোচনা। তাকে কিছুক্ষণ দেখার পর গঙ্গারাম চলে গেল নিজের কাজে। আসুন জানা যাক তরুনটির পরিচয়। সে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। বয়স ২৩ বছর। বর্তমানে আইএসআই এর বিশেষ একটা শাখায় কাজ করছে। নাম আজগর ফাতমী।

একটা জটলার পাশে দাঁড়িয়ে ফাতমী শুনতে পেল একজন বছর চল্লিশের লোক বলছে, “বিবিসি রেডিওত কইছে দশ হাজার বাঙ্গালী লন্ডনে পাকিস্তানী দুতাবাসের সামনে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার দাবীতে সমাবেশ করছে। এইবার ভুট্টো আর এহিয়া বুঝব ঠ্যালা!” সেই জটলায় দাঁড়ানো একজন ফিটফাট লোক বলে উঠল, “শেখ সাহেবের হুকুম মতো অসহযোগ আন্দোলন তো শুরু হয়ে গেছে। পিআইএ’র সব বাঙ্গালী কর্মকর্তা কর্মচারী অফিস না করে মিছিল নিয়ে বের হয়ে শেখ সাহেবের বাড়ির দিকে আসছে।” এটা শুনে সবার মধ্যে কেমন যেন একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল। একজন বলে উঠল, “চলেন, চলেন! সবাই শেখ সাহেবের বাড়ির দিকে যাই। দেখি উনি কি বলেন। এটা বলতেই কে একজন স্লোগান ধরল, “জয়য়য়য় বাংলা! আমার নেতা, তোমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব…!” তার স্লোগানের সাথে তাল মিলিয়ে সবাই ধানমন্ডির দিকে এগুতে লাগল।

ফাতমী ভাবল ইউনিভার্সিটি এলাকার দিকে একটু যাওয়া দরকার! সেখানে গিয়ে দেখল, ছাত্ররা জায়গায় জায়গায় জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। সবার চোখ মুখ কেমন জানি কঠিন, চোয়াল শক্ত! সবার মুখেই গতকালকের মুজিবের ভাষণের আলোচনা! ঘুরে ফিরে ফাতমী যা বোঝার বুঝে নিল। চিন্তিত মুখে সে একটা রিক্সা ডেকে মগবাজারের দিকে যেতে বলল তাকে। মগবাজার নেমে রিক্সা বদল করে সে রওয়ানা করল তেজগাঁ শিল্প এলাকার দিকে।

তেজগাঁ পৌঁছে একটা বড় ওয়্যারহাউইজের একটু দূরে রিক্সা ছেড়ে দিল। একটু থেমে চারপাশে নজর বুলিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল যে কেউ তাকে অনুসরণ করেনি। এই ওয়্যারহাউজের চারপাশে উঁচু দেয়ালে ঘেরা, সামনে দুই পাল্লার একটাই বড় গেট! গেটের উপরে একটা সাইনবোর্ডে লেখা “জুবিলি কটন লিঃ”। এটা আসলে আইএসআই এর একটা সেফ হাউজ। পূর্ব পাকিস্তানে সে আছে আন্ডার কাভার মিশনে। তুখোড় বাংলা বলে সে। এছাড়াও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে। এই দুই ভাষার উপর তাকে রীতিমতো ট্রেনিং দেয়া হয়েছে। ফাতমী দেখে গেটের দুইজন গার্ড বসে বসে ঝিমুচ্ছে। কিন্তু ফাতমী ভালমত দেখে বুঝল যে এটা আসলে ভান; তারা পুরোমাত্রায় সতর্ক আছে। কিন্তু অভিজ্ঞ আর প্রশিক্ষিত চোখ ছাড়া তাদের এই ভান অন্য কারো চোখে ধরা পড়বে না। গার্ডদের একজনকে সে জানালো যে তুলার ডেলিভারি চালান নিয়ে এসেছে সে, ম্যানেজারের সই নিতে হবে। এটা আসলে কোডেড ম্যাসেজ। ম্যাসেজ বুঝেই গার্ড গেট খুলে দিল। ভেতরে কিছুদুর ইঁট বিছানো রাস্তা পেরিয়ে গোডাউনের বিশাল দরজা। সেই দরজার গায়ে একটা ছোট দরজা। দরজার কাছে পৌঁছুতেই ভেতর থেকে একজন দরজা খুলে দিল টোকা দেয়ার আগেই। ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেকগুলো বাতিল যন্ত্রাংশ, তুলার বেইল ইত্যাদি রাখা। সেগুলো পেরিয়ে বিশাল ফ্লোরের একেবারে শেষ মাথায় একটা দরজা খুলে ঢুকে পড়ল সে। একটা পরিপাটী অফিস। কুলকুল শব্দে এয়ার কুলার চলছে। এক কোনে একটা টেবিলের ওপাশে বসে আছে কর্নেল তাবরেজ খোখার। দেখতে প্রচন্ড সুপুরুষ এবং মার্জিত একটা ভাব আছে চেহারায়। তার সম্পর্কে জানা না থাকলে ফাতমী এই চেহারা দেখে বিভ্রান্ত হতো। কিন্তু সে জানে যে কর্নেল খোখার কতটা ধূর্ত, নির্দয় আর ভয়ঙ্কর একটা মানুষ। তাকে সার্ভিসের সবাই আড়ালে ‘কর্নেল হায়েনা’ নামে ডাকে। কর্নেল খোখার এটা জানে এবং এই ডাকাটা উপভোগও করে!

(চলবে…)

২৬০জন ১৩জন
8 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য