ঈশ্বর কোথায় থাকেন? আলোয় নাকি অন্ধকারে?
ঈশ্বর কোথায় থাকেন? আলোয় নাকি অন্ধকারে?

আজকাল দুঃখগুলো হয়েছে পান্তাভাতের মতো , একেবারেই সস্তা।
গরীবের পান্তা নয় , মধ্যবিত্ত পান্তা। ঈশ্বর আমাকে পাঠালেন অবতার হিসেবে আনন্দ আর কষ্ট কে শায়েস্তা করতে। দুজনকে নিয়েই বসলাম বললাম আমায় ঈশ্বর পাঠিয়েছেন এখন বলো তোমরা কি করতে চাও? এতো বেড়েছো কেন?
হিংসুটে আনন্দ দেখে আর বলে “এই দুঃখ জীবনেও তুই দামী হবিনা।”
মায়া লাগে সস্তা দুঃখদের জন্যে। তারপর রেগে বললাম আনন্দ এবার তোকে সস্তা করে যদি না আনি , আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে মিলিয়ে তোকেও মাটিতে নামিয়ে আনবোই আমি। হিংসে করিস!
দুঃখের চোখে জল আমার কথা শুনে। বললাম এই কারণেই তোর অবস্থা এতো করুণ। কথায় কথায় জল আনিস কেন রে? জলের গতি কমিয়ে এখন একটু সুস্থির হয়ে বল তো দেখি কেমন থাকতে চাস তুই?
দুঃখ — আনন্দ যেমন অনেক দামী অতো দামী হতে চাইনা , আবার সহজলভ্যও না।
আমি — তাহলে কেমন শুনি ?
দুঃখ — হাতের নাগালে রইবো কিন্তু আমাকে নিতে হলে অনেক সাধনা করতে হবে।
আমি — ওরে বাবা অনেক কঠিন কাজ! আচ্ছা দেখছি তোকে নীলাকাশের কাছে পাঠানো যায় কিনা সেখানে মেঘের বুকে থাকবি আর মাঝে-মধ্যে জল হয়ে ঝরবি। কি ঠিক আছে?
দুঃখগুলোর হাসি আর থামাতে পারিনা । একদিকে জল , অন্যদিকে হাসি ।
আনন্দ এসব দেখে বলে, “ক্ষমা চাই নীলাঞ্জনা আমাকে সহজলভ্য করে দিওনা আমি আর অহঙ্কার করবো না।”
আমি — বললেই হলো! কিছুদিন তোকে হিসেব দিতেই হবে। জানিস না , শুনিসনি সেই প্রবাদ ‘অহঙ্কার পতনের মূল?’  এবার তোর জন্যে ঈশ্বর আমায় পাঠিয়েছেন অবতার হিসেবে। তোকে অনির্দিষ্টকাল মানুষের সাথে থাকতে হবে।
আনন্দ — আমায় ক্ষমা করো মানুষের সাথে থাকতে গেলে মরে যাবো, এরা কথায় কথায় বেশী জ্বালায়, তার চেয়ে বলো জন্তু-জানোয়ারের সাথেও থাকবো আমি।
আমি– আরে ভয় নেই মানুষের মাঝে জন্তু-জানোয়ার আরোও বেশী কিন্তু তোকে রাখা হবে মধ্যবিত্ত পান্তাভাতের মধ্যে। তোর অনেক ভাব হয়েছে এর শাস্তি তো তোকে পেতেই হবে। আর কি করে বুঝলি মানুষেরা বেশী জ্বালায়?
আনন্দ — একটু হাসি দেয়ার চেষ্টা করি, অমনি না-পাওয়ার চিন্তা করে। আরে যা চায়, তা-ই পায়। কিন্তু পেয়েই ভুলে যায়। এরপর আমার অবস্থা এতোই করুণ হয়, তার চেয়ে তো দুঃখ ভালো আছে। অন্তত কেঁদে কষ্ট কমাতে পারে। আমি হাসিয়ে কিছু সময় স্থায়ী হয়। আনন্দ বলতেও পারেনা তারও যে কষ্ট হয়।
অন্যদিকে আমার ঠিক সামনে বসেই দুঃখগুলো শুনছিলো আর জল মেশানো হাসিতে ভরিয়ে রাখছিলো। বললাম এই এখুনি জল মুঁছে ফেল নইলে তোর অবস্থান বদল করবো না। দুঃখগুলো নিশ্চিত আগের জন্মে দমকল বাহিনীতে ছিলো যতো জল মুঁছছে, ততোই গড়িয়ে পড়ছে । কি যে মেজাজ খারাপ হলো! ঈশ্বরকে তখুনি কল দিলাম দেখি নাম্বার ব্যস্ত। পরে এসএমএস করলাম “ঈশ্বর দুঃখের সমস্যা কি বলবে? হাসে আবার জলও পড়ে। আমার তো আর ভালো লাগছে না মেজাজ কিন্তু গরম হয়ে আছে, ফ্রী হয়েই কল দিও । তা নইলে দুঃখকে কিন্তু স্বর্গে তোমার কাছেই পাঠিয়ে দেবো।”
পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঈশ্বরের ফোন —

ঈশ্বর — হ্যালো নীলাঞ্জনা কেমন আছো?
আমি — দেখো ভালো করেই জানো কেমন আছি, এসব ভাবের প্রশ্ন ছাড়ো। আসল কথায় আসো।
ঈশ্বর — এতো রাগ করছো কেন? তোমায় অবতার হিসেবে পাঠালাম, মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। তা নইলে সব যে ভুল হয়ে যাবে।
আমি — শোনো তুমি নিজে কি শান্ত? মাথা গরম হলে কি কি করো তার লিষ্ট দেবো? ঝড়-বন্যা-সুনামী-আগেয়গিরি-ভূমিকম্প এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় তো আছেই। পারমাণবিক বোমা থেকে শুরু করে কতো কি যে ভয়ঙ্কর অস্ত্র-শস্ত্র বানাতে মানুষের মাথায় শয়তানী বুদ্ধি দিয়েছো। এসব কি ভালো? বড়ো বড়ো কথা বলো।
ঈশ্বর — এই, এই চুপ, চুপ! আর বলোনা প্লিজ। কি করবো বলো রাগ ওঠে, জীবনের মস্ত বড়ো ভুল মানুষ বানানো। কোন কুক্ষণে যে মাথায় এলো আমার নাম-ধ্যান করবে এমন কাউকে তো চাই। এই ভুল থেকে আমার নিজেরই নিষ্কৃতি যে নেই নীলাঞ্জনা।
আমি — এখন তুমি শুরু করলে দীর্ঘশ্বাস? ধুরো দুঃখকে পাঠাচ্ছি, ধরে বসে কাঁদো। বিরক্তিকর!
ঈশ্বর — না, না এই ভুল করো না প্লিজ। তাহলে এই স্বর্গেও পান্তাভাতের মেলা বসে যাবে। আর ওই যে পূণ্যবান পুরুষেরা এসেছে স্বর্গে, তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।
আমি — বুঝলাম না, কি খারাপ হবে?
ঈশ্বর — হুর-পরীদের মন খারাপ হলে কে এসব পূণ্যবানদের মনোরঞ্জন করবে?
আমি — বাহ এজন্য মর্ত্যের মানুষ কাঁদবে আর তুমিসহ পূণ্যবানরা নারী নিয়ে খেলবে?
ঈশ্বর — এক কাজ করো নরকে পাঠিয়ে দাও। ওখানে নাৎসি বাহিনী থেকে শুরু করে হিটলার-সাদ্দাম-লাদেন আর বাংলাদেশের রাজাকারদের আগমন ঘটেছে। নরকে এখন বিশাল আয়োজন চলছে।
আমি — নরকে তো এমনিতেই কষ্ট। শাস্তি পাচ্ছেই। দুঃখকে পাঠাবো কেন আর?
ঈশ্বর — এটাইতো দরকার। বিষে বিষে বিষক্ষয়।
আমি — ঈশ্বর তুমি কেন এমন সব কীটের জন্ম দিয়েছিলে?
ঈশ্বর — ভুল করে এদের জন্ম দিয়েছিলাম এখন আর ফিরিয়ে নেয়ার উপায় নেই।
আমি — ভুল তো বারবার করেই যাচ্ছো। তোমায় শাস্তি দেয়ার কেউ নেই, পাচ্ছে সব মানুষ। দুঃখ-কষ্ট এতো বেশী পাঠিয়েছো পৃথিবীতে। আর নিজে বসে বসে আরামসে আছো।
ঈশ্বর — দেখো বেশী বলোনা, এখন রাগ উঠছে আমার। যতো পাত্তা দিচ্ছি, ততোই জ্বালাচ্ছো আমায়। বলছি ভুল হয়েছে। ফিরিয়ে নেয়া আর যাবেনা দুঃখ-কষ্টকে।
আমি — ফিরিয়ে যদি না নিতে পারবে তাহলে সুখী মানুষের জন্ম দিচ্ছো না কেন? এতো কষ্ট এদের দিয়েছো যে স্টক ফুরাতেই চায়না। তোমার জল-স্থল-অন্তরীক্ষের চেয়েও এদের নেটওয়ার্ক বিশাল, জানো? আমি আনন্দকে রেখে দুঃখকে আকাশের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ঠিক আছে?
ঈশ্বর — বলো কি তুমি! বৃষ্টি শুরু হলে আর থামতেই চাইবে না, বাংলাদেশ এমনিতেই বন্যায় ভেসে যায় এরপর তো ডুবেই যাবে।
আমি — তাহলে বলো কি করবো আমি? একটা কাজ করতে পারি আনন্দকে সস্তা করে দুঃখকে দামী করে দেই?

ঈশ্বর –কি করে করবে? আগে বলো শুনি!
আমি — পৃথিবীর তাবৎ রাজনীতিকদের কাছে রেখে দেই, ভালো বুদ্ধি না?
ঈশ্বর — সাব্বাস নীলাঞ্জনা জীবনে এই প্রথম কাজের মতো কাজ করলে, তোমাকে আমি এই কারণে পুরষ্কৃত করতে চাই। বলো কি চাও?
আমি — চাইলে দেবে তো? সব মেয়েদের নিরাপত্তা চাই। আর সব পুরুষদেরকে একটা নিশ্চিন্তের আশ্রয় হিসেবে তৈরী করো। যাতে কোনো মেয়ে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। আর শোনো, পুরুষের মধ্যে শুদ্ধ প্রেম দিও, অবহেলা সরিয়ে। নারীদের মধ্যে ব্যক্তিত্ত্ব দিও যাতে অবহেলাকে অবহেলা দিতে পারে আবার শুদ্ধতার সাথে জীবনকে সাজাতে পারে। সোজা কথা প্রেম দিও বেশী করে, যেনো শুদ্ধ হতে পারে সারাটি পৃথিবী।
ঈশ্বর — এমন প্রেমের জন্ম দিতে গেলে আমাকে পুরোপুরি ভালো হতে হবে। অন্য কিছু চাও। তোমার এই চাওয়া কোটি কোটি ঈশ্বরও পারবে না পূরণ করতে।
আমি — বলো কি! তুমি ভালো না? তাহলে তোমার পুজো করে কেন সবাই? তোমায় নিয়ে মারামারি-কাটাকাটি। আরে মানবতা যে একমাত্র ধর্ম সেও কারো মাথায় নেই। বুঝেছি কেন এমন করে মানুষ। আমায় ক্ষমা করো আমি আজই অবতার পদ থেকে মুক্তি চাই।

এন্টিগোনিশ, কানাডা
১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১১ ইং।

কেবলই বড়ো হতে চায়...
কেবলই বড়ো হতে চায়…


কেবলই বড়ো হতে চায় (২১ বৎসর আগের লেখা)

মায়ের কবোষ্ণ বুকে মাথা রেখে শিশু নিরাপত্তা চায় নিশ্চিন্ত ঘুমের;
তবুও সে বালক কিংবা বালিকা হতে চায়।
ক্ষতকে ভালোবেসে ক্ষতের সৃষ্টি–
গড়িয়ে যায় চোখের জল,
তবুওআকাশ ছুঁতে চায়।
বোকা বালক-বালিকা বোঝে না কিছুই
কেবলই বড়ো হতে চায়।
ঋতুস্রাবের যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকে,
ভয়ে কেঁপে ওঠে বালিকা;
অবাধ স্বাধীনতার লোভে বালক, কিশোর হতে চায়।
তবুও বালক-বালিকা বড়ো হতে চায়।
উষ্ণ ছোঁয়ার জন্যে,
ঠোঁটে ঠোঁট রাখার জন্য্‌
কপট অভিমানের জন্যে,
কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী হতে চায়।
বোকা শিশু কিচ্ছু বোঝে না;
বৃ্দ্ধ হবার জন্যে
কেবলই বড়ো হতে চায়।

 শমশেরনগর চা’বাগান, মৌলভীবাজার
৫ অক্টোবর, ১৯৯৪ ইং।

**লেখা দুটি লিখেছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে। নীচের কবিতার ‘আমি’টা দায়িত্ত্বহীন একজন মানুষ। উপরের লেখাটির ‘আমি’টা একজন মা। একই ‘আমি’ কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কতো কিছুর বদল।

৫৫৮জন ৫৫৮জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ