কুকুরটা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে বেশ ক্লান্ত। ওভারব্রিজের রেলিংয়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাপাচ্ছে। একবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার মানুষের ভীড়ের দিকে। চোখ থেকে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। আর বানরটি মানুষের কাণ্ড দেখে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। অনিক খেয়াল করল তার বাবাও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কুকুরটার দিকে। হাতে ধরে রাখা আঙুলে হালকা ঝাঁকি দিয়ে প্রশ্ন করল—

— ওদিকে কি দেখছ বাবা?

–সিনেমা। অনেকটা বেখেয়ালী উত্তর বাবার।

–সিনেমা! এসব কি বলছ বাবা!

–হ্যাঁ সিনেমা। ঐ দেখ, কুকুরটার চোখের ভেতর দারুণ এক চিত্র ফুটে উঠছে, বুঝলে বাবু। আর বানরটির মুখের দিকে তাকাও। দেখতে পাচ্ছ সে কি বলতে চাচ্ছে? সে উপহাসের হাসি হাসছে আর বলতে চাইছে এই লোকগুলো গাধার বাচ্চা। এতকিছু দেখেও এরা মানুষ হল না! আর কত শিক্ষা পেলে এরা মানুষ হবে?

বাবার কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝল না অনিক। তার ব্যথিত মন ক্রমেই বিষন্ন হয়ে উঠল। কিন্তু বাসা থেকে বেরুনোর সময় কি উচ্ছলতাই না ছিল ওর মনে।

বইমেলায় যাবার আনন্দে মনটা বেশ চনমনে অনিকের। ট্যাক্সিতে বসে বাবার সাথে নানান বায়না তুলে ধরছে সে। মেলায় গিয়ে প্রথমে পুরো মেলা অঙ্গণ ঘুরে দেখবে। তারপরে এক এক করে অনেকগুলো বই কিনবে। সায়েন্স ফিকশনের বই তার প্রথম পছন্দ। ভূতের বইও খুব প্রিয়। এগুলোর পাশাপাশি কিছু ছড়ার বই ও কয়েকটা গল্পের বই কিনবে। ছবি ওঠা তার খুব সখ। তাই বই কেনার সময় লেখকের সাথে তার ছবি উঠিয়ে দিতে হবে। বইকেনা শেষ হলে খাবারের দোকানে যাবে। সেখানে চটপটি ও ফুসকা খাবে। আর আইসক্রিম তো তার কমন খাবার। ফেরার সময় মায়ের জন্য কিছু ফুল কিনে নিয়ে আসবে। অসুস্থতার কারণে মা আজ তার সাথে যেতে পারছে না। তাই মায়ের জন্য তার কিছু উপহার নিয়ে আসা উচিৎ। তাছাড়া সে জানে গোলাপ আর রজনীগন্ধা তার মায়ের খুব পছন্দের ফুল।

গল্পে গল্পে কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে। গেট দিয়ে ঢুকে কিছুদূর যেতেই মাইক্রোফোন হাতে একটা লোক এগিয়ে এল তাদের দিকে। লোকটি মেলায় আগত মানুষের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও অনুভূতি জানতে চাইছে। লোকটি অতি আদরে তার হাতটি অনিকের ঘাড়ের উপর রাখল। তারপর জিজ্ঞেস করল মেলায় এসে তার কেমন লাগছে, কি কি বই কিনেছে, কি কি বই কিনবে ইত্যাদি। অনিক খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলল। টিভিতে তাকে দেখাচ্ছে শুনে খুব উৎফুল্ল হল সে।

লোকটি অনিকের কথা বলার ধরন দেখে খুব খুশি হল। সে পকেট থেকে কয়েকটা চকলেট বের করে তার হাতে দিল। লোকটিকে অনিকের খুব চেনা চেনা লাগছে। সে বাবাকে লোকটির পরিচয় জিজ্ঞেস করল। বাবা বললেন

–উনিই সেই বিখ্যাত ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন।

–এই কারনেই উনাকে আমার চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আমি উনাকে বেশ কয়েকবার টেলিভিশনে দেখেছি। গতবার উনার দুইটি ছড়ার বই কিনেছিলাম। আজও কিনব।

–আচ্ছা কিনে দেব। উনি খুব ভাল মানুষ। চ্যানেল আইয়ের সরাসরি বইমেলা অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনা করছেন। আর ওই যে ওপাশে বসে আড্ডা দিচ্ছে দেখছো? উনাদের একজন খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম আরেকজন খ্যাতিমান প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ।

— উনি তো শুধু প্রচ্ছদশিল্পী নয় বাবা। উনিও তো নাম করা একজন লেখক। আমি উনাদের দুইজনের বইই আগে কিনব।

–আচ্ছা চল। শুধু উনাদের বই কেনা নয়। চল উনাদের সাথে তোমার ছবি তুলে দেই।

ছবি তোলা শেষে মেলা ঘুরে ঘুরে অনেকগুলো বই কেনা হল। বেশ কয়েকজন লেখকের অটোগ্রাফও নেয়া হল। তারপর চটপটি, ফুসকা খেয়ে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিল। বাবা একটি ট্যাক্সি ডাকলেন। মায়ের জন্য কেনা ফুলগুলো কোলের উপর রেখে ট্যাক্সিতে বসল অনিক। খাচ্ছে আর বাবার সাথে কথা বলছে সে। হঠাৎ সামনে একটা জোরালো আওয়াজ। কিছু লোকজনের ছোটাছুটি দেখল। ক্রমেই ভীড় বাড়তে লাগল।

একটা লোক গাড়িচাপা পড়েছে। কিছু লোক ঘাতক বাসটি ঘেরাও করে ভাঙচুর করছে। ড্রাইভার ও হেল্পার পলাতক। একেকজন একেকজনের দোষ খুজছে। কেউ ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছে। কিন্তু লোকটিকে বাঁচানো যায় কিনা সে চেষ্টা করছে না কেউ। একজন ভদ্রলোক লোকটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিতে চাইলেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। স্পটডেড।

ভদ্রলোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন “আমি স্পষ্ট দেখলাম কিভাবে চোখের সামনে লোকটি মারা গেল। দশ হাত দূরে ওভারব্রিজ থাকতেও কেন যে লোকটা এভাবে রাস্তা পার হতে গেল বুঝলাম না।” অনেকেই তার কাছে জানতে চাইল কিভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটল। লোকটি বলল ” ওভারব্রিজের নীচে আমি খবরের কাগজ কিনছিলাম। ওইখানে একটা লোক ওই বানরটি নিয়ে খেলা দেখাচ্ছিল। আর ঐ লোকটি এই পাশ দিয়ে গেল। সাথে তার ওই কুকুরটি ছিল। লোকটি রাস্তা পার হয়ে ওপারে যমুনা ফিউচার পার্কের দিকে যাবে। কিন্তু সে ওভারব্রিজে না উঠে সোজা নীচ দিয়ে পার হতে গেল। ডিভাইডারে বেড়া দেয়া আছে। কিন্তু কে বা কারা সেটা ভেঙে একজন মানুষ পার হবার মত রাস্তা করে রেখেছে। কিন্তু সেটা খুবই বিপজ্জনক। লোকটি বোকার মতো সেদিক দিয়েই পার হতে চাইল। কিন্তু তার কুকুরটি তার সাথে না গিয়ে ওভারব্রিজ দিয়েই পার হচ্ছিল। এমন সময় দ্রুতগামী বাসটি তাকে চাপা দিল”। আরেকজন বলল লোকটি নিজের দোষেই মারা গেল। এবার ভদ্রলোক একটু রাগান্বিত স্বরে বলল “কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। যে কোন মানুষ ভুল করতে পারে। একজন পাগলও ভুল করে রাস্তার মাঝখানে চলে আসতে পারে। তাই বলে তাকে গাড়িচাপা দিয়ে চলে যেতে হবে, এটি ঠিক নয়। আমরা সবাই মানুষ, সবাইকেই সতর্কতা অবলম্বন করে চলা উচিত।”

দেখতে দেখতে মানুষের ভীড় আরও বেড়ে গেল। রাস্তায় জ্যাম ক্রমেই দীর্ঘ হল। কুকুরটা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে বেশ ক্লান্ত। ওভারব্রিজের রেলিংয়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হাপাচ্ছে। একবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার মানুষের ভীড়ের দিকে। চোখ থেকে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। এসব দেখে অনিকের মনটা ভারাক্রান্ত হল। সে করুণ দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাল। তার বাবাও হতভম্ব হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কুকুরটার দিকে। হাতে ধরে রাখা আঙুলে হালকা ঝাঁকি দিয়ে অনিক বলল চল বাবা এবার বাসার দিকে যাওয়া যাক।

৫২জন ২৭জন
0 Shares

একটি মন্তব্য

  • সাবিনা ইয়াসমিন

    রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনার দৃশ্য হরহামেশা দেখা যায়। প্রায় সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত হয় নয়তো দোষ নিয়ে আলোচনা বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয়, কিন্তু দুর্ঘটনা কবলিতদের পাশে অল্প ক’জনকে দেখা যায়। ওভারব্রীজ থাকতেও শর্টকাটে রাস্তা পারাপার অনুচিত, আবার সবার পক্ষে ওভারব্রীজ দিয়ে পারাপার হওয়া সম্ভবপর হয়না। পথচারী এবং গাড়ীর চালক উভয়কেই সতর্কতার সাথে পথে নামা দরকার।
    বাচ্চাদের ভেতরে একবার সাহিত্যের বীজ বুনে দিলে সেই বীজ থেকে ডালপালা মেলতে সময় লাগে না। ছোট্ট অনিকের মতো সকল বাচ্চারা যেন বেড়ে উঠে মেধায়, সাহিত্য মননে।

    শুভ কামনা 🌹🌹

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ