নেশায় মেশা

রেহানা বীথি ৩ মার্চ ২০২০, মঙ্গলবার, ১০:০৩:৫৪পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৪ মন্তব্য

ছোটবেলায় খুব ছবি আঁকতাম। পেন্সিল দিয়ে যা ইচ্ছে তা-ই এঁকে এঁকে ভরে ফেলতাম খাতার পাতা। অর্থহীন সেসব ছবি। তারমধ্যে কোনোটা হয়তো সামান্য অর্থ প্রকাশ করে ফেলতো আমার অজান্তেই। খুশি হতেন আব্বা-আম্মা। তাঁরা এতোটাই খুশি হতেন যে, বাড়িতে আসা অতিথিদের সামনে গর্বভরে মেলে ধরতেন আমার অজান্তে অর্থ পাওয়া ছবিগুলোর পাতা। অতিথিরা স্নেহপরবশ হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, বাহ্, চমৎকার আঁকার হাত তো! এত ছোট মেয়ে অথচ কী সুন্দর করে ছবিতে তুলে ধরেছে বিষয়টিকে! বড় হলে নিশ্চয়ই জীবনে অনেককিছু করবে!
আনন্দে চোখ ভিজে যেত আমার। বুক ভরে যেত বিশ্বাসে, সত্যিই আমি অনেককিছু করতে পারবো একদিন!

সময় গড়ায়। সেই খাতার পাতা ছবিতে ভরে ফেলা আমি দেখতে দেখতে বড় হয়ে উঠি। আমি গান শুনি, গানে মজে যাই। ছবির খাতাটা শূন্য পড়ে থাকে। ক্যাসেট প্লেয়ারে নানান শিল্পীর গান শুনে শুনে গাইতে থাকি। কেউ কেউ বলে, বেশ ভালো গাও তো, গান শেখো? না, গান শিখিনি। শেখার চেষ্টাও করিনি তেমন। তবে আমি গান অন্তঃপ্রাণ হয়ে যাই। সেটা প্রায় নেশার মতো। নেশাটা ঠিক কতদিন ছিল মনে নেই, তবে ধীরে ধীরে একসময় তা জায়গা বদল করে নেয়। আকৃষ্ট হয়ে পড়ি বই পড়ার প্রতি।

স্কুলে বন্ধুদের কাছ থেকে নিয়ে তো বটেই, কিনেও পড়েছি প্রচুর বই। প্রকাশ্যে কিংবা পাঠ্যবইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে বই পড়ার এই নেশাটা বয়েও বেড়িয়েছি দীর্ঘদিন। ছাত্রজীবন শেষের আগেই শুরু হয় সংসারজীবন। না চাইতেও জড়িয়ে পড়ি সংসারের নানা জটিলতায়। জড়াতেই হয়! অন্তত আমাদের সমাজে মেয়েদের না জড়িয়ে কোনও উপায়ও থাকে না। একসময় লেখাপড়া শেষ হয়, সন্তানের মা হই, কর্মজীবনে প্রবেশ করি। সিদ্ধান্ত নিই, সরকারি চাকরির চেষ্টা না করে মিয়া-বিবি একসাথে প্র্যাকটিস করবো। কারণ, চাকরি করলে বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়াতে হবে আর নিজ জেলায় কোনদিনই পোস্টিং হবে না। মিয়ার যেহেতু নিজ জেলা ছেড়ে নড়ার উপায় নেই, অতএব আমিও নড়বো না। থেকে গেলাম, চেষ্টা করলাম সংসার সাজাতে। এই সাজাতে গিয়ে এতটাই বিভোর হয়ে যাই যে, বই পড়ার নেশাটা আমার কেটে যেতে থাকে ধীরে ধীরে। না কেটে উপায় কী! সেই ভোর থেকে শুরু হয় জীবন থামে মধ্যরাতে। ছোট ছোট দুই মেয়ে, তাদের স্কুল, লেখাপড়া, অসুখ হলে নির্ঘুম রাত, নিজের কর্মক্ষেত্র। জীবন থেকে বিশ্রাম জিনিসটাই যেখানে হারিয়ে গেছে, সেখানে বই পড়ার কথা তো চিন্তাতেই আনা যায় না!

একটু একটু করে মেয়েরা আমার বড় হতে থাকলো। আমারও একটু একটু করে জুটতে লাগলো অবসর। মনে একটু যেন খোলা হাওয়া লাগতে শুরু করলো। এমন সময়ে আমার এক বন্ধুর কথায় মর্মাহত হলাম ভীষণ। বন্ধুটি বললো,
“তুই কী রে? তোর একমাত্র বড় বোন ডাক্তার, আবার বিসিএস ক্যাডারও, তুই কিনা তারই বোন হয়ে সরকারি চাকরির না করে এখানে পড়ে আছিস?”
আমি সরকারি চাকরি করছি না সে কারণে নয়, মর্মাহত হয়েছিলাম বন্ধুটির বলার ভঙ্গিতে। তার খোঁচাটা উপলব্ধি করে অবাকও হয়েছিলাম ভীষণ। সে নিজে বিসিএস পাশ করলেও তার ভাই-বোনেরা কিন্তু কেউ-ই তা করেনি! সেকথা কি সে ভুলে গেছে? যাইহোক, এসব প্রত্যেকের আলাদা আলাদা উপলব্ধির বিষয়। যে যেমন ভেবে সুখ পায়, সে তা পাক না! আমি তো বাবা দিব্যি সুখে আছি!

দেখেছেন, কথা কোনদিক থেকে কোনদিকে চলে গেল! বলছিলাম টুকরো টুকরো অবসর জোটার কথা, সেই অবসরে কী কী করে ফেললাম সেসব না বলে কীসব আবোল তাবোল!
অবসরে আবার বইয়ের ঝাঁপিতে উঁকিঝুঁকি দিতে দিতে পেয়ে গেলাম মুখবই। কত কথা বলে মানুষ এই মুখবইতে! কত গল্প-কবিতা, দিনযাপনের খুঁটিনাটি, কত আনন্দ-বেদনা! পড়ি আর টুক টুক করে মন্তব্য দিয়ে যাই। এই মন্তব্য দেখেই শ্রদ্ধেয় পার্থ সেন মহাশয় বন্ধু-অনুরোধ পাঠান এবং তাঁর গ্রুপ ‘শনিবারের আসর’ -এ আমাকে একরকম জোর করেই যুক্ত করেন। কী ভালো একটা গ্রুপ! সবাই কত সুন্দর সুন্দর লেখা লিখেন ওখানে! আমি শুধু পড়ি আর অবাক হই। মনে ভরসা নিয়ে একদিন একটা লেখা আমিও দিলাম। খুবই আবোলতাবোল একটা লেখা। তাতেও গ্রুপের সবার এত ভালোবাসা পেলাম যে বলার না! সাহস বেড়ে গেল নিমেষেই। একে একে অনেক লেখা লিখে ফেললাম ওখানে। নিজের প্রতি অনাস্থাটা ধীরে ধীরে রূপ নিল আস্থায়। পাঁচটি বছর অতিক্রম করার আগেই টুকটাক লেখা পত্রিকায় বেরোতে শুরু করল। ভালোবাসা পেলাম অনেকের। নিজের প্রতি আস্থা আরও একটু বাড়লো।

আজ মনে হয়, শুধু পড়া নয়, লেখালেখিটাও আমার বর্তমান নেশা। যে নেশায় মিশে আছে অনেকখানি ভালোলাগা। জীবনে সাফল্যের মানেটা সবার জন্য এক নাই বা হল! হেরে না গিয়ে আত্মসম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারা যায় যে কোনও অবস্থান থেকেই। হাত বাড়িয়ে ছোঁওয়াও যায় ভালোবাসার নীল আকাশ।

১৯৪জন ২১জন
27 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য