নীল টি শার্ট

এস.জেড বাবু ৩ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার, ০১:২৩:১৫অপরাহ্ন গল্প ২৭ মন্তব্য

টানা ৪০ জন লোকের সরগম আর ঢোলের বাঁজনার মধ্যে কি করে ঘুমাতে হয়, এই টেকনিক সম্ভবত একজন প্রবাসি ছাড়া কেউ ভালো জানেনা। বিশেষ করে ইউরুপের মতো নামী-দামী দেশগুলির ব্যাচেলর মেসে যারা থাকে, তাদের শব্দদুষন আর পলিউশানে নিশ্চিন্তে ঘুম দেয়ার জন্য শুধু মানষিক ইচ্ছেটাই যথেস্ট্য।

অরণ্য তেমন একটা ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০০ বছর পুরুনো ভিসুভিয়ানো আগ্নেয়গিরীর পাদদেশে, পালমা কম্পানিয়া নামের ছোট্ট শহরের ৮০ বছরের পুরোনো একটা ঘরে গাদাগাদি করে রাখা ৫টা সিঙ্গেল বেড। অরণ্যের বেডটা ঘরের দিক্ষন পশ্চিমে একটা জানালার নিচে- দেয়ালের জন্মলগ্নে লাগানো ওক কাঠের শেওলা ধরা কপাট গুলির একটার নিচের অংশে ছয় ইঞ্চি মতো ঘা- যার চার ইঞ্চি ছিদ্রটাতে অরণ্যর গায়ের নীল টি শার্ট টা স্থান করে নিয়েছে পাহাড়াদারের। মাইনাশ ১৩ ডিগ্রী রাতের তাপমাত্রায় সো সো করে শীতল আচরণের বাতাস পাহাড়া দেয় বিথীর কিনে দেয়া গেলো বছরের নীল টি শার্ট।

এটা জুন মাস, ইউরুপে সামার সিজন-
তিন বেলায় তিন রংয়ে সাজে প্রতিটি রাস্তা – সকাল আর সন্ধ্যায় দিন রাত্রীর ব্যাবধান রেস্টুরেন্ট আর বারগুলিতে – বেলা শেষে সম্পূর্ন্য ভিন্ন এক প্রকৃতি- অন্য এক রূপসজ্জা –

বলতে গেলে- শীতের প্রতিটি আধামরা শুকনো গাছের হাড়গুলিতে সবুজ রং লেগেছে গেলো মাসে- আজ কাল তো মোহনীয়- লাল নীল বেগুনী রংয়ে সবুজের সমারোহে লজ্জ্যায় অবনত বধূ সেজে আছে চারপাশের প্রকৃতি- প্রতিটি গাছ, সন্ধ্যের অন্ধকারে।।
দালান গুলির খোলা জানালায় ফিনকি দিয়ে বের হওয়া সোনালী আলো যেনো ষোড়শীর কানের দোলে মুক্তার বিচ্ছুরিত রশ্মী-
কি নিদারুন মোহনীয়তা।

আর অন্যদিকে এক এক ইঞ্চি করে কমতে কমতে সংখ্যায় প্রায় ৩ এর কোঠায় আর সাইজের যোগফল নাই বা বললাম পোষাকের বসন্তের।
সব মেয়ে একই না হলেও প্রায় অধিকাংশরাই আন্ডারওয়্যার শব্দটা সামারে সত্যি ভূলে যায়- হাই হিলের ঠুক ঠুক ছন্দে হেলে দুলে চলা ষোড়ষী নৃত্ত্বে কখনো ব্যাঘাত ঘটায় উড়ন্ত দুস্ট বাতাস- ওই দিকের গল্প অন্য কোন দিন অন্য কোথাও অন্য কোন আলোচনায়।

নভেম্বরের শেষ দিকে জানালার ফুটো বন্ধ করতে কাজে লাগানো বিথীর কিনে দেয়া নীল টি শার্ট টা অরণ্যর হাতে এখন – জানালা খুলে ঘুমালে ভোর হওয়ার আগে ঘুম ভেঙ্গে যায় – তাই জানালার ছিদ্রট মুক্ত করে দিলে সামাণ্য হীম শীতল বাতাসে ঘরের ভেতরটা অনেক তাজা অক্সিজেনে ভরা থাকে।

এই শেওলা আর পাটকাঠির গন্ধভরা ঘরে এতো এতো জনের আসা যাওয়া যে বলা আর গুনা মুশকিল। আসলে এটি সদর ঘর- ড্রয়িং রুম বা বসার ঘর বলতে পারেন। সদর দরজাটা অরণ্য’র বেডের পায়ের পাশ থেকে দেড় ফিট দুরে।
রুমের দরজা খুলতে না হলে ওখানে একটা বেড পাতা হতো। বাড়ি ওয়ালার কিছু ইউরো বেশী আয় হতো-
কি দিন, কি রাত- সারাক্ষন এবাড়িতে বাসা মালিকের আত্মীয় স্বজন, ভাড়াটিয়াদের আত্মীয়, অনাত্মীয় বন্ধু আর আমরা সবার যাওয়া আসায় হামেশা এই রুম পরিপূর্ন শব্দে আর আলোয়। আর অরণ্যর বেড ঘরে ঢুকে ডান পাশে। মানুষ ডানে ঘুরে বেশি। ঘরে ঢুকে যেহেতু বসার জন্য সোফা, চেয়ার বা আলাদা কোন ব্যাবস্থা নেই- তো বসার জায়গা অরণ্য’র বেড।

প্রতি বেডের মাঝখানে দেড় ফিট ফাঁকা জায়গার শেষ অংশে দেয়ালে ঠেকানো ছোট্ট কুমোদিনো- দুইটা ড্রয়ার- দু পাশে ব্যাচেলর দুজনের সদ্য ব্যাবহৃত প্রসাধনি, নেল কাটার পেস্ট-চিরুনী আরও কত কি।
অরণ্য টুথ ব্রাস কখনো ড্রয়ারে রাখেনা- কতবার ব্রাস করে করতে বাথরুমের আয়নায় গিয়ে দেখা গেলো ব্রাসের রং সবুজ।
থুথু ফেলতে ফেলতে বাইরের লনে এসে হরহর করে বমি- সাথে চিৎকার চেচামেচি।

আমাদের এই ফার্মের মালিক- ( বাসার মালিক ) সেদিন চুল শূণ্য মাথা চুলকাতে চুলকাতে এসে অরণ্যের সামনে বসে। বলে ব্রাস ধূয়ে নিলে নতুন হয়ে যায়। এই নতুন ব্রাস দিয়ে ব্রাস করলে কিছু হয় না।
আমরাতো একজনের প্লেটে অন্যজন খাই-
অরণ্য রেগে গেলো- বললো- আপনি বাকি জীবন ব্রাস কিনবেন না – আপনার পালতু মুরগী ( ভাড়াটিয়া ) যারা আছে তাদের একজনের ব্রাস একদিন ব্যাবহার করবেন। টুথপেস্ট ফ্রী।

যাই হউক- এর পর থেকে অরণ্য’র ব্রাস থাকে ওর লাগিজে। বেড এর নিচে।

এই মূহুর্তে জানালার ছিদ্র থেকে উদ্ধার করা টি শার্টটা- বেডের নিচে লাগেজের উপরে স্থান পেলো।

শার্ট টা খুলে হুকে রেখে, বালিশের নিচ থেকে হেডফোনটা খুজে বের করলো সে। দুকান বন্ধ করতে হবে হেড ফোন আর গানের কল্যানে।
এই হলো ঘুমানোর টেকনিকের প্রথম ধাপ- ভিন্ন রকম কাজের সময় হওয়ায় সবছেলেরা একসাথে ঘরে আসে যায় না-
কেউ সন্ধ্যে ছয়টায় ঘরে ফিরে কেউ রাত ১১টায় কেউ তিনটায় –

অন্যদিকে কেউ কাজে যাচ্ছে বিকেলে- কেউ সকালে, কেউ রাত দশটায় তো কেউ ভোর চারটায়।
সমস্যা যাওয়ার সময় না-
সমস্যা আসার সময় –
কাজে বের হয়ে যাওয়ার সময় সবার অনেক তাড়া থাকে- মেপে মেপে ঘুম থেকে উঠে যদি বাথরুমের লাইনে পড়তে হয় তবেতো সর্বনাশ- কখনো বীনা পারফিউমে, বীনা চাবিতে ঘর থেকে বের হয়ে যায় কতজন।
সমস্য হলো – যখন কেউ কাজ থেকে ফিরে- তখন।
বাস থেকে নেমে বা কেউ কেউ কাজ থেকে বেড়িয়ে সোজা একটা বারে, কেউ একটা বিয়ার, কেউ এক পেগ হুইস্কি, কেউবা দুধ কফি-
মূলত- ভীরশূণ্য অবস্থায় মোবাইলে কাছের লোকজনদের সাথে দেশে কথা বলা।

নিজের সমস্ত দিনের নোংড়া কস্টগুলি ছেঁকে ইউরুপের সৌন্দর্যের ফ্লেভারে ভরা যেসব গল্প ছেলেরা দেশে বলে- সেসব গল্পের অনেক কথাই হয়তো বাংগালীদের সামনে মানায় না-
কারণ ওরা সত্যিটা জানে, বুঝে- ওরা হাসবে।

তারচেয়ে একটা বারের সব শেষের টেবিলে বসে একচোট গল্প নিজের মতো করে বলে ফেলা-
কোন সমস্যা নেই- কারণ চারপাশের মানুষগুলি কেহই বাংলায় বলা মিথ্যে কথাগুলির একটা বর্ণও বুঝবেনা।

সমস্যা কিন্তু ওদের নিয়ে না- সমস্যা হলো- কাজ শেষ করে, মোবাইল কানে লাগিয়ে হেড ফোন ছাড়া লোকাল বাস, রাস্তা পার হয়ে এমনকি ঘর পর্যন্ত গল্প টেনে নিয়ে আসা লোকগুলি- ওরা ঘরে এসেও কথা বলতে থাকবে- কখনো বসবে অরণ্য’র বেডে- ডানদিকে কাত হয়ে মোবাইল ডানকাঁধে – ডান হাত ফুল শার্টের হাতামুক্ত। এমনি করে বাম হাত-
কখনো শার্ট টা অন্য কারো বেডেই রেখে চলে যায়-
সবচেয়ে সমস্যার হলো যখন জুতা মোজা খুলে অন্য কারো বেডের নিচে রেখে যায় অন্য কেউ।

হাহাহা
আশা করি বর্ণনা লাগবেনা-

অরণ্য বালিশের নিচ থেকে কাথাটা বের করে, আজ কাথাঁর যে দিকটায় বীথি – মানে অরণ্যের বড় বোনের ওড়না দিয়ে বোনা, সে পাশটা গায়ে জড়িয়ে শোবে-
শীত না হলেও অবাঞ্ছিত আলোর হাত থেকে বাঁচতে এই পাতলা কাথার আয়োজন।
অন্যপাশে মায়ের আঁচল- কখনো অরণ্য মায়ের আঁচলের নিচে ঘুমানোর স্বাধটাও নেয়।

হটাৎ কি যেনো মনে করে বিছানায় উঠে বসে অরণ্য-
বেডের নিচে হাত দিয়ে টি শার্টটা হাতে নিয়ে আসে-

কান থেকে হেডফোন খুলে, কাথাটা সরিয়ে বীথির দেয়া অধোয়া টি শার্ট টা গায়ে দেয় অরণ্য-
জাযগায় জায়গায় ভেজা ছিদ্র হয়ে যাওয়া টি শার্ট-
খুব ইচ্ছে করছে আয়নায় নিজেকে দেখতে-

বড় বোনের চোখে- এক বছর আগে- বাংলাদেশে বীথির নতুন শশুড় বাড়িতে প্রথম রমজানের ঈদ উপহার এই নীল টি শার্ট পড়ে কেমন দেখাচ্ছিলো অরণ্য’কে !!

বোন বিথী সেদিন চিৎকার করে বলছিলো- আমার ভাই পৃথীবির শ্রেষ্ঠ সুন্দর ভাই।

বিছানা থেকে নেমে, অনেকটা দৌড়ে লনের ওপাশে বাথরুমের আয়নায় দাড়ালো অরণ্য-

এইতো ভাই-
দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর মনের ভাই- দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর বোনের ভাই- টি শার্ট টার আজ এক বছর- ছিড়ে গেছে – আর সে নিজে !!??

সে নিজে অনেকটা ফর্শা হয়েছে। আগে যেখানে বোনের কসমেটিক্স দিয়ে সাজিয়ে দিতো বোন আদরের অরণ্যকে- আজ বোনের মমতায় নিজেকে আরও সুন্দর করে সাজাতে- দুনিয়ার বিখ্যাত সব প্রসাধনী ব্যাবহার করে অরণ্য-
চুলগুলি আরও সিল্কি- চোখ অনেক ফর্শা- ঘামের গন্ধ নেই শরীরে-চুলের ছাঁটে একটু ভিন্নতা- লম্বা চিপ কানের নিচ পর্যন্ত। চুলও অনেক লম্বা তখনের তুলনায়। চোখের লাল মানচিত্র নেই- অনেক সুন্দর – নিজেই নিজেকে বলে অরণ্য-
সে পৃথীবিতে একমাত্র ওর বোন বীথির চোখে সবচেয়ে সুন্দর হতে চায়। কারন- বীথি- ওর সৌন্দর্যে সবচেয়ে বেশী খুশি হয়।

পনের হাজার কিলো দুরে – রাত তিনটা-
আর বীথি তার ভাইকে দেখেনি একবছর-
সে প্রবাসে, দুর দেশে-

আজ ভোরবেলায় বীথির গায়ে সেই নীল শাড়ী-
যা একবছর আগে এই দিনে তার ভাই অরণ্য টিউশনির টাকায় কিনে তাকে ঈদ উপহার দিয়েছিলো-
ফিরে যাওয়ার আগে নরম সুরে বলেছিলো- আপু-
একটা অনুরোধ রাখবি ?

বীথি বলেছিলো বল সোনা-

অরণ্য বলেছিলো- আপু নীল শাড়িতে তোকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে- ঈদ তো কাল-

তুই কি আজ নতুন শাড়িটা পড়ে দেখাবি !!

দেখা না একবার-
যদি আগের দিন একবার পড়লে, তোর ঈদের শাড়িটা পুরুনো না হয়ে যায় তোহ্ —॥

-০-
ছবি- নেট থেকে

৪০০জন ১৪জন
82 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য