নিয়তি

ফ্রাঙ্কেনেস্টাইন ২০ জানুয়ারী ২০১৫, মঙ্গলবার, ১২:৪৮:০০অপরাহ্ন গল্প ৪ মন্তব্য

রাইফেল হাতে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলেছে ক্যাপ্টেন পার্থিব ! সঙ্গে রয়েছে আরো ৪ সৈনিক। রাত প্রায় ৪টা। সূর্য উঠতে এখনো প্রায় ঘন্টা দুয়েক বাকি। এর আগেই মিশন শেষ করতে হবে তাকে। চারপাশে কেবল অন্ধকার। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদটার আবছা আলোতে রাইফেল হাতে তার প্রতিকৃতিটা কেমন যেন ভূতুড়ে দেখাচ্ছে !

পার্থিব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডো। এই মূহুর্তে তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে সামনের কলেজটায় জিম্মি হয়ে থাকা প্রায় চারশ ছাত্রীকে উদ্ধার করার ! ঘড়ি দেখলো সে। একটু অপেক্ষা করতে হবে। তাই একটা গাছের আড়ালে চলে গেল সে।

অন্য সব দিনের মতই সেদিন সকালেও নিশির মত প্রায় চারশ ছাত্রী কলেজে গিয়েছিল। কিন্তু কে জানতো কলেজ শুরু হওয়ার ঘন্টাখানেক পরেই সেখানে হানা দিবে বাংলাদেশী জঙ্গি সংগঠন আল-রায়েদা ! এদের মূল ঘাঁটি পার্বত্য চট্টগ্রামে। বেশ কিছুদিন ধরে সেনাবাহিনী-পুলিশ-র‍্যাব-বিজিবির সাথে এদের সংঘর্ষ চলে আসছে ওই এলাকাগুলোতে। এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে সরকার এদের কঠোর হাতে দমনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেনাবাহিনীর কমান্ডো ইউনিট, নৌ-বাহিনীর সোয়াডস আর বিমানবাহিনীর বিশেষ ফোর্স নিয়ে তৈরি করে এক যৌথ কমান্ড যাদের অপারেশনে একে একে কোনঠাসা হয়ে পড়ে আল-রায়েদা ! মাঝখানে পার্বত্য চট্টগ্রামে এদের দাপট থাকলেও এখন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। সেজন্য রাজধানী ঢাকায় যে জঙ্গিরা এভাবে এসে আক্রমণ চালিয়ে কলেজের ছাত্রীদের জিম্মি করবে এটা কেউ ভাবতেও পারেনি। মিলিটারি ইন্টিলেন্স আর অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও অবাক হয়ে গেছে কারণ এ ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে তার বিন্দুমাত্র আঁচও তারা করতে পারেনি !

মতিঝিলে অবস্থিত দেশের এই অন্যতম সেরা মহিলা কলেজে এমন আক্রমণের কারণে পুরো দেশই তোলপাড় হয়ে গেছে। জঙ্গিদের দাবী একটাই, আটকৃত কমান্ডার শায়েখ হান্নানকে মুক্তি দিতে হবে। আর দিতে হবে নগদ অর্থ ও অস্ত্র। ঘটনার পর পরই জরুরি বৈঠক বসে সচিবালয়ে। এরপরে যোগাযোগ করা হয় সশস্ত্র বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে। জরুরি ও অত্যন্ত গোপনীয় মিটিং শেষে কমান্ডো অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয় তারা। জানিয়ে দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীকে। তবে এই ব্যাপার সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয় মিডিয়ার কাছ থেকে। প্রেস কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী জানান, ” কোন কমান্ডো অভিযানের সম্ভাবনা নেই, ছাত্রীদের জীবনই অধিক মূল্যবান। তাই জঙ্গিদের সাথে আলোচনা করে মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হবে। ”

শীতের রাতে গাছের আড়ালে বসে বসে এই কথাই ভাবছে ক্যাপ্টেন পার্থিব। ঘড়িতে দেখে রাত ৪টা বেজে ৩ মিনিট। ঠিক সোয়া ৪ টায় তাকে আক্রমণে যেতে হবে। কিছু সময় আছে তাই আবার ভাবনার জগতে চলে গেলো সে !

সশস্ত্র বাহিনী হেডকোয়ার্টারে মিটিং এ কমান্ডো অপারেশনের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর পরই ইউনিট-৩ এর কমান্ডার মেজর আলমকে ডাকা হয়। মেজর আলমের ট্র্যাক রেকর্ড অনেক ভালো। আজ পর্যন্ত ১৭টি সফল অপারেশন তিনি পরিচালনা করেছেন। সেনাপ্রধান যে কোন কমান্ডো অপারেশনে সবার আগে তাকেই মনোনয়ন দিবেন। আর যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সেরা কমান্ডোদের পাঠানোর, তাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি জেনারেল মইজ। মেজর আলমের ইউনিটে নতুন পোস্টিং পেয়েছে পার্থিব। এই প্রথম সে কমান্ডো মিশনে যাচ্ছে। অনেক জটিল অপারেশন, তাই একটু নার্ভাস ছিল সে।

” ভয়ের কোন কারণ নেই, ইয়াং ম্যান। তুমি যথেষ্ট যোগ্য বলেই আমার ইউনিটে আসতে পেরেছ ! ” – এই বলেই তাকে অভয় দিয়েছিলেন মেজর আলম।

আসলেই ইয়াং ম্যান সে। এইচএসসির পর আর্মিতে যোগ দেয় সে। তিন বছর পর কমান্ডো ট্রেনিং এর জন্য মনোনয়ন পায়। এক বছর বিভিন্ন ট্রেনিং নেওয়ার পরেই সে ক্যাপ্টেন হিসেবে কমান্ডো ইউনিট-৩ এ যোগদান করে।

” স্যার সময় হয়ে গেছে ! ” – সার্জেন্ট মুকুলের কথায় বাস্তবে ফিরে এলো সে। সময় ৪টা ১১।
” হুম, সময় হয়ে এসেছে। সবাই রেডি হও। ” লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সে।

ঠিক সোয়া ৪টায় তাকে কলেজের পিছন দিক থেকে আক্রমণে যেতে হবে। সামনের দিক দিয়ে আক্রমণের দায়িত্ব মেজর আলম স্বয়ং নিয়েছেন। তার সাথে রয়েছে ১৭ জন কমান্ডো।

উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নিশি, মাস তিনেক পরে এইচএসসি পরীক্ষা দিবে সে। কলেজে এসেছিল স্পেশাল ক্লাস করতে। আর এখন পড়ে গেছে অনেক বড় বিপদে। জীবনে কোনদিন সে ভাবতে পারেনি এমন পরিস্থিতিতে তাকে পড়তে হবে ! ভীষণ ভয় পাচ্ছে তার। কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে কিন্তু জঙ্গিদের ভয়ে সেটাও পারছে না। আতংকে, ভয়ে প্রতিটা মূহুর্ত যেন শামুকের গতিতে পেরিয়ে যাচ্ছে !

রোমাঞ্চ, উত্তেজনা আর নার্ভাসনেস সব মিলিয়ে কেমন শীত শীত করছে পার্থিবের। বুকের ভেতরের ধকধক শব্দটা নিজেও শুনতে পাচ্ছে।
দীর্ঘ এক মূহুর্ত চোখ বন্ধ করে রাখলো সে। লম্বা শ্বাস নিয়ে আস্তে আস্তে ছাড়তে লাগলো। ঠিক ৪টা ১৩ মিনিটে সে উঠে দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে এগিয়ে যেতে লাগলো কলেজের দেয়ালটার দিকে। চোখে নাইট ভিশন গগলস রয়েছে।

আশপাশ পুরো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে এই আবছা অন্ধকারেও ! ভালো করে দেখে দেয়াল টপকে ওপাশে নামতে যাবে, এমন সময় তার হাত ধরে আটকে দিল একজন। দেখতে পেলো কারেন্টের কাঁটাতার।

স্পর্শ করেছে তো মরেছে ! আরেকটু হলেও গিয়েছিল সে। মনে মনে নিজেকে তাই গাল দেয় পার্থিব। এইজন্যই তো কোন গার্ড নেই এদিকে ! আরো সতর্ক হয়ে যায় সে। কিন্তু এখন ভিতরে যাবে কি করে ? দেয়ালের উপর এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে যে কারো চোখে পড়ে যেতে পারে।

হটাত দেয়াল ঘেষে থাকা গাছটা চোখে পড়ে তার। গাছের একটা ডাল অনেক দূর গিয়েছে। কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম না করতে পারলেও ওই ডাল থেকে লাফ দিয়ে হয়তো করা সম্ভব।
যেই ভাবা সেই কাজ। ডালের মাথায় গেলে ডাল ভেঙ্গে পড়তে পারে তাও একটু ঝুকি নিয়েই সে লাফ দেয়। লাফ দিয়ে সে কলেজ মাঠে এসে পড়েছে। একেবারে খোলা জায়গা। মাটিতে শুয়ে পড়ে সে। স্ক্রল করে এগিয়ে যায় মূল একাডেমিক ভবনের সিড়ির দিকে।

সিড়িতে যেতেই চোখ পড়ে এক গার্ডের উপর। চেয়ারে রাইফেল হাতে ঝিমাচ্ছে। কাছে যেতে একটু শব্দ হয়ে গেলো পার্থিবের ! ঝট করে চোখ মেললো সে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে, পার্থিবের এক হাত তার মুখে আর অপর হাতে ধরে থাকা ছুরিটা তার গলা কেটে দিয়েছে !

একে একে তার সঙ্গীরা চলে এসেছে। সবাই মিলে সাবধানে পৌঁছে গেলো দোতালায়। বিল্ডিংটা তিনতলা। তবে এখন তাদের নিশ্চিত হতে হবে যে ছাত্রীদের জিম্মি করে রাখা হয়েছে কোথায় !

দোতালাটা শুনশান দেখে প্রথমে বুঝতে পারেনি তারা, কিন্তু একটু এগোতেই দেখে এক জঙ্গির লাশ পড়ে আছে। বুঝে গেলো মেজর আলমের দল এখানে এসে পড়েছে আগেই। হটাত প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ শুরু হলো। মাথার উপরেই যেন হচ্ছে গোলাগুলিটা। বুঝতে পারলো সামনের সিড়ি দিয়ে তিনতলায় আক্রমণ চালিয়েছে মেজর আলমের দল। যার অর্থ জিম্মিরা তিনতলাতেই রয়েছে। পিছনের সিড়ি দিয়ে দৌড় দিলো তারা। যে করেই হোক কারো ক্ষতি হওয়ার আগেই সবাইকে উদ্ধার করতে হবে !

পিছনের সিড়ি দিয়ে উঠতেই দেখে দুইজন জঙ্গি আছে। সরাসরি গুলি করলো পার্থিব। এরপরেই তিনতলায় পৌঁছে গেলো সে। পিছনের সিড়ির ঠিক পাশেই দুটো হলরুম। এখানেই আটকে রাখা হয়েছে জিম্মিদের।

প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দে আতংকে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে নিশির। কেন এ গোলাগুলি কিছুই বুঝতে পারছে না। তাদের হলে থাকা জঙ্গিরাও বাইরে বেরিয়ে গুলি চালাচ্ছে কাদের দিকে জানি। কিন্তু একটু পরেই দরজায় জঙ্গিদের জায়গায় দেখা গেলো কালো পোশাক, মাথায় হেলমেট আর অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে কিছু মানুষ ! কারা এরা ? অবাক হয়ে ভাবতে থাকে নিশি।

মিনিট দশেক পরে গোলাগুলি থেমে যায়। মাথা থেকে হেলমেট খুলে নেয় পার্থিব। আতঙ্কে থাকা জিম্মিদের উদ্দেশ্যে বলে, ” আপনারা প্লিজ কেউ ভয় পাবেন না, আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পার্থিব। আপনারা এখন নিরাপদ। ”

পুরো রুম জুড়ে খুশির হুল্লোড় পড়ে যায়। অবাক হয়ে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে থাকে নিশি। কেন যেন তাকে তার ভালো লেগে যায়। অবাক হয়ে ভাবতে থাকে মানুষ এত দুঃসাহসী হয় কিভাবে !

এরপরের কিছুদিন ধরে তার স্বপ্নের জগতে ঘুরতে থাকে পার্থিবের ভাবনা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আস্তে আস্তে মন থেকে মুছে যেতে থাকে।

তিন বছর পরে একদিন নিশি মায়ের হাতে ছেলেটার ছবি দেখে সে ! দেখে পরিচিত পরিচিত মনে হয় কেন জানি ! তার মা জানায় ছেলেটা আর্মির মেজর। নিশির চাচার বন্ধুর ছেলে। নিশির সাথে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে নিশির চাচা। তিনি নিশির মত জানতে চান কারণ ছেলেপক্ষের কোন আপত্তি নেই।

অবাক হয়ে নিশি ভাবতে থাকে কেন চেনা মনে হলো তার কাছে। বিজলির ঝলকের মত মনে পড়লো সেই কমান্ডো অপারেশনের কথা। মনে পড়লো তার সেই ভালো লাগার কথা। খুশি হয়েই বিয়েতে রাজি হয় সে।

অন্যরকম এক উত্তেজনায় নিশির দিন কাটে। অবাক হয়ে ভাবে, নিয়তির এ একি অদ্ভুত এক খেল ! নাইলে কে ভাবতে পেরেছিল কোন চেষ্টা ছাড়াই নিয়তি এভাবে তাকে তার পছন্দের মানুষটার সামনে এসে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিবে !

৪৩৫জন ৪৩৫জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ