নিশীর গল্প ১

নীরা সাদীয়া ২৪ এপ্রিল ২০১৭, সোমবার, ০৬:১৪:০৭অপরাহ্ন গল্প ২০ মন্তব্য

18057132_1739057556385616_4851096777201654056_n

মেয়েটাকে চিনতাম অনেকদিন যাবত। শ্যামলামতন মিষ্টি দেখতে একটা মেয়ে,নাম নিশী।আমার সহপাঠী ছিল। খুব ঘুরে বেড়াতে ভালবাসত মেয়েটি,কিংবা বলা চলে বাস্তবতা থেকে বোধহয় পালিয়ে বেড়াত।কেননা তার পরিবারে কোন সুখ,শান্তি ছিল না। নিশীর বাবা অনেক নামকরা ব্যাবসায়ী,মা গৃহিণী। এক এক করে তার ভাইবোনের সংখ্যা নয়েতে গিয়ে থামল।সবাই আঁড়চোখে তাকাতো ওদের পরিবারের দিকে,কেননা আজকালকার যুগে কারো এত বেশি ছেলে মেয়ে থাকে না। শুধু কি তাই? তার মা ছিলেন প্রতিবন্ধী, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, যদিও সাধারনভাবে দেখে তা বোঝা যেত না। খুব সুন্দর, লম্বা, ফর্সা একজন মহিলা, যাকে অল্প সময় দেখে নিছক সুন্দরী ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। যাই হোক, মা অসুস্থ থাকলে একটি পরিবারের যা হাল হয় আরকি। আটটি মেয়ে ও একটি ছেলের মাঝে নিশিই বড়। তার কাঁধেই থাকত ছোট ভাইবোনগুলোকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব। সংসারে রোজ মায়ের সাথে বাবার, ভাইয়ের সাথে বোনের, বোনের সাথে বোনের ঝামেলা অশান্তি লেগেই থাকত। মায়ের আদর কোনদিনও পায়নি তারা,যেহেতু তাদের মা বোঝেনই না স্বামী কি,সন্তান কি! রান্না বান্না থেকে বেড়ে ওঠা সবই হত ছোটা বুয়ার হাতে। এসব থেকে পালিয়ে বাঁচতেই নিশী সর্বদা বাহিরে বাহিরে ঘুরে বেড়ায়। এলাকায় তার নামে টিটকারী কেটে অনেকেই বলতো, “পাড়া বেড়ানী মেয়ে”। এভাবেই বেড়ে উঠছিল নিশীথ অাঁধারের বুকে এক শ্যামল কণ্যা নিশী।……

নিশী যত বড় হয়, তার সাথে সাথে বেড়ে ওঠে একটি দেহ। শিশু থেকে শরীর হয়ে উঠতে লাগল সে নিজের অজান্তেই। এসব দিকে এই বয়সে খেয়াল রাখার কথা তার নয়, তার মায়ের। কিন্তু যার মা নিজের খেয়ালই রাখতে পারেন না,তিনি মেয়ের কি খেয়াল রাখবেন,কি করে কাক শকুনের গল্প বলবেন তার কণ্যাশিশুকে? তাই অযতনে বেখেয়ালে বেড়ে উঠতে থাকে মেয়েটি।চারপাশে কতজনের কত গুঞ্জন তাকে নিয়ে,অথচ একটু ভাল পরামর্শ দেবার মত কেউ নেই। এতসব নিত্য অপ্রয়োজনীয় অশান্তি নিয়ে যখন দিনাতিপাত করতে লাগল মেয়েটি, এমন সময় কোথা থেকে যেন উড়ে এল এক রোমিও,বলল, “ভালবাসি” তখন নিশীকে আর পায় কে? মা,বাবা, ছোট ছোট ভাইবোনকে যে ভালবাসে,কিন্তু তাকে কেউ জড়িয়ে ধরে না,পরম মমতায় আগলে রাখে না কপালে চুমু খেয়ে বলে না “আমার লক্ষী মেয়ে,আমার মা”…… সেই মেয়েটিকে নাকি কেউ ভালবাসে! এত যেন উত্তপ্ত মরুর বুকে এক ফোঁটা শিশির! কে আসল কে নকল বোঝার বয়স হয়নি তার, সে শুধু জানে সেও একটু ভালবাসা চায়,চায় একটু দরদভরা গলার স্বর। কতইবা আর বয়স, তের কি চৌদ্দ, এটুকু মেয়ে আর কিইবা বোঝে?

টনির মুখে এ কথা শুনে সেদিন আর চুপ থাকতে পারেনি নিশী। পাড়ার বখাটে টনির প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগল যেন। বাবা সারাদিন অফিস করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন।তাই সে কি করল,কোথায় গেল না গেল সেসব দেখার মত আর কেউ রইল না। এ সুযোগে রোজ চলে টনির সাথে গ্যারেজের ভেতর আড্ডা। একটু ধরা,একটু ছোঁয়া, টনির লালসা,নিশীর অজ্ঞতা…..এরই নাম ভালবাসা! এভাবেই দিন চলতে লাগল। কিছুদির পর তাদের আটতলা ফ্ল্যাটের চারতলার ভাড়াটিয়া সাজুও বলে দিল “লাভ ইউ জান!” একজনের ভালবাসাতেই টইটম্বুর অবস্হা, এর মাঝে আরেকজন! মন্দ হয় না ব্যপারটা! সাজুও সাড়া পেল। ধীরে ধীরে টনির লালসার শিকাড় গিয়ে ধরা দিল সাজুর খাঁচায়। টনি কি তা সহজে মেনে নেবে? তাই রোজ শুরু হল স্কুলে যাওয়া আসার পথে নানা হুমকি ধামকি!কিছুদিন যায়, আবার নিশীর দরজায় টোকা দেয় নতুন একজোড়া কামুক চোখ। এমন করে চলতে থাকে দিন,জোড়ায় জোড়ায় বাড়তে থাকে চোখের সংখ্যা। তাদের ভালবাসায় ভরপুর নব্য কিশোরীর রঙিন দুনিয়া। এটা সেটা উপহার আসতে থাকে, বাবার টাকায় বাড়তে থাকে বিলাসিতা আর সাজসজ্জা।

ছাত্রী হিসেবে নিশী বরাবরই ছিল মেধাবী।কিন্তু এত অঢেল পয়সা,বিলাসিতা আর এত পুরুষের আসা যাওয়া কিছুতেই তার মনটাকে স্থির থাকতে দেয়না। তাকে ঘিরে ধরে নানা অস্থিরতা, পরিবারে জট পাকায় কত অসহ্য যন্ত্রণা। তবু নিশী বেঁচে থাকে বাবার আদরে আর প্রেমিকদের ভালবাসায়।

একবার এক মে মাসের কথা। আমরা তখন সবে নবম শ্রেনিতে উঠেছি। ইংরেজি,অংক সহ বিজ্ঞানের সকল বিষয়ই আমাদের কাছে খুব শক্ত লাগছিল। তাই আমরা ইংরেজি পড়তে গেলাম বদরুল আলম স্যারের কাছে,তিনি একজন অধ্যাপক,তবে নবম শ্রেনির ছাত্র-ছাত্রী ও পড়ান। তিনি বয়সে যুবক,সদ্য একটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেছেন। আমরা চারজন পড়তে যাই যার মাঝে নিশীও ছিল।

চলবে…..

নীরা সাদীয়া
৮.০৪.১৭

৩৯০জন ৩৯০জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ