নিশীর গল্প
শেষ পর্ব
.
খালা,খালাত বোন, খালাত ভাই সকলকে পেয়ে তারা আহ্লাদে আটখানা। রোজ খালা নিশিকে চুল বেঁধে দেয়, খালাত বোনকে নিয়ে ঘুরতে বেরোয়, খালাত ভাই নানান প্রশংসা করে। বেশ কাটে একেকটি দিন।ও রমিজা খালার ছেলেমেয়েদের নামইতো বলা হয় নি। ছেলেটির নাম রনি,মেয়েটির নাম দীপা। রনি গ্রামের বাড়িতে জমি দেখাশোনা করত। এখন শহরে বাস করায় তাদের জমিগুলো দেখা শোনার কেউ নেই। তাই রনিকেই কিছুদিন পর পর গ্রামের বাড়ি যেতে হয় দেখাশোনা করতে। সেখানে সপ্তাহমতন থাকে,তারপর ফিরে আসে। এবার যাওয়ার আগে নিশীকে ছাদে ডেকে নিয়ে বলছে,

রনি: বাড়ি গেলে তোমাকে খুব মিস করি।
নিশী: আমিও।
:তাহলে বল, যে কদিন আমি থাকব না,আমাকে চিঠি লিখবে।
:লিখব। তবে রোজ নয়।
:কেন?
:ধুর পাগল, রোজ কি চিঠি দেয়া যায়?
:ও তাওতো কথা।আচ্ছা, তবে অন্তত দুটো চিঠি দিও।
:একটা দিব, যাও।

এই বলেই নিশী দৌড়ে গেল। কোথায় গেল কে জানে?
এরপর থেকে শুরু হল তাদের পত্র যোগাযোগ। যেন একটা দিনও কেউ কাওকে ছেড়ে থাকতে পারে না। কিন্তু মজার ব্যপার হল, রনির জন্য নিশী যে টান অনুভব করে তা আরও অন্তত না হয় ৩০/৪০ জনের জন্য করে! এত বড় মন হয় কারো? আমরা যতই দেখতাম,ততই অবাক হতাম। তখন বুঝতাম না এ কীসের টান? মনের নাকি শরীরের? একটু ছোঁয়া, মুহূর্তের কাছে আসা, তারা কি সেটাকেই মিস করত,নাকি একে অন্যের জন্য মন থেকে কিছু অনুভব করত? একটা মন একসঙ্গে কজনকে দেয়া যায়? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা মানে সে বয়সে আমাদের জন্য ইঁচড়ে পাকামো করা ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। তাই আমরা অতবেশি ঘাটাতে যেতাম না।

যাই হোক, এভাবেই বেশ চলছিল আমাদের দিনগুলি। দেখতে দেখতে নবম পাস করে দশম শ্রেনিতে উঠে গেলাম অামরা। সামনে এগিয়ে এল এস এস সি পরীক্ষা। তাই কেউ আর কারো খোঁজ রাখতে পারি না। নিজের পড়াশোনা নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত।এমন সময় একদিন ঘটে গেল এক ভয়ানক দূর্ঘটনা যা নিশীর ছোটবোন প্রভার কাছ থেকে জানতে পারলাম। প্রভা এসে বলল,

“জানো আপু কি হয়েছে?”

“কি প্রভা? কি দেখে ভয় পেয়েছ? অমন করে ছুটে এলে কেন?”

“আপু, রনি ভাইয়া আমাকে বলেছে নিশী আপুর ঘরে ভূত ঢুকেছে। আমি যেন সেদিকে না যাই।”

“তারপর?”

“তাই আমি যাইনি। দেয়ালে ফুঁটো দিয়ে সব দেখেছি।সব শুনেছি। রনি ভাইয়া নিশী আপুকে বলছিল, আজ তারা এমন আনন্দ করবে যা আজীবন মনে থাকবে। এজন্যেই কায়দা করে মাকে টাকা দিয়ে কাজের মেয়ে সহ সবাইকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাবা ফিরবে সন্ধ্যায়। বাড়িতে আর কেউ নেই। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, তাই ভাইয়া আমাকে খেয়াল করে নাই। তারপর ঘুম ভাঙলে আমাকে ভূতের ভয় দেখাল। আমিতো ভূতে ভয় পাইনা,কিন্তু রনি ভাইকে ভয় পাই। তাই চুপি চুপি ফুঁটো দিয়ে দেখলাম। দেখি রনি ভাইয়া আপুর সাথে বরফ পানির মত কি যেন খেলছে। আমাকে খেলায় নিল না। খেলতে খেলতে একবার ধরে ফেলল আপুকে। এরপর আরেকটা কি যেন খেলল অনেকক্ষণ ধরে। সেটা আমি বুঝতে পারিনি, তবে ভয় লাগছিল। খেলার শুরুতে আপু খুব কাঁদছিল। তখন ভাইয়া কানে কানে কি যেন বলল। আপু তারপর আর কাঁদেনি। চুপ হয়ে রইল। এভাবে কতক্ষণ ভাইয়া খেলতে থাকল আর হাসতে থাকল। আপু আর কথা বলছে না।আচ্ছা আপু কি মরে গেছে? নাহলে কথা বলে না কেন?”

এসব বলতে বলতে কেঁদে অস্হির ছোট্ট একটা মেয়ে প্রভা। আমিতো হতভম্ব। অনেকবার পা বাড়িয়েও সাহস কুলিয়ে উঠতে পারলাম না নিশীদের বাড়ির পথে যাবার। আবার প্রতিটা মুহূর্তে এ ঘটনাটা আমাকে তাড়া করছিল। আমি কিছুতেই মাথা থেকে এটাকে বের করতে পারছিলাম না।মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে যাব।

এরপর কেটে গেল অনেকগুলো দিন।ধীরে ধীরে ঘটনাটি ভুলে গেলাম। পরীক্ষা এগিয়ে আসছে,আর আমাদের পড়ার চাপ বাড়ছে। পড়া ছাড়া আর কিছুই মাথায় থাকল না। দেখতে দেখতে পরীক্ষা চলে এল। আমরা ভয়ে ভয়ে পরীক্ষা দিতে উপস্থিত হলাম। একটা করে পরীক্ষা শেষ হচ্ছিল আর মাথাটা হালকা হচ্ছিল। হঠাৎ একদিন শুনি নিশী পরীক্ষা দিতে আসেনি। তখন আবার মনে হয়ে গেল ঘটনাটা। আবার ভাবলাম,নিশীতো আগের পরীক্ষাগুলো দিয়েছে।তাহলে আজ হঠাৎ কেন এল না? তবে কি সে অসুস্থ?তার বাড়ি গেলাম খোঁজ নিতে। ছোট একটা বোন বলল,সে খালার বাড়ি গেছে।
পরীক্ষার মাঝখানে খালার বাড়ি যাওয়াটা আমার কাছে খুবই অস্বাভাবিক লাগল। কিন্তু আমিতো কিছুই জানতাম না। কিছু ভাবতেও পারি নি। অতপর লোকমুখে শুনলাম নিশী তার খালাত ভাইকে বিয়ে করে নিয়েছে।কিন্তু এটাও বুঝিনি পরীক্ষার মাঝখানে বিয়েটা কেন তার এতটা জরুরী ছিল। বোঝার বয়সটাও হয়নি তখন আমাদের। কিছুদিন পর কাজের বুয়া সব বলল, সে নাকি প্রচুর বমি করত,টক খেতো ইত্যাদি। যাই হোক, এসব শুনে আমাদেরতো মাথা নষ্ট।কিছুতেই মানতে পারললাম না যে এমন একটা কিছুও ঘটার মত ছিল।

আমরা পাস করে কলেজে ভর্তি হলাম। একদিন খবর পেলাম নিশীর একটা ছেলে হয়েছে। বর ও ছেলে নিয়ে নিশী বাবার বাড়িতেই থাকে,তার বাবা সব মেনে নিয়েছেন ইত্যাদি। কিন্তু বর খারাপ আচরণ করে, কোন কাজ করে না, বেকার, বর বাড়ির সকলকে বের করে দিয়ে সব একা দখল করতে চায় ইত্যাদি গল্প। লোকমুখে শোনা গল্প কতটুকু সত্য তা বলতে পারব না।তবে নিশী যে সুখে নেই তা বুঝলাম

নিশী এরই মধ্যে আবার আদাজল খেয়ে পড়াশোনা করতে লাগল। সে আবার এস এস সি দেবে। কিন্তু রনি তাকে কিছুতেই পড়তে দেবে না। বাহিরে যায়, টুকটাক কাজ করে, আবার বাড়ি ফিরে এসে তার মহান দায়িত্ব পালন করে, সেটি হচ্ছে নিশীকে পড়াশোনায় বিরক্ত করা। তারপরো মেয়েটি এগুতে চায়, খড়কুটো আশ্রয় করে দাঁতে দাঁত কামড়ে বেঁচে থাকতে চায়। এসময়টাতে পাশে ছিলেন একমাত্র তার বাবা,যিনি ভরসা দিয়ে, স্নেহ দিয়ে আগলে রেখেছেন তাকে। রনি কিছুতেই পড়াশোনা থামাতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিল নিশিকে নিজ বাড়ি নিয়ে যাবে। যা ভাবা তাই করল। বউ ছেলে নিয়ে নিজের ভাঙা চালায় উঠল। সেখানে চলত মেয়েটির ওপর রোজকার অত্যাচার। অত্যাচারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেলে বাবার বাড়ি চলে আসত, আবার কদিন পর ছেলের টানে ফিরে যেত। এভাবেই সে একদিন এস এস সি পাশ করে ফেলল। এতে তার সাহস আর জেদ দুটোই আরো বেড়ে গেল। তবে কাল হয়ে দাঁড়াল তার পতি। সে আর নিশীকে ঘরে তুলবে না। ছেলেকেও রেখে দেবে। কি আর করা, বাধ্য হল ছেলেকে ছাড়া একা বাবার বাড়িতে পরে থাকতে। তারপরো হাল ছাড়ল না সে। দেখতে দেখতে এইচ এসসি পাশ করে অনার্সে ভর্তি হয়ে গেল।এভাবেই এগিয়ে চলতে লাগল তার সংগ্রামী জীবনের একেকটা দিন।

এরই মধ্যে জীবনটাকে অন্ধকার করে দিয়ে চলে গেলেন স্নেহভরা সেই ছায়াতরুটি- বাবা। তার বাবা তার তপ্ত রুক্ষ দিনের শীতল হাওয়া ছিলেন। তার বাবা চলে যাওয়াতে যেন পৃথিবীটা আবার কেমন অচেনা হয়ে গেল । তবু লড়াই করতে হবে, তবু বাঁচতে হবে। এটাই তার বাবার শিক্ষা। তাই সে লড়ে যায়, বেঁচে থাকে। কেটে যায় একলা জীবন।

হঠাৎ একদিন অচেনা বসন্তের মত কোথা থেকে উড়ে এল কিছু গাঙচিল বাদল,শিহাব ও মহসিন। তারা নিশীর সাথে একই স্কুলে পড়ত। বিয়ে হয়ে যাবার পর তারা আর যোগাযোগ রাখেনি। কিন্তু এখন সে ডিভোর্সি এবং একাই আছে, তাই তারা তার পাশে বন্ধুর ছায়া হয়ে রইল। তারা যেন নিশীর নিশব্দ পৃথিবীতে কলকল ধ্বনি। তাদের পাশে থাকা ভুলিয়ে দিল অনেক দুঃস্বহ যন্ত্রনার জলছবি। বন্ধুত্বের উষ্ণতায় ঢেকে রইল জীবনের দগদগে ঘা গুলো।

তবু “পাছে লোকে কিছু বলে”
যেতে হয় তারে পিছু ফেলে।

সমাপ্ত।
২৪.০৪.১৭
নীরা সাদিয়া

৪৮৬জন ৪৮৬জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ