নিতান্তই ছায়াকাব্য (ছোটগল্প)

আলম দীপ্র ৫ ডিসেম্বর ২০১৪, শুক্রবার, ১০:৪৬:২৩পূর্বাহ্ন গল্প ১৪ মন্তব্য

যেদিন স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় আমার ছায়াটা আমাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আমার সঙ্গ ছেড়ে চলে গেল তখন কিছু একটা ঘটে গেল । কি সুদরভাবে কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে চলে গেল ! কিছু ফার্ন আর ছোটোখাটো উদ্ভিদের পাশে আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম , মূর্তির মতো । অতিমানবীয় অক্ষমতা আমাকে পুরোমাত্রায় গ্রাস করেছিল । আমার সামনে দিয়ে ছায়াটা হেঁটে চলে গেল কিছুই করতে পারলাম না আমি । এমনকি চেষ্টাটাও করার সুযোগ পেলাম না । কেবল কিছু হতাশার দেয়াল আবির্ভূত হল চারপাশে । আমার দিকে ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে রইল । মনে হল ছায়াহীন আমার লজ্জায় হাসছে । আমি মাথা নিচু করেছিলাম , লজ্জায় , বেদনায় । তারা তবু তাকিয়েছিল । সেই থেকে আমার ছায়াহীন জীবনের সূচনা ।
প্রথমে ভেবেছিলাম ছায়াহীন জীবনে এক সময় অভ্যস্ত হয়ে যাব । ভাবনা পর্যন্তই । দেখা গেল মধ্যরাতে ঘুম থেকে চিৎকার করে জেগে উঠি , হাতড়ে হাতড়ে আমার অতি পরিচিত ছায়াটা খুঁজি । মাঝে মাঝে কি যেন দেখতে পাই । চমকে উঠি । পরবর্তীতে তা কেবল হৃদয় বেদনা ই শুধু বাড়িয়ে দেয় । আমার কাজ শেষ হয় না । আমার চির অসমাপ্ত কাজ , খুঁজতে থাকা ।
একসময় ছায়াহীন নগ্নতাকে ঢাকার চেষ্টায় রত হলাম । এহেন চেষ্টা নেই যা করলাম না । সফলকাম হওয়া তবু সম্ভব হল না । উন্মত্ত নগ্নতা ক্ষণে ক্ষণে তীব্র উল্লাসে হর্ষধ্বনিতে লিপ্ত হয় । সাথে সাথে লজ্জারা এসে জড়ো । নিজেদের অস্তিত্বে নিজেরাই ছি ছি করে । অনেক কষ্টে মুখ লুকাই । লুকানোর ঠাই কেউ দেয় না ।
পাক পবিত্র হয়ে প্রার্থনায় বসি ।
“হে ! আল্লাহ , আমার অস্তিত্বের প্রতীক , আমার চিরসুন্দর অভিমানী ছায়া আমাকে ফিরিয়ে দেও । ”
কণ্ঠস্বর করুণ হয়ে আসে । গলা ভেঙ্গে যায় । এক সময় ফিস ফিস শব্দ বের হয় । নিজের কথা নিজেরই শুনতে কষ্ট হয় । তবে উচ্চ কণ্ঠের আড়ালে স্তব্ধ ইচ্ছের তুলনায় , ফিস ফিস কণ্ঠে তীব্র ইচ্ছা অনেকটাই শ্রেয় ।
কিছুদিন নিজেকে ঘরবন্দি করি । শ্বেত-শুভ্র কামরাটা । চোখের গোলকটা মনের অজান্তেই ঘোরাফেরা করে । পিপাসার্ত চোখে খুঁজে বেরায় একটা কালো রঙের অবয়ব ! হতাশা চক্ষুগোলকের মাঝ থেকে জল হয়ে বেরিয়ে আসে । বেরিয়ে আসাই তো ভালো । কিছুক্ষণ যায় , আবার সেই হতাশাগ্রস্ত অশ্রু তৈরির প্রক্রিয়া চলে গহীনে ।
বেশিদিন ঘরবন্দি হয়ে থাকা সম্ভব হল না । একসময় ঠিকই নগ্নতার চাদরে নিজেকে ঢেকেঢুকে সবার সামনে উপস্থিত হতে হল । কাঁপা কাঁপা পায়ে আমি পথ চলা শুরু করলাম । চারপাশে বার বার তাকাই । কি সুন্দর মানুষের জীবন । সবাই পাশাপাশি একজন সঙ্গীকে নিয়ে চলছে । সেই সঙ্গী অপার্থিব ! পার্থিবতার নোংরামি তাদের ছুঁয়ে যেতে পারে না । আমি যেন কেবল একা । নাহ মাঝে মাঝে আমার মতো কয়েকজন কে পেয়ে যাই । লজ্জায় যেন কুঁকড়ে আছে একেকজন । আমার দিকে কেউ কেউ তাকিয়ে থাকে । তাদের চোখ কেমন জানি জ্বলে ওঠে । ঠোঁট নড়ে ওঠে । কিন্তু তারা কিছু বলে যায় । তবে রেখে যায় কিছু বিচ্ছিরি অবয়বের দৃষ্টি । চুইঙ্গামের মতো তারা আমার পেছনে লেগে থাকে । সেই আঠালো ভাব দূর হতে সময় নেয় । আমি যেন পথভ্রষ্ট , ছায়াদেবতার খোঁজে পারি দিচ্ছি পথ ।
আমি যখন তখন সবকিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি । কিন্তু এ যে অসম্ভব ! আমার সেই অভিমানী ছায়াটাকে ভুলে যাওয়া যেমন ভুলে যাওয়ার প্রক্রিয়াই ভুলে যাওয়া ! আমার আশেপাশে ভাবনা মাকড়শারা জাল বুনে চলে । হাঁপাতে হাঁপাতে মাকড়শার জাল কাটতে উদ্যত হই । কি আশ্চর্য ! হাত এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায় । জাল থেকে যায় অক্ষত । বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে আরেকবার হাত চালাই , কখনও দেখা যায় জাল আর খুঁজে পাই না । বোঝা যায় জালগুলোর বাস্তব কোনও অস্তিত্ব আদৌ ছিল । এগুলো কেবলি আমার চোখের কোণে তৈরি হয়েছিল ।
কিছুদিন বাসে ওঠা ছেড়ে দিয়েছিলাম । লজ্জা ঢাকার এক প্রক্রিয়া । তবে পুনরায় বাসে ফিরে আসতে হল । লোকজনে ভরপুর দেখে একটা বাসে উঠে যাই । কাউকে দেখার সময় যেখানে কারো থাকে না । হয়ত জানালার দিকে মুখে ফিরিয়ে আনমনা ভাব নিয়ে বসে থাকি । না হয় ছদ্মবেশী পকেটমারদের ভিড়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি । মাঝে মাঝে পকেট কাটা পড়ে । আমার তেমন খারাপ লাগে না । যেখানে ছায়া হারিয়ে ফেললাম সেখানে এই সামান্য কারণে মন দূষিত করে কি লাভ ! হ্যাঁ ! মন তখন দূষিত হয় , যখন কেউ কেউ আমার দিকে নিবিড় চোখে তাকায় । তার চোখ জ্বলে ওঠে । একসময় লজ্জাময় হীন এক আচরণ করে । চোখে মুখে কৌতুকময় ঘৃণা ফুটে ওঠে । হয়ত তার অজান্তেই ঠোঁট বেঁকে যায় । তখন আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি । অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করি । একসময় বিপরীত মানুষটাও অন্যদিকে মনোযোগ দেয় । কিন্তু তার সেই দৃষ্টি আমাকে গুঁতোগুঁতি শুরু করে । সেই যন্ত্রণা মুখ চেপে সহ্য করি । ক্ষীণ আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে গিয়েও বের হয় না । হৃদয়ের কোনো এক কোণে স্থায়ী বসবাস শুরু করে । একসময় বংশবিস্তার করে । আমি কিছুই করতে সক্ষম হই না । কেবল আরও কিছু আর্তনাদের উৎপাদক হিসেবে কাজ করি ।
দিন দিন আমার অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল । একলা একলা পড়ে থাকি । খাওয়া-দাওয়া মুখে রুচে না । অন্ধকারের সাথেই কথা বলতে ভালো লাগে । ভালো লাগে নির্জনতার সাথে বসে থাকতে । বন্ধুদের আমার দূর অবস্থার কথা বলেছি । কেউ কেউ হা হুতাশ করে ! কেউ কেউ নিজের কাহিনী শোনায় ! কেউ আবার বলে , দোস্ত ঠিক হয়ে যাবে এতো চিন্তা করিস না । আহা ! কত সহজেই না বলে দেওয়া যায় !
সেদিন বাইরে বেরুতে যাব , হঠাত কিছু ছদ্মবেশী ছায়া আমার পথ রোধ করল । আমি হন্যে হয়ে আমার নিজের ছায়াকে খুঁজতে লাগলাম । কিন্তু ছায়ার যে কোনো চেহারা নেই , রঙ নেই ! কিভাবে সেই ঘন কালো অবয়বকে চিনি ! আমার চোখ দুটোর অস্থিরতা দেখে ছায়াগুলো হাসতে শুরু করল । আমার খুব রাগ হতে লাগল ! ইচ্ছে হল দু একটা ঘা বসিয়ে দিই তাদেরকে । কিন্তু সুপ্ত ভয় মনে নাড়া দিয়ে উঠে । কি জানি আমার নিজের ছায়াকে আঘাত দিয়ে দিই ! সেটা বড়ই দুঃখজনক হবে ! ভয়ে ভয়ে তাই দূরে সরে যেতে লাগলাম । তারা আমার পদক্ষেপে সচকিত হল ।
আমি ভয়ে ভয়ে পেছনে যাচ্ছি । তারা হিংস্র জন্তুর মতো আমার দিকে এগুতে লাগল । যেকোনো সময় অসহায় আমাকে তীব্র আঘাত করবে তারা । আমি নিরুপায় হয় চোখ বন্ধ করতে গেলাম । ঠিক তখন কি যেন একটা ঘটে গেল ! যেমন ঘটেছিলো আমার ছায়াটা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় । হুটহাট করে ক্ষুদ্র ঝড়ের মতন করে কালো অবয়বটা ঘরে প্রবেশ করে । বিশাল হাতে আমাকে ঘিরে দাঁড়ায় । ছদ্মবেশী ছায়াগুলো অপ্রতিভ হয়ে ওঠে । তাদের নিজ গোত্রের কাউকে তারা আঘাত করবে না ।
তারা পিছু হটতে থাকে । আমার ছায়া আমার দিকে তাকানোর মতো ইচ্ছে পোষণ করল না । চুপচাপ কাছে এসে দাঁড়ালো । তার আগমনে আমি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে গিয়েও করলাম না । যদি বিরক্ত হয় ! তাকে নিরবে আশ্রয় দেই ।
এখন আর আমি তেমন ভয় পাই না । ছায়ার পালিয়ে যাবার ভয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে বসে থাকি না , তার যা ইচ্ছা করবে ।
তার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে !

0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ