নিখাদ ভালোবাসা

তৌহিদ ২৪ জুলাই ২০১৯, বুধবার, ১২:২৯:১০অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৭ মন্তব্য

অনেককেই বলতে শুনেছি স্কুল জীবনেই প্রেমে পড়েছিলো বা হয়েছিলো অথবা কারো উপরে ক্রাশ খেয়েছিলো। তাদের অনেকেই মুখ ফুটে তার ভালোবাসার মানুষকে সে কথাটা বলতে পারেনি। হয়তো একতরফা প্রেম ছিলো সেটা। অথচ স্কুলের গন্ডিতে আমি প্রেম নামক বস্তুটিকে লজ্জা পেতাম। সে কারনেই আমার প্রেম হয় নাই।

কিন্তু কলেজে এসে আমিও একজনের উপর ক্রাশ খেয়েছিলাম। অবুজ মনের ভালোবাসায় পতিত হওয়া যাকে বলে। তিনি ছিলেন আমাদের কলেজের সবচেয়ে সুন্দরি মহিলা। আমাদের ক্লাসের ম্যাডাম, বিবাহিত কিন্তু নিঃসন্তান ছিলেন তিনি। আমার এই ভালোবাসায় কোনো নোংরামি ছিলোনা। ক্লাসে কিংবা ক্লাসের বাইরে তিনি আমাকে ডাকতেন এই দুষ্টু বলে। এ নিয়ে বন্ধুরা দারুন হিংসে করতো আমায়।

তিনি সবাইকে পড়া ধরতেন, না পারলে রাগ করতেন। সবার শেষে আমাকে বলতেন- এই দুষ্টু এবার তুমি বলতো….. আর ক্লাসের সবাই মিটি মিটি হাসতো। আমিও মুচকি হাসি দিতাম আর বলতাম ম্যাডাম পারবোনা। তিনি বলতেন উহ! এই দুষ্টুকে নিয়ে আর পারা গেলোনা। আমার প্রিয় ম্যাডাম।

ক্লাসের বাইরে কলেজ মাঠে, রাস্তায় যখনি দেখা হতো তখনি বলতেন – এই দুষ্টু কেমন আছ?

আমিও মুচকি হাসি দিয়ে বলতাম- ভালো আছি ম্যাডাম।

দীর্ঘ আঠারো বছর তার সাথে আর দেখা হয়নি। আজ আকস্মিকভাবেই তার সাথে দেখা রাস্তায়। ছোট্ট ফুটফুটে এক বাবুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। সামনাসামনি পড়ে যাওয়াতে আমি সালাম দিলাম। তিনি উত্তর দিয়ে বললেন- ভালো আছো তৌহিদ? আমার নাম তিনি মনে রেখেছেন!

– জ্বী ম্যাডাম। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম তিনি একটুও বদলাননি, ঠিক শেষবার যেরকম দেখেছিলাম তেমনি আছেন।

কোথায় আছি, কি করছি এসব জিজ্ঞেস করছেন আর এর ফাঁকে তার কোলের বাচ্চাটি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো, আমিও হাত বাড়িয়ে তাকে কোলে নিলাম।
– এটা আমার ছোট মেয়ে। ছেলে বড়, ক্যাডেটে পড়ে।

বাচ্চাটি আমার গাল টানছে, নখ দিয়ে ঠোঁটে চিমটি কাটছে। উহ! অসহ্য।

ম্যাডাম বললেন- এই দুষ্টু!

কি বলছেন ম্যাডাম! আমাকে এই বয়সে এসেও ভরা রাস্তায় সবার সামনে এই দুষ্টু বলে ডাক দিচ্ছেন! আহ! সেই প্রিয় শব্দগুলি দিয়ে তিনি আমাকে ডাকছেন!

দাও আমার কোলে দাও বাবুকে, না হলে একটু পরে তোমার চুল টানতে শুরু করবে – ম্যাডাম আমাকে বললেন।

ওহ! তাহলে তিনি তার বাচ্চাকে এই দুষ্টু বলে ডাকছিলেন এতক্ষন! এটা ভেবে মনটা কিঞ্চিত খারাপ হলো আমার।

তৌহিদ তুমি কিন্তু আগের মতই আছ। শুধু ভুঁড়ি হয়েছে আর চুলে পাক ধরেছে, চুলও পাতলা হয়ে যাচ্ছে তোমার।
– এই একটু আধটু ম্যাডাম।
– নাহ! যত্ন নাও, না হলে ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার নানান সমস্যা অল্প বয়সেই জেঁকে বসবে শরীরে।

মনে মনে বললাম – ম্যাডাম আর একটুক্ষন আপনার পিচ্চি আমার কোলে থাকলে আমি নিশ্চত আরো তিন চারটা চুল মাথা থেকে সে নাই করে দিত।

বললাম আপনার বাবুটা কিন্তু দারুন দুষ্টু! তিনি আমার দিকে চেয়ে থাকলেন। আমার কথাতে কি রাগের কোন বহিঃপ্রকাশ ছিলো? আশ্চর্য আমার রাগ উঠছে কেন? মনে হচ্ছে এখান থেকে চলে যেতে পারলেই আমি বাঁচি।

তিনি আমার পরিবারের সবার খোঁজ খবর নিলেন। কলেজে আসতে বললেন একদিন।
– জ্বী আচ্ছা ম্যাডাম। তার গাড়ি চলে এসেছে।
– আচ্ছা ভালো থেকো, আর অবশ্যই যোগাযোগ রেখো কিন্তু!
– ঠিক আছে ম্যাডাম।
আমি দাঁড়িয়ে আছি, তিনি চলে গেলে তারপর রিক্সা নিব।

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- তৌহিদ, তোমার মনে আছে কলেজে আমি এই দুষ্টু বলে ডাকতাম?
আমি বললাম- মনে আছে ম্যাডাম। কিন্তু কি আশ্চর্য কলেজের সেই মুচকি হাসিটা আমার আজ আর এলোনা!
– আচ্ছা ভালো থেকো, এ কথা বলে তিনি চলে গেলেন।

আমি সালাম দিয়ে তাকে বিদায় জানিয়ে বাসায় ফেরার সময় রিক্সায় বসে ভাবছি- তার সাথে কাটানো শেষ সময়টুকুর কথা। আমারতো মনঃক্ষুন্ন হবার কথা না। তবে কি হিংসে? আমার সামনে তার বাচ্চাকে এই দুষ্টু বলে ডেকেছে তাই! দুধের বাচ্চাকে হিংসে করছি আমি! অদ্ভুত এই মানবমনের প্রকৃতি, নিজের স্বার্থ সবসময় দেখে।

আমি বুঝতে পারলাম কেন আমাকে এই দুষ্টু বলে ডাকতেন ম্যাডাম। নিঃসন্তান তিনি হয়তো কলেজে আমাকে সন্তানের মত ভালোবাসতেন। আমার মাঝেই নিজের সন্তানের মুখ কল্পনা করতেন। অথচ কলেজে জীবনে এটা নিয়ে তার মাঝে কখনওই কোন অতিরঞ্জন ছিলোনা। আমিও ওই অতটুকুন ভালোবাসা পেয়ে হয়তো তার প্রেমে পড়েছিলাম। প্রত্যেকটা মানুষ যে শুধু বিশুদ্ধ ভালোবাসাই পেতে চায়।

কি বোকা ছিলাম আমি! আজও তাই রয়ে গেছি। ভালো থাকবেন প্রিয় ম্যাডাম।

——————
তৌহিদ, রংপুর।

৫০০জন ১৪৭জন
53 Shares

২৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ