২০০৪ বা ‘৫ সালের কোন এক সময় আমি নিউজিল্যান্ডে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিই এক এজেন্টের মাধ্যমে যে নিজেই নিউজিল্যান্ডে বসবাস করে, আমার উদ্দেশ্য ছিলো আর দেশে থাকবোনা, নিউজিল্যান্ডে প্রচুর সুযোগ সুবিধা আছে, সেই সময় ওখানে যেকোন ধরণের ব্যবসা করলে অথবা বাড়ি কিনলে ওখানকার সিটিজেনশিপ পাওয়া যায়, একি উদ্দেশ্যে এগুতে হলে এজেন্টের মাধ্যম ব্যবহার করাটা বেস্ট ছিলো, সেই আমার ভিসা করিয়ে আনলো ভারত থেকে কারণ বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোন এম্বেসি নেই, এজেন্টের সাথেই আমার ডিল ছিলো ও আমাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করবে নিউজিল্যান্ডে বসবাস করার জন্য।
এনিওয়ে একদিন আমি রওনা হয়ে গেলাম মালেশিয়ান এয়ারওয়েজের বিমানে চড়ে, আমাদেরকে এক রাত স্টে করতে হবে মালেশিয়াতে, এয়ারলাইন্স কোম্পানি আমাদের জন্য হোটেল দেবে ফুড সহ।
বিমানেই কিছু বয়স্ক ভদ্রলোক ও মহিলার সাথে পরিচয় হলো যারা নিউজিল্যান্ডে যাবে একি বিমানে, আমরা সন্ধ্যার সময় মালেশিয়ার এয়ারপোর্টে পোঁছে গেলাম, আমাদেরকে এয়ারলাইন্সের বাস এসে এয়ারপোর্টের লাগোয়া প্যান প্যাসেফিক হোটেলে দিয়ে এলো, আমরা আমাদের পাসপোর্ট টিকেট দেখিয়ে যার যার রুম পেয়ে গেলাম, বেল বয় আমাকে রুমে দিয়ে গেলে আমি কাপড় চেইঞ্জ করে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে নিচে নামলাম ডিনার করার জন্য, ডাইনিং টেবিলেই পেয়ে গেলাম আমার সহযাত্রীদের, এই সুযোগে ওদের সাথে আমার খুব খাতির হয়ে গেলো।

ডিনার শেষে রুমে ফিরে এসে মিনিবার থেকে ভদকার দুইটা মিনি বোতল নিয়ে কিছুক্ষণ খেলাম, এরপর দিলাম ঘুম, সকাল সাতটায় ঘুম ভাঙলে বাথরুমে গোসল করে ফ্রেস হয়ে নিচে নামলাম ব্রেকফাস্ট করার জন্য, রেস্টুরেন্টে নিজের কুপন জমা দিয়ে জয়েন করলাম আমার সহযাত্রীদের সাথে, উনারা অলরেডি খাওয়া শুরু করে দিয়েছেন।
আমি প্রথমে গেলাম ব্রেড, বাটার, অমলেট নেওয়ার জন্য, সাথে এক গ্লাস অরেজ জুস নিয়ে ফিরে এলাম, আমাকে এইসব খেতে দেখে পুরান ঢাকার হাসবেন্ড ওতাইফ দুই মুরুব্বি বললেন “কি ভাই আপনি তো দেখি খুব অল্পই খান, গতরাতেও অল্প খেয়েছেন আর এখনো কম খাচ্ছেন”?
আমি হাসলাম একটু, ওগুলো খাওয়া সেরে গেলাম বুফেতে দেওয়া লাজানি পাস্তা নিতে, সাথে আরো এক গ্লাস জুস সাথে নিয়ে এসে খেতে লাগলাম, উনারা বললেন ” বাহ আপনি তো দেখছি এইটাও খান, তা এইটা কি জিনিষ “?
আমি বুঝিয়ে বললাম উনাদের কি ধরণের পাস্তা এইটা, বললাম আপনারাও খান, খেতে বেশ সুস্বাদু, উনারা উঠে গিয়ে আনতে গেলেন, লাজানি খাওয়ার পর উঠে গিয়ে এক প্লেট ভর্তি করে বিভিন্ন ফ্রুট যেমন, ড্রাগন ফ্রুট, কিউয়ি, তরমুজ, আনারস, আম, কলা, আপেল, আঙ্গুর ইত্যাদি নিয়ে সাথে আরো এক গ্লাস জুস নিয়ে টেবিলে ফিরে আসার পর দেখি সহজযাত্রীরা আমার প্লেট দেখে অবাক, জিজ্ঞেস করলো আমি একা খাবো কিনা?
আমি হেসে বললাম হাঁ একাই খাবো।

আমরা সবাই ব্রেকফাস্ট শেষে যার যার রুমে ফিরে গেলাম, আমাদের আজকের ফ্লাইট রাত নয়টাতে, দুপুরে লাঞ্চের জন্য একবার নামলাম, অল্প কিছু খেয়ে রুমে এসে ব্যাগ ব্যাগেজ রেডি করে কিছুক্ষণ রেস্ট করে সন্ধ্যা ছয়টার সময় নিচে নেমে এলাম আমার লাগেজ নিয়ে, রিসেপশনে দোর কার্ড ফেরত দিয়ে তাদের বিলে সাইন করে অপেক্ষা করছি সহযাত্রীদের জন্য, ওরা ইতিমধ্যে সবাই চলে আসলে এক সাথে গাড়ীতে চেপে রওনা হলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে, এয়ারপোর্টে পোঁছে নিজেদের ট্রানজিট ফরমালিটি পূরণ করে অপেক্ষা করছি লাস্ট কলের, এক ঘন্টা আগে লাস্ট কল শুনে আমরা বিমানে চড়ে বসলাম।
ফ্লাইট টেইকঅফ করলো আমাদের নিয়ে, পরদিন দুপুরে নিউজিল্যান্ডের বৃহত্তম শহর অকল্যান্ডে আমাদের বিমান ল্যান্ড করলো, আমরা অকল্যান্ড এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেক শেষে বের হয়ে আসলে, পুরান ঢাকার মুরুব্বি উনার মেয়ের ফোন নাম্বার দিয়ে যোগাযোগ করার অনুরোধ করে বিদায় নিলেন, আমি এগিয়ে গেলাম এয়ারপোর্টের বাস স্ট্যান্ডের পাশে, সেখানে টিকেট কাটতে হয় মেসিনে, শুধু মেসিনে লিখতে হবে আমি কোথায় যাবো, টিকেটের টাকা জমা দিলে টিকেট বেরিয়ে এলো, বাস এসে পড়েছে দেখে আমি বাসে উঠেই বাস ড্রাইভারকে টিকেট দেখালে বললো, সেন্ট্রাল হোটেল?
আমি হাঁ বললে সে আমাকে সিটে বসতে বললো, প্যাসেঞ্জারদের নিয়ে আমাদের বাস এগিয়ে চললো আমাদের গন্তব্যে, এক সময় আমার হোটেলের অন্য পাশে নামিয়ে দিলো।

পরদিন সকালে আমার এজেন্ট এলো আমাকে তার বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য, সে গতরাতে এসেছে ঢাকা থেকে, তার বাসাতেই থাকবো।
তার বাসায় যাওয়ার আগে এক ইমিগ্রেশন এজেন্টের সাথে পরিচয় করায়ে দিলো ওর অফিসে নিয়ে গিয়ে, পরদিন সেই এজেন্ট পরদিন এসে আমাকে নিয়ে যাবে।
এরপর আমরা তার বাসায় গেলাম, ওর ওয়াইফ আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালো, উনার বাসাটা এক আলিশান ভাবে তৈরি, দুই তলা বিল্ডিংয়ের দুইটা পার্ট আছে, একটাতে নিজে থাকেন আর আরেকটা ভাড়া দিয়েছেন, কথায় কথায় জানলাম বাড়ীটা কেউ কিনতে চাইছে কিন্তু উনি বিক্রি করবেননা, বর্তমান মূল্য পাঁচ লাখ ডলার, তখন নিউজিল্যান্ডের প্রতি ডলার চল্লিশ টাকা।
উনারা আমাকে একটি আরাম দায়ক বেড সহ রুম দিলেন যার পাশেই আল্ট্রা মর্ডান বাথরুম ও টয়লেট আছে, আমার রুমটাতে বাইরে বেরুনোর জন্য বড় একটা স্লাইডিং গ্লাস ডোর সহ গ্লাস ওয়াল আছে, রুম থেকেই পিছনের ছোট গার্ডেন দেখা যায়, সকালে প্রচুর পাখি আসে সেই বাগানে।
আমার ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার সহ সব কিছুই আমার এজেন্টের সাথে এরেঞ্জ করা হয়েছে।
পরদিন সকালে লোকাল এজেন্ট মার্ক আসলো আমাকে নিয়ে যেতে, পথমে গেলাম ব্যাংকে একাউন্ট খুলার জন্য, একাউন্ট খুলার সাথে সাথেই পেলাম ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড, আমি চাইলে বাংলাদেশের স্টান চ্যাট, এচএসবিসি থেকেও টাকা তুলতে পারবো।
এরপরে গেলাম ওর অফিসে, সেখানে আমার কর্ম সিদ্ধি কিভাবে হবে তা জানালো, জানলাম আমি যদি একটা বাড়ি করি তাহলে আমি দেবো এক লাখ ডলার, বাকি তিন লাখ ডলার ব্যাংক লোন দেবে।
আরো জানলাম ওদের আদিবাসী মাওরি জাতির কথা, যারা সভ্যতার সাথে মিসে থাকলেও নিজেদের সভ্যতাকে বিষর্জন দেয়নি, অকল্যান্ড টাওয়ার দেখলাম যার উপরিভাগ উপর থেকে ঘুরে ঘুরে নিচে নেমে আসে, মানুষজনকে নিয়ে আবার উপরে উঠে যায়।

সেইদিন আসার পথে পুরান ঢাকার মুরুব্বিদের সাথে দেখা করতে গেলাম, উনারা আমাকে স্বাদরে গ্রহণ করলেন, ওদের সাথে এক সাথে লাঞ্চ করলাম, গল্প গুজব করে বিদায় নিলাম, উনার মেয়ের জামাই আমাকে গাড়ী করে নামিয়ে দিতে গেলেন, অনুরোধ করলেন ঈদের দিন উনাদের সাথে ঈদ জামাতে যাওয়ার জন্য, আমি পরে জানাবো বলে বিদায় নিলাম।
দুইদিন পরেই ঈদ কিন্তু এজেন্ট ভদ্রলোকের বাসা থেকে কিছু বলছেনা দেখে ঈদের আগের দিন রাতে বললাম যে আমাকে অমুক ফ্যামিলি থেকে ঈদের জামাতে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে, উনারা বললেন আপনার সুবিধা যেভাবে হয় করবেন, আমি আমন্ত্রণদাতাকে ফোন দিয়ে বললাম আমাকে উঠিয়ে নিতে, পরদিন ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে অপেক্ষা করছি এর মধ্যে উনারা এলেন আমাকে নিয়ে যেতে, কাছেই মসজিদ আছে, উনারা আমাকে নিয়ে গেলেন, মসজিদ মানে আহামরি তেমন কিছুই না, নেই বড় গুম্বুজ, না আছে মিনার, বড় একটা হল রুমের মতো ঘর, পাশে আরো কিছু রুম আছে যেখানে মহিলারা নামাজ পড়বেন, ফ্লোরে কার্পেট দেওয়া যাতে একটা করে ঘর দেওয়া আছে যেন একটা ঘরে একজন করে দাঁড়াতে পারেন, মানুষজন তেমন নেই, সব মিলিয়ে হয়ত এক দেড়শ মানুষ হয়েছে জামাতে, ইমাম হলেন পাকিস্তানি, যে বেশি ইংরেজিতে এ উর্দুতে বয়ান দিচ্ছে, নামাজ শেষ করার পর আমরা সবাই বসে রইলাম খুৎবার জন্য, যা প্রথমে ইংরেজি ও আরবিতে পড়লেন ইমাম সাহেব, এরপর মুনাজাত শুরু হলে আমরা মুনাজাত করলাম, এরপর শুরু হলো কোলাকুলি, এই কোলাকুলিতে সবাই সবাইর সাথে কোলাকুলি করছে, আপনার পরিচিত না হলেও সবাই কোলাকুলি করছে।

সব শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমরা প্রথমে গেলাম মুরুব্বিদের কাছে, সেখানে হাল্কা কিছু খেয়ে আমি বিদায় নিলাম, উনারা আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেলো, আমি এজেন্টের বাসায় ফিরে ভদলোকের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের মোবারক বাদ দিলাম, উনার ওয়াই, বাচ্চাদেরকেও ঈদ মুবারক জানালাম, উনারা আমাকে দুপুরের খাওয়ার জন্য টেবিলে বসালেন, ভাবী ভদ্রমহিলা প্রচুর আয়োজন করেছেন, পোলাও কোরমা, রোস্ট সহ ইত্যাদির আয়োজনে মুগ্ধ হলাম, উনার রান্নার হাতও বেশ।
এর কয়েকদিন পরেই আমার রিটার্ন ফ্লাইট, আসার আগের রাতে ভদ্রলোকের সাথে বসে উনার বিল মিটিয়ে দিলাম, পরদিন উনি আমাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে গেলেন।
এইখানে উল্লেখ করতে চাই, অকল্যান্ডে প্রায় ছোট বড় ভূমিকম্প হয়, এইখানে বেশ কিছু সুপ্ত আগ্নেয়গিরি আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, এইখানকার প্রতিটি বাড়ি বানানোর সময় বাড়ির কাঠের পিলারের নিচে রাবার জাতীয় কিছু দেওয়া হয় যেন ভূমিকম্পের কারণে বাড়ি গুলোর কোন ক্ষতি নাহয়, অকল্যান্ডের আবহাওয়া না ঠান্ডা, না গরম থাকে, শীতে অল্প সল্প শীত অনুভূত হয়।
আমার এরপরের গন্তব্য ছিলো মালেশিয়া, যেখানে আমি চার রাত ছিলাম, এরপর দেশে ফিরে আসি।

……. সমাপ্ত।

৪৬৫জন ২৫৫জন
75 Shares

৩১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য