নিঃস্বঙ্গ প্রেম (২য় পর্ব)

আর্বনীল ১৭ এপ্রিল ২০১৪, বৃহস্পতিবার, ১১:৫০:০৩পূর্বাহ্ন গল্প ৮ মন্তব্য

‘অর্ক’র ফুফুর মেয়ে নবনী এবার কলেজে ভর্তি হয়েছে। আজ তার ক্লাসের প্রথম দিন। সে একা যাবে না। কেউ একজন সাথে গিয়ে ওকে কলেজে পৌছে দিয়ে আসতে হবে। অর্ক’র বিবিএ ফাইনাল পরিক্ষা শেষ। এখন কাজকর্ম নেই বললেই চলে। তাই এই মহান বিরক্তিকর কাজ করার দায়িত্ব পরল তার উপর। কি আর করা নবনীকে ঠিক ঠাক মত কলেজে পৌছে দিল ঠিকই। যত ঝামেলা হল ফেরার পথে। বাসার কাছাকাছি আসতেই অর্ক দেখল রাস্তার পাশে লোকজন জড়ো হয়ে কি যেন দেখছে। অর্ক সেদিকে এগিয়ে গেল। ২০-২১ বছরের একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাদঁছে। আর উৎসুক জনতা তা দেখে মজা পাচ্ছে। অর্ক মেয়েটার কাছে গিয়ে বলল, কি হয়েছে? এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলে মানুষের মত কাদঁছেন কেন? মেয়েটা কাদঁতে কাদঁতেই বলল, আমি হারিয়ে গেছি।

হারিয়ে গেছেন মানে কি?

আমি বান্ধবীদের সাথে পিকনিকে এসেছিলাম। পথের মাঝে বাস নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সবাই বাস থেকে নেমে আশে পাশে যে যার মত করে হাঁটছিলাম। তখন হারিয়ে গেছি।

মেয়েটাকে দেখতেই কেমন বোকা বোকা লাগছে। অর্ক বলল, আপনি বোকা নাকি? আপনার কাছে মোবাইল ফোন নেই? বান্ধবীদের ফোন করুন তাহলেই তো হয়।

মেয়েটা সাথে সাথে ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করল। মনে হয় সে ভুলেই গিয়েছিল যে ওর কাছে একটা মোবাইল ফোন আছে। কিছুক্ষন মোবাইলে কথা বলে মেয়েটা আবারো কাদঁতে শুরু করল।

অর্ক বলল, কি হল আবার কাদঁছেন কেন?

মেয়েটা চোখ মুছতে মুছতে বলল, ওরা অনেক দূর চলে গেছে। এখন আমি যাব কি করে?  :’(

অর্ক জানতে চাইল কোথায় যাবেন আপনি?

চিটাগং।

কাঁন্না বন্ধ করে চলুন আমার সাথে। আপনাকে চিটাগং এর বাসে তুলে দেই। আপনি চলে যান।

মেয়েটা বলল, আমি একা যেতে পারব না। একা কখনো কোথাও যাইনি।

এমন কথা শুনে আশে-পাশে লোকজনের হাসি আর কে দেখে! মানুষগুলো যে কি অদ্ভত!। অর্ক’র নিজেরও মেজাজ কিছুটা গরম হয়ে গেল। বলে কি মেয়ে! এত বড় মেয়ে নাকি একা কোথাও যায়নি। অর্ক ধমক দিয়ে বলল, কাঁন্না থামান। সেই তখন থেকে বাচ্চা মেয়েদের মত কেঁদে যাচ্ছেন।

মেয়েটা বোধহয় প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। কাঁন্না থামিয়ে চোখ বড় বড় করে অর্ক’র দিকে তাকিয়ে রইল। তাকানোর মাঝে কেমন একটা অসহায় ভাব। মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে অর্ক’র নিজের কাছে খারাপ লাগল। এমন ভাবে ধমক না দিলেও হত। কি নাম আপনার?

মেয়েটা ভয়ে ভয়ে বলল, না…না… নায়লা।

আপনি একা যেতে পারবেন না। তো এখন করবেন কি?

আমি জানিনা।

এখানে আপনার কোন আত্বীয়-স্বজন আছে?

নায়লা না সূচক মাথা নাড়ল।

অর্ক মনে মনে বলল, ভালো বিপদে পরা গেল তো। এখন কি করবো; ওকে ওর মত রেখে চলে যাব? না এটা করা ঠিক হবে না। একা একটা মেয়ে মানুষ। তার উপর চেহারা তো মাশাল্লাহ! বখাটে ছেলেদের হাতে পরলে তো আর কথাই নেই। তার চেয়ে আপাদত বাসায় নিয়ে যাই। পরে যেটাই হোক একটা ব্যাবস্থা করা যাবে। চলুন আমার সঙ্গে।

নায়লা বলল, কো…কোথায় যাব?

জাহান্নামে।

আমি কেন জাহান্নামে যাব? আমি যাব না।

আমি বলছি তাই যাবেন। কোন কথা না চলুন…

নায়লা বলল, আমি কোথাও যাব না।

বেশ! তাহলে আর কি করা? আপনি বরং এখানে থেকেই বখাটে ছেলেদের পাশার গুটি হোন। আমি গেলাম। অর্ক বাসার দিকে হাঁটা ধরল। কিছুদুর যেতেই নায়লাও তার পিছনে পিছনে যেতে শুরু করল। অর্ক থামল। নায়লার দিকে ফিরে তাকাতেই …

নায়লা ভয়ে ভয়ে বলল, আমি যাব।

অর্ক একটা হাসি দিল। তবে এটা যুদ্ধ জয়ের হাসি নয়। সম্পুর্ন অচেনা-অজানা একটা মেয়ে তাকে বিশ্বাস করতে পেরেছে। সে জন্যই হাসি। অর্ক বলল, চলুন যাই……

 

এই হল ঘটনা। কিন্তু এই সহজ কথাটা তার বাবাকে কে বুঝাবে? এখন বুঝাতে যাওয়া মানেই বাবাকে আরো উত্তেজিত করে তোলা। এটা করা একেবারেই ঠিক হবে না। তার চেয়ে ভাল হয় বাবার কথা মত বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া। বাবা একটু বোঝুক অকারনে এতো রাগ করা ঠিক না। সব ঘটনার পেছনে একটা কারণ থাকে। সেটা না জেনে কাউকে শাস্তি দেওয়াও উচিত না। অবশ্য একদিকে ভালোই হল। এ ফাকে অর্ক কয়েকদিনের জন্য বাইরে থেকে ঘুরে আসতে পারবে। চার দেয়ালের ভেতর বসে থাকতে থাকতে সে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নায়লা মেয়েটাকে নিয়ে কি করবে? বেচারি বিপদে পরে এসেছে। আচ্ছা অভির বাসায় রেখে আসলে কেমন হয়? ওতো অর্ক’র ছোটো কালের বন্ধু ও নিশ্চয় ব্যাপারটা বুঝবে। কিন্তু… নাহ! এটাও ঠিক হবে না। অভির মা বাবা আবার কি না কি ভেবে বসে কে জানে? ধ্যাৎ!! এছাড়াতো আর কোন বুদ্ধিও মাথায় আসছে না। অর্ক নিজের মাথার চুল নিজেরই ছিড়তে ইচ্ছে করছে তার।

 

ভেতরে আসব?

লুঙ্গি আর শার্ট পড়ে নায়লা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অর্ক বলল, হ্যা আসুন। কিন্তু আপনি এসব পড়ে আছেন কেন?

আমি শাড়ি পরতে পারি না জেনে ওই আন্টিটা এসব পড়তে দিয়েছে।

অর্ক মনে মনে বলল, তারমানে এইটা ফুফুরই কাজ? তিনি আর কিছু পেলেন না। শার্ট আর লুঙ্গিই দিতে হল?

নায়লা বলল, আপনি সারাদিন কোথায় ছিলেন? এখানে কাউকে আমি চিনি না। একা একা খুব ভয় লাগছিল।

নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হচ্ছে অর্ক’র। পুরো দিনটা বন্ধুদের সাথে আড্ডা না দিয়ে মেয়েটাকে কিছু সময় দেয়া উচিত ছিল। অর্ক বলল, সরি। আসলে আমার একটা কাজ ছিল। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন না।

নায়লা একটা চেয়ার টেনে অর্কর মুখোমুখি হয়ে বসে বলল, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।

কি কথা বলুন।

আমি মনে হয় আপনাকে ঝামেলার মাঝে ফেলে দিয়েছি। আর নতুন করে আপনার কোন ঝামেলা হোক আমি তা চাইনা। আমি চলে যাচ্ছি।

অর্ক এই কথা শোনার পর পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। এই বোকা মেয়ে এখন এতো গুছিয়ে কথা বলছে কি করে? আর এত সাহসই বা পায় কোথা থেকে? অর্ক বলল, চলে যাচ্ছেন মানে কি? কোথায় যাচ্ছেন? কার সাথে যাচ্ছেন?

নায়লা বলল, মামাকে ফোন করে ট্রেনের একটা টিকেটের ব্যাবস্থা করিয়েছি। স্টেশনে মামার একজন বন্ধু থাকবে নাম আকমল হোসেন। উনাকে গিয়ে মামার কথা বললেই টিকেট-টা আমার হাতে দিয়ে দেবে।

অর্ক বলল, এসবের মানে কি? আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি মনে হয় আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাই না?

না। না… আসলে আমি আপনাকে আর ঝামেলার মাঝে ফেলতে চাচ্ছি না।

তাই বলে…

আমাকে ভুল বুঝবেন না প্লিজ।

অর্ক মনে মনে বলল, না ভুল বুঝছি না। আপনি বরং আমার উপকারই করলেন।

নায়লা বলল, আপনিতো আমার জন্য অনেক করেছেন। আরেকটু সাহায্য করবেন?

হ্যা বলুন কি সাহায্য করতে হবে?

আমার ট্রেন রাত ৯:১০ শে ছাড়বে। স্টেশনে একা যেতে হবে ভেবেই ভয় করছে। আসলে একা একা কোনদিন কোথাও যাইনিতো। তাছাড়া এখানে স্টেশনটা কোথায় আমি তাও জানিনা। আপনি একটু কষ্ট করে আমাকে স্টেশনে পৌছে দেবেন?

অর্ক বলল, আপনি স্টেশনে একা যেতে ভয় পাচ্ছেন। একা একা চিটাগং যাবেন কি করে? তখন ভয় করবে না?

নায়লার মুখ চুপসে গেছে। সে কিছু বলছে না। তার চোখ মুখ দেখে পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে সে তার ট্রেন ভ্রমনের প্রতিটা মুহুর্ত ভয়ে ভয়ে কাঁটাবে।

অর্ক মনে মনে বলল, হে রুপবতি! তোমাকে একা যেতে দিতে আমারও কেন জানি ইচ্ছে করছে না। রেখে দেব যে তারও উপায় নেই। বাবার কড়া নির্দেশ আমাকে আজই গৃহত্যাগী হতে হবে। তোমাকে কতটুকু সাহায্য করতে পেরেছি বা পারব জানিনা। তবে বাবার কাছে মস্ত বড় অন্যায় করে ফেলেছি। যার কোন ক্ষমা নেই।

কি ভাবছেন? পৌছে দেবেন না আমাকে?

ভাবছি আপনাকে একা ছাড়া ঠিক হবে কিনা। কিন্তু এখন ভেবেও কোন লাভ নেই। আপনি নিজেই সব ঠিক করে ফেলেছেন। চলুন আপনাকে পৌছে দিচ্ছি।

থ্যাং ইয়্যু।

 

চলবে…

#৪

২৫৮জন ২৫৮জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য