“নারীর কোন সহজাত অযোগ্যতা নেই, তাঁর সমস্ত অযোগ্যতা পরিস্থিতিগত, যা পুরুষের সৃষ্টি বা সুপরিকল্পিত এক রাজনীতির ষড়যন্ত্র।”
———- হুমায়ুন আজাদ।

আমাকে অনেকেই নারীবাদী হিসাবে চিহ্নিত করেন। মূলত ‘নারীবাদ’ বলতে কি বুঝায়, স্পষ্টত সে ব্যাখ্যাটাই আমার অজানা। আমি লিখি। যখন যা মনে আসে তাই লিখি। শুধু চেষ্টা করি লিখতে গিয়ে স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে লিখার। এছাড়া সে লিখায় পক্ষ-বিপক্ষ বিবেচনায় নেই না। লিখতে গিয়ে কখনো ভাবি না, এ লিখায় কে চটে গেলো বা কারা খুশিতে বগল বাজালো। এমনকি লিখতে বসে এটাও ভাবি না, এভাবে লিখলে ‘লাইক’ বেশি পড়বে বা ওভাবে লিখলে ‘ফোকাস’ বেশি হবে। শ্রেফ সমাজ ভাবনা থেকেই লিখি। নিজের ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতোটুকু সম্ভব তুলে ধরি। নিজস্ব গণ্ডির ভেতরে থেকেই নিজের একান্ত মনের ভাবনাটুকুই ফুটিয়ে তুলি।

ফেসবুকে আমার বন্ধুতালিকায় মিনিমাম ৩৫% সাইলেন্ট রিডার। অনেক নামীদামী, শুধীসমাজে সজ্জন ব্যক্তিকেও দেখেছি সাইলেন্ট রীডার তো দূরের কথা, প্রতি স্ট্যাটাসে স্ট্যাটাসে ‘লাইক’/’কমেন্ট’ না করলে নির্দ্বিধায় ঝেড়ে ফেলে দেন। আমিও নিজেও এর শিকার। এক সেলিব্রেটি তাঁর স্ট্যাটাসে শুধু ‘লাইক’ দেই, কিন্তু ‘কমেন্ট’ করি না এই অপরাধে মাসখানেক আগে আমাকেও ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। আমি কোন অভিযোগ করিনি। করার প্রয়োজনও বোধ করিনি। আমি বুঝে নিয়েছি আমার অপরাধ! কিন্তু দুর্ভাগ্য তিনি সেলিব্রেটি হলেও তাঁর জ্ঞানের গভীরতা দিয়ে তিনি অনুভব করতে পারেন নি যে, চুনোপুঁটিরা সেলিব্রেটিদের সমীহ করেও অনেক সময় ‘কমেন্ট’ করা থেকে বিরত থাকে। চলতে চলতে একটা সময় হয়তো ইজি হয়ে যেতো। কিন্তু হায়! তিনি আমায় সে সময়ও দেন নাই। আমি সাধারনত খুব কম মানুষকেই বন্ধু তালিকায় আমন্ত্রণ জানিয়েছি। সেই খুব কম মানুষের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। যাহোক, যা বলছিলাম। সাইলেন্ট রীডার। হ্যাঁ, আমি তাদের তালিকা থেকে সরিয়ে দেই না কারণ, আমি জানি তারা আমি যাই লিখি না কেনো, পড়েন। মূলত পড়েন যে এটাই আমার কাছে মূখ্য। যারা অযথাই ঘুমন্ত অবস্থায় (৪/৬ মাস পড়ে উদয় হন এমন ব্যক্তি) তালিকায় জায়গা দখল করে আছেন অনুভব করি, কেবল তাদেরকেই কাট করি।

যাহোক, ধান ভানতে শীবের গীত গেয়ে লাভ নেই। যা বলবো বলে লিখতে বসেছি, নারীর সহজাত অযোগ্যতা।
হ্যাঁ, বাস্তবতা তাই। গত প্রায় এক বছরে আমার কর্মস্থল থেকে চার চারটি মেয়ে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো। আর দুজন যাই, যাচ্ছি অবস্থা! তারা সকলেই দারুণ মেধাবী এবং কর্মস্থলে ভীষণ এক্টিভও ছিলেন। তবে কি সে কারণ? কেনো তারা যথাযথ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মস্থলে নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার কথা বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন?
কারণ একটাই। পরিস্থিতিগত। পরিস্থিতিগত কারণেই তাদের ফিরে যেতে হলো এবং তা আরো মহৎ কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে। মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে।
কি সে মহৎ কাজ?
মহৎ কাজটি হচ্ছে জাতি গঠণে ভূমিকা রাখতে। আগামীর পৃথিবীকে সুন্দর করতে। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। হ্যাঁ, তারা আগামীর ভবিষ্যতকে লালনপালন করতেই ঘরে ফিরে গিয়েছেন। এই যে ঘরে ফিরে যাওয়া, এটা কি তার অযোগ্যতার কারণে যেতে হয়েছে? এই যে আজকের পৃথিবীকে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের পিছনে শ্রম-ঘাম যেমন দিয়েছেন বাবা তেমন দিয়েছেন মা। কেউ দিয়েছেন মাথার উপর ছায়া, কেউ দিয়েছেন বুকের ওম। শুধু ছায়াতে যেমন মানবশিশুর বিকাশ ঘটে না, তেমনি শুধু ওমেও তার পূর্ণতা আসে না। তাইলে কেনো শুধু শুধু ঘরে থেকে সন্তান লালনপালনকারী নারীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেখা হয় বা কেনই বা বলা হয় কর্মক্ষেত্রে নারী পারফেক্ট না?

তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণে নারী আজ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে সংকল্পবদ্ধ। এতে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বেগবান হলেও আগামীর শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আবার কর্মক্ষেত্রে অযোগ্যতা ঘোচাতে মেধা বিকাশে মনযোগী নারী সন্তানের প্রতি অবহেলা করছে, যা মানবশিশুর পরিপূর্ণ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আলটিমেটলি ক্ষতিগ্রস্ত কারা হচ্ছে? শুধুইই কি ওই সন্তান? শুধুই কি তার মা-বাবা? সমাজ, রাষ্ট্র তথা দেশ নয়?
তাহলে কেনো সবসময় নারীকে কোণঠাসা করে রাখা হয়? কি ঘরে, কি বাইরে? উপার্জনক্ষম না হলে ঘরে সে গুরুত্বহীন যদিও সে অর্ধাঙ্গিনী।
আবার কর্মস্থলেও তাকে কথা শুনতে হয় নিয়মের ভেতরে থেকেই প্রয়োজনীয় ছুটিছাটা নিতে গেলে। কারা কথা শুনায়? সহকর্মী? না। বয়স এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয়কারী লোকজনেরাই। এমন নয় যে, নিয়ম বহির্ভূতভাবে ছুটি নিয়ে কথা! একই পরিমান ছুটি অনেকসময় পুরুষ কর্মীরাও নিয়ে থাকেন জরুরী প্রয়োজনে।
আর মেটারনিটি লীভ? সে তো রাষ্ট্র আইনি কাটামোতেই বেধে দিয়েছে। রাষ্ট্র জানে, কেনো নারীর ছ’মাস মেটারনিটি লীভ দরকার। কারণ, রাষ্ট্র কর্মজীবী মা থেকে একটি সুস্থ/পূরনাঙ্গ নাগরিক পেতে চায়। মেডিকেল সাইন্স বলে, ছ’মাস মাতৃদুগ্ধ একটা মানবশিশুর মানসিক বিকাশে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

চলবে…….

৩৫৩জন ৩৫৩জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

  • নীলাঞ্জনা নীলা

    একজন নারীকে দশভূজা বলা হয়ে থাকে। দুটি হাত নিয়ে একই সাথে দশটি কাজ সম্পন্ন করে। আবার বিসর্জনও তাকেই দিতে হয়। এমনকি সহনশীলতা, ধৈর্য, আত্মত্যাগ সবকিছুকে একসাথে নিয়েও চলতে হয়। বিশ্বের বহু দেশেই নারীদের অবস্থান দরোজার পাপোষের মতো। আর আমাদের দেশে তো আরোও বেশি। বদল হবেনা আপু। বরং দিন কে দিন বেড়ে চলছে। জানিনা সামনে কি আছে!

    আমার ছেলেটা যখন পৃথিবীতে এলো, চারমাস ছিলো মেটার্নিটি লিভ। তারপর প্রায়ই অসুস্থ হলে ছুটি নিতে হতো। প্রিন্সিপাল বলে ফেললেন এভাবে ছুটি নিলে তো হবেনা। আর এখানে পরিবার আগে। কাজের মধ্যে ফোনে কথা বলা নিষেধ। কিন্তু সন্তানের ফোন এলে যতোই ইম্পোর্টেন্ট কাজে থাকা হোকনা কেন, অগ্রাধিকার পায় সন্তানই। সেই দেশই উন্নত যে দেশে নারীর যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

    পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম রুবা’পু।

  • মোঃ মজিবর রহমান

    আর মেটারনিটি লীভ? সে তো রাষ্ট্র আইনি কাটামোতেই বেধে দিয়েছে। রাষ্ট্র জানে, কেনো নারীর ছ’মাস মেটারনিটি লীভ দরকার। কারণ, রাষ্ট্র কর্মজীবী মা থেকে একটি সুস্থ/পূরনাঙ্গ নাগরিক পেতে চায়। মেডিকেল সাইন্স বলে, ছ’মাস মাতৃদুগ্ধ একটা মানবশিশুর মানসিক বিকাশে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

    আসলে রুবা আপু আমরা কাজ করি আর না করি কিছু বাড়তি গীত না গেলে ঘুম আসে না এই বিসয়ে যারা বলে তাঁরা সেরকমই তাঁরা আমার কাছে সমাজের কীট। এরা সমালচনা করতেই যানে কাজে নয়।
    এইত কিছুদিন আগে একটি পোষ্ট পড়লাম যারা ইন্ডিয়ায় চিকিৎসা নিতে যাই তাঁরা নাকি দেশের চিকিৎসা ব্যাবস্থা ধুস্ব করছে। কাকে কি বুঝাবেন কি বুঝবে।

  • নীরা সাদীয়া

    একদম মনের কথাগুলো বলেছেন। আজকাল পুরুষরা অাবার বলে বেড়ায়, নারী থাকবে ঘরে, কেন তার বাহিরে কাজ করা দরকার? কেন সে সমান অধিকার চায়? কিন্তু তাদের হেলা আর তাচ্ছিল্যই আজ নারীকে টেনে বের করেছে। ফলে অণু পরিবারগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। চলতে থাকুক, আরো লিখবেন এ বিষয়ে, সে আশাবাদ রইল।

  • নীহারিকা

    দারুন লেখা। কিন্ত সমস্যা হলো এসব বলে বলে চিৎকার করে মেয়েরাই। এখনো পর্যন্ত কোনো বড় লেখক এ বিষয়গুলি নিয়ে তেমন লেখেন না। কর্মক্ষেত্রে কি অন্য জায়গায় নারীর চলাচলের, অবস্থানের স্বাভাবিক পরিবেশ এখনো নেই এদেশে। এসব কবে হবে জানি না….

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ