ছাত্রী হেনস্তার ঘটনায় উত্তাল বিক্ষুব্ধ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। “গত ১৭ জুলাই রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রীতিলতা হল সংলগ্ন এলাকায় ৫ জন দুর্বৃত্তের হাতে শারীরিক হেনস্তার শিকার হন এক ছাত্রী” {সূত্রঃ আজাদী, ২৩ জুলাই’২২}। বখাটেরা ওই ছাত্রী

এবং তার সাথে থাকা বন্ধুকেও মারধর করে এবং তাঁদের মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। দুঃখের বিষয়, তাদেরকে ওই জায়গা থেকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে তাঁকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে বলেও জানান ভুক্তভোগী ছাত্রী। তিনি হাটহাজারী থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।  গত ২২ জুলাই পর্যন্ত দুইজনকে শনাক্ত করা হলেও কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। “নারীর প্রতি সহিংসতা যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে মাত্রাগতভাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না বলেই নারী ও শিশু লাঞ্ছনার ঘটনা বেড়ে চলেছে। ধর্ষণ বাড়ছে, বাড়ছে ধর্ষণের পর হত্যা। একই সঙ্গে বাড়ছে নিষ্ঠুরতা। বিচারহীনতা ধর্ষণকারীদের উৎসাহিত করছে” { সূত্রঃ আজাদী, ২৩ জুলাই’২২}। পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে নগরে ধর্ষণের মামলা হয় ১০৮টি, ২০১৮ সালে ১৩০, ২০১৯ সালে ১৯৫, ২০২০ সালে ২৪৮, ২০২১ সালে ২৫১টি এবং ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৪২টি। অর্থাৎ প্রতি বছরই বেড়েছে ধর্ষণের ঘটনা।

গত ২৩ জুলাই তারিখে পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবর থেকে জানা যায়, গত ৭ জুলাই এক নারী চিকিৎসক দাঁতের চিকিৎসা নিতে গিয়ে ডেন্টাল সার্জনের ব্যক্তিগত চেম্বারে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ করেন। তাঁরা দুইজনই চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত। পাশাপাশি “গত ২১ জুলাই নগরীর সদরঘাটে আপন চাচাতো ভাইয়ের হাতে ১৫ বছরের এক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে । ১৯ জুলাই মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার সময় রাঙামাটি সরকারি কলেজের পার্শ্ববর্তী টিটিসি সংলগ্ন এলাকায় ছেলে বন্ধুর সাথে বেড়াতে যাওয়া এক পাহাড়ি কলেজ ছাত্রীকে তিন জন বাঙালি সেটলার যুবক জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসে এক ছাত্রীকে যৌন হেনস্তা ও তার বন্ধুকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। নগরীর জিইসি এলাকায় রোববার (১৭ জুলাই) রাত ১টার দিকে রিকশাযোগে ষোলশহরের দিকে যাওয়ার সময় এক গৃহবধূকে ৩ যুবক রিকশা থেকে নামিয়ে ফ্লাইওভারের নিচের একটি টং ঘরে নিয়ে আরো তিনজনসহ মোট ছয় জন তাকে সেখানে ধর্ষণ করে। ২৭ জুন বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় এক শিশুকে (৫) ধর্ষণের অভিযোগে বদরুল আলম (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২৩ জুন বরিশাল থেকে স্বামীর খোঁজে দেবরের সাথে চট্টগ্রাম আসার পথে স্টিমারে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নারী। সাথে থাকা ৪ মাসের বাচ্চাকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে দেবরসহ ৩ জন মিলে রাতভর ওই নারীকে ৭ দফা ধর্ষণ করে। পরে চট্টগ্রাম এনে তাকে একটি বাসায় নিয়ে গিয়ে আবারও ধর্ষণচেষ্টা করে তারা। এ সময় রক্তক্ষরণ শুরু হলে তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে যায় ধর্ষকরা। ১৯ জুন এক নারী চট্টগ্রাম আদালতে যেতে দুপুরে অক্সিজেন মোড় থেকে একটি বাসে উঠেছিলেন অন্য কোনো যাত্রী না থাকায় বাসে তাকে ধর্ষণ করা হয়। ৪ জুন বোয়ালখালীতে ৯ম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী (১৪) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৩১ মে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে চট্টগ্রাম থেকে এক বান্ধবীকে নিয়ে কক্সবাজারে ছুটে গিয়েছিল দশম শ্রেণির স্কুল শিক্ষার্থী সামিহা আফরিন মৌ (১৬)। কিন্তু প্রতারক সেই প্রেমিক মৌর সঙ্গে দেখা করেনি। সেখানে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে একটি হোটেলে তুলে সেখানকার টমটম চালক। হোটেলে ধর্ষণের শিকার হয় মেয়েটি। পরদিন মৌকে চট্টগ্রামের বাসে তুলে দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে বকাঝকা করে। আর এ সব ঘটনা সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে সে। ১৮ মে আনোয়ারা উপজেলায় কবিরাজি চিকিৎসার জন্য বৈদ্যর কাছে যাওয়ার পথে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের সলিমপুর পাক্কার মাথা এলাকায় বাক প্রতিবন্ধী এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ৭ মে বিকেলে। ৬ মে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে রৌফাবাদ এলাকা থেকে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ১৮ এপ্রিল মীরসরাইয়ের ধুমঘাট ব্রিজ এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা নারীর লাশের পরিচয় জানতে সক্ষম হয়েছে রেলওয়ে থানা পুলিশ। আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী ওই নারী কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা বলে জানিয়েছে তারা। ওই নারী মৃত্যুর আগে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ১৩ মার্চ হালিশহরে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রীকে (১৪) হাত-পা বেঁধে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি সাতকানিয়ায় খালা-ভাগ্নিকে একসঙ্গে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে” {সূত্রঃ আজাদী, ২৩ জুলাই’২২}। উপরোক্ত ঘটনাগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। মাথা হেট হয়ে যায়। নারীর প্রতি হেনস্তা সহিংসতা আমাদেরকে শঙ্কিত এবং আতঙ্কিত করে তুলছে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের হওয়া অর্ধশতাধিক মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই শিশু, কিশোরী এবং তরুণী। যাদের বয়স পাঁচ থেকে ২৫ বছর। শতকরা হিসাবে ৬০ শতাংশের বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন এ সব বয়সের নারী। তারা হয় ফুসলিয়ে ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নতুবা জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। ধর্ষণের মামলায় শাস্তি বাড়ানো হলেও কমছে না এ অপরাধের সংখ্যা। উল্টো দিন দিন বাড়তির দিকে”। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ জাতীয় অপরাধ আগেও ঘটত। এখন তার কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকাশও পাচ্ছে ব্যাপক হারে। এ জন্য দায়ী অনেকগুলো ফ্যাক্ট। আর অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করায় ঘৃণিত এই সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিরোধ না করা গেলে সামনের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। “সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেনের মতে, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা। মানুষের মধ্যে যে আদিম প্রবৃত্তি, তা দমিয়ে রাখতে হলে শৈশব থেকে বা পরবর্তীতে স্কুল কলেজে যথাযথ জ্ঞান চর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে” {সূত্রঃ আজাদী, ২৩ জুলাই’২২}।

আমাদের দেশে শিশু নারী শিশু নির্যাতন ধর্ষণের জন্য আইন আছে তবে আইনের কঠোর প্রয়োগ নেই। পাশাপাশি অর্থ বিত্ত্ব প্রভাব প্রতিপত্তি বিবিধ আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক কারণে আইনের সঠিক সুষ্ঠু এবং নির্মোহভাবে প্রয়োগে বিরাট বাঁধা। তদন্ত কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ অভাব, সাক্ষিদের সাক্ষ্য প্রদানের অনীহা বা আর্থিক লোভের কারণে বিপথগ্রস্ত হওয়া বা তদন্ত কর্মকর্তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে আইনের সঠিক প্রয়োগ হয়না। পারিবারিক ধর্মীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং অনুশাসনের মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়াতে হবে।  আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার পাশাপাশি মানবিক ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধ এবং আদর্শের অবক্ষয় রোধ করাটাও জরুরি। উন্মুক্ত অশ্লীল অপ ও বিজাতীয় এবং আকাশ সংস্কৃতি বিকৃত যৌন আগ্রহের সৃষ্টি করছে সমাজে। গোড়ায় রয়েছে পারিবারিক শাসন এবং তদারকি জোরদার করা। আমরা আশা করি রাষ্ট্র সঠিক আইনের প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা হেনস্তা প্রতিরোধে ভুমিকা রাখবে। আমাদের কন্যা মা বোনদের নিরাপদ আবাস স্থল হবে রক্তের দামে কেনা স্বাধীন স্বদেশ বাংলাদেশ।

তারিখঃ ২৩/০৭/২২ ইংরেজি।

১২৩জন ৮৯জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ